বেতাল পঞ্চবিংশতি – ত্রয়োবিংশ উপাখ্যান । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

Comments
বেতাল পঞ্চবিংশতি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত প্রথম গ্রন্থ৷ ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাসাগর লল্লুলাল রচিত হিন্দি “বেতাল পচীসী” গ্রন্থের আলোকে এই গ্রন্থ রচনা করেন৷ আপাতদৃষ্টিতে অনুবাদ মনে হলেও তিনি হুবহু অনুবাদ না করে মূল গ্রন্থের আলোকে এটি রচনা করেন৷ বেতাল পঞ্চবিংশতি তাঁর প্রথম গ্রন্থ হলেও এই গ্রন্থে শক্তিশালী গদ্যের লক্ষণ সুষ্পষ্ট ছিল।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর রচিত প্রথম গ্রন্থ ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ বাঙালীয়ানায় ধারাবাহিকভাবে নিয়মিত প্রকাশ।
বেতাল কহিল, মহারাজ!
ধৰ্মপুরে গোবিন্দ নামে ব্ৰাহ্মণ ছিলেন। তাঁহার দুই পুত্র। তন্মধ্যে একজন ভোজনবিলাসী; অর্থাৎ, অন্নে ও ব্যঞ্জনে যদি কোনও দোষ থাকিত, তাহা দুজ্ঞেয় হইলেও, ঐ অন্নের ও ঐ ব্যঞ্জনের ভক্ষণে তাহার প্রবৃত্তি হইত না; দ্বিতীয় শয্যাবিলাসী; অর্থাৎ, শয্যায় কোনও দুর্লক্ষ্য বিঘ্ন ঘটিলেও, সে তাহাতে শয়ন করিতে পারিত না। ফলতঃ, এই এক এক বিষয়ে তাহাদের অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। তদীয় ঈদৃশ বিস্ময়জনক ক্ষমতার বিষয় তত্ৰত্য নরপতির কর্ণগোচর হইলে, তিনি তাহাদের ঐ ক্ষমতার পরীক্ষার্থে, সাতিশয় কৌতুহলাবিষ্ট হইলেন, এবং উভয়কে রাজধানীতে আনাইয়া জিজ্ঞাসিলেন, তোমরা কে কোন বিষয়ে বিলাসী।
অনন্তর, তাহারা স্ব স্ব পরিচয় দিলে, রাজা, প্রথমতঃ ভোজনবিলাসীর পরীক্ষার্থে, পাচক ব্ৰাহ্মণকে ডাকাইয়া, নানাবিধ সুরস অন্ন ব্যঞ্জন প্রভৃতি প্ৰস্তুত করিতে আদেশ দিলেন। পাচক, রাজকীয় আজ্ঞা অনুসারে, সাতিশয় যত্ন সহকারে, চৰ্য্য, চুন্য, লেহ, পেয়, চতুবিধ ভক্ষ্য দ্রব্য প্রস্তুত করিয়া, ভূপতিসমীপে সংবাদ দিল। রাজা ভোজনবিলাসীকে আহার করিবার আদেশ করিলে, সে আহারস্থানে উপস্থিত হইল; এবং, আসনে উপবেশনমাত্র, গাত্ৰোত্থান করিয়া, নৃপতিসমীপে প্ৰতিগমন করিল।
রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন, কেমন, তৃপ্তিপূর্বক ভোজন করিয়াছ। সে কহিল, না মহারাজ! আমার ভোজন করা হয় নাই। রাজা জিজ্ঞাসিলেন, কেন। সে কহিল, মহারাজ। অন্নে শবগন্ধ নিৰ্গত হইতেছে; বোধ করি, শ্মশানসন্নিহিতক্ষেত্ৰজাত ধান্যের তণ্ডুল পাক করিয়াছিল। রাজা শুনিয়া, তদীয় বাক্য উন্মত্তপ্ৰলাপবৎ অসঙ্গত বোধ করিয়া, কিঞ্চিৎ হাস্য করিলেন; এবং এই ব্যাপার গোপনে রাখিয়া, ভাণ্ডারীকে ডাকাইয়া, সেই তণ্ডুলের বিষয়ে সবিশেষ অনুসন্ধান করিতে আদেশ দিলেন। তদনুসারে ভাণ্ডারী, সবিশেষ অনুসন্ধান করিয়া, নরপতিগোচরে আসিয়া নিবেদন করিল, মহারাজ। অমুক গ্রামের শ্মশানসন্নিহিতক্ষেত্ৰজাত ধান্যে ঐ তণ্ডুল প্রস্তুত হইয়াছিল। রাজা শুনিয়া নিরতিশয় চমৎকৃত হইলেন, এবং ভোজনবিলাসীর সবিশেষ প্রশংসা করিয়া কহিলেন, তুমি যথার্থ ভোজনবিলাসী।
অনন্তর, রাজা, এক সুসজ্জিত শয়নাগারে দুগ্ধফেননিভ পরম রমণীয় শয্যা প্রস্তুত করাইয়া, শয্যাবিলাসীকে শয়ন করিতে আদেশ দিলেন। সে, কিয়ৎ ক্ষণ শয়ন করিয়া, নৃপতিসমীপে আসিয়া, নিবেদন করিল, মহারাজ। ঐ শয্যার সপ্তম তলে এক ক্ষুদ্র কেশ পতিত আছে; তাহা আমার সাতিশয় ক্লেশকর হইতে লাগিল; এজন্য শয়ন করিতে পারিলাম না। রাজা শুনিয়া চমৎকৃত হইলেন; এবং, শয়নাগারে প্রবেশপূর্বক, অন্বেষণ করিয়া দেখিতে পাইলেন, শয্যার সপ্তমতলে যথার্থই এক ক্ষুদ্র কেশ পতিত রহিয়াছে। তখন, তিনি, যৎপরোনাস্তি সন্তোষপ্রদর্শনপূর্বক, বারংবার তাহার প্রশংসা করিয়া কহিলেন, তুমি যথার্থ শয্যাবিলাসী। অনন্তর, তাহাদের দুই সহোদরকে, যথোচিত পারিতোষিকপ্ৰদানপূর্বক, পরিতুষ্ট করিয়া বিদায় করিলেন।
ইহা কহিয়া, বেতাল জিজ্ঞাসা করিল, মহারাজ! উভয়ের মধ্যে, কোন জন অধিক প্ৰশংসনীয়। রাজা কহিলেন, আমার মতে শয্যাবিলাসী।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
আরও পড়ুন

বেতাল পঞ্চবিংশতি – দ্বিতীয় উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – তৃতীয় উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – চতুর্থ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – পঞ্চম উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – ষষ্ঠ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – সপ্তম উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – অষ্টম উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – নবম উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – দশম উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – একাদশ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – দ্বাদশ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – ত্রয়োদশ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – চতুর্দশ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – পঞ্চদশ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – ষোড়শ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – সপ্তদশ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – অষ্টাদশ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – উনবিংশ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – বিংশ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – একবিংশ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – দ্বাবিংশ উপাখ্যান

 

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.