বেতাল পঞ্চবিংশতি – বিংশ উপাখ্যান । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

Comments
বেতাল পঞ্চবিংশতি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত প্রথম গ্রন্থ৷ ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাসাগর লল্লুলাল রচিত হিন্দি “বেতাল পচীসী” গ্রন্থের আলোকে এই গ্রন্থ রচনা করেন৷ আপাতদৃষ্টিতে অনুবাদ মনে হলেও তিনি হুবহু অনুবাদ না করে মূল গ্রন্থের আলোকে এটি রচনা করেন৷ বেতাল পঞ্চবিংশতি তাঁর প্রথম গ্রন্থ হলেও এই গ্রন্থে শক্তিশালী গদ্যের লক্ষণ সুষ্পষ্ট ছিল।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের দ্বিশততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর রচিত প্রথম গ্রন্থ ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ বাঙালীয়ানায় ধারাবাহিকভাবে নিয়মিত প্রকাশ।
বেতাল কহিল, মহারাজ!
বিশালপুর নগরে, অর্থদত্ত নামে, ধনাঢ্য বণিক ছিলেন। তিনি, কমলপুরবাসী মদনদাস বণিকের সহিত, আপন কন্যা অনঙ্গমঞ্জরীর বিবাহ দিয়াছিলেন। কিছু দিন পরে, মদনদাস, ভাৰ্যাকে তদীয় পিত্ৰালয়ে রাখিয়া, বাণিজ্যার্থে দেশান্তরে প্ৰস্থান করিল।
এক দিন, অনঙ্গমঞ্জরী, গবাক্ষ দ্বারা, রাজপথনিরীক্ষণ করিতেছে; এমন সময়ে, কমলাকর নামে, সুকুমার ব্রাহ্মণকুমার তথায় উপস্থিত হইল। উভয়ের নয়নে নয়নে আলিঙ্গন হইলে, পরস্পর পরস্পরের রূপলাবণ্যদর্শনে মোহিত হইল। ব্ৰাহ্মণকুমার, নিকাম ব্যাকুল হইয়া, গৃহগমনপূর্বক, প্রিয় বয়স্যের নিকট স্বীয় বিরহবেদনার নির্দেশ করিয়া, বিচেতন ও শয্যাগত হইল। তাহার সখা, উশীরানুলেপন, চন্দনবারিসেচন, সরসকমলদলশয্যা, জলার্দ্রতালবৃন্তসঞ্চালন প্রভৃতি দ্বারা, শুশ্রূষা করিতে লাগিল।
এ দিকে, অনঙ্গমঞ্জরীও, অনঙ্গশরপ্ৰহারে জর্জরিতাঙ্গী হইয়া, ধরাশয্যা অবলম্বন করিলে, তাহার সখী, সবিশেষ জিজ্ঞাসা দ্বারা, সমস্ত অবগত হইয়া, প্ৰবোধদানচ্ছলে, অনেক ভর্ৎসনা করিল। তখন সে কহিল, সখি! আমি নিতান্ত অবোধ নহি; কিন্তু মন আমার প্রবোধ মানিতেছে না। নির্দয় কন্দৰ্পের নিরন্তর শরপ্ৰহারে আমি জর্জরিত হইয়াছি। আর যাতনা সহ্য হয় না। যদি সেই চিত্তচোরকে ধরিয়া দিতে পার, তবেই প্ৰাণধারণ করিব; নতুবা, নিঃসন্দেহ, আত্মঘাতিনী হইব।
ইহা কহিয়া, অনঙ্গমঞ্জরী, অশ্রুপূর্ণ নয়নে, অবিশ্রান্ত দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিতে লাগিল। তাহার সহচরী, কালবিলম্ব অনুচিত বিবেচনা করিয়া, কমলাকরের আলয়ে গমনপূর্বক, তাহাকেও স্বীয় সহচরীর তুল্যাবস্থ দেখিয়া, মনে মনে কহিতে লাগিল, দুরাত্মা কন্দৰ্পের কিছুই অসাধ্য নাই; কি স্ত্রী, কি পুরুষ, সকলকেই, সমান রূপে, স্বীয় কুসুমময় শরাসনের বশবর্তী করিয়া রাখিয়াছে। অনন্তর, সে কমলাকরের নিকটে বলিল, অর্থদত্ত শেঠের কন্যা অনঙ্গমঞ্জরী প্রার্থনা করিতেছে, তুমি তাহারে প্ৰাণদান কর। কমলাকর, শ্রবণমাত্র অতি মাত্র উল্লাসিত হইয়া, গাত্রোত্থান করিল, এবং কহিল, আপাততঃ তুমি, এই অমৃতবৰ্ষী মনোহর বাক্য দ্বারা, আমায় প্ৰাণদান করিলে।
তৎপরে সহচরী, কমলাকরকে সমভিব্যাহারে লইয়া, অনঙ্গমঞ্জরীর বাসগৃহে উপস্থিত হইয়া দেখিল, সে প্ৰাণত্যাগ করিয়াছে। অমনি কমলাকর, হা প্রেয়সি! বলিয়া, দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগপূর্বক, ভূতলে পতিত ও তৎক্ষণাৎ পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইল।
অনঙ্গমঞ্জরীর গৃহজন, আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইয়া, উভয়কে শ্মশানে লইয়া, একচিতায় অগ্নিদান করিল। দৈবযোগে, অর্থদত্তের জামাতা মদনদাসও, সেই সময়ে, শ্বশুরালয়ে উপস্থিত হইল; এবং, নিজ ভার্যা অনঙ্গমঞ্জরীর মৃত্যুবৃত্তান্ত শুনিয়া, হাহাকার করিতে করিতে, উর্ধ্বশ্বাসে শ্মশানে গিয়া, জ্বলন্ত চিতায় ঝম্পপ্রদানপূর্বক, প্রাণত্যাগ করিল।
ইহা কহিয়া, বেতাল জিজ্ঞাসা করিল, মহারাজ! এই তিনের মধ্যে কোন ব্যক্তি অধিক ইন্দ্ৰিয়দাস। রাজা কহিলেন, মদনদাস। বেতাল কহিল, কেন। রাজা কহিলেন, অনঙ্গমঞ্জরী, পরপুরুষে অনুরাগিণী হইয়া, তাহার বিরহে প্রাণত্যাগ করিল; তাহাতে মদনদাসের অন্তঃকরণে অণুমাত্র বিরাগ জন্মিল না; প্রত্যুত, তদীয় মৃত্যুশ্রবণে প্রাণধারণে অসমর্থ হইয়া, অগ্নিপ্ৰবেশ করিল।
ইহা শুনিয়া বেতাল ইত্যাদি।
আরও পড়ুন

বেতাল পঞ্চবিংশতি – দ্বিতীয় উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – তৃতীয় উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – চতুর্থ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – পঞ্চম উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – ষষ্ঠ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – সপ্তম উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – অষ্টম উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – নবম উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – দশম উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – একাদশ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – দ্বাদশ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – ত্রয়োদশ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – চতুর্দশ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – পঞ্চদশ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – ষোড়শ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – সপ্তদশ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – অষ্টাদশ উপাখ্যান
বেতাল পঞ্চবিংশতি – উনবিংশ উপাখ্যান

 

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.