মারুফা রহমানের কবিতা

Comments

তোমাকে

ঠোঁটের আলতো আলোয়
সুহৃদ
ত্রিনয়নে সন্ধ্যে দিলাম–  
সাঁঝবাতিটা জ্বললো যখন,
দমকা বাতাস উড়িয়ে নিলো
সব উচাটন।

চোখের কোণে
ঝর্ণা ঝরে-
মুক্তো আভা বিকিরণে

সখী চিবুক তোলো
চেয়ে দ্যাখো –

একলা মোটেও নও
তুমি,
অন্তহীন এ ছায়াপথে ।

যূথপ্রিয়তা

নদীটা ভাবনায় ছিলো
সামনে এসে দাঁড়ালো যখন
জানলা জুড়ে, জলের মরীচিকা
ঘর ভাসালো আলুথালু
আলোর পাথার
ভাবনা জুড়ে অবাক নদী
অনন্তকাল

শুক্ল যুঁথি পাল তুলে কার
চুল সাজায়
ভেজা চাঁদ লুকায়েছে আজ
ওই হিয়ায়
কাল তাকে মেখেছিল মেঘ
আজ ছুঁলো বৃষ্টিজল
যেভাবে গাছে গাছে পাতার গান
ছোঁয়
বসন্ত-হৃদয়

ও নদী তোর বুকে এ মুখ রাখি
পালের আবেগ দেখ্ দেখি
ওই জোয়ার ভাটায়

কলাতিয়ায় বিকিকিনি

এ পুরাণ যেন বর্তমান, 
পাবন মাতানো পাতাল-আকাশ মিলে মিশে
সব পথ মিলেছে এ-পথে।
যে পথে ধলেশ্বরীর সমস্ত ইন্দ্রিয় মেলে ষষ্ঠের বিন্দুতে।
জলেশ্বরীর পাড় পেরিয়ে জলো ক্ষেতে ডাহুকের ঠোঁট নিড়ানি, 
বৃক্ষের জঙলা ভেঙে একটা কানাকুয়ো হঠাৎ ডেকে ওঠে।
সংসার পেতেছে এক ব্যাঙমা-ব্যাঙমী ভেজা মাটির সুড়ঙ্গ ঘরে।
ঘুমন্ত রাজকন্যার সোনার কাঠি, রূপার কাঠি বদলের
সব রূপকথা, এখন বুকপকেটে।

ওসব গল্প পাথর চাপা আজকের পুঁথিপাঠে–
কলাতিয়া বাজারের এক কোণে
ফেলে দেয়া সবজির আরেক বাজার গড়ার বয়ান;

নাকে-মুখে কাপড়ে নিজেরে লুকোনো গেরস্ত বধূয়া
‘সামর্থ্য’ ঢেকেছে, কানে বাঁধা ধুলা-মুখোশে।
নীরব লোনাঠোঁটে রুই আর বোয়ালের বাজার ঠেলে
এগিয়ে যায় বাদ দেয়া আধেক-পচা সবজির দরদামে।

তিন রাস্তার মোড়ে রাখা কালো, সাদা গাড়ির দরজা খুলে
নেমে আসে রোদচশমা চোখে মানুষেরা।
আর্দালি তাদের, আগে আগে হেঁটে যায় ভিড় ঠেলে।
হাতের ইশারায় ফাঁকা হয় বোয়াল, নদীর রুই
আর মানকচু ঝোলে ভেসে ওঠা শোলমাছ ।

বাজার ভরা মুখোশের মানুষ; কেউ অভাব লুকোয়,
কেউ আড়াল করে, কোটি মানুষের সামর্থ্য চুরির চোখ দুটো।

কলাতিয়া জলেশ্বরীর পথ মিলায়
আকাশের নীলে…
ব্যাঙমা-ব্যাঙমী ব্যস্ত গোপন পুঁথি লেখায়।
যদি আবার সুদিন আসে,
সব পথ মিলেমিশে একাকার হয় এক পথে!
যেদিন সিন্দুর লাল মেঘে ধুলো উড়িয়ে ফিরবে
গৃহস্ত ঘরে মহিষের বাথান
সেইদিন,
এই তিনরাস্তার মোড়ে–এই কলাতিয়ায়
জ্যোৎস্নার আলো মেখে তারা আসর বসাবে
আবার।
আরো একবার মন্দ্র সপ্তকে কণ্ঠ খুলবে
মুখোশ খোলা কাহিনীর মুখরতায়

ভগ্নমনোরথ

হারানো মানুষের সাং–গ্রাম থাকে না
পথের ধুলোয় বালিয়াড়ি বসত
হাওয়ার গন্ধে চিহ্ন পড়ে রয়
হারানো মানুষের পর বলে কেউ নেই

হারানো মানুষের স্মৃতি নেই
সুধায় ভরা প্রতি মুহূর্ত জীবনকাল
স্নায়ুর পরতে সব শূন্য পাতা
বাঁকানো চক্র রেখায়
উদ্ভূত নানান রঙিন ছবি আঁকে
ছাই আর সাদা রঙ।

হারানো মানুষের সাং–পাড়া নেই
খেলার মাঠ থাকে না,
এক সিঁড়ি জীবনে ঘুরপাক খেতে খেতে
আকাশ অধরা 

হারানো মানুষের মানচিত্রে
শুধু নদী
জোয়ার ভাটায় গড়ানো দিন-রাত্তির
পর বলে তার কেউ নেই
আপন নামের কিছু নেই

মনমেঘ

কপোতাক্ষ ইচ্ছেডানা
উড়াল দিল আকাশে
পরতের পর পরত খুলে
মেঘমালার মন পড়ে…

সূর্য যখন ঢাকল ও মুখ
অভিমানে আড়ালে
তুমিও কি হও বিষণ্ন
ও মেঘ,
মনভারী সকালে?

রঙধনু যেই ছোঁয় ধরণী
রোদ বৃষ্টির অভিসারে
তুমিও কি স্ফূর্তিতে খুব
উড়নি ভাসাও বাতাসে?

ঈশানকোণে মন্দ্র নিনাদ
আকাশ উপুড় বরিষণ
ও কালিয়া মেঘা
কাঁদছ তুমি! গলছে
কাজল নীলাম্বরে

স্রোতোঞ্জনে সেজেছ
ও মেঘ
বাজছে মল্লার মৃদঙ্গম
কপোতাক্ষের ডানায়
কী আজ হারাবে
মন মেঘ প্রিয়ম?

লেখক:
Marufa Rahman
মারুফা রহমান, কবি, কৃষক, সাংবাদিক।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট