মহামারী পরবর্তী বিশ্ব ব্যবস্থা । সেলসো আমোরিম

Comments
মহামারী উত্তর পৃথিবী যে নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করবে সে বিষয়ে প্রায় সকল রাজনৈতিক বিশ্লেষকই একমত। এই নিবন্ধে ব্রাজিলের প্রাক্তন পররাষ্ট্র মন্ত্রী সেলসো আমোরিম (১৯৯৩-৯৪, ২০০৩-২০১০) তার মতামত ব্যক্ত করেছেন। প্রকাশিত হয়েছে প্রোগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইটে।

সামনের দিনগুলোতে রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা নতুন রূপ পরিগ্রহ করবে। বিভেদ নয়, ঐক্যবদ্ধ ভাবেই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।

যদিও কোভিড-১৯ পরবর্তী পৃথিবী কেমন হবে তা ধারণা করা কঠিন, তবে মনে হচ্ছে এই বিষয়ে বিশ্লেষকরা একমত যে ২য় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে যে সকল গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে বিশ্ব এবার তার চেয়েও ব্যাপক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করবে; যা ধারণাতীত, এমনকি “সত্যিকারের সমাজতন্ত্রের” পতন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির চেয়েও।

সম্ভবত তর্কাতীতভাবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ভবিষ্যতবাণীগুলোর একটি হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হিসাবে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করবে। ক্রয় ক্ষমতার বিচারে তা ইতিমধ্যেই ঘটেছে, আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংকের মত আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা সমূহ প্রায়শ: এই মানদণ্ডের ভিত্তিতে মুদ্রা বিনিময় হারের ভারসাম্য রক্ষা এবং নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তি নির্ধারণ করে। আর কয়েক বছরের মধ্যে চীনের অর্থনীতি জিডিপির হিসাবেও বাজার মূল্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পিছনে ফেলবে।

চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতিফলন ঘটছে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে, যেমনটি সাধারণত ঘটে থাকে; এবং সামরিক-কৌশলগত ক্ষেত্রে কম হলেও দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপেই। এমনকি পশ্চিমা, বিশেষত মার্কিন চিন্তাবিদরা যুক্তরাষ্ট্রের ম্লান হতে থাকা ঔজ্জ্বল্যের বিপরীতে চীনের কথিত ‘কোমল ক্ষমতা’ (Soft Power) বৃদ্ধির কথা বলছেন। মহামারীর সময়ে করা সাম্প্রতিক গবেষণায় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে তথা কথিত ‘ স্বাধীনতার ভূমি” (land of freedom) ইউরোপের রাষ্ট্রসমূহ বিশেষত জার্মানির কাছে তার জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। একই সময়ে চীনের প্রতি আকর্ষণ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে; তাদের ‘বেল্ট এন্ড রোড’ যার আরেক নাম ‘নতুন সিল্ক রোড’ প্রকল্পকে ধন্যবাদ। নিজস্ব রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন মৌনতা সত্ত্বেও চীনের এই আবেদনের সামর্থ্য আরও জোরালো হয়েছে এই উপলব্ধির দ্বারা যে স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে [ভালো বা মন্দ যাই হোক] দেশটি ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম; এবং মহামারী সংশ্লিষ্ট সহায়তা কার্যক্রমের কূটনীতি ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিনিয়োগের প্রবণতা উভয় ক্ষেত্রে তার সক্ষমতার কারণে। একই সময়ে অন্যান্য রাষ্ট্রের প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্লিপ্ততা বা ক্ষেত্র বিশেষে বৈরিতা ‘কোমল শক্তি’ হিসাবে আমেরিকার আরো অবনমন ঘটিয়েছে, জোসেফ নেয়ি [‘কোমল শক্তি’ শব্দ যুগলের উদ্ভাবক] ও অন্যদের এমনই মত।

এখনো অস্পষ্ট হলেও সামনের দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কোনদিকে যাচ্ছে তা আরো পরিষ্কার হবে। অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামোগত স্বার্থ একই থাকবে; লগ্নি পুঁজি থেকে শুরু করে বৃহৎ প্রযুক্তি নির্ভর কর্পোরেশন ও কৌশলগত সামরিক গুরুত্ব। যদিও বিশ্বব্যাপী এই স্বার্থ কী ভাবে রক্ষিত হবে তা অনেকাংশেই প্রভাবিত হবে মহামারী উদ্ভূত অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ও কালো জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রেক্ষিতে। মোদ্দা কথা, ডোনাল্ড ট্রাম্প বা জো বাইডেনের মধ্যে কাকে পছন্দ করা হচ্ছে তার উপর নির্ভর করবে ওয়াশিংটন দুইটি পথের কোনটি অনুসরণ করবে; প্রথমত, অন্যদের অবস্থান ও মতামত বিবেচনায় না নিয়ে কেবলমাত্র অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় আগ্রাসী প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান জারি রাখা; দ্বিতীয়ত, অপ্রয়োজনীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ বিভেদ ও বিরোধ এড়িয়ে চলা যা ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মোটের উপর চলে আসছে। এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের নভেম্বরের শুরুর দিনগুলো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সরাসরি বিরোধের মানে হচ্ছে পৃথিবী স্নায়ু যুদ্ধোত্তর এক-কেন্দ্রিক অবস্থান  [যা গত দুই দশক ধরে ক্রমশ: অপসৃয়মান] থেকে সরে নতুন দ্বি-কেন্দ্রিক বিশ্বের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, অনেক বিশ্লেষক একে নতুন স্নায়ু যুদ্ধ হিসাবে অভিহিত করছেন। বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিরোধকে খাটো করে দেখা ঠিক হবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষক গ্রাহাম অ্যালিসন যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এই অবস্থাকে ‘থুসিডিডিসের ফাঁদ’ (Thucydides Trap) তত্ত্ব দ্বারা ব্যাখ্যা করেছেন। এই তত্ত্বানুসারে বিদ্যমান কর্ত্তৃত্বশালী শক্তিকে খর্ব বা অতিক্রম করে নতুন শক্তির উত্থান যুদ্ধের ঝুঁকি (বা বাস্তব পরিস্থিতির) সৃষ্টি করে। খ্রিস্ট যুগের পাঁচ শতাব্দী পূর্বে এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যে পেলোপোনেশিয়ান যুদ্ধ এই কারণেই সংঘটিত হয়েছিল।

কিন্তু ঠিক এই রকম নাও হতে পারে। প্রথমত, সামরিক কৌশল বিবেচনায় রাশিয়াকে বাদ দেয়া যাবে না; রাশিয়া তার মারাত্মক আধুনিক বিধ্বংসী অস্ত্রসমূহের ক্রমাগত মানোন্নয়ন করে যাচ্ছে যার মধ্যে রয়েছে হাইপারসনিক রকেট ও শক্তিশালী পারমানবিক ক্ষমতা সমৃদ্ধ টর্পেডো। এছাড়াও রাশিয়ার আছে বিস্তৃত সীমান্ত, ইউরোপের প্রাণকেন্দ্র থেকে শুরু করে সেই উত্তর মেরু অঞ্চল পর্যন্ত, তেল ও গ্যাসের মত প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ; বলা বাহুল্য বিশ্ব অর্থনীতিতে যার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর, ‘ইয়ালেতসিন হ্যাংওভার’ সময় পার হয়ে মস্কো এখন আবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার দৃঢ়তা প্রদর্শন করছে, ক্রিমিয়া ও সিরিয়ায় তার ভূমিকার মাধ্যমে প্রমাণ দিচ্ছে। এই অবস্থায় কৌশলগত সামরিক  (যা একই সাথে রাজনৈতিক অভিপ্রায়ের সমার্থক) বিবেচনায় দ্বি-কেন্দ্রিকতার বিপরীতে বরং সঠিকভাবে একটা ‘তে পায়া’ (tripod) এর কথা বলা যায় যেখানে তিন পরাশক্তিই বিভিন্ন মাত্রার ভারসাম্য খুঁজে নেবে।

বর্তমানে এই ভারসাম্যের প্রকাশ দেখা যাচ্ছে মস্কো ও বেইজিংয়ের ‘ইউরেশিয়ান’ জোট বনাম যদৃচ্ছভাবে আগ্রাসী ও অননুমেয় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মধ্যে। যার নমুনা আফগানিস্তান ও সিরিয়া সংক্রান্ত বিরোধ এবং কিছুটা উত্তর কোরিয়ার সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। কিন্তু এই ধরণের জোটের স্থায়িত্ব এখনও অনেক দূরবর্তী বিষয়। ৬০ ও ৭০ দশকের চীন-সোভিয়েত বিরোধের কথা মাথায় রেখে ইউরেশিয়ার এই দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্বের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না, সে ক্ষেত্রে এর সুযোগ নেবে ওয়াশিংটন । একটি বিস্তৃত অভিন্ন সীমান্ত যেমন গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করে তেমনি কখনো তা বিরোধের উৎসও বটে। যদিও রাশিয়ার বিনিয়োগ নির্ভরতা ও চীনের অর্থনৈতিক সহযোগিতার কারণে এই মূহুর্তে তা মনে হচ্ছে না কিন্তু আখেরে কী হবে তা বলা মুশকিল।

একই সময়ে ভাইরাস-উত্তর বিশ্ব ব্যবস্থায় ‘কৌশলগত ত্রিত্ব’ (strategic tripod) কাঠামোই একমাত্র ধারনা নয়। পুনর্গঠিত বিশ্বে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন তার প্রভাব বজায় রাখবে। সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তসমূহ ইউনিয়নকে শক্তিশালী করার বিষয়ে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের (মূলত: এঞ্জেলা মার্কেলের জার্মানি ও ইমানুয়েল ম্যাক্রনের ফ্রান্স) নতুন ইচ্ছার প্রতিফলন বলে মনে হচ্ছে,; বিশেষত রাজস্ব-নীতির ক্ষেত্রে ইউরোপিয়ান প্রতিষ্ঠানসমূহের ভূমিকায়। শুধুমাত্র ঋণ নয়, দুই সরকার সরাসরি বৃহত্তর প্রণোদনা প্রদানে সম্মত হয়েছে এর মধ্যে আছে মহামারী-উত্তর পুনর্গঠনে সরাসরি ভর্তুকি প্রদান ও দেনা (debt)  ভাগাভাগি। এই বিষয়ে ব্রাসেলসের সমর্থন আছে। এই সংকটকালে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে সুফল প্রদানের লক্ষ্যে ইউরোপীয় কমিশন তাদের সদিচ্ছা কী ভাবে প্রকল্পে রূপায়িত করে তা দেখার জন্য আমাদের অবশ্য অপেক্ষা করতে হবে। বহুকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় অনেক সময় নিষ্ঠুর শক্তির মোকাবেলায় কার্যকর সহযোগিতার প্রয়োজন হবে, সেক্ষেত্রে উদ্যোগ গ্রহণ ও সংলাপ আয়োজনে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সক্ষমতাকে খাটো করে দেখা ঠিক হবে না। আবার সর্বদাই একটি দুর্বল পদক্ষেপ হিসাবে গণ্য হওয়া ব্রেক্সিট মধ্য মেয়াদে হয়তো সত্যিই প্যারিস-বার্লিন অক্ষকে আরো শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে অবদান রাখবে, দক্ষিণ ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বিন্যাস সহ। অবশ্যই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে যার মধ্যে রয়েছে প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত দেশসমূহের স্বৈরাচারী প্রবণতা যা প্রাচীন এই মহাদেশ যে গণতান্ত্রিক ইমেজ প্রদর্শন করতে চায় তার পরিপন্থী। পরিস্থিতি যাই হোক জলবায়ু, অভিবাসন, বাণিজ্য ও মানবাধিকারের মত  বৈশ্বিক ইস্যুতে ইউরোপ সমন্বিতভাবে কাজ করে যাবে। বৃহৎ ব্লকসমূহের এই বিশ্বে [যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া প্রত্যেকে নিজেরাই এক একটি ব্লক] ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার প্রভাব বজায় রাখবে।

অবশেষে আমাদের জিজ্ঞাসা হচ্ছে এই নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা গঠনে ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান বিশেষত ব্রাজিলের অবস্থান কি? এই অঞ্চলের দেশগুলোর একটি পছন্দ হতে পারে যে যার মতো চলা, নানা কৌশলে যে কোন অগ্রাধিকার ভিত্তিক জোটে যুক্ত হয়ে সর্বাধিক সুবিধা গ্রহণ করা। খারাপ বিকল্প হতে পারে যা অনেক সরকার ইতিমধ্যেই অনুসরণ করছে বৈশ্বিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ যে কোন একটি বৃহৎ শক্তির স্বার্থে নিজেদের  জিম্মি করে ফেলা। যখনই কোন দেশ বা অঞ্চলের স্বার্থের সাথে এই হেজিমনি শক্তির সংঘাত হবে তখন তাদের একটিকে হার মানতে হবে। সংহতি, সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ সংলাপ ইত্যাদি মূল্যবোধ ও ধারণা অধিকতর ক্ষমতাশালী দেশের লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে অগ্রাহ্য করা হবে। দিগন্তে দৃশ্যমান বহুকেন্দ্রিকতার বিবেচনায় (যদিও এখনো দ্বি-কেন্দ্রিকতার নমুনাই প্রকাশ্য) ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান জাতিগুলোর যথা সম্ভব একত্রে কাজ করাই যুক্তিযুক্ত হবে, একই সাথে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ভবিষ্যতের বিশাল অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে হবে। অবশ্যই বর্তমান সময়ে এটা কল্পনা করাও দুষ্কর যে এ রকম একটা অথর্ব সরকার এবং পরিষ্কার নতজানু নীতি নিয়ে চলা এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রের পক্ষে অধিকতর স্বাধীনতা নিয়ে চলা সম্ভব। তা সত্ত্বেও যদি পরিস্থিতি অনুকূল হয় ল্যাটিন আমেরিকান ও ক্যারিবিয়ান সংহতি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের জন্য আমাদের স্বচ্ছতা বজায় রাখা দরকার। যদি সম্ভব হয় ব্রাজিলের উচিত হবে আগে থেকেই একটি বৃহত্তর দক্ষিণ আমেরিকান ঐক্য গড়ে তোলা।

দক্ষিণ/ ল্যাটিন আমেরিকান (এবং ক্যারিবিয়ান) ঐক্যের এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর অন্যান্য জোটের সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে। পরিস্থিতির ভিন্নতা  এবং রাজনৈতিক পক্ষপাত সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তন, টিকা প্রাপ্তির সুযোগ, অর্থনৈতিক অবরোধের বিরোধিতা এবং বহুত্ববাদের উন্নয়ন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতে আফ্রিকা তার ঐক্য বজায় রাখতে পেরেছে। ব্রাজিলের ক্ষেত্রে আফ্রিকার সাথে সহযোগিতা একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বাধ্যবাধকতা, সত্য হচ্ছে এখানকার জনগণের বৃহৎ অংশের পূর্ব পুরুষ আফ্রিকান। উন্নয়নশীল দেশসমূহের স্বার্থরক্ষায়ও এই ধরণের পদক্ষেপ জরুরি; পরিবেশ, বাণিজ্য অথবা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিভিন্ন সময়ের বিতর্কে আমরা এমনটাই দেখেছি। ক্রয় ক্ষমতার বিচারে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশের একটি ভারত থেকে শুরু করে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রেও প্রায় একই রকমের ঘটনা ঘটবে (চীনকে বাদ দিয়ে, সত্যিকার অর্থে চীনকে এখন ‘উন্নয়নশীল বলা চলে না)। চীনের প্রতি অনুগত হয়ে কিংবা বিপরীতে শত্রুভাবাপন্ন হয়ে এই সব রাষ্ট্র কতদূর স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখতে পারবে তা দেখার জন্য আরো অপেক্ষা করতে হবে এবং তা এই মূহুর্তে অনুমান করা কঠিন।

লক্ষণীয় যে এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে এই বহুকেন্দ্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা। এই মহামারীর ভিতরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে সাতটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক ভার্চুয়াল সভায় মিলিত হয়েছিলেন। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের তথ্য মতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র  ছাড়াও এতে ব্রাজিল, ইসরায়েল, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রীরা যোগ দেন। আপাতদৃষ্টিতে একটি অসম গ্রুপ মনে হলেও তাদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আদর্শগত কিংবা আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব ও স্বার্থের কারণে চীন বিরোধী নীতির ক্ষেত্রে নিজেদের একটি সম্ভাব্য জোট হিসাবে বিবেচনা করা। আশ্চর্যজনক ভাবে এখানে কোন ইউরোপিয়ান দেশ নেই কারণ ইউরোপিয়ান নেতৃবৃন্দ প্রমাণ করেছে বেইজিং প্রশ্নে তারা বাস্তববাদী । যদিও এই ধরণের জোটের গঠন ও স্থায়িত্ব সম্বন্ধে ধারণা করার সময় এখনো হয়নি কিন্তু তা বর্তমান মার্কিন সরকারের চূড়ান্ত চীন-বিরোধী ভবিষ্যৎ রূপরেখাকে তুলে ধরছে যা ঘটনাক্রমে ব্রাজিল ও ল্যাটিন আমেরিকার স্বার্থের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই ক্রমবর্ধমান বিরোধপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হ্রাসে ব্রিকস (BRICS) ও আইবিএসএ (IBSA) -এর মতো রাজনৈতিক জোটের (যার অংশ ব্রাজিল) কাজ করা উচিত।

নতুন যে বিশ্ব ব্যবস্থার কথা ভাবছি তার ক্ষেত্রে পৃথিবীর  বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরে ও পরস্পরের মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো ঘটবে তাকে বিবেচনায় না নেয়া অতি সরলীকরণ হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু হয়ে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়া অভূতপূর্ব বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন আর এর সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত ঔপনিবেশবাদী কর্মকাণ্ডের (এখনো ইউরোপিয়ান দেশসমূহের অভিবাসন নীতিতে দৃশ্যমান) বিরুদ্ধে সংগ্রাম দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্ট করেছে। এই সংগ্রাম মহামারীর কারণে ইতিমধ্যে উত্থাপিত দাবীসমূহ যেমন স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন কিংবা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে জনগণের অধিকতর সম্পৃক্তির সাথে যুক্ত হবে। অপর দিকে নয়া উদারনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতা যার ফলে চিলি, কলম্বিয়া, ইকুয়েডরের মত দেশে দেশে জনতার যে প্রতিবাদ বিক্ষোভ হচ্ছে আর্থিক মন্দা ও বেকারত্বের কারণে তা এই অঞ্চল জুড়ে আরো বিস্তৃত হবে; যদি কঠোর কৃচ্ছতাসাধনের নীতির বদলে অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের অধিকতর অংশগ্রহণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পায়। যে সকল দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ ভঙ্গুর ও দুর্বল সে সকল অনেক দেশে সামাজিক অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না, এর ফলে সেখানে সমাজে সত্যিকারের গণতন্ত্রায়ণ হবে অথবা নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার প্রচেষ্টা থেকে ফ্যাসিস্ট প্রবণতা দেখা দেবে যা ব্রাজিল ও বলিভিয়ার বর্তমান অবস্থার চেয়েও ভয়াবহ হবে।

ভবিষ্যৎ বিশ্ব ব্যবস্থা গঠনে এই ধরণের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের ভূমিকা উপেক্ষা  করা যাবে না আর তার গতিমুখ নির্ধারিত হবে প্রগতিশীল শক্তির বিশাল জনগোষ্ঠীকে (শ্রমিক, সংখ্যালঘু ও যুবকদের সহ) সম্পৃক্ত করার সামর্থ্যের ওপর।

সার কথা, সামনের দিনগুলোতে অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন মিলেই বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার বিকল্প গড়ে উঠবে। জাতি সংঘের মতো আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান ও জি-সামিট এর মতো নানাবিধ অনানুষ্ঠানিক সমাবেশের মাধ্যমেই তা কার্যকর হবে যেখানে বৈশ্বিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয় এবং কদাচিৎ তাতে মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয় যা আবার প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। এই সব আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে জলবায়ু, মহামারী ও কর্ম-সংস্থানের মতো ইস্যু। বিভিন্ন জাতি রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী ও সিভিল সমাজের কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করবে তা কি সংহতি ও সহযোগিতার ভিত্তিতে নাকি স্বার্থপরতার ও সংঘাতের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। ইতিহাস জুড়ে সর্বদাই দেখা যায় চ্যালেঞ্জের সমাহার। আর তা সঠিকভাবে সমাধানের দায়িত্ব মানব জাতির উপরই বর্তায়।

লেখক: সেলসো আমোরিম

ভাষান্তর: মিলন কিবরিয়া

Anwarul Anam Kibria

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত ও বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.