ভাষার ইহজাগতিকীকরণ কেন দরকার

Comments

। অদিতি ফাল্গুনী ।

যেভাবে ‘ওল্ড চার্চ স্লাভোনিক’ থেকে আধুনিক রুশ ভাষার উদ্ভব হয়েছিল

শৈশবে শোনা ঠাট্টা। ওপার বাংলায় নাকি কখনো কখনো ‘অনুষ্ঠানে কেউ সভাপতিত্ব’ করছেন বলতে গিয়ে ‘অনুষ্ঠানে পৌরহিত্য করেন অমুক’ বা ‘আজকের অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে’-র বদলে আজকের অনুষ্ঠান মন্ডপে’ বলা হয়েছে এবং এমনটি ‘আকাশবানী’ বা সেদেশের বেতারেই শোনা গেছে। এটি উড়ো গুজব না সত্য তা’ এত বছর পর নির্ণয় করা কঠিন। তবে, এর দেখাদেখি বাংলাদেশেও কেউ যদি ‘অনুষ্ঠানে ইমামতি করেন অমুক’ বা এজাতীয় কিছু বলেন- তবে কেমন হবে? হালে এমনকি বাংলাদেশের নতুন কবি-লেখকদের অনেকেই সমাজ মাধ্যমে ‘শুক্রবার’কে ‘জুম্মাবার’ লিখছেন। 

না- এখন ভাষার মাস নয়। ‘দৈনিক খবরের কাগজ’-এর মুদ্রিত বাংলা সংস্করণের ‘মতামত’ বিভাগ অবশ্যই রাজনীতি-অর্থনীতি-সমরনীতি-কৃষি-শিল্প সহ নানা প্রয়োজনীয় বিষয়েই কলামের জন্য পরিসর বরাদ্দ করবে। এ সময়ে কেন আমি  ‘ভাষার ইহজাগতিকীকরণ’-এর মত বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হলাম? পৃথিবীর আর দশটা জীবিত ভাষার মত বাংলাও হাজার বছরের নানা জনজাতির পারষ্পরিক সংমিশ্রণে এবং সেই সব জনজাতির বিবিধ শব্দ-ভান্ডার থেকে আহরিত নানা শব্দের সম্মিলনে এক বহতা নদীর মতই সজীব ও জাগ্রত। লাতিন বা সংস্কৃতের মত এই ভাষা মরে যে যায়নি, তার একমাত্র কারণ এই ভাষার ইহজাগতিকা। আর্য-অনার্য-শক-হুণ-পাঠান-মোগল-কোচ-দ্রাবিড়-পারসিক-বর্মী-তুর্কী-আরবি-পর্তুগীজ-ওলন্দাজ-ইংরেজি বা নানা নৃ-গোষ্ঠির হরেক শব্দ-ভান্ডারের অবগাহনে বাংলা আজো তাজা। সমস্যা সূচীত হয় যখন অতিরিক্ত ‘সংস্কৃতায়ণ’ বা অতিরিক্ত ‘আরবি-ফার্সীকরণ’ আমাদের ভাষার সহজ গতিধারাকে ব্যহত করতে চায়। ওপারের কথা বিশদ জানি না। হালে এপারে একদল মূলত: সমাজ মাধ্যমের কবি-লেখকসহ তথাকথিত ‘উগ্র বাম’ ধারার মানুষজন এমন সব আরবি-ফার্সি শব্দের বাহুল্য ভরা লেখা সমাজ মাধ্যমে পোস্ট করেন, যার অর্দ্ধেক অর্থ বোঝা কঠিন। বাংলা যদি শুচিবায়ুগ্রস্থই হতো, তবে আজ আর এই ভাষা জীবিত থাকত না।  সত্যজিত রায়ের ‘বাদশাহী আংটি’-তে সাতাশ বছরের ফেলুদা যেখানে তেরো-চোদ্দর কিশোর কাকাতো ভাই তোপসেকে রহস্য করে বলছে যে একটি চিরকূটে কি লেখা আছে সেটা তোপসে বুঝবে না, কারণ দু’টো শব্দই উর্দূ- অনেক জোরাজুরি করে চিরকূটটি দেখার পর তোপসে কিন্ত অবাক হয়। শব্দ দু’টো হচ্ছে ‘খুব ভাল।’ তারপরই পাঠককে লেখক জানিয়ে দেন যে ‘খুব’ ও ‘ভাল’- এই দু’টো শব্দই মূলত: উর্দূ। কাজেই আমাদের ভাষা সহজভাবেই পৃথিবীর নানা সভ্যতার শব্দ গ্রহণ করেছে। তবে, আজকাল যে কথায় কথায় এক শ্রেণির নেটিজেন ‘তরিকা, নোক্তা, দোহায়, ইজাজত’ জাতীয় বিচিত্র শব্দে সমাজ মাধ্যমে লেখা পোস্ট করছেন, এসব শব্দের অর্থ কী?

গত ৬ই জুন (২০২৬) ঢাকার ধানমন্ডিস্থ রাশান প্রজাতন্ত্রের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ইউনেস্কো-স্বীকৃত ‘ইন্টারন্যাশনাল রাশান ল্যাঙ্গুয়েজ ডে’ উদযাপন করতে গিয়ে দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা অবধি একটি দীর্ঘ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বর্তমানে সেখানে ভাষা শিখছি বলে আমিও সেই অনুষ্ঠানে ছিলাম। সেখানেই একটি সেমিনার পেপারে প্রথম জানতে পারি যে কীভাবে  ‘ওল্ড চার্চ স্লাভোনিক’ থেকে জার পিটার দ্য গ্রেটের মত আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ শাসক ও পুশকিন থেকে লেরমন্তভের মত এক ঝাঁক কবি-লেখকের হাতে আধুনিক-ধর্মনিরপেক্ষ-ইহজাগতিক রুশ ভাষার উদ্ভব হয়! সত্যি বলতে ‘ওল্ড চার্চ স্লাভোনিক’ নামে কোন ভাষা এই গ্রহে আছে বা ছিল, এটা এই সেমিনারে অংশগ্রহণের আগে আমি জানতামই না। কিন্ত, কেন দেশব্যপী বহু খ্রিষ্ট ভক্ত, গির্জাঅন্তপ্রাণ লাখ লাখ নাগরিকের প্রতিবাদের মুখেও জার পিটার দ্য গ্রেট রুশ ভাষার ইহজাগতিকীকরণ বা ‘সেক্যুলারাইজেশনে’ ব্রতী হন? কারণ রুশ ভাষা শুধু তার বিপুল ও সমৃদ্ধ সাহিত্যের গুণেই নয়, পদার্থবিদ্যা থেকে মহাকাশবিজ্ঞানের নানা শাখায় রাশিয়ার যা কিছু আজ অর্জন- নব্বইয়ের দশকে সমাজতন্ত্রের পতনের পর যত ভাঙন আসুক- আজো রাশিয়ার যত কিছু অর্জন তার পেছনে রুশ ভাষার এই ‘ইহজাগতিকীকরণ’ বা ‘সেক্যুলারাইজেশন’-এর অন্যতম নিয়ামক ভূমিকা আছে। 

আসুন, এবার দেখা যাক যে কীভাবে পূর্ব ইউরোপের গির্জা-ঘনিষ্ঠ এবং মূলত: খ্রিষ্ট ধর্মের নানা অনুষ্ঠান ও উপাদানের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ‘ওল্ড চার্চ স্লাভোনীক’ থেকে একটি ‘ইহজাগতিকীকরণ’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আজকের আধুনিক রুশ ভাষার উদ্ভব হয়। অবশ্য একদিনে এই রূপান্তর সম্ভব হয়নি। এই Õইহজাগতিকীকরণ’ প্রক্রিয়া স্তরে স্তরে সম্পন্ন হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় নানা আচার-অনুষ্ঠানের সাথে অন্বিত শব্দাবলীর সাথে স্থানীয় বা লোকায়ত নানা শব্দ জুড়ে একটি ধর্মনিরপেক্ষ বা ইহজাগতিক, বৈজ্ঞানীক ও প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারোপযোগী রুশ ভাষার সৃষ্টি হয়।

ওল্ড চার্চ স্লাভোনিক (ওসিএস)

পূর্ব ইউরোপের এই ভাষা নবম শতকে দুই খ্রিষ্টান সন্ন্যাসী ভাই সিরিল এবং মেথোডিয়াসের হাতে বিকশিত হয় এবং এই ভাষাই গোটা স্লাভিক অঞ্চলের প্রথম স্লাভিক সাহিত্য ভাষা হিসেবে বিবেচিত। সমগ্র স্লাভ অঞ্চল জুড়ে ধর্মীয় নানা পুঁথি এবং প্রার্থনার ভাষা হিসেবে এই ভাষা ব্যবহৃত হতো। এই ‘ওল্ড চার্চ স্লাভোনিক’ থেকেই ‘চার্চ স্লাভোনিক’ নামে আর একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও সাহিত্যের ভাষা হিসেবে স্বীকৃত ভাষার উদ্ভব হয় যা নানা ধর্মীয়, দার্শনিক এবং রাষ্ট্রীয় নথি-পত্রে আঠারো শতক পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়েছে। যদিও এই ‘চার্চ স্লাভোনিক’ কখনোই মানুষের মুখের কথ্য ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি, তবু আজকের রুশ ভাষার শব্দ-ভান্ডার, বাক্যগঠন এবং ভাষাগত শৈলীর নানা প্রেক্ষিতকে প্রভাবিত করেছে। এই ‘চার্চ স্লাভোনিক’-ই একটি দ্বি-ভাষিক প্রেক্ষিত বা আবহ সৃষ্টি করে যেখানে পুরণো পূর্ব স্লাভিক লোকজ ভাষা প্রতিদিনের যোগাযোগের কাজে এবং আনুষ্ঠানিক লেখা-লিখির জন্য ‘চার্চ স্লাভোনিক’ ব্যবহৃত হতে থাকে।  

‘চার্চ স্লাভোনিক’ থেকে ধর্মনিরপেক্ষ রুশ ভাষায় রূপান্তর

রুশ ভাষার ‘ইহজাগতিকীকরণ’ বা ‘সেক্যুলারাইজেশন’ প্রক্রিয়া অবশ্য সূচীত হয় ১৮ শতকে জার ‘পিটার দ্য গ্রেটে’র সময়ে যিনি রাশিয়াকে আধুনিক ও পশ্চিম ইউরোপের মাপে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। রুশ পুরুষদের দাড়ি কাটতে বাধ্য করা বা দাড়ি কাটতে রাজি না হলে দাড়ির জন্য কর আরোপ করা থেকে শুরু করে ১৭০০ সালে নার্ভার কাছে সুইডেনের সাথে যুদ্ধে রাশিয়ার পরাজয়ের পর পাদ্রিদের নিন্দা-মন্দ সত্ত্বেও রাশিয়ার যাবতীয় গির্জা, সন্ন্যাসীদের মঠ এবং কনভেন্ট থেকে বাধ্যতামূলক ভাবে এক-তৃতীয়াংশ ঘন্টার ধাতু ঢালাই করে রুশ সেনাবাহিনীর বন্দুক, কামান তৈরির কাজে নিদের্শ জারি করা জার পিটার ভাষা সংস্কারেও ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

সন্ন্যাসী সিরিলের নামে নামাঙ্কিত রুশ জনতার বহু প্রিয় সিরিলিক বর্ণমালায় পিটারের নির্দেশে চালু করা হলো ‘গ্রাঝদানস্কি শ্রিফট’ বা ‘সিভিল স্ক্রিপ্ট।‘ এই ‘সিভিল স্ক্রিপ্ট’ বা ‘নাগরিক লিপি’-র মাধ্যমে সিরিলিক লিপির জটিলতাকে সরলতর করে, সিরিলিক বর্ণমালার গরিষ্ঠসংখ্যক বর্ণকে ল্যাটিন টাইপোগ্রাফি তথা ল্যাটিন বর্ণমালার সদৃশ একটি চেহারা দেবার চেষ্টা করা হয় যাতে করে পাঠ্য বিষয়াদি ইহজাগতিক এবং প্রশাসনিক কাজে-কর্মে অধিকতর অভিগম্য হতে পারে। জার পিটার প্রবর্তিত এই ‘নাগরিক লিপি’ ব্যবহারের ফলে ডাচ-জার্মান-ফরাসী ভাষা থেকে প্রচুর বৈজ্ঞানিক, প্রশাসনিক এবং প্রযুক্তি-সংক্রান্ত শব্দাবলী আহরণ করা সহজতর হলো এবং রুশ ভাষা তার অতীতের মূলত: ধর্মীয় ও সাহিত্যিক বহিরাবরণের খোলস ঝাড়তে সক্ষম হলো।

লোমানোসভ প্রবর্তিত ত্রয়ী শৈলী 

ভাষাবিদ মিখাইল লোমানোসভও রুশ ভাষার সাহিত্যিক আঙ্গিককে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং এই লক্ষ্যে ‘ত্রয়ী শৈলীর তত্ত্ব’ পেশ করেন: 

উচ্চ শৈলী: চার্চ স্লাভোনিক ভাষার নানা শব্দে সমৃদ্ধ, বীরগাঁথা ও গীতিকবিতার জন্য ব্যবহৃত।

মধ্য শৈলী: স্লাভোনিক ও দেশীয় নানা শব্দের মিশ্রণ যা নাটক, চিঠি-পত্র ও সাধারণ সাহিত্যের জন্য ব্যবহৃত। 

নিম্ন শৈলী: মূলত: দেশী বা লোকজ শব্দে ঠাসা, যা সাধারণত: হাস্য-কৌতুকে এবং ব্যক্তিগত নানা বিবরণ লিখতে ব্যবহার্য।

 লোমানোসভের এই শৈলীই রুশ ভাষাকে একদিকে যেমন তার ‘চার্চ স্লাভোনিক’ ভাষার মর্যাদা ও প্রকাশ ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করেছে, অন্যদিকে ধীরে ধীরে ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক আঙ্গিকেও নানা লোকজ উপাদান গ্রহণ করার সক্ষমতা দান করে, যার ফলে ভাষাটি ইহজাগতিক বা ধর্মনিরপেক্ষ, সাহিত্যিক এবং বৈজ্ঞানিক নানা উদ্দেশ্য পূরণে সক্ষম হয়।  

রুশ ভাষার ইহজাগতিকীকরণের ভাষিক বৈশিষ্ট্য সমূহ: রুশ ভাষার এই ইহজাগতিকীকরণের প্রক্রিয়ায় অন্বিত মূল প্রক্রিয়াগুলো ছিল:

শব্দগত অভিযোজন: পৃথিবীর বা বিশেষত: পশ্চিম ইউরোপের নানা ভাষা থেকে বিজ্ঞান, প্রশাসনিক কাজ-কর্ম এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা পরিচালনায় প্রচুর শব্দ গ্রহণ এবং নতুন শব্দ সৃষ্টি। 

ব্যকরণগত সহজীকরণ: চার্চ স্লাভোনিক ভাষার বাক্য গঠনের জটিলতা হ্রাস করা,

শৈলীগত মিশ্রণ: স্লাভোনিকের জটিল ও অলঙ্কারবহুল শব্দ-ভান্ডারের সাথে লোকজ শব্দের ব্যবহারের মাধ্যমে একটি তুলনামূলক সহজ সাহিত্য আঙ্গিকের সৃষ্টি।

এমনকি আজকের দিনেও আধুনিক রুশ ভাষায় প্রচুর ‘চার্চ স্লাভোনীক’ ভাষার উপাদান রয়েছে। বিশেষত: এর প্রাতিষ্ঠানিক, সাহিত্যিক এবং নানা আনুষ্ঠানিক প্রেক্ষিতে ব্যবহৃত শব্দাবলীর ক্ষেত্রে। তবে, রুশ বাষা আজ ইহজাগতিক বা ধর্মনিরপেক্ষ যোগাযোগের জন্য পরিপূর্ণভাবে কার্যকর যা বহু শতাব্দীর অভিযোজন ও আধুনিকায়নের প্রতীক।

সুতরাং ’ওল্ড চার্চ স্লাভোনিক’ থেকে আজকের রুশ ভাষার এই ইহজাগতিক বা ধর্মনিরপেক্ষ বিবর্তন সম্ভব হয়েছে এক ধারাবাহিক ও বহু-স্তরভিত্তিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। প্রচুর সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং ভাষিক উপাদানের প্রেক্ষিতে এই বিবর্তন সম্ভব হয়েছে। ’চার্চ স্লাভোনিক’ যখন রুশ ভাষার বৌদ্ধিক ও শৈলীগত ভিত্তি গঠন করেছে, তখন ’পিটার দ্য গ্রেট’-এর সংস্কার অভিযান এবং লোমানোসভের অবদানই আজকের আধুনিক, ইহজাগতিক ও সাহিত্যিক রুশভাষার জন্ম দিয়েছে যা প্রতিদিনের ভাব প্রকাশের পাশাপাশি বিশেষায়িত জ্ঞানের সৃষ্টিতেও সক্ষম। পাশাপাশি পুশকিন থেকে লেরমন্তফ- অসংখ্য কবি-লেখকের অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছে আধুনিক রুশ ভাষা ও সাহিত্য। এজন্যই ২০১০ সালে ইউনেস্কো জাতিসঙ্ঘের ছয়টি ভাষাকেই সমান স্বীকৃতি দেবার মানসে ’ইন্টারন্যাশনাল রাশান ল্যাঙ্গুয়েজ ডে’ প্রবর্তন করতে চাইলে রুশরা আজো তাঁদের প্রধানতম কবি আলেক্সান্দর পুশকিনের জন্মদিনেই এই দিনটি প্রবর্তনের প্রস্তাব করেন। যেহেতু পুশকিন একা হাতে রুশ ভাষা ও সাহিত্যকে বহু দূর  ঠেলে নিয়ে গেছেন বলে রুশদের ধারণা।

যেহেতু পুশকিন একা হাতে রুশ ভাষা ও সাহিত্যকে বহু দূর  ঠেলে নিয়ে গেছেন বলে রুশদের ধারণা। 

শুধু রুশ ভাষা বলে নয়, একইভাবে ১৭৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লবের জোয়ারে ল্যাটিন ভাষার ধর্মগন্ধী আবরণ ছেড়ে ফরাসী ভাষার ‘ইহজাগতিক’ বা ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে ওঠা শুরু হয়। জার্মান ভাষার ইহজাগতিকীকরণ তথা আধুনিকায়ণে মহান জার্মান দার্শনিকদের রচনাবলীর আছে বিপুল ভূমিকা। ইংরেজিকেও ল্যাটিনের নিগড় ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পার হতে হয়েছে আদি ইংরেজি-মধ্য(যুগীয়) ইংরেজি- প্রাক-আধুনিক ইংরেজির পর্ব। এতগুলো পর্ব পার হয়ে তবে আজকের আধুনিক ইংরেজির বর্তমান চেহারাটা আমরা পাচ্ছি যার প্রধান উপাদানগুলোর ভেতর রয়েছে জার্মানিক শেকড় (ভিত্তি ব্যকরণ এবং মূল শব্দ-ভান্ডার), ল্যাটিন এবং ফরাসী (আইন, বিজ্ঞান ও ধর্ম সংক্রান্ত নানা শব্দাবলীর আকর), ভাইকিং ও নর্স (ইংরেজি ব্যকরণকে সহজতর করে দৈনন্দিনের অনেক শব্দ যুক্ত করেছে), ঔপনিবেশিক প্রসারণ (বিশ্ব জুড়ে সাম্রাজ্য প্রসারিত করে নানা অঞ্চলের নানা শব্দ গ্রহণ করেছে) এবং প্রযুক্তিগত ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন (অভিবাসন, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও উদ্ভাবনার মাধ্যমে ইংরেজির নয়া নয়া বিবর্তন)। 

সুতরাং ‘ভাষার মাস’ বা ‘বইমেলার মাস’ না হলেও এপারে ওপারে কোথাও বাংলা ভাষাকে অতি ‘সংস্কৃতায়িত’ বা অতি ‘আরবি-ফার্সী’কৃত করার বদলে ভাষা যত ‘ইহজাগতিক’ হয়ে উঠবে, ততই সমুদ্র বিজ্ঞান থেকে সৌরভুবন জয়ে বাংলাভাষা হয়ে উঠতে পারবে এক সুযোগ্য হাতিয়ার। ধর্মান্ধদের হাত থেকে বাংলা ভাষাকে রক্ষার প্রয়াসেই এই ক্ষুদ্র নিবন্ধের অবতারণা।

লেখক:
Audity Falguni
অদিতি ফাল্গুনী
কবি, কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক; ঢাকা

*প্রকাশিত এ লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট