মহসীন মন্টুর কবিতা

Comments

মিহির ক্ষণে

একদা আমাদের এই বদ্বীপ ঘিরে কেবলই রাত্রি ছিল
গভীর অন্ধকার সেইসব রাত, ভয়াল !
প্রেতেদের আনাগোনা ছিল অবিরত।
দানবের দম্ভিত পদভারে জননীরা ছিলেন শঙ্কিত
পিতারা অরক্ষিত বুকে আগলে রাখতেন গাঁয়ের সদর।
শিশুদের মায়াবী চোখ ছিল পান্ডুর স্থবির !
তখন কোন নদী ছিল না।
বহতা জলে মাছেদের সন্তরণ যেমন
ছিল না তেমন কোন ভাটিয়ালী বটঝুরি তট,
ছিল জানালায় রোদের আনাগোনা চুপিসার,
মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা ভালোবাসার ধন।

হঠাৎ শার্সিতে রোদ্দুর সাহসী হলেন
সাহসী মানুষের সাথে সখ্য হলো অবারিত তাঁহাদের।
ক’জনা দুর্দম শালিকের আগমনে
কপাট খুলে যায় ! সব অন্ধকার নিমেষে উধাও !
আলোর ঝলকানিতে যখন ভূমিষ্ঠ শিশু ঝর্ণার মতো;
কবিগণ খুঁড়ে গড়লেন মাটিতে সুগন্ধি গোলাপ বাগান
যুবক-যুবতী সুর্য ওঠার গানে রোশনাই হলো।
মায়েরা হলেন সুধাময়ী ঘর
বোনেরা নদীর মতো
পিতারা হলেন নির্ভার পুরুষ।
বলিকারা ঝিলমিল পুকুর, বালকেরা সূর্য়ের হাসি।
সেই সূর্যের দিন ক’জনা পিতা নির্বাক ছিলেন
ক’জনা মাতা শূন্য বুকে !
কেউ কেউ ভাই
কোন কোন বোন
মেহেদি-রাঙা হাত জায়া
অবুঝ সন্তান
চোখের নদীতে ভাসালো সবুজ উঠান।
তছনচ গোলাপ বাগান !

তবু চত্বরে সবুজ ঘাসের বন ছুঁয়ে
রক্তিম সূর্য উঠে এলেন
তাঁহাদের নিঃশ্বাসের বেদিতে।
অবাক দাঁড়ানো বালক-বালিকা আমরা
প্রতীক্ষার সকলে বিজয় দেখেছিলাম
দিবাকর সেই মিহিরের দুর্জয় ক্ষণে।

ফিরিয়ে দাও

মিথ্যে-প্রিয় ইচ্ছে আমার নিন্দ্রা ভাঙে,
নিদ্রা যায় !
আশার ক্ষণে পদ্ম-ভাষায় বলতে কথা
ভালোবাসার ভিক্ষে পাতে
যে আধুলি ঘুমিয়েছিল
জাগিয়ে দাও !

আমার উঠোন ভাসিয়ে দিয়ে
তোমার হাতের বেয়াড়া বাতাস
কোন পাঁজরে তাড়িয়ে নাও !
বন্দি তালুর জাদুর খেলায় দেখিয়ে গোলাপ
ফুল ফোটালে লাল রুমালে
পাখির খেলা দেখিয়ে… অবাক
বুকপকেটের ইন্দ্রজালে বাসমতি চাল ভাত ফোটালে।
আষাঢ় বেলার সুখের ঘ্রাণে
আগুন ছাড়াই বুকের ভাঁজে !
সোনার থালায় খোয়াব রেখে পুড়িয়ে দিলে
একটি হৃদয়। কুহক জলে
ডাহুক পাখির কান্না তুমি উড়িয়ে দিয়ে
তুষের আগুন ধিকিধিকি নেভাতে চাও?
জাদুর খেলা দেখিয়ে গোপন নিভৃতে যাও?
– ও জাদুকর কেমন জাদু দেখাও তুমি !
মায়ায় জলে আগুন জ্বেলে যাও হারিয়ে
ইন্দ্রজালে পুড়িয়ে দিয়ে ফুরিয়ে যাও ?
বৌ-ছি খেলা রদিনগুলো সব মাড়িয়ে যাও ?
জুঁই-চামেলি ইচ্ছেপ্রিয়, ক্ষণগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে
নিদ্রা ভাঙো !
নিদ্রা যাও ?

পারবে তুমি ?
এক বরষার শিউলিবেলার গল্পগুলো
বৃষ্টিভেজা লাল দোপাটি স্বপ্নগুলো ফিরিয়ে দিতে ?
ফিরিয়ে দাও !
ও চাটুকার …

হাইওয়ে

সেতু পেরোলেই প্রত্যাশার শহর।
রোদ্দুর সাথে সর্বক্ষণের সবক্ষণ আমার
বড়ো দাওয়াই; দেহের মনের।
জাগি না রাতের প্রহর; রাতের দেখা পরে না পাই যদি ?
তবু রাত্রি আজ সেই সব রাতেরই মতো
চাঁদ যখন ক্লান্ত হয়ে; সাথি হয় ঘুম
আমি খেলি অরুন্ধতী, লুব্ধক, সপ্ত-ঋষিদের সাথে
মনে হয় এই আমি; নই আমি সেই !
অজাগর হাইওয়ে !
বেপরোয়া মাতাল বেগবান অযান্ত্রিক যান।

সব পখি প্রভাতে জাগে না
সব মেঘ রোদেও সরে না
কিছু কুঁড়ি ফুটেও ফোটে না
শিউলিরা তবু ঝরে যায় কর্মশেষের দায়ে।
‘মানুষ’ তবু প্রত্যাশার ঘুমে
প্রত্যয়ে ভাবি নিজস্ব প্রভাত
প্রাপ্তির বহর/
সেতু পেরোলেই প্রাত্যাশার শহর।

সংশপ্তক !
অদ্ভুত ছায়া মাড়িয়ে
ঘুণপোক
সরিয়ে দেখব রোদেলা সকাল
মরুতে নবীন শ্যাম ঘনঘাস।

বর্ষায় একলা ঘুঘু

ময়ূরী পেখম মেলে মেঘলা মেখলা সাজে
অঝোর ধারায় ঝরে
জানালার আকরে গাথা
সকালের রোদ ফিরে কাঁদে !

অর্কিড জীবনে দোলায় হৃদয় সাক্ষাতে যার ছিলে
অশনির বেলকনি ফ্রেমে বন্দি অধরা প্রেমে
বাঁধিয়ে সাজাও কেন তারে ?

বাঁধা তো ছিলই পাখি
রাধাই ভেবেছিলে যারে
ভাঙা মন রাঙানো যায় ভেবে;
ছলছল বৃষ্টিকে নামাও
হৃদয়ের ডুব-চুপ জলে
মন্দিরা বাজে না জানোই
নিরবে অজানা আঁকা ভুলে।

ময়ূরী পেখমও যদি
কাজরি মেঘেদের সাজে
বাদলে কদমের ফুলে
পরশীর ঝাউবনে চুপে একা-
হৃদয় আসে ও ভেসে কোনো ছলে;
মোহনায় জমানো স্মৃতি-জলে
জেগে ওঠা হঠাৎ বালুচরে
কাকলিরে পাবে কি দেখা ?

স্মৃতিরা সবই যেন বাঁধা
মাধবের ক্ষরণে বাসে রাধা।

রাখিতে বন্ধনে রেখা,
কপোলে রাঙানো প্রিয় চুম,
চুপিসার লজ্জায় ঢাকা মুখ,
সখি সে কই বাসে; সন্ধ্যার বর্ষার এই পলে
স্মরনে মরণের খেলা খেলে ?

হৃদয়ে ডেকে যায় ঘুঘু
শুধুই কার খোঁজে
মেঘনার নিকষ কালো জলে ?

বাতাবি লেবুর ফুল

সন্ধ্যা নাবার কালে-
যাহাদের বাসে বাতাবি লেবুর ফুল !

এবেলায় এখন তাহাদের ছেলেবেলা
ওবেলায় ছিল মুখরা বিকেল কিছু
রোদেলা দিনের পাললিক বনে যারা
সকালের, তারা সত্য সকালে যেমন-
শিউলিরা থাকে শিশিরের সাথে মিলে
হেঁটে যাওয়া কিশোর শহরের অলিগলি
কিশোরীর দেহ থির-থির ভরা নদী।
করতোয়া পার, হেলদোল বুনো ঘাস-
ফুলে ঢেউ তুলে বাতাসের সাথে মেশে
বাউরি সুবাস রংধনু রঙে ভাসে
ওবেলা পাড়ায় খেলা যতো নানা ছলে
এই বেলাতেও জেগে থাকে ঘুম বাসে !

বালক-বালিকা বনে যাও কেন ক্ষণে ?
স্মৃতির গহনা খুঁজে ফিরো বুনো ঝোপে,
ভিজে থাকো কার স্মৃতি নিয়ে বোনাজলে ?
গন্ধ মাতানো বাতাবিলেবুর ফুল,
জেলখানা মোড়, বুড়ো জামগাছ ছেড়ে
বকশী বাবুর পুরোনো পুকুর ধরে
অন্য পাড়ার ব্যাডমিন্টন কোর্টে
রঙ ছড়ানো প্রজাপতি গেছে উড়ে !

বুকের পাঁজরে হারানো দিনের গান !
বাঁশি বেজে যায় তাহারই সন্ধ্যা রাগে
সেইসব গানে, প্রাণে যারা ছিল সুরে
ওড়না ছুঁয়েছে ছাতিমের ঘ্রাণ আশে !
মাতাল হাওয়ার হীরক-পান্না-জহর
বুকপকেটের অলিন্দে কী আর পাবে-
খুঁজে ছিটেফোঁটা হারানো স্বপ্ন বাসে
শেষ বিকেলের সন্ধ্যা নাবার ঘোরে ?

কিশোর বালিকা আকাশের তারা হয়ে
বসন্ত-বাহার আরশিতে যাবে কেঁদে !

ক্ষরণে নদী জলবতী (১৯৪৭)

[প্রয়াত শ্বশুর মহাশয় মীর মোজাম্মেল হক স্মরণে]

শোনো তবে; আমাদের জলবতী রূপকথা নদী;
চোখ ছলছল বয়ে চলা তোমাদেরই স্রোতঃস্বিনী !
এখন জল গড়িয়ে হু-হু সন্ধ্যা নামে লোকালয়ে।
“ভোর হলো …
দোর খোল … !”
– দুয়ার খোলে না আগের মতো কেউ।
রৌদ্র আঁচলে ঘুম ঘুম মুখ মুছে বাহির পানে চাও
গ্রামাঞ্চলেও কোলাহল হারিয়ে গেছে দেখো-
আশ্চর্য আকাশ !
নাগরিক চিল আর শালিকের বাধাহীন ওড়াউড়ি ছিল!
চিলেকোঠায় রাতের প্যাঁচা, দুপুর ভাসানো রৌদ্র,
মোরগের বাঁক, চড়ুইয়ের ঝাঁক
বাঘ-সিংহ-হরিণের আহ্লাদি নন্দন খাঁচায় শাবকের
আগমনী উৎসব
সবুজের উচ্ছ্বাস হাসি চত্বর
টলমল জলে খলবলে মাছ
সকলে হিম নিনাদের কোলে !

আজতক দায়হীন হেঁটে গেছি কত নদী !
বড়ো-ছোটো জনপদ।
বাণিজ্য হলাহলে হারিয়ে যাওয়া অভিমানী বৃক্ষচ্ছায়া !
একটাই চাঁদ একটাই সূর্যের ঘড়ি
আমাদের ! ভেঙে সকলই রঙিন পাথর, সময় !
উঁকি দেয়া নির্বাক উচ্ছ্বাস, হাঁক দিয়ে বলে –
‘এসেছি গো প্রিয় সখা-সখি সভাসদগণ
একবার ভুলে যাও সকল যথেচ্ছ উৎসবের যাম।
দেখো ! সাথে এনেছি বেহিসেবে হারানো তোমাদের
অভিমানী বসন্ত বাউরি, সাদা বকপাখি,
জলঙ্গী জলসিড়ি পারে জলজ চাঁদ-মালা দল।’

বিষবৃক্ষ কিনারে, বালুচরে
পাঁজরে আহাজারি !
-“নদী… নদী… নদী ! … এমনই বহো নদী !”

তাকাও এপার ওপার ! দেখো ! এই আজ
তোমাদের খোয়ানো বুকে বিক্ষত রূপকথা নদী !
ক্ষরণে জলবতী !

লেখক:
Mohsin Montu
মহসীন মন্টু, কবি

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট