২ মে ১৯৭১, ভাঙ্গার জান্দী গ্রাম গণহত্যা । মাসুদ রানা

Comments

ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার তুজারপুর ইউনিয়নের একটি গ্রাম জান্দী। ১৯৭১ সালের পূর্বে এই গ্রামের সাথে ভাঙ্গা উপজেলার যাতায়াত ব্যবস্থা তেমন ভালো ছিলনা, ভাঙ্গা হতে ২ কি. মি. দক্ষিণে নওপাড়া নামক স্থান হতে পায়ে হেটে ৩ কি. মি. ভিতরে যেতে হতো, তবে ১৯৭১ সালের পূর্ব পর্যন্ত এই গ্রামকে সবাই মিনি কোলকাতা বলে চিনতো। কারন তৎকালিন সময়ে ফরিদপুরের যত ধনী স্বর্ণের ব্যবসায়ী ছিলো তাদের অধিকাংশই বসবাস ছিল এই গ্রামে, সেই সময় এই গ্রামের একমাত্র যাতায়াত ব্যাবস্থা ছিলো নওপাড়া হতে কাঁচা রাস্তা, কিংবা কুমার নদী খাল ধরে নৌকায়।

২১ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী ফরিদপুর জেলায় প্রবেশ করে, ফরিদপুরের শ্রী-অঙ্গনে হামলা করে ৮ জন সাধুকে হত্যা। এ খবর ফরিদপুরে ছড়িয়ে পরলে ফরিদপুর শহরের হিন্দুরা ফরিদপুর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে থাকে। ফরিদপুরের আন্যতম পরিবহন ব্যবসায়ি টনিক সেন ও তার পরিবার ফরিদপুর শহর ছেড়ে এক নিকট অত্মীয়র কাছে জান্দী গ্রামে আশ্রয় নেন। তিনি ফরিদপুর শহর ছাড়ার পূর্বে ফরিদপুর ফিলিং ষ্টেসন হতে তেল সরিয়ে রেখে আসে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের তার পবিরহন দিয়ে সাহায্য করেন।
পাকিস্তানি সেনারা তার উপরে খিপ্ত হয়ে তাকে খুজতে থাকে। টনিক সেনের ড্রাইভার ইঙ্গুল কাজীর (এমদাদ কাজী) কাছ থেকে টাকা খেয়ে টনিক সেনের অবস্থান বলে দেয়। কথিত আছে, ইঙ্গুল কাজী (এমদাদ কাজী) টনিক সেনের কাছ হতে ৫০০০০ টাকা ঋণ নেন এবং তিনি যানতেন টনিক সেনের কাছে অনেক অর্থ আছে। ঋণের টাকা যেন না দিতে হয় এবং টনিক সেনের সকল টাকা আত্মসাৎ করতে পারে, এই কারনে পাকিস্তানি সেনাদের তার অবস্থান বলে দেয়।

২ মে ভোর ৩টার সময় রাজাকার শাহজাহান মাস্টার, এমদাদ কাজী (ইঙ্গুল কাজী) জৈনক হারুন মেম্বার ও টনিক সেনের ড্রাইভার সহ প্রায় শতাধিক পাকিস্তানি সৈন্য জান্দী গ্রাম ঘিড়ে ফেল।

প্রত্যক্ষদর্শী বাদল চক্রবর্তী বলেন, “আমরা গ্রামের প্রায় ৩০/৪০ জন একত্রিত হয়ে পোদ্দার বাড়ির সামনে দিয়ে পালিয়ে অন্য গ্রামে যাওয়ার চেষ্টা করি। পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের চতুর্দিক হতে ঘিরে ফেলে। আমাদের পাকিস্তানি সৈন্যরা অনেকক্ষন বন্দি করে বসিয়ে রাখে। ওরা বলে “জান্দী কাহা”।

তারা আমাদেরকে টানিক সেনের কথা জিজ্ঞাস করে বলে “টানিক কাহা?” আমার জেটার মাথার চুল পাকা ছিল জেটাকে খুজতে থাকে। পাকিস্তানি সৈন্যরা বলে, “পাক্কা বাবু কাহা?”

আমি তাদের কথা বুঝতাম না। আমার এক কাকা ছিল উনি বলে তোর জেটাকে খুজতেছে। যা ওনাকে নিয়ে আয়। আমি আমার জেটাকে নিয়ে আসি। ওনাকে টনিক সেনের কথা জিজ্ঞাস করে। জেটা টনিক সেন এখানে নাই বলে পাকিস্তানি সৈন্যরা ওনাকে অনেক জোরে একটা থাপ্পড় মারে। পরে পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের সবাইকে রত খোলা দিয়ে গ্রাম হতে বাহির হয়ে যেতে বলে। আমরা সবাই যার যার মত করে ছুটে পালিয়ে যায়।”

সর্ব প্রথম পাকিস্তানি সৈন্যরা, জান্দী গ্রামে টনিক সেনকে ধরতে বণিক পাড়ার আক্রমণ চালায়। টনিক সেনকে ধরে নির্যাতন করে হত্যা করে, বনিক পাড়ায় অবস্থানরত টনিক সেনের পরিবারের ৫ জন সদস্য সহ মোট ১৮ জনকে কালিমাহেনর বাড়ীর সামনে একিত্রত করে তাদের ধুতি দিয় বেঁধে লাইন করে দাঁড় করিয় নির্যাতন করতে থাকে। নির্যাতনের শেষে তাদের গুলি করে, গুলিতে যারা মারা যায়নি তাদের বেয়নেট দিয়ে খুজিয়ে হত্যা করে। ১৭ জন শহীদ হয় একজন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়।

পূজারত আবস্তায় জান্দী গ্রামের মন্দিরের পূরহিদকে মন্দিরের ভিতরে গুলি করে হত্যা করে। মন্দিরের পাশের হিন্দু বাড়ি গুলো হতে পরুষদের ধরে হত্যা করে এবং নারীদের নির্যাতণ করে।

তাদের হত্যা ও নির্যাতন করার পর, ঐ গ্রামে অত্মগোপন করে থাকা হিন্দু পুরুষদের ধরে হত্যা করে। তাছাড়া ছুটা ছুটি করা অবস্থায় গুলি করে আনেকে হত্যা করে। ঐদিনের আক্রমণে গ্রামে প্রায় ৪১ জনের বেশি, পুরুষ শহীদ হয়। অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হয়। ২ মে সকাল ৮ টার দিক, পাকিস্তানি সৈন্যরা ও রাজাকাররা মালামাল লুট করে ভাঙ্গা থানায় চলে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী বিপ্লব মিত্র বলেন, “আমরা আগে জানতে পরে আমাদের গ্রামের সকল মহিলাদের অন্নগ্রামে পাঠিয়ে দেই। রাত ৩-৪ টার সময় আমার বাবা যখন টয়লেট করতে বের হয়। তখন তিান আমাদের বাড়ির পাশদিয়ে, মানুষদের ছুটাছুটি করেত দখে তিনি তাদের বলেন, “তোমরা ছোটাছুটি করছো কেন?” তারা বলেন, “মিত্র বাবু দেখেন পাকিস্তানি সৈন্যরা আসতেছে মিত্র বাবু, তাড়াতারি পালান।”

আমরা ফুকুরহাটি খাল পার হয়ে পাশের গঙ্গাধরদি গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নিই। দূর হতে পাকিস্তানি বাহিনীদের দেখা যাচ্ছিল তবে তাদের পোশাকে চেনা যাচ্ছিল না। তারা যে কামান টেনে আনছিলো তা বোঝা যাচ্ছিল।

প্রথম আক্রমণ হয় বণিকপাড়ায় কালীমোহন সেনের বাড়িতে। সেখানে টনিক সেন ও তাঁর স্বজনেরা আশ্রয় নিয়েছিলেন। টনিক সেনকে গুলি ও বেয়নেট দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তাঁর বাবা উপেন সেন ও দুই ভাগনে শহীদ হন। এর মধ্যে টনিক সেনের ভাগনে সুকেশ সেন ছিলেন ফুটবল খেলোয়াড়। কালীমোহন সেনের বাড়িতে ওই দিন একসঙ্গে ১৮ জন ব্যক্তিকে ধুতি দিয়ে বেঁধে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়। পরে বেয়নেট দিয়ে কোপানো হয়। ১৭ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তবে একজন সেদিনের মতো বেঁচে গিয়েছিলেন। তিনি ব্যবসায়ী রতিকান্ত চন্দ্র।

পরর্বতীতে তাড়া গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি আক্রমণ করে। এই আক্রমণে ৪১ এর বেশী পুরুষ শহীদ হয় তাদের মধ্যে একজন শুধু মুসলিম ছিলেন, বাকিরা সবাই হিন্দু ছিলেন।”
মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য স্মৃতিবহ স্থানের মত জান্দী গ্রামের গণহত্যায় শহিদের গণকবরটি দীর্ঘদিন অসংরক্ষিত অবস্তায় ছিলো। ২০০৬ সালে গণকবরটি সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ২০০৬ সালে গণকরটি সংরক্ষণ করা হয়। তবে শহিদে সঠিক তালিকা করা সম্ভব হয়নি। গণকবরটি সংরক্ষণ করা হলেও এর রক্ষনা-বেক্ষনের কোনো প্রকার ব্যবস্তা গ্রহণ করা হয়নি।

লেখকঃ

কর্মকর্তা, গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র, খুলনা।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট