বৃত্তায়ীত নষ্টবৃত্ত । ডা. নাজমুল হাসান

Comments

বৃত্তায়ীত নষ্টবৃত্ত: ছাই দিয়ে গু ঢেকে রাখা গণতন্ত্র
*
কেনাকাটায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের দুর্নীতির মহোৎসব এবং হরিলুট রূপপুরের কেনাকাটার দুর্নীতির মচ্ছবকে শিশুতোষ প্রমাণ করেছে। ১১৬টি যন্ত্র ক্রয়ে ৪১ কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। আমি মাত্র দুটি উল্লেখ করছি-

– ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি হেডকার্ডিয়াক স্টেথোসকোপের দাম দেখানো হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা।
– যুক্তরাষ্ট্র থেকে এরকম ৪টি স্টেথোসকোপ আনতে ব্যয় দেখানো হয়েছে সাড়ে ৪ লাখ টাকা।

সরকারি কেনাকাটায় শতভাগ ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়; কোনোটি বড়, কোনোটি ছোট- দুর্নীতিহীন কোনো কেনাকাটা হয় না। এটি অনুভূত বাস্তবতা, প্রমাণসাপেক্ষ নয়। এরমধ্যে দুয়েকটি দুর্নীতির কাহিনী মাত্র প্রচারিত হয়, বাকিগুলো প্রচারিত হয় না। প্রচারিত হওয়ার পেছনের কারণ মূলত দুটি-

– ভাগ-বাটোয়ারা এবং বোঝাপড়া নিয়ে সমঝোতা না হ‌ওয়ায় দুর্নীতিবাজদের মধ্যেই কেউ এটিকে খুঁচিয়ে ধরিয়ে দেয়।

– সরকারের অডিট ডিপার্টমেন্টের শতভাগ লোক দুর্নীতিগ্রস্থ। এ কারণে স্বচ্ছ কেনাকাটার বিপদ অনেক বেশি, তাদের টাকা যেহেতু দিতে বাধ্য হতেই হয় সুতরাং উপরি টাকা রাখার ব্যবস্থা করেই কেনাকাটা করতে হয়। স্বচ্ছ কেনাকাটা করলে তাদের উপরি টাকা আসবে কোত্থেকে? এদের আবদার ও চাহিদার পরিমাণ অনেক সময় চুরি করে চোর যতটুকু হজম করেছে তার চেয়েও বেশি হয়ে যায়, ফলে সমঝোতা হয় না। এরা তখন তা প্রচার করে নিজেরা সাধু সাজার ভেক ধরে। শতভাগ ক্ষেত্রে এরা যে ঘুষ খায়, দুয়েকটিকে প্রচার করে নিজেদের কর্মদক্ষতা প্রমাণ করে বাকিগুলোকে হালাল করার পন্থা অবলম্বন করে।

আমাদের সমগ্র রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনাই চোর, যদিও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে জড়িত সকল মানুষ চোর নয়, অনেক ভালো মানুষ আছে। আর একারণেই ভালো মানুষদের বেঁচে থাকাটা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ।

জিডিপি বৃদ্ধি বা বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ গণতন্ত্র ও সুশাসনের নির্দেশক নয়। অনেক বিত্তবান পরিবারে প্রচুর অশান্তি আছে কিন্তু অনেক বিত্তহীন অভাবী পরিবারের শান্তি অনেক বেশি- বিষয়টি এরকম।

যাহোক, দুর্নীতি চলছে, দুর্নীতি মহাসমারোহে চলবে। দুর্নীতি করে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যই এদেশের সকল সিস্টেম, সকল রাজনীতি। দুর্নীতিকে জায়েজ করার জন্য কখনো জিরো টলারেন্স নীতি, কখনো সুশাসন, কখনো উন্নয়ন, কখনো গণতন্ত্র ইত্যাদি নানা ধরনের টোপ প্রচার করে জনগণকে মরীচিকার মধ্যে রেখে, ধোঁকা দিয়ে মহাসমারোহে দুর্নীতি চালিয়ে যাবার জায়গাটিকে মসৃণ রাখা হয় কিন্তু এগুলো সত্য নয়, প্রকৃত‌ও নয়, এগুলো শুধুই ভেক।

প্রকৃত অর্থে এগুলির কোনোটিই যে সত্য নয় সেটি আর কেউ না বুঝলেও আমজনতার কাতারে থাকা প্রতিটি মানুষ প্রতি মুহূর্তে হাড়ে হাড়ে বোঝে। রাষ্ট্রের সকল সিস্টেম সর্বক্ষণ আমজনতাকে ধরে চিবিয়ে-চিপড়িয়ে-নিংড়ে খাওয়ার জন্য হা করে বসে থাকে। অসাবধানবশত একটু সমস্যায় পড়লেই অক্টোপাশের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরে গিলে খায়। তখন বোঝা যায় রাষ্ট্রীয় সিস্টেম কেমন করে ড্রাকুলার মত সাধারণ মানুষের রক্ত শুষে খাচ্ছে। জনগণের তুষ্টি এদের বিবেচ্য নয়। এদের আরাধ্য দেবতা হচ্ছে রাষ্ট্রের পরিচালনা ব্যবস্থার সাথে জড়িত ব্যক্তিগণ, যারা মুখে আমজনতার কথা বললেও প্রকৃত অর্থে সবচেয়ে বড় ঠগ ও জোচ্চর। এদের জনসমর্থনের প্রয়োজন নেই। এদের দরকার জো হুকুম মার্কা একটা সরকারি নষ্টবৃত্ত, যারা পরস্পর পরস্পরের সহযোগী হয়ে রাষ্ট্রকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে সকল প্রকার অর্থ ক্ষমতা ভোগ করবে।

এ রাষ্ট্রব্যবস্থা একটা বিত্তায়ীত নষ্টবৃত্ত। এ রাষ্ট্রব্যবস্থা হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির সাথে জড়িত বড় বড় দুর্নীতিবাজ ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের ব্যাপারে যতটা-না কন্সার্ন তারচেয়ে বেশি কন্সার্ন একটা প্রতিবাদী লেখার লেখককে দমন করতে- ফেসবুক, টুইটার, মিডিয়াকে দমন করতে। ছাই দিয়ে গু ঢেকে রাখা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এটিই বৈশিষ্ট্য।

আমরা অনেক তদন্ত কমিটি দেখি, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট রাষ্ট্রীয় প্রেসনোট এবং বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতার মতোই মিথ্যা। ফলে, এমনও হতে পারে কেনাকাটার দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত কমিটি শেষপর্যন্ত সাপ্লায়ার বা দোকানদারকে দোষী করে রিপোর্ট জমা দেবে- কেন সে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করল সেটিই তার অপরাধ। সে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করার জন্যই সরকারি সংশ্লিষ্ট মহল বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হয়েছে। অসম্ভব তো কিছু নয়, এমনটা হতেই পারে, আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা গণতান্ত্রিক দেশে বসবাস করছি না! জনগণের স্বার্থে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা সবকিছুই করতে পারে। এ বিষয়ে সাম্প্রতিককালের উদাহরণটি আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।

বহুল প্রচারিত সেই ঘটনাটি যেখানে সরকারের একজন যুগ্মসচিব ফেরি আটকে রেখেছিল এবং যে কারণে একজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে, সেই ঘটনায় যুগ্মসচিবকে বাঁচানোর জন্য রাষ্ট্র তদন্ত কমিটির রিপোর্টের নামে কি প্রহসনটাই না করলো! তাহলে নীরবে-নিভৃতে এই দেশের মানুষ সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে কতটা জিম্মি? উন্নত বিশ্বে একটা কুকুরের যে মূল্য আছে আমাদের দেশের প্রশাসনের কাছে একজন সাধারণ মানুষের সে মূল্য নাই।

রাষ্ট্রের সবকিছু নষ্টদের দখলে।

লেখক:
Nazmul Hassan
ডা. নাজমুল হাসান, লেখক, গল্পকার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

*এই  লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.