ভুতের পা উল্টে দেবো নাকি নির্বিকার থাকবো

Comments
এক

আমি আমার ঘরে হাঁটু ভাঁজ করে শুয়েছি নাকি চেয়ারে পা উঠিয়ে বসেছি তা নিয়ে যদি কারো ভাবনার উদ্রেক হয়, কেউ আলাপে মত্ত হয়—তাকে কি বলবো? হয় সে বেকার জমিদার, নাহয় বেকুব অকর্মণ্য, আর তা না হলে মূর্খ ও নীচ মানসিকতার।

আর যদি ভদ্র ভাষায় বলি তো তার ঘরে আয়না নেই তাই সে নিজেকে দেখতে পায় না বলে অন্যের দিকে তাকিয়ে জীবনপাত করে।

এই রকম মানসিকতার মানুষগুলোই চিন্তায় মশগুল থাকে—কে ডাবের পানি খেলো, কে কমলার জুস খেলো, কে লেবুর শরবত খেলো তা নিয়ে। আর গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে তারা এসব নিয়েই। তাদের জ্ঞান-গম্যিতে ভালো দেখার তাকত নেই, ভালো ভাবার ক্ষমতা নেই, ভালো চিন্তার প্রসঙ্গ নিয়ে দুকথা বলার মুরোদও তাদের নেই। এরা তাই দেখতে পায় না কে না খেয়ে থাকলো, বুঝতে পারে না কাকে বাঁচাতে তার কী করণীয়।

এমন মানুষের ভিড় বাড়ছে বলেই তৃতীয় লিঙ্গের মতো সত্য বাস্তবতা নিয়ে কোনো আলাপ উপস্থাপনা বা নাটক সিনেমা গ্রহণ করবার মানসিক সক্ষমতাও তাদের নেই।

শিক্ষার আলো তাদের কাছে পৌঁছায়নি, জ্ঞানের আলো তাদের চিন্তার কানা গলির নাগাল পায়নি। এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক এবং পারিবারিক চর্চা ও বিকাশকে ওরা নাহয় জল দিয়ে যত্ন দিয়ে লালন করতে অক্ষম। এদেশের বুদ্ধিজীবী এবং প্রচার মাধ্যমেরও যদি এমত প্রসঙ্গে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সক্ষমতা না থাকে তো এই দেশ ও সমাজের করুণ চিত্র বোধগম্য হবার মানুষেরও আকাল পড়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

না জেনে বুঝে তাই পহেলা বৈশাখ উদযাপন নিয়ে কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা নিয়ে, কোরআনের প্রথম বঙ্গানুবাদ নিয়ে, পতাকা নকশার সত্যাসত্য নিয়ে কথার প্লাবন বইয়ে দিচ্ছে মানুষ।

দুই

আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর আগে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি যখন প্রায় দুইশ বছর ভারতবর্ষে রাজত্ব শুরু করে, তার কিছুদিন পর থেকেই তাদের বিভিন্ন কর্মকর্তারা দফায় দফায় সময়ে সময়ে এদেশের মানুষকে নিয়ে আচরণ আর ধরণগত বিবিধ আঙ্গিকে তথ্য যোগান দিতো ঔপনিবেশিক রাজতন্ত্রের কাছে। এইসব গোপন প্রতিবেদন নিয়মিতভাবে পাঠানো হতো ইংল্যান্ডে। এর উদ্দেশ্য ছিল এদেশের মানুষ সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিয়ে, যথাযথ জ্ঞাত হয়ে, মানুষের আচরণ ও মনস্তাত্ত্বিক ধরন ও প্রকৃতি বিষয়ে জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে শাসনপদ্ধতি নির্ধারণ করা। এর সুফল কাজে লাগিয়েই তারা প্রায় দুই শতক রাজত্ব করে গেছে অনায়াসে। এই প্রতিবেদন আমাদেরকে হেয় করার জন্য বা বাহবা দেয়ার জন্য করা হতো না, কেবল সম্যক ধারণা তৈরির জন্য নিখাদভাবে তৈরি হতো।

সেই প্রতিবেদনে বাংলার মানুষ সম্পর্কে দশকে দশকে প্রায় একই রকম নেতিবাচক সত্য উচ্চারণে উন্মোচন করে গেছেন বৃটিশ নানা পদ-পদবীধারীরা। সেগুলোর সারমর্ম যেসব তথ্য ও সত্য উচ্চারণ করে গেছে তার সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরলে আমাদের ধরন ও প্রকৃতি ফের খোলাসা হবে আমাদের কাছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—এই অঞ্চলে তথা বাংলায় সৎ ও সত্যবাদী মানুষের অস্তিত্ব বিরল। মানুষের মধ্যে দেশপ্রেমের বালাই নাই। সবাই সবাইকে অবিশ্বাস করে। ব্যক্তি হিসেবে এদের ভিতর মানসম্মানবোধ কম। এদের মধ্যে জনকল্যাণমূলক মনোভাব একেবারেই নেই। সুবিধা নিতে অনর্গল মিথ্যা বলতে এদের বাধে না। অব্যবস্থার ফলে শাস্তির ভয় নেই বলে মনিবের কথা শুনতেও গড়িমসি করে। এরা মনে করে চালাকি আর কূটকৌশলই জ্ঞানের পরিচায়ক, মানুষকে ঠকানো আর ফাঁকি দেয়া গুণ। এমন পরিবার নেই যেখানে বিষয়সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ নেই। অশ্রাব্য গালাগালি করে এরা মনের ঝাল মিটায়। নীতিহীন স্বার্থপরতায় ভরা সমাজ ঘৃণা, বিবাদ, নিন্দাবাদ আর মামলাবাজিতে নিমজ্জিত।

এই গোপন প্রতিবেদনে আরো লেখা হয়েছে যে, বাঙালিরা কপট, অকৃতজ্ঞ, মিথ্যাচারী। সাধারণ মানুষ অসহায় ও নির্বিকার। এরা কল্পনাবিলাসী, বাস্তববিমুখী, কলহপ্রিয় ও আত্মকেন্দ্রিক। বাঙালিরা ভীরু ও দাসসুলভ। তবে অধস্তনের প্রতি আবার চোটপাট নিতে চড়াও।

কয়েকশো বছর পেরিয়ে গেলেও আমাদের এসব স্বভাবের আদৌ কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় না।

তিন

অথচ মজার ব্যাপার হলো এই যে, ষোড়শ শতকের ভারতবর্ষ বিশ্ব জিডিপির চব্বিশ শতাংশ ধারণ করতো। ভারতবর্ষের অর্থনীতি ছিল ষাট মিলিয়ন ডলারের সমান। তখন গোটা ইয়োরোপের জিডিপি ছিল বিশ্ব জিডিপির আঠারো শতাংশ। ইংল্যান্ডের জিডিপি ছিল বিশ্ব জিডিপির মাত্র এক শতাংশের কিঞ্চিৎ বেশি। ইংল্যান্ডের অর্থনীতি তখন ছিল মাত্র পৌনে তিন মিলিয়ন ডলারের সমান।

সেই ইংল্যান্ড রাণী এলিজাবেথের জলদস্যুতার পৃষ্ঠপোষকতা আর মদদের সুবাদে ধনসম্পদ আহরণ করতে গিয়ে ভারতবর্ষের মালামাল বোঝাই স্পেনের বিশাল এক জাহাজ লুট করে যা পায় তার অনেক পরিমাণ লুটতরাজ হবার পরও যা রাণীর কাছে জমা হয়, তা ছিল সেই সময়ে ইংল্যান্ডের রাজকোষের অর্ধেকের সমান। ভারতবর্ষের সম্পদের ধারণা পেয়ে এবার বানিজ্যের উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতবর্ষের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠে তারা। এরই জের ধরে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির উদ্ভব আর বানিজ্য করতে এসে উপনিবেশ বানিয়ে ফেলা।

সেই আমলে বিশ্ব অর্থনীতির এক চতুর্থাংশের অধিকারী ভারতবর্ষের সিংহভাগেরই যোগানদাতা ছিল বাংলা।

চার

হ্যাঁ, তার মানে এই না যে বাংলার ঘরে ঘরে সম্পদ উপচে পড়ছিল। ইংরেজরা রাজত্ব কায়েম করার পর তাদের গোপন প্রতিবেদনে যা লিখেছিল তাদের গোটা শাসনকাল জুড়ে, ভীরু ও দাসসুলভ থেকে শুরু করে তার প্রতিটি ধরনধারণই ভারতবর্ষের সেই স্বর্ণযুগেও বিদ্যমান ছিল এদেশের মানুষের মাঝে।

অর্থ বিত্ত বৈভব সব জমা হতো সামন্ত প্রভুদের খাজাঞ্চিখানায়। সাধারণ মানুষ তাই অসহায় ও নির্বিকারই ছিল শত শত বছর ধরে।

সঙ্গত কারণেই শোষণ বঞ্চনা ছিল বাংলার সাধারণ মানুষের নিত্যসঙ্গী। এমন একটা প্রেক্ষিত তাই যুগে যুগে রুখে দাঁড়াবার মতো মানুষেরও জন্ম দিয়েছে যুগে যুগে।

তবে এই রুখে দাঁড়ানো মানুষগুলো বরাবরই ছিল সংখ্যায় কম। ইংরেজদের সেই গোপন প্রতিবেদনে এদের কথাও এসেছে কমবেশি। তারা তাই এটাও লিখেছিল যে, এদের মধ্যে চিন্তাশীল এবং বিপ্লবী মানুষের দেখাও তারা পেয়েছে। কিন্তু অসহায় ও নির্বিকার মানুষের সংখ্যাধিক্যে এই চিন্তাশীল এবং বিপ্লবী মানুষের অর্জন তাই চিরকালই হয় অধরা থেকেছে নাহয় ক্ষণস্থায়ী হয়েছে।

পাঁচ

এই ঐতিহ্য আর ধারাবাহিকতা বয়ে বেড়াচ্ছি বলেই বোধকরি বায়ান্ন, একাত্তর আর নব্বুইয়ের মতো দুর্দমনীয় দেশপ্রেম ও ত্যাগের অর্জন পায়ে ঠেলে আমরা সত্যিকারের প্রজ্ঞা ও ঐতিহ্যের অর্জন চিরস্থায়ী করে ধারণ করতে পারিনি।

কথায় না বড়ো হয়ে কাজে বড়ো হওয়া লোকের সংখ্যা এজন্যই সম্ভবত চিরকাল নগন্য রয়ে গেছে এদেশে। আমাদের আশি শতাংশ মানুষ তাই অন্তরে ভালো চেয়েও দ্বিধাবিভক্ত, ভীরু, দাসসুলভ, অসহায়, নির্বিকার এইসব পরিচয়ের আড়ালে নিয়মিতভাবে হারিয়ে ফেলেছি আমাদের গৌরবময় পরিচয়ের সোনালি সূত্রগুলো।

উল্টোস্রোতের এই গতিপথ রুদ্ধ করতে হলে আমাদের কথায় না বড়ো হয়ে কাজেই বড়ো হতে হবে। যে কোনো প্রসঙ্গে দু কথা বলবার আগে, তা নিয়ে আলাপে মাতবার আগে আমি আপনি যদি একটু সতর্ক ও যত্নশীল হই তবে এই আকালের দিনে গোটা সমাজের নষ্ট গন্তব্যে যাত্রার লাগামটা কিছুটা হলেও টেনে ধরা সম্ভব।

আমরা কি পারি না আমাদের যার যার জায়গা থেকে এই লাগাম টানার কাজে আরেকটু ক্রিয়াশীল হতে? আমাদেরকে পারতে হবে। সমাজ সমষ্টি ও আমাদের সন্তানদের আগামী পৃথিবীটাকে মনুষ্যত্ব আর মূল্যবোধে ন্যূনতম মাত্রায় বাঁচিয়ে রাখতে এটুকু আমাদের অবশ্য করণীয়।

এই পেরে ওঠার জন্য সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে আমাদের পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৎ ও সত্যের প্রতিষ্ঠা। এই দুই জায়গায় আপোষহীন হতে হবে সেরাটুকু চর্চায় ও কার্যকরণে ধারণ করার জন্য। এর পরে সঙ্গত ও সহজাতভাবে চলে আসবে জবাবদিহিতা ও দায়িত্ববোধের প্রসঙ্গ। আর যা কিছু শুভ, সুন্দর ও মঙ্গলকর তা তাহলে মুঠোর ভিতর আসতে থাকবে অনায়াস ও সহজাতভাবে।

এইটুকু না হলে যে সমাজের শতভাগ মানুষই আজ বাদে কাল অসুস্থ হয়ে পড়বে। বৈকল্যে নিমজ্জিত হয়ে যাবে। আগামী আরো জোর শুধু ভুতের পায়ে হেঁটে যাবে।

লেখক:
Lutful Hossain
লুৎফুল হোসেন, কথাসাহিত্যিক, সাহিত্য সম্পাদক, বাঙালীয়ানা

* বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট