মাতৃভাষার এ অবমাননা ভুলতে চাই । কামাল লোহানী

Comments

ভাষা আন্দোলনের ৬৭ বছর পেরিয়ে গেছে, সামনের বছর মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী অর্থাৎ ৫০ বছর পালিত হতে যাচ্ছে, অথচ আমরা সচেতন নাগরিক ভাষা শহীদদের প্রতি ন্যুনতম শ্রদ্ধাবোধ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছি। কথাটি বলছিলাম কারণ এতদিনেও আমরা ভাষা শহীদদের অন্যতম দাবী, ‘সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু কর’ এই কাজটিও করতে পারিনি। বাংলাদেশ সরকার এ প্রসঙ্গে একটি সরকারী নির্দেশনামা জারী করেছে বঙ্গবন্ধু আমলে।

ভাষা আন্দোলনের দাবী ছিল ১. অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, ২. সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু কর, ৩. সকল ভাষার সমান মর্যাদা দিতে হবে এবং ৪. সকল রাজবন্দীদের মুক্তি চাই। এ ছিল পাকিস্তান আমলের লড়াইয়ের শ্লোগান। এখন বাংলাদেশ, অন্যতম নয় একমাত্র রাষ্ট্রভাষাই বাংলা। ৪র্থ দাবীটি যে কারণে উত্থাপিত হয়েছিল, তা এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু সকল ভাষার সমান মর্যাদা আর বাংলা ভাষা সর্বস্তরে চালু করার দাবী আজো রয়ে গেছে। সকল ভাষা বোঝাতে পাকিস্তান আমলে ভাষা সংগ্রামের সময় যে প্রাসঙ্গিকতা ছিল, তা কি আজ আছে? তখন পাকিস্তানের অর্ন্তভুক্ত উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মাতৃভাষা ‘পশতু’, বেলুচিস্তানের ‘বেলুচ’, সিন্ধু প্রদেশের মাতৃভাষা ‘সিন্ধ’, আর বিভক্ত পূর্ব পাঞ্জাবের ‘পাঞ্জাবী’কে বোঝানো হয়েছিল, কিন্তু আমাদের এই স্বদেশে বলতে গেলে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ব্যবহারিক ভাষা প্রচলিত নেই, আছে কেবল ৫৪টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে প্রচলিত আঞ্চলিক ভাষা। আমরা তাই মাতৃভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে যে সব আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও তার প্রকৃতি, ব্যাকরণ ও বর্ণমালা আছে, তাদেরও যথাযোগ্য মর্যাদা দাবী করে আসছি দীর্ঘকাল থেকে। বর্তমান সরকার অবশ্য আদিবাসীদের ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে দু’একটি আদিবাসী ভাষায় লেখাপড়া করার জন্যে বই প্রকাশ করেছিল। এ জন্যে নিশ্চয়ই আমরা সরকারকে সাধুবাদ জানাবো। কিন্তু দেশের সর্বাধিক মানুষ যে ভাষা ব্যবহার করেন অর্থাৎ বাংলাভাষা, যার জন্যে ১৯৫২ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশের ছাত্রজনতা নিজ রক্ত ঢেলে দিয়ে আপন মাতৃভাষার সম্মান রক্ষা করেছিলেন, মুক্ত স্বদেশে সরকারি নির্দেশ জারী করা ছাড়া আর কি কোন পদক্ষেপ আমরা গ্রহণ করতে পেরেছি?

আজ সেই ভাষা শহীদদের রক্তকে অপমান করে আমরা বাংলার পাশাপাশি ইংরেজী ও আরবী সহ বিদেশী ভাষার প্রতি কি আমাদের প্রীতি প্রদর্শন করছি না? মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে যেখানে একমাত্র বাংলাই রাষ্ট্রভাষা সেখানে অফিস আদালত, ঘরবাড়ী এমন কি রাস্তাঘাট ও দোকানপাটেও আমরা নির্লজ্জভাবে ভিনদেশী ভাষা ব্যবহার করে যাচ্ছি। এটা কি ‘রক্তস্নাত বাংলা’র প্রতি আমাদের অবজ্ঞা প্রদর্শন নয়? কেন এমন হচ্ছে? সরকার তো নিদের্শই দিয়েছেন কিন্তু তারপরেও এই গাফিলতি কেন?

একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন, আমাদের পূর্বপুরুষ অর্থাৎ ভাষা শহীদেরা যাঁরা প্রাণ বিসর্জন দিয়ে গেছেন আপন মাতৃভাষার জন্যে, সেই দেশেরই ২১ শে ফেব্রুয়ারী আজ ইউনেস্কো স্বীকৃত ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে দু-শতাধিক দেশে প্রতিবছর পালিত হয়ে যাচ্ছে, যে জন্যে কানাডা প্রবাসী দুই বঙ্গসন্তান সালাম ও রফিককে প্রথমে এবং পরে সেই সময়ের আওয়ামী সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলতে চাই, আজ কেন নিজ দেশেই মাতৃভাষা হিসাবে বাংলা ভাষা এত ম্লেচ্ছ। আমরা কী তবে মাতৃভাষার প্রতি আমাদের যে শ্রদ্ধাবোধ তা কি ভুলে গেছি? না, অন্যভাষা আচরি বিদেশী সমাজব্যবস্থাকে নিজ দেশে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছি? নাকি আমরা বিদেশে গিয়ে ঐ ভাষার সুবাদে উচ্চ শিক্ষাগ্রহণ করে ভাল একটা চাকরি বাগিয়ে সংসারে কিংবা ব্যক্তিজীবনে কেবলমাত্র অর্থসমাগম ঘটাচ্ছি? তাহলে ধিক সেই বঙ্গসন্তানকে। আধুনিকতার সুযোগে প্রযুক্তির বিপুল প্রগতিতে আমরাতো সদাই উচ্ছলিত এবং যা কিছু ভাল তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত। তাই তো ভাষা আন্দোলনের অন্যতম দাবী ছিল ‘সকল ভাষার সমান মর্যাদা চাই’। আমরা তো কেউ কখনো একথা বলিনি যে, বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা এদেশে লেখা বা পড়া যাবে না। রাষ্ট্র পরিচালকদের কাছে প্রশ্ন তাঁরা কি এসব জানা সত্বেও বাংলার অমর্যাদাকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নিয়েছেন? না হলে যে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যে ভাষা সংগ্রামের কাল থেকে দাবী তুলে আসছি, সেই দেশে মুক্তিযুদ্ধের পরেও কেন বাংলাকে এমনভাবে অবমাননা? চতুর্দিকে তাকিয়ে কী দেখেছেন আলাদা করে ইংরেজী ও আরবী পদ্ধতির শিক্ষা কী হারে বেড়ে গেছে এদেশে। যদি রাষ্ট্র পরিচালকেরা আপন মর্যাদা ও সম্মান প্রসঙ্গে সচেতন থাকতেন তাহলে কি এই দুরবস্থা সৃষ্টি হতে পারতো? আমার নয় দেশবাসীরই জবাব, না। অর্থাৎ কিনা দেশে যেকোনো ক্ষমতাসীন সরকার এই বিষয়টিকেই তেমন পাত্তা দিতে চাননি। যদি চাইতেন, তবে আদৌ কি এই বৈষম্যের সৃষ্টি হতে পারতো? আমারতো মনে হয়, হতো না।

এতক্ষণ দুঃখের কথাই শুধু বললাম যে তা নয়, নিজ দেশের জনগণের মাতৃভাষাকে কী হারে অবমান ও অপমান আমরা নিজেরাই করেছি, তা একবার হিসেব করে দেখলেই বোধ হয় বুঝতে পারবো। সুতরাং এর যথাবিহিত বিধান করা কী উচিৎ নয়? ভাষা আন্দোলনের রক্তে ঢাকা পিচঢালা কালো পথে আর সবুজের প্রান্তরে লাখ শহীদের ’৭১ এর রক্ত যে দেশে মিশে আছে, সে দেশের মানুষ হয়ে আমরা কি নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় নিবেদিত হতে পারি না? রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে বিদেশের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে অথবা যে কোন কারণেই আন্তর্জাতিকভাবে যদি ভিন্ন ভাষা প্রয়োগ করতে হয় তাতে তো ভাষা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের এই বাংলাদেশ কখনো আপত্তি করেনি, এখনো করে না, এমন কি ভবিষ্যতেও করবে না। একথা আমি হলফ করে বলতে পারি। আমি নয় শুধু দেশবাসী সকলে একমত এ প্রসঙ্গে। অথচ তারপরও কেন বাংলাভাষাকে হেয় প্রতিপন্ন করে সর্বত্র ইংরেজী ব্যবহার চলছে।

এসব প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্র পরিচালক অর্থাৎ ক্ষমতাসীন সরকারই দিতে পারে। কারণ তাঁরা সকল ক্ষমতার অধিকারী। আর তাদের মাধ্যমেই ৭২এর সংবিধান বর্ণিত, ‘জনগণই রাষ্ট্রের মালিক’ কথাটি যথার্থতা প্রমাণ করা যেতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন সরকারি গাফিলতি ও হীনমন্যতা বিসর্জন দিয়ে মাতৃভাষার প্রতি যথোপযুক্ত সম্মান দেখানোর জন্যে সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা। নির্দেশ জারী করুন, আগামী এক মাসের মধ্যে দেশের ভেতর মাতৃভাষা বাংলা ছাড়া অন্যকোন ভাষা ব্যবহার করলে তার প্রতি কঠোর শাস্তি বিধান করা হবে। মন্ত্রনালয় এ বিষয়ে সব কিছু ভেবে চিন্তে এই বিষয়ে আইন প্রণয়ন করতে পারে। তবে শাস্তি বা আইনের কথা সরকারই ভাববে, জনগণ নয়। প্রয়োজন হলে সরকার জনগণ, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সহযোগিতা অবশ্যই গ্রহণ করতে পারে। তবে যে ব্যবস্থাই গ্রহণ করুন না কেন, তা যেন প্রয়োগ হয়, সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখার জন্যে রাষ্ট্রপরিচালকদের প্রতি সনির্বন্ধ অনুরোধ থাকবে।

বাংলাভাষাকে সর্বস্তরে প্রচলনের ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরে যে বিড়ম্বনার সৃষ্টি করছে, তা কিন্তু কোনভাবেই স্বস্তির নয়। সবশেষে বলি ভাষা সংগ্রামী আর মুক্তিযোদ্ধদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে, বাংলার মানুষের প্রতি সম্মান দেখিয়ে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।

লেখক পরিচিকামাল লোহানীতি:
কামাল লোহানী:
ভাষা সংগ্রামী, শব্দসৈনিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

 

 

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.