বিশ্লেষণে বঙ্গবন্ধু – পর্ব ৪

Comments

চতুর্থ পর্ব

। আনিস আহমেদ ।

আইয়ুব খানের পতনের পর, ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করলেন বটে কিন্তু ইয়াহিয়া ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা এটা বুঝতে পারছিলেন যে এবার পাকিস্তানে একটি সাধারণ নির্বাচন দিতেই হবে। তারা ভেবেছিল ‘৫০ এর দশকে পাকিস্তানে নির্বাচিত সরকার নিজেদের মধ্যে দলীয় বিভেদের কারণে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল, সেই ভাবে বোধ হয় এবারও রাজনৈতিক দলগুলো ব্যর্থ হবে। অতএব, বোকার স্বর্গে বাস করা পাকিস্তানের সামরিক শাসক ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দিল। কিন্তু তারা এটা অনুধাবন করতে পারেনি যে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের যে বিপুল জনপ্রিয়তা অবিচ্ছিন্ন অনুভূতির জন্ম দিয়েছে তাতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। 

অন্যদিকে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে পিপলস পার্টির জনপ্রিয়তাও সেখানকার অন্য সব দলকেও ছাড়িয়ে গেল। পূর্ব পাকিস্তানে এই নির্বাচন নিয়ে সন্দিহান ছিলেন কেউ কেউ। মওলানা ভাসানী দিয়েছিলেন ‘ভোটের আগে ভাত চাই’ স্লোগান কিন্তু তাতে বাঙালী তেমন কর্ণপাত করেনি। বঙ্গবন্ধু জানতেন ভোটে জয়লাভ করলে ভাতের ব্যবস্থাও নিশ্চিত হবে। 

বঙ্গবন্ধুও নির্বাচনে তাঁর দলকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন। ‘এর কারণ এ নয় যে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে উদগ্রীব ছিলেন কারণ তিনি জানতেন পাকিস্তানিরা কখনই বাঙালীর হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা ছেড়ে দেবে না। ১৯৫০ এর দশকের মতো তারা রাজনৈতিক কূটচালও চালতে পারবে না কারণ বাঙালির হাতে রয়েছে ৬-দফা প্রস্তাব যা বাহ্যত বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসনকে (প্রকৃতঅর্থে স্বাধীনতাকে) সুনিশ্চিত করবে। ৬-দফা  সম্পর্কে পাকিস্তানের সামরিক সরকার অবগত ছিল কিন্তু তারা ভেবেছিল মুজিব নির্বাচনে যদি জয়লাভ করেন, তা হলে তিনি সম্ভবত ক্ষমতায় যাবার জন্য আপস করবেন। পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের মানুষকে বাহ্যত সন্তুষ্ট করার জন্য ১৯৭০ ‘এর নির্বাচনের আগে ইয়াহিয়া খানের সামরিক প্রশাসন Legal Framework Order (LFO)  জারি করে।  তাতে পশ্চিম পাকিস্তানকে আবার চারটি প্রদেশে বিভক্ত করা হয় এবং আনুপাতিক হারে সংসদে আসন বিতরণের বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয় যা সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ছিল ন্যায়সঙ্গত। এই আদেশের দুএকটি ধারা যেখানে পাকিস্তানের আঞ্চলিক অখণ্ডতার কথা বলা হয়েছে তা বঙ্গবন্ধুর সুদূর প্রসারিত স্বপ্নের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল, সেটি কৌশল করেই বঙ্গবন্ধু এড়িয়ে যান। কারণ তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে এই  নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে যাচ্ছে আর তখন বৈধভাবেই তিনি বাঙালির সার্বিক অধিকার রক্ষার জন্য পদক্ষেপ নিতে পারবেন।

সত্তরের নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল, ভোলায় মারাত্মক এক ঘূর্ণিঝড়ে আনুমানিক চার লক্ষ লোক প্রাণ হারান। নিহতদের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ছিল সবচেয়ে বড় প্রাণনাশী ঘূর্ণিঝড়। এই দুর্যোগের সময়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের মানুষ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে। বিদেশ থেকেও সাহায্য আসে প্রচুর। কিন্তু পরিহাসের ব্যাপার হলো, এই প্রলয়ঙ্কারী দুর্যোগে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে তেমন কোনো সহায়তা আসেনি। ওই সময়ে পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান বিদেশ সফরে চলে যান, বাংলাদেশের মানুষকে দেখতে আসেননি, কোনো রকম সহানুভূতিও প্রকাশ করেননি। 

এই অবস্থা বাংলাদেশের মানুষের মনে বিপুল ক্ষোভের সঞ্চার করে, তারা আবার উপলব্ধি করলো যে অবাঙালি শাসিত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার কোনোভাবেই বাঙালির দুঃসময়ে সাড়া দেবে না। ক্রমশই দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের জনগণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রতি অগাধ আস্থা আনলো। তারই প্রতিফলন দেখি ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে। পুরো পাকিস্তানের মোট ৩১৩টি আসনের অনুপাতে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি পায় ৮১টি আসন যা আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত আসনের অর্ধেকেরও কম।

পাকিস্তানের টনক নড়ে। বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে তারা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। ডিসেম্বরে নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর, তারা পরের বছর মার্চ মাসে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকে আর তাতেই বোঝা যায় যে বাঙালির এ বিপুল বিজয়ে তারা শঙ্কিত, বাহ্যত নানান কারণে অধিবেশন আহ্বান করাতে এই বিলম্ব। কিন্তু নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করলেন যে আগে এটা ঠিক করতে হবে যে ৬ দফার ব্যাপারে তাঁর নিজের দলের কেউ যেন কোনো রকম আপসের পক্ষে না যায়। অতীতে, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করার আগে, বেসামরিক সরকার পতনের পেছনে দলীয় আনুগত্য পরিহার করে সংসদে অন্য দলে ভিড়ে যাওয়ার ঘটনা দায়ী ছিল। বঙ্গবন্ধু সেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এসেছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সকল নব-নির্বাচিত সদস্যকে নিয়ে একটি জনসভার আয়োজন করেন। বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্য ছিল জনতার সামনে এদেরকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করা যে তারা যেন কোনোক্রমেই, কোন প্রলোভনেই ৬-দফা প্রস্তাবের বিষয়ে আপস না করেন। এই প্রস্তাবের সঙ্গে অবশ্য শিক্ষার্থীদের ১১ দফা প্রস্তাবও সংযোজিত ছিল। তিনি এটিও পরিষ্কার করে বলেন যে ৬-দফা প্রস্তাব তাঁর নয়, আওয়ামী লীগেরও নয়, প্রস্তাবটি বাংলাদেশের জনগণের। এই শপথবাক্য পাঠ করানোর মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু বস্তুত বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে জনগণকে নিয়ে গেলেন।

(পরবর্তী পর্ব ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫-এ প্রকাশিতব্য)

লেখক:
Anis Ahmed
আনিস আহমেদ
শিক্ষক, নিবন্ধকার ও বেতার সাংবাদিক; ওয়াশিংটন ডিসি

*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

ঐতিহাসিক সেই ভাষণের শ্রুতিলিখন পাঠ করুন:
মহাকাব্য: ৭ মার্চ ১৯৭১

উত্তাল মার্চের আর সব দিনগুলো:
পড়ুন –

১ মার্চ ১৯৭১
২ মার্চ ১৯৭১
৩ মার্চ ১৯৭১ 
৪ মার্চ, ১৯৭১
৫ মার্চ, ১৯৭১

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট