মকবুল ফিদা হুসেন এবং মৌলবাদ

Comments

।। কুশলব্রত ঘোষ ।।

মকবুল ফিদা হুসেন৷ নামটা বলতেই আমরা যেন এক সাদা চুল-গোঁফ-দাঁড়িওয়ালা বেয়াড়া শিল্পীকে বুঝি৷ তিনি লম্বা তুলি হাতে ইয়া বড় বড় ছবি আঁকেন আর খালি পায়ে বিশ্ব-ব্রহ্মান্ড চষে বেড়ান৷ কখনও বহুমূল্য ফেরারী চেপে মিলিয়ে যান বাতাসে৷

Maqbool-Fida-Husain-01

ছবি সূত্র: ইন্টারনেট

তাঁর উত্থান যেন এক রূপকথা৷ মাত্র দেড় বছর বয়সে মাকে হারিয়েছেন৷ বাবা বিয়ে করেছেন অন্যত্র৷ শুরু হয়েছে অস্তিত্বের লড়াই৷ মহারাষ্ট্রের পান্ধেরপুর থেকে ইন্দোর, ইন্দোর থেকে বরোদা, মুম্বাই-এ জে জে আর্ট কলেজ৷ বেঁচে থাকার তাগিদে  ২৫/৩০ পয়সা square feet হিসেবে হুসেন হিন্দী ছবির poster, hoarding এঁকেছেন৷ পরেরটুকু ইতিহাস৷ পরবর্তীতে তিনি মস্ত মানুষ৷ তাঁর ছবির দাম লক্ষ-কোটি৷ তিনি পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ৷ রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য৷ Forbes magazine-এর ভাষায়, ‘ভারতবর্ষের পিকাসো’৷

১৭ই সেপ্টেম্বর, ১৯১৫-য় হুসেনের জন্ম৷ মুম্বাইয়ের পান্ধের শহরে৷ ১৯৪৭-এ দেশভাগ৷ চোখের সামনে ধর্মের নামে উন্মত্ত বর্বরতা, রক্তপাত দেখেছেন৷ তবু মানুষের উৎসবের ছবি এঁকেছেন৷ দুঃখ, দুর্দশা, হাহাকার তাঁর ছবিতে ঠাঁই পায়নি৷ বরং জরুরী অবস্থার সময় আঁকা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর ছবিতে দেবী, ভারতমাতা৷ তাই কেউ কেউ তাকে বড়লোকের ধামাধরা ক্ষমতার ফেউ বলতে ছাড়েননি৷ তবে তাঁর নিজের মায়ের মুখ কেমন ছিল হুসেন নাকি কোনোদিন মনে করতে পারেননি ৷ তাই তাঁর বেশিরভাগ ছবিতেই মহিলাদের কোনো স্পষ্ট মুখ নেই ৷

Maqbool-Fida-Husain-03

ছবি সূত্র: ইন্টারনেট

স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষে হুসেন নতুনকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছেন৷ তাঁর মনে হয়েছে বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে Bengal School of Art -এর নেতৃত্বে এবং অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রশ্রয়ে কলকাতা এবং শান্তিনিকেতন থেকে যে জাতীয়তাবাদী শিল্প-আন্দোলন শুরু হয়েছিল তার আর কোনো প্রয়োজন নেই৷ ভারতীয়তা ছেড়ে তাকে হতে হবে বিশ্বজনীন৷ তাই ১৯৪৮-এ আর এক বিখ্যাত শিল্পী ফ্রান্সিস্ নিউটন্ সৌজা-র সৌজন্যে সমভাবাপন্ন মুম্বাইয়ের ‘প্রোগ্রেসিভ আর্টিস্ট্ গ্রুপে’ যোগ দিয়েছিলেন৷

তাঁর ৯৫ বছরের দীর্ঘ জীবনে হুসেন অসংখ্য ছবি এঁকেছেন৷ প্রায় চল্লিশ হাজার৷ তবে মুম্বাইয়ের ব্যাবসায়ী গুরু শ্রীবাস্তব যেদিন ১০০ কোটিতে একশটি ছবি আঁকার প্রস্তাব দিলেন তখন চায়ের কাপে তিনিই টেবিল৷ যদিও ২৫ কোটিতে পঁচিশটি ছবি আঁকার পর শ্রীবাস্তবের গণেশ উল্টেছে, ব্যাঙ্ক-জালিয়াতির দায়ে তিনি রণে ভঙ্গ দিয়েছেন৷

Maqbool-Fida-Husain-02

ছবি সূত্র: ইন্টারনেট

হুসেনের উন্নাসিক খামখেয়ালীপনার অনেক গল্প শোনা যায়৷ একবার বিদেশ যাবেন বলে কলকাতা এয়ারপোর্টে যাচ্ছিলেন৷ হঠাৎ গাড়ি থেকে নেমে বেজায় খামখেয়ালে এক মস্ত গাছের তলায় ঘুমিয়ে পড়লেন৷ প্লেন ছেড়ে চলে গেল৷ স্টুডিও-র চেয়ে গ্যালারীতে, মহার্ঘ্য হোটেলে বসেই ছবি আঁকতে বেশি পছন্দ করতেন৷ বহুবার পর্দা, আসবাব, কার্পেট, মেঝেয় রঙ লাগিয়েছেন৷ ক্ষতিপূরণও দিয়েছেন ৷ আর মাধুরী দীক্ষিতকে নিয়ে তাঁর মাতামাতি তো সর্বজন-বিদীত৷ আর্থার মিলার যেমন মেরিলীন মনরোকে নিয়ে মগ্ন থাকতেন, মাধুরীকে নিয়ে তিনিও তেমনি৷ মজা করে কেউ কেউ তাঁর নাম রেখেছেন – ‘মাধুরী ফিদা হুসেন’৷

তাঁর লেখা, পরিচালনা, প্রযোজনায় ‘গজ-গামিনী’-র মুখ্য ভূমিকায় তাই অনিবার্য্যভাবেই মাধুরী দীক্ষিত৷ তাঁর আরেকটি film: Through the eyes of a painter শ্রেষ্ঠ পরীক্ষামূলক ছায়াছবি হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে৷ কান ফেস্টিভেলে হুসেনের বানানো ছবি: ‘Meenaxi: A tale of Three Cities’ বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে৷

Maqbool-Fida-Husain-04

ছবি সূত্র: ইন্টারনেট

তবে হুসেনের এই সব-পেয়েছির স্বপ্ন-উড়ান্ তাঁর ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত৷ পরবর্তীতে র্ধর্মীয় মৌলবাদের খপ্পরে পড়ে তা মুখ থুবড়ে পড়েছে৷ ‘Meenaxi: A tale of Three Cities’-এ ব্যাবহৃত কাওয়ালী সঙ্গীতটি All India Ulema Council  পছন্দ করেনি৷ তাদের মতে আল্লাহকে নাকি ভয়ানক অপমান করা হয়েছে৷ পবিত্র কোরানে যে-সব শব্দ-চয়ন করে আল্লাহর আরাধনা করা হয়েছে তিনি নাকি তাই দিয়ে নারী-সৌন্দর্য্য বর্ণনা করেছেন৷ সুতরাং যাহা ঘটিবার তাহাই ঘটিল৷ মোল্লাদের বদান্যতায় সিনেমা দেখানো বন্ধ হল৷

হিন্দু মূর্খ পন্ডিতরাও পিছিয়ে ছিলেন না৷ ১৯৯০-এর মাঝামাঝি হিন্দি মাসিক পত্রিকা ‘বিচার মীমাংসায়’ একটি প্রবন্ধ ছাপা হল – ‘এম এফ হুসেন: শিল্পী না ঘাতক’৷ সঙ্গে প্রায় দু-যুগ আগে ১৯৭০-এ আঁকা হিন্দু দেব-দেবীর কিছু নগ্ন ছবি৷ ব্যাস্ আর ষায় কোথায়! হুসেন যদিও এইসব ছবিতে সনাতন হিন্দু ধর্মের যে দার্শনিক দিকটি আছে, অর্থাৎ পুরুষ-প্রকৃতির মিলনের মধ্যেই সৃষ্টির রহস্য তাকেই রঙে-রেখায় ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন, হিন্দু-ধর্মের স্বঘোষিত মোড়লরা সে-সব বুঝতে চাননি৷ তারা তাঁকে প্রায় গাধার পিঠে চাপিয়ে দেশছাড়া করেছেন৷ শেষ পর্য্যন্ত হুসেনকে ভারত ছেড়ে কাতারের নাগরিকত্ব নিতে হয়েছে৷ দেশভাগ যা পারেনি ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে ধর্মীয় মৌলবাদ তা করে দেখিয়েছে৷ সূদুর লন্ডনে ৯৫ বছর বয়সে হুসেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন৷ ধর্মের স্বঘোষিত পাহারাদাররা খুশি হয়েছেন নিশ্চয়ই৷ জানিনা কোনারক, খাজুরাহের মন্দিরের গায়ে খোদাই করা যৌন-মিলন আর রতিক্রীড়ারত মূর্তিগুলো সম্পর্কে তাঁদের কি ধারণা!

Maqbool-Fida-Husain-05

ছবি সূত্র: ইন্টারনেট

একটি তথাকথিত গণতান্ত্রিক দেশে কেন এমন হয় ভাবতে বড় অবাক লাগে৷ Freedom of expression তাহলে কি শুধুই সোনার পাথরবাটি? ভারতবর্ষে সলমন্ রুশদীর The Satanic Verses নিষিদ্ধ হয়েছিল৷ বামফ্রন্টের আমলে পশ্চিমবঙ্গে তসলীমা নাসরীনকে থাকতে দেওয়া হয়নি৷ আর জন্মশতবর্ষে হুসেন রয়ে গেলেন ধর্মীয় গোঁড়ামী আর রাজনৈতিক সুবিধাবাদের অন্তরালে৷

তবে আশার কথা মুম্বাই হাইকোর্ট হুসেনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো খারিজ করে আমাদের আরও উদার এবং সহনশীল হতে বলেছে৷ বলেছেঃ, “A painter at 90 deserves to be in his home–painting” and not “made to run from pillar to post facing proceedings”৷ মৌলবাদীরা কি শুনতে পাচ্ছেন ?

লেখক:

কুশলব্রত ঘোষ, শিল্পী, বিজ্ঞাপন জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.