ভুলে থাকতে চাই

Comments

। জাহাঙ্গীর আলম খোকন।

 এক

দিন যায় রাত আসে। ২৪ ঘন্টায় দিন। ৩৬৫ দিনে বছর হয়। কোথাও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। শুধু ঘটনাপ্রবাহ অনিশ্চিত পূর্ব বাংলায়। ১৯৬৮ সালের আগরতলা মামলা ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালে ২৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পাক সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। 

১৯৬৯ সালের ৩১ মার্চ ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্ট পদ গ্রহণ করেন। ২৮ নভেম্বর ইয়াহিয়া ঘোষণা করেন ১৯৭০ সালে গণ পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি রাজনৈতিক কর্যকলাপের ওপর বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু তারপরেও আন্দোলন থেমে থাকেনি। অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তান। তার কারণ– একটি মাত্র স্কুল পাঠ্য বই। বইটির নাম দেশ কৃষ্টি। ১৯৬৯ সালে পূর্ব-পাকিস্তান স্কুল টেক্সট বুক বোর্ড থেকে প্রকাশিত পাকিস্তান দেশ কৃষ্টি নামক বইটি ১৯৭০ সালের জানুযারি মাসে সকল স্কুলে নবম দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। বইটি বির্তকিত হয়েছিল এর অন্তর্গত রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে, যেখানে বাঙালি সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করা হয়েছে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সব গুণকীর্তন তুলে ধরা হয়েছে। বইটি বাতিলের দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররা ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে। এত ব্যাপক আন্দোলন দেশের ইতিহাসে আর কখনো হয়নি। পাকিস্তানের ২৪ বছরের শাসন আমলে ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২ এর হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ’৬৯ এর গণ-আন্দোলন, ’৭০ এর আন্দোলন ছিল স্কুল ছাত্রদের অংশগ্রহণে সংগঠিত আন্দোলন। তীব্র আন্দোলনে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকার দেশ কৃষ্টি বইটি বাতিল করতে বাধ্য হয়। কুমিল্লায় এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় নাজমুল হাসান পাখি, রুস্তম আলী এবং আরো অনেকে। সেদিন আমিও গুলিতে-মিছিলে সাথী হয়ে রাজপথে লড়েছি, স্লোগানে প্রকম্পিত করেছি চারদিক–সামরিক জান্তার নিকটবর্তী পতন ত্বরান্বিত করতে। 

দুই 

পুর্ব বাংলা জেগে উঠেছে। জেগে উঠেছে এদেশের কৃষক শ্রমিক ছাত্র-জনতা। ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসন বঞ্চনার প্রতিবাদে নিজেদের করেছে সংগঠিত। শেখ মুজিবের ৬ দফার প্রাণের দাবি আঁকড়ে ধরে, কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের জন্য বাঙালি সকল প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে মরিয়া, মিছিল মিটিং আর রাজপথে বজ্রমুষ্ঠি হাতে অধিকার ফিরে পাবার বাসনায় উম্মুখ। শেষ পর্যন্ত জেনারেল ইয়াহিয়া ঘোষণা করে, সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ঘোষণার পর উল্লাসে ফেটে পড়ে বাঙালি। যে বাঙালি শুধু কবিতা লিখে স্বপ্ন দেখতো, যে বাঙালি গুন-গুন করে একা একা গান গাইতো, যে বাঙালি লুকিয়ে প্রেম করতো সেই বাঙালি রাতারাতি বদলে যায়। তারা হয়ে ওঠে লড়াকু সৈনিক। 

আমি তখন স্কুলে আসতে যেতে দেখতাম ভোটের মিছিল, শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগের মার্কা নৌকা। ৬ দফার মার্কা নৌকা। প্রফেসর খুরশিদ আলম নৌকার প্রার্থী। ভোটের মিছিল থেকে স্লোগান শুনতাম, একজন বলতো আমার তোমার মার্কা, অন্যরা বলতো নৌকা নৌকা। পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা। একজন উচ্চস্বরে বলতো পদ্মা মেঘনা যমুনা, মিছিলের বাকি মানুষেরা সমস্বরে বলতো তোমার আমার ঠিকানা। আমিও অনেক দিন মিছিলে মিছিলে স্লোগানে জনতার একজন হয়েছিলাম। আমার কাছে ভালো লাগতো– বেবি ট্যাক্সি করে মাইক বাজিয়ে ভোটের পাবলিসিটিতে গান বাজাত, একটি গান আমার হৃদয়ের মর্মমূলে প্রায়ই বাজতো– ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি, তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী! ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে! তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে।’ এত ভালোলাগার গান আগে কোনোদিন শুনিনি। 

তিন 

গ্রীষ্মকাল। গুমোট গরম। গাছের পাতারা স্থির। বাতাস নাই। আগুন ঝরা সূর্য। ঘুঘু ডাকা উতলা দুপুর। শেষ বিকেল হলুদ রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে সবকিছু। কমলালেবু রোদে হযরত পাড়াটাকে ঢেকে দিয়েছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। শহরে পরিস্থিতি ভালো নয়– উড়ো খবর। শেখ মুজিব আর ইয়াহিয়ার বৈঠক ভেঙে যাবার পর সবার মনে শঙ্কা, কি জানি কি হয়। শেষ বিকেলে পাড়ার অনেকেই চকবাজার থেকে বড়ো বড়ো ইলিশ ১ টাকা সের দরে কিনে এনে পাড়া মাথায় তুলছে। মা আমাকে পাঠালো। তখন সন্ধ্যা ঘনায়মান। চকবাজার গিয়ে দেখি মাছ কেনার হুড়াহুড়ি। পাঁচ টাকায় পাঁচটা মাছ কিনে নিয়ে দ্রুত ফিরলাম। সন্ধ্যা সাতটা। বড়ো খালু এলেন। ইলিশ দিয়ে খেয়ে নয়টায় আব্বাকে নিয়ে রেলস্টেশনে গেছেন। খালু রাত সাড়ে দশটার ট্রেনে রাজশাহী যাবেন। মসজিদের কাছে মানুষের শোরগোল। শহরের মানুষ বলাবলি করছে কি যেন ঘটতে চলেছে। হযরত পাড়ার মাছ ব্যাবসায়ীরা এসে খবর দিল। শহর থমথমে। আর্মি নাকি আসছে। আশেপাশে পুরুষ-মহিলার জটলা। শহর থেকে অনেকেই ফেরেনি। তাদের পরিবার পরিজন উৎকণ্ঠিত। আব্বা আসছে না কেন– আমাদেরও চিন্তা। পাশের বাসার ইসমাইল স্যার, সিদ্দিক কাকা খোঁজ নিলেন কয়েকবার আব্বা এসেছে কিনা। আমি মসজিদের ওখানের মানুষের জটলায় কয়েকবার যাই। আতংকিত মানুষজন। ১১টায় আব্বা মসজিদের কাছে আসতেই মানুষজন ঘিরে ধরলো। আব্বা শহরের অবস্থা বলল, থমথমে। সব মানুষজন শহর ছেড়ে বাড়ি চলে গেছে। আব্বা ফিরে আসাতে বুকটা হাল্কা হয়ে গেল। রাত ১১:৪০। শহর থেকে গোলাগুলির শব্দ শোনা গেল।

অন্ধকারের বাক্স খুলে আলোর মিছিল আসতে শুরু করলো। আমরা ঘরের পাশে নারকেল গাছের ঘন অন্ধকারে দেখলাম– সেনাবাহিনীর ট্রাক মসজিদের পাশ দিয়ে একটার পর একটা হেড লাইটের তীব্র আলো জ্বেলে চলে যাচ্ছে বিহারি কলোনির দিকে। আমি গুনতে থাকি। এক দুই করে মোট ৩০টা ট্রাক। ট্রাকের সামনে মেশিন গান ফিট করে ধরে আছে আর্মি।

শহর থেকে গোলাগুলির শব্দ আসছে। আমাদের পাশে ছায়া বাগানটায় অন্ধকারে মানুষের ফিস-ফিস কথা শোনা যায়। গিয়ে দেখি অনেক মানুষ। মহিলারাও। কে যেন একটু আগে শহর থেকে দোকান বন্ধ করে আসতে গিয়ে আটকে যায়। গলির চিপায় দাঁড়িয়ে আরো অনেকের সাথে দেখে– পাকিস্তানি আর্মি ট্রাকে করে শহরের পথে পথে ঘুরছে আর গুলি করছে। সামনে যাকে পাচ্ছে তাকে গুলি করছে। আমরা ঘর থেকে বাইরে– সামনের বড়ো পুকুর পাড়ের নিচে দাড়িয়ে দেখছি। দক্ষিণে বিহারি কলোনি। ভয়ে সবাই কাঠ-মূর্তি। যদি বিহারি কলোনির ছেলেরা আমাদের ঘর-বাড়ি আক্রমণ করে, লুটপাট করে। আমাদের বাড়ির পিছন দিকটায় সর্দার আলেক মিয়ার বাড়ি। সে ছায়া বাগানে অনেক লোকের মাঝে আছে।

সবাই ক্ষণে ক্ষণে সাহস দিচ্ছে। বাড়ি থেকে দা, কুড়াল, যা আছে তাই নিয়ে এখানে চলে আসে যেন। বিহারিরা যদি আক্রমণ করে তাহলে জান দিয়ে প্রতিহত করবে। সাহস পেলাম। বিহারিরা এই পুকুর পাড়ের রাস্তা ধরে আসতে পারে, নাহয় মসজিদের পাশের সদর রাস্তা দিয়ে। আশেপাশের বাড়ির সবাই ঘরের পিছনে সারা রাত চুপটি করে অন্ধকারে গাছের মতো দাঁড়িয়ে-বসে ভোরের অপেক্ষায়।

মনে হলো এত আঁধার এইসব মানুষদের জীবনে আর আসেনি। এমন করে ভোরের প্রতীক্ষা কোনোদিন করেনি। অনেক প্রত্যাশার সুর্য উঠলো আকাশে রক্তের আলপনা এঁকে। যারা রাতে ফেরেনি। ভোরে অলিগলি ধরে তারা অনেকেই ফিরে এসেছে। তাদের মুখে শুনলাম শহরে মানুষকে পাখির মতো গুলি করে মেরেছে। লাশ পড়ে আছে পথে পথে।

সকাল ৮ টায় আমার জ্যাঠা এলেন। গ্রাম থেকে। আমাদের নিয়ে যেতে। আমরা জ্যাঠাকে দেখে কান্নায় ভাসতে থাকি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গ্রাম থেকে এসেছেন। আমাদের সাথে ইসমাইল স্যারের পরিবারও সাথী হলো। আমরা নূরপুরের গ্রামের পথ ধরে পাড়ি দিলাম। পেছনে পড়ে রইলো আমাদের নতুন বাড়ি-ঘর।

ঘরে রয়ে গেল চেয়ার, আমার পড়ার টেবিল, শোবার খাট, পুরানো কাঠের আলমারি, মায়ের আচারের বয়ামগুলি, টেবিলঘড়ি, বইপুস্তক দেওয়ালে আমার আঁকা সবুজ পাহাড়, লাল-ঝুটির পাখি, রয়ে গেল আমার প্রিয় বিড়ালটা। আমাদের সাথে যেতে পারল না, ঘরের ইঁদুর, টিকটিকি, ঘুলঘুলিতে বাস করা চড়ুই পাখিরা। রয়ে গেল, আমাদের ঘরটা, ঘরের পেছনের ছোটো ডাব গাছ, আমড়া গাছটা, আব্বার সাথে গিয়ে হাবিব ব্যাংক থেকে ১০ টাকা দিয়ে কেনা মেয়েদের ছোটো মেক-আপ বাক্সের মতো টিনের ব্যাংকটা– যার চাবি হাবিব ব্যাংকের কাছে জমা আছে।

চার 

১৯৭১, জুলাই মাসের প্রথম। আমাদের পরিবার ও গ্রামবাসী সবাই ভারতে রাজনগরে, শরনার্থী। আমরা ফেলে গেছি, প্রিয় জন্মভূমি, ঘরবাড়ি, জমিজমা, পুকুরের মাছ, ফেলি গেছি আজন্ম প্রিয় ভালবাসার গ্রামটি। বাবা জুন মাসের এক বৃষ্টি ধরা সকালে কুমিল্লা যাবেন বলে অনিশ্চিত যাত্রায় পাড়ি জমালেন। অনেকের নিষেধ সবিনয়ে না শুনে চলে গেলেন। আমাদের পাশের গ্রাম ধনুসাড়া থেকে কারা যেন দু’তিন রিকশা বাঁশের চাটাই বা ধাড়ি নিয়ে কুমিল্লা যাবে। আব্বা তাদের সঙ্গী হবেন। পাকবাহিনীর আচমকা টহল, পথে-ঘাটে লোকজন চেক করা, সন্দেহ হলে সাথে সাথে গুলি করে মারা– এইসব আমরা শুনতে পাই। আব্বা গেছে সাত-আট দিন পার হলো। ফেরার কোনো নাম নাই, পরিবারের সবাই আতঙ্কিত। তাদেরকে আরো ভয়ার্ত সময়ে নিমজ্জিত করে একদিন আমিও নেমে গেলাম– ভারত থেকে কুমিল্লা শহরে যাব আব্বার খোঁজে। আসার সময় আমাদের পাশে থাকা আতর ইসলামকে বলে এসেছি। আমার চলে যাবার পরে যেন জানিয়ে দেওয়া হয় আমি কুমিল্লা শহরে গেছি। ধনুসাড়া হাজী গ্রাম, নারায়ণপুর পার হয়ে নালঘর বাজারে তাদের দেখা পেলাম। তারা আমাকে ফিরে যেতে বলল বার বার। ভয় দেখাল। আমি কোনো নিষেধ মানিনি। 

গ্রামের পথ ধরে চলেছি। আকাশে মেঘ রোদ লুকোচুরি খেলায় মত্ত। ভ্যাপসা গরম। বাতাস জমাট বাঁধা। আশেপাশে গাছপালা স্থির। মনে হয় সবকিছু জমে গেছে। মানুষ-জন বাড়ি-ঘরে আছে কিনা বুঝা যায় না। দুয়েকজন পুরুষ দেখা যায় বাড়ি থেকে উঁকি দিয়ে দেখে। পাকবাহিনী এখনো এদিকে আসেনি। ট্রাংক রোডের আশেপাশে তারা হঠাৎ আসে। তাদের জীপ ও ট্রাকের আওয়াজে গ্রামবাসী শুধু পশ্চিম দিকে পালাতে থাকে। অনেক বৃদ্ধ, শিশু, মহিলা দৌড়ে পিছিয়ে পড়লে তাদের পাকবাহিনী ধরে গুলি করে। মহিলাদের ধরে নিয়ে যায়, ধর্ষণ করে। বাড়ি-ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। পথে যেতে যেতে এমন পোড়া ঘরবাড়ি দেখেছি অনেক গ্রামে। প্রায় গ্রাম মনে হয় মানব শূন্য। বিরান। খাঁ খাঁ করছে গ্রামের পর গ্রাম।

সন্ধ্যার শেষ আলোতো আমরা চকবাজারে এসেছি। মালগুলির বাঁধা দড়ি খুলছে। আমি ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে একটা রিকসায় চাটাইয়ের বান্ডিলে হাত রেখে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ ওপর থেকে একটা বান্ডিল পড়লো বাম হাতে। মুহূর্তেই ঘটে গেল অঘটন। হাতের কব্জি মুচড়ে গেল। চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম। যখন হুশ এলো আমি তখন পাশে দেখছি একজন মহিলাকে। যে আমার হাত ধরে বসে আছে। হাতে জামবাকের গন্ধ।

দূরে মাল টানা রিকসাওয়ালারা। সবাই উদ্বিগ্ন। দালানঘরে মোমের আলো জ্বলছে। সাতটার পরে শহরে কারফিউ জারি করা আছে। ডাক্তার ডাকা বা ওষুধ আনা সাধ্যের বাইরে। হাতে সাদা শাখা পরা হিন্দু মহিলা। আমার হাতে একটু একটু করে জামবাক দিয়ে ডলে দিচ্ছে। আমি বিকারগ্রস্ত। শুধু মা’কে ডাকছি আর দেখছি চিরকালীন শাখা পরা বাংলার মায়েদের স্নেহের হাত দুটি। যে হাত দিয়ে জ্বর তাপে পোড়া শরীরে তাপ শুষে নিতে মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে। এ যেন বাংলাদেশের চিরকালীন মায়ের হাত। শুধু মনে পড়লো কে তোমার নাম রেখেছে জননী, এই নাম তোমাকেই যে মানায়। চকবাজারে সেই জননীর দুইতলা বাড়িটি আজো আছে। নামটা ভুলে গেছি। 

পাঁচ 

সকালের দিকে চোখ মেলে দেখি, অনেক সকাল। ধূপ-ধুনার সুগন্ধ। আমোদিত চারদিক। যে ঘরে ছিলাম, তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পথে নামলাম। সকালের রোদ শিশুর মতো হাসছে। চকবাজারের দোকানপাট খুলে গেছে। রাস্তায় মানুষজন। বেবি স্ট্যান্ড দু’পাশে, আর্মি কয়েকজন। জীপে করে টহলে আছে পাক আর্মি। সাঁই করে যেতে দেখলাম। আসতেও দেখলাম। আমি ক্লান্তি অনুভব করলাম। হেঁটে চলছি। পথ ফুরায় না। হযরত পাড়া বহু দূর চলে গেছে। হেঁটে চলছি। 

কখন এসে গেছি, টের পাইনি। মসজিদের কাছে এসে দেখি আমাদের বাড়ির নারকেল গাছ দেখা যায়। দেখা যায় সেই বড়ো পুকুর, ছায়াবাড়ির আলো আঁধারির বিশাল বাগান। তিন মাস আগে পালিয়ে গিয়েছিলাম জীবন বাঁচাতে। আহা! আমাদের জীবনের কি মায়া! 

বাড়িতে ঢুকে দেখি– ঘরে তালা মারা। ঘরের বন্ধ দরজায় আব্বার স্যান্ডেল। বুঝলাম বাইরে গেছে। দরজার সিঁড়িতে বসে পড়লাম। চোখে ঘুম। কখন যেন এসে আমাদের বিড়ালটা গা ঘেঁষে আছে। এক বুক ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরে আদর করলাম। কুয়োর পাড়ে পেয়ারা গাছে কাঠবিড়ালির উঁকিঝুঁকি, কাগজি গাছের নিচে দোয়েল লেজ নাচায়। সিদ্দিক কাকা একদিন বলেছিল, বৃটেনে দোয়েল পাখি হলো অশুভ। যাত্রাপথে দোয়েল পাখি দেখলে অশুভ। আমাদের দেশে এইসব শুনলে মানুষ হাসবে। হলুদ রঙের বড়োসড়ো ঝোলা লেজের পাখিটা আমায় দেখে। কতদিন আমায় দেখেনি তারা। বাড়ির গাছগুলো কত সজীব, গাঢ় সবুজ হয়েছে! 

ঘুমিয়ে পড়েছিলাম দরজায় ঠেস দিয়ে। আব্বার ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। আব্বাকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলি। আব্বা আমাকে শান্ত করে। সব কথা শুনে জনকের হৃদয়-ধ্বনিত হাহাকার– তুই কেন এলি! পথে যদি কোনো অঘটন হতো তাহলে কি হতো, হাতটাও ভেঙে ফেললি। তিনি দ্রুত ঔষধ আনতে বাইরে গেলেন। ঘরের অনেক জিনিসপত্র নাই। লুট হয়ে গেছে। আমার প্রিয় চেয়ার, পড়ার টেবিলটা নাই। হাবিব ব্যাংক নাই। সিকি, আধুলি আর এক টাকার কাঁচা পয়সায় ওটা প্রায় ভরে গিয়েছিল। কান্না আর ধরে রাখতে পারলাম না। হু হু করে ফুঁপিয়ে কাঁদলাম। কেন কাঁদছি বুঝতে পারিনি– হাবিব ব্যাংকের জন্য নাকি হাতের ব্যাথার জন্য।

পরদিন সকালে আব্বা গেলেন শহরে। দুপুরের পর ফিরবেন। আমি আব্বার চলে যাবার পর বেরিয়ে পড়ি। হাঁটতে হাঁটতে তেলিকোনা, চকবাজার। চারদিকে মানুষজন ঠিকই আছে। আগেকার মতো চিৎকার, চেঁচামেচি নাই।

কেমন শান্ত, কোলাহল নাই। রাস্তায় পাকবাহিনী, আবার জীপে করে টহল করছে। আমি আরো সামনে গেলাম। রাজগঞ্জ। আমার পরনে লুঙ্গি। গায়ে জামাটা ময়লা। পায়ে স্পঞ্জ। কেমন দরিদ্র লাগছে এই শহরে। 

আকাশে মেঘ ভরপুর। রোদ হঠাৎ উঁকি দেয় আবার মুখ লুকায় মেঘের কোলে। হাঁটতে লাগলাম। ফিরে এলাম রাজগঞ্জ, রূপকথা সিনেমা হলের কাছে। বারোটা বাজে। নোটিশ বোর্ডের মতো টাঙ্গানো দেওয়ালে সিনেমার স্টিল ছবি দেখছে মানুষ-জন গলা উঁচু করে। উর্দু সিনেমা, আখেরী চাট্টান। রঙিন পোস্টারে তলোয়ার নিয়ে মারামারির দৃশ্য ভরা।

ছয় 

এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। সারা আকাশে কালো মেঘ যেন অনেক বুনো মোষ আকাশ নামক চারণভূমিতে ঘাস খেতে খেতে জায়গা বদল করছে। এর মাঝে রামধনু উঠলো সাত-রঙ নিয়ে। রূপকথা সিনেমা হলের বারান্দা থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামতেই গিরিদারী প্রাইমারীর ঘণ্টা শুনলাম দুইটা। স্কুলে দুই ঘণ্টা ক্লাস হয়েছে তৃতীয় ঘণ্টা চলবে। আমি বাসায় ফিরে যাব। 

এই সেই স্কুল এখানে ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় মিছিল আসতো, আমরা যোগ দিতাম। রাজপথে স্লোগানে শরীক হয়েছি, আইয়ুব শাহীর গদিতে আগুন জ্বালো এক সাথে। মাত্র সেদিনের কথা, ২৫ মার্চ রাতে পাক বাহিনী সারা দেশের মতো কুমিল্লা শহরে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ মানুষের ওপর। রাত বারোটায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মেজর ইফতেখার হায়দারের নেতৃত্বে পুলিশ লাইনে হামলা করে ১৫০ জন পুলিশকে হত্যা করে। পুলিশ বাহিনীও প্রতিরোধ করে, তবে অত্যাধুনিক অস্ত্রের সাথে পেরে ওঠেনি।

সেনাবাহিনীর আরেকটি দল রামমালা রোডে, আনসার প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে তিন শতাধিক ঘুমন্ত আনসারের ওপর হামলা চালায়। অনেকে মারা যায়। কেউ পালিয়ে যায়।

পাক মেজর কুখ্যাত আগা বোখারী ও ক্যাপ্টেন বোখারী কুমিল্লার জেলা প্রশাসক এ.কে.এম. সামছুল হক খানকে ধরে নিয়ে যায়। শিবনারায়ণ দাশের বাবা সতিশ চন্দ্র দাশকে ধরে নিয়ে যায়। পুলিশ সুপারের বাসা থেকে পুলিশ সুপার খোন্দকার কবির উদ্দিন আহম্মদকে ধরে নিয়ে যায় (২৯ মার্চ তাদেরকে কুমিল্লা সেনানিবাসে ফতেহ মোহাম্মদ স্টেডিয়ামের পাশে গুলি করে হত্যা করা হয়) ডিগম্বরি তলা থেকে ধরে নিয়ে যায় ছাত্র ইউনিয়ন নেতা প্রিয় লাল ঘোষ, নীলরতন সরকারের ছেলে ব্যাবসায়ী নিহার রঞ্জনকে, সাহা মেডিকেল হলের মালিক নিতাই সাহাকে, সুপারি বাগান এলাকার কেডি রায় এন্ড কোং এর মালিক কেডি রায়কে, পরে তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। 

নূরপুরেরর আবুল হোসেনকে হত্যা করা হয় ‘পিপাসা’র সামনে। ২৭ মার্চ বাগিচাগাঁও থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করে ভিক্টোরিয়া কলেজের ডেমোনেস্ট্রেটর অসীম কান্তি রায়কে। তিনি ছিলেন কুমিল্লা পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান বিপ্লবী অতীন্দ্রমোহন রায়ের ছেলে। কান্দিরপাড় থেকে ধরে নিয়ে যায় কাপড় ব্যাবসায়ী ফনিন্দ্র সাহাকে। ধরে নিয়ে যায় কৈলাশ চন্দ্র ভট্টাচার্যের ছেলে ঔষধ ব্যাবসায়ী প্রাণ গোপাল ভট্টাচার্য ও তার শ্যালক বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামীকে (পরে তাদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি)। 

স্টেশন রোডে আবদুল মালেক এমপির ভাই আব্দুর রশিদ ঠিকাদারের বাড়িটি ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়। ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সম্পাদক রুস্তম আলীর নজরুল এ্যাভিনিউর বাসাটি। পাকবাহিনী হত্যা করে আরো অনেক মানুষকে। ধরে নিয়ে যায় অনেক নাম না জানা মা-বোনকে। হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ছে এইসব কথা। আমি হাঁটছি।

ক্লাস সিক্সের ইতিহাসে পড়েছিলাম, পর্যটক ফা হিয়েন ও ইবনে বতুতার কথা। তারা সেই সময় দেশের অর্থনৈতিক সামাজিক দিকগুলি প্রত্যক্ষ করেছেন। আর আমি প্রত্যক্ষ করছি এই ৭১ সালে কুমিল্লা শহরের বাঙালিদের জীবনযাত্রা। এই শহরে গতিশীল জীবনযাত্রা, স্কুল, কলেজ, সিনেমা, অফিস আদালত সব চলছে। তাহলে আমরা কেন সীমান্তের ওপারে লাখ লাখ শরনার্থী হয়ে, আশ্রয়হীন হয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে দেশ ছেড়ে, পরিবার-পরিজন নিয়ে ভারতের শরনার্থী ক্যাম্পে ছুটছি! সেখানে জায়গা না হলে হিন্দু উদার মানুষের ছেড়ে দেওয়া একটি ঘরে গাদাগাদি করে মহিলাদের থাকা, পুরুষদের কাছাকাছি টিলা বা সমতলে আম-কাঁঠাল-জাম, শ্যামল গাছের নিচে গাছের পাতা মাথার নিচে বালিশ সমান উঁচু করে শুয়ে থাকা। মেঘ বৃষ্টিতে ভিজে জেগে থাকা। কত মানুষ। কত কষ্ট। দিনে-রাতে খেয়ে না খেয়ে থাকা। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের প্রবল খিদায় জাউভাত পেট পুরে না খেতে পারার বেদনা। মায়ের স্তনে শিশুর জন্য দুধ নেই। হাহাকার। রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের মরণপণ লড়াই। একটা স্বাধীন দেশ কামনা করা কি শুধু পুর্ববাংলার গ্রামের মানুষেরই! তাদের এত ত্যাগ, এত রক্ত কি বৃথা যাবে!

চলে এলাম দাদু বেকারির সামনে। ২৫ পয়সা দিয়ে মিষ্টি বন কিনে খেলাম। বাসায় সাবান নেই। পাশের দোকান থেকে ২৫ পয়সা দিয়ে দোকানিকে বললাম আধপোয়া বাংলা সাবান দিতে। পেছনে তিনজন পাক আর্মি ছিল খেয়াল করিনি। তাদের একজন ছুটে এসে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল তুলে বলল, কিয়া বোলতা হায়? বাংলা সাবুন? ইয়ে সালে বাংলা সাবুন বলতে হায় কিউঁ। দোকানি দ্রুত হাত জোড় করে বলল, স্যার, ইয়ে বাচ্চা হায়; তারপর আমাকে বললো, ‘এই উর্দু সাবান বলো’। আমি ঘটনায় হতভম্ব। ভয়ে বলি উর্দু সাবান। দোকানি বলল, মাফি চা। দোকানি নিজে বলল– মাফি চা’তা হু। পাক সৈনিকটি শান্ত হলো। চলে গেল সৈনিক অন্য দুজনের কাছে। দোকানি বলল, বাড়ি কই? আমি তোতলাতে তোতলাতে বলি, হযরত পাড়া।

সাত 

আজ দুদিন জ্বর। ঘর বন্দি। ঘরে বসে বসে কত রাজ্যের আজগুবি চিন্তা এসে জ্বীন-ভুতের মতো আছর করে। আকাশের অবস্থা ভালো না। সারা দিন-রাত বৃষ্টি।

সন্ধ্যার পরে শাহিনের বাবা এসেছিল। আমার আব্বাকে বারবার বলেছে– আমাদের পরিবারের সবাইকে নিয়ে আসতে। ইসমাইল স্যার এসেছে। দুদিন পর পরিবার আসবে। আনসার এডজুটেন্ট সাহেবের পরিবার এসেছে। শাহিনের বাবা বিহারি হলেও আব্বার ভালো শুভাকাক্সক্ষী। বিদ্যুৎ বিভাগে চাকরি করেন। 

শাহিনের বাবা বিদায় নেবার পর আমরা ডাল আর আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খেলাম। আব্বা আমাকে বলল– কাল আমরা গ্রামে ফিরে যাব। তবে খুব কড়াকড়ি চলছে শহর থেকে বাইরে বের হবার পথে পথে। পাকিস্তানি সৈন্যরা রাজাকারদের সাথে গ্রামের রাস্তা-ঘাটে চেক করছে লোকজনকে।

রাতে হ্যারিকেনের আলো কমিয়ে দিয়ে ঘুমের দেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে দেখি ঘুম আসছে না। আলো আঁধারের মায়াজালে প্রবেশ করি। দেখি আমাদের পরিবার হাজারো পরিবারের মতো সীমান্তের ওপারে শরানার্থী হয়ে গাদাগাদি করে মাটিতে শুয়ে আছে। রাত্রি শেষের প্রতীক্ষায়। জাউ-ভাত রেঁধে তরকারি ছাড়া খায়। অসুখে জ্বরে অনেকে দিশাহারা। আবার পুরুষেরা জটলা করে স্বাধীন বাংলা বেতারে খবর শুনছে। রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনীর বিজয় বার্তা। আমাদের গ্রামের শরণার্থীদের স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি উল্লসিত মুখাবয়বে। যেমন আমি ক’দিন আগে আসার সময় দেখেছিলাম বালুজুড়ির যুদ্ধ। 

৯ জুলাই। ব্রাভো কোম্পানির মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট ইমামউজ্জামান, তাঁর নেতৃত্বে এক প্ল্যাটুন সৈন্য নিয়ে বালুজুড়ির পূর্বে পাকবাহিনীর ওপর এমবুশ করে। আগেই খবর নিয়ে আসে রেকি দল। পাক সেনারা একটা সিএন্ডবির ট্রাক আর দুইটা জীপ ভর্তি গোলাবারুদ ও রসদ নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রামের মাঝামাঝি চৌদ্দগ্রামের বালুজুড়ি ভাঙা পুল মেরামত করার প্রস্তুতি নেয়। যা মুক্তিবাহিনী আগেই ধ্বংস করেছিল। সেগুলি মেরামতের চেষ্টা করছিল। কুমিল্লা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক খোলার জন্য পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের মরণপণ চেষ্টা দিন দিন বাড়িয়ে দিচ্ছিল। 

এমবুশ করে মুক্তিবাহিনী হঠাৎ গুলি শুরু করে। এতে হানাদার বাহিনীর অনেকেই নিহত হয়। খবর পেয়ে চৌদ্দগ্রাম থেকে আরও পাক সেনা আসে মর্টার, কামান, মেশিনগান এসব নিয়ে। তিনটা পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। মুক্তিযোদ্ধারা ফিরতি আক্রমণ প্রতিহত করে। এই যুদ্ধে ৩০ জন পাক সেনা নিহত হয়। তারা পিছু হটে। পাকবাহিনীর ট্রাকটা মুক্তিযোদ্ধারা ধ্বংস করে। বিকালে চারটায় পাক জঙ্গি বিমান যুদ্ধক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করতে চেষ্টা করে। তারা দূরে সরে যাওয়াতে জঙ্গি বিমান টহল দিয়ে ফিরে যায়। 

১০ জুলাই ১১টায় পাক হানাদার বাহিনী মিয়া বাজার থেকে আস্তে আস্তে ভাঙা সেতুর দিকে আসতে থাকে। আগেই ওত পেতে থাকা মুক্তিবাহিনী গুলিবর্ষণ শুরু করলে সাথে সাথে দুইজন পাক সৈন্য নিহত হয়। বেলা ৩টা পর্যন্ত যুদ্ধ করে পাক-হানাদাররা যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে। তাদের আরো ৮ জন সৈন্য সেদিন নিহত হয়েছিল। দুর্ভাগ্য সেদিন সকাল ৯টায় আমি দাদাসহ গ্রামে গিয়েছিলাম, পুকুরে মাছ ধরতে। আমার দাদা প্রথমে ধরা পড়ে পাক সৈন্যদের হাতে। দাদার খোঁজে এসে আমিও ধরা দেই। জনমানবহীন গ্রামে আমি আর দাদা। আর পাকিস্তানি সৈন্যরা। এই কথা ভাবতেই আজও শিউরে উঠি। 

ক্লান্ত অবসন্ন নিদ্রামগ্নতার মধ্যে স্মৃতির সেলুলয়েড চলে আর ছেলেটি শিউরে শিউরে ওঠে। শহর যতই সচল থাক। বাংলাদেশের জন্ম মুহূর্ত আসন্ন– এটা বুঝতে পারি। এই শতাব্দীর সত্তর দশক এক মায়া-মন্ত্রময়। পূর্ব বাংলার মাঠে-ময়দানে জীবন বাজি রেখে হানাদার পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছে মুক্তিবাহিনী। কুমিল্লা শহর, সিনেমা হল, বাজার, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত সকল মানুষের সাথে গ্রামে থাকা আর ভারতে পাড়ি জমানো হাজারো মানুষের মানবেতর জীবন এবং অনিশ্চিত যুদ্ধের ময়দানে মুক্তিবাহিনীর রণাঙ্গনে লড়াই, এইসব জীবন-যুদ্ধের মাঝে বালকটি প্রকৃত অর্থে বড়ো হয়ে ওঠে। 

আগামীকাল সকালে বালকটি আবার চলে যাবে তার বাবার সাথে এই শহর ছেড়ে। চলে যাবে যুদ্ধের ময়দানের কাছে। চলে যাবে গ্রামের হাজারো মানুষ যারা শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে তাদের কাছে। চলে যাবে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন দেশের জন্ম নেওয়ার প্রসব যন্ত্রণা দেখবে বলে। বুকপকেটে অপেক্ষার আধুলি নিয়ে সে চলে যাবে সেই রূপকথার দেশে।

আট 

পাক সেনাদের আক্রমণের মুখে আর অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ডোবা আমাদের ভারত-বাসের সমাপ্তি হয় ১৬ ডিসেম্বর। নির্দিষ্ট লক্ষ্যের প্রতি অবিচল আস্থাই ছিল আমাদের একমাত্র পুঁজি, আর ছিল আশার আলো। তিরিশ লক্ষ শহিদের রক্ত, দু’লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা ছিনিয়ে এনেছি স্বাধীনতা। অর্জিত হয়েছে লাল সবুজের পতাকা। জানুয়ারির মাঝামাঝি আমরা পৌঁছাই কুমিল্লায়। নতুন করে ঘরদোর ঠিক করে আবার বসবাস শুরু করি। ভুলে থাকতে চাই নয় মাসের ব্যাথা বেদনা। ভুলে থাকতে চাই একাত্তরের দুঃস্বপ্নগুলো। 

লেখক:
Jahangir Alam Khokon
জাহাঙ্গীর আলম খোকন
লেখক, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক; কুমিল্লা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট