মার্কিন খেলোয়াড়দের অভিনব প্রতিবাদ নাকি সামাজিক দায়বদ্ধতা । মন্তব্য প্রতিবেদন

Comments

মার্কিন খেলোয়াড়দের মাঝে প্রতিবাদী চরিত্রের প্রকাশ ঘটছে খুব দ্রুত। মর্যাদার প্রশ্নে তো বটেই সামাজিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবীতে তাদের প্রতিবাদ বিশ্বব্যাপী দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জাতীয় সঙ্গীতের সময় না দাঁড়িয়ে হাঁটু মুড়ে বসে কিম্বা জাতীয় সঙ্গীত না গেয়ে তারা এই প্রতিবাদ জানাচ্ছেন যার শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে, চলছে আজও।

কলিন কেপারনিক

Players Protests_ColinKaepernickGame

কলিন কেপারনিক

মার্কিন ন্যাশনাল ফুটবল লিগের আফ্রিকান আমেরিকান খেলোয়াড় কলিন কেপারনিক সম্ভবত প্রথম ২০১৬ সালে ন্যাশনাল ফুটবল লিগের (NFL) একটি ম্যাচের আগে অভিনব এ পদ্ধতিতে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সান ফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত এক ফুটবল ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত চলার সময় এক হাঁটু গেড়ে কেপারনিক মাটিতে বসে থাকেন। পুলিশের বিরুদ্ধে বর্ণবিদ্বেষের অভিযোগের প্রতিবাদে এ প্রতিবাদ করেন বলে নিজেই তিনি জানান। এ প্রতিবাদ তিনি অব্যাহত রাখেন। তাকে অনুসরণ করেন ওকল্যান্ড রেইডার্স, মার্সন লিঞ্চসহ আরো অনেকেই।

Players Protests_ColinKaepernickKneeling

জাতীয় সঙ্গীতের সময় হাঁটু মুড়ে বসে কলিন কেপারনিক

তবে এমন কাণ্ডে তার উপর নেমে আসে শাস্তির খড়গ। কেপারনিককে জাতীয় সঙ্গীত অবমাননার অভিযোগে দল থেকে বাদ দেয়া হয়। এমনকি এই ঘটনার পর থেকে অন্যকোনও দল তাকে নেয়নি। ২০১৭ র সেপ্টেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এনএফএল কর্মকর্তাদের ফোন করে প্রতিবাদকারীদের দল থেকে বের করে দেবার নির্দেশ দেন।

Players Protests_ColinKaepernickjustdoitcampaign02

নাইকির বিজ্ঞাপনে কলিন কেপারনিক

২০১৮ সালে মাল্টিন্যাশনাল স্পোর্টস সু এবং অ্যাপারেল জায়েন্ট নাইকি তাদের “Just Do It” শ্লোগানের ত্রিশ বছর উপলক্ষে প্রকাশ করে একটি বিজ্ঞাপন। সেখানে কেপারনিকের ছবির উপরে লেখা থাকে, “Believe in something. Even if it means sacrificing everything.” এরপরেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গরা। পোড়ানো হয় নাইকির জুতো। সেই জুতো পোড়ানোর ছবি ভাইরাল হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। বিজ্ঞাপনটির নিন্দা করে মুখ খোলেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। তিনি অভিযোগ করেন যে এর মাধ্যমে নাইকি দেশবিরোধী কাজে মদত দিচ্ছে।

মেগান র‌্যাপিনো

Players Protests_MeganRapinoeGame

মেগান র‌্যাপিনো

ফ্রান্সের মাটিতে হল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় মার্কিন মেয়েদের ফুটবল দল। পুরুষ ফুটবলারদের সমবেতন দেবার দাবী করে আসছে মহিলা দল অনেকদিন থেকেই। সমান বেতনের দাবীর পাশাপাশি সমকামী অধিকার, পুলিশী অত্যাচার, জাতিবৈষম্যসহ সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বিশ্বকাপে থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে জাতীয় সঙ্গীতের সময় গলা মেলাননি মেগান র‍্যাপিনো। মেগানকে ব্যঙ্গ করে ট্রাম্প টুইট করেন, ‘এর মধ্যে প্রতিবাদ কোথায়?’

Players Protests_MeganRapinoeNationalAnthem

জাতীয় সঙ্গীত না গেয়ে দাঁড়িয়ে আছে ন মেগান র‌্যাপিনো

পাত্তা দেননি মেগান। ফাইনালেও একই পদ্ধতিতে প্রতিবাদ জানান মেগান। এর আগে এক সাক্ষাতকারে মেগান বলেন, ‘বিশ্বকাপ জিতলেও হোয়াইট হাউসে যাব না।’ একই কথা মেগান বলেন কোয়ার্টার ফাইনালের আগেও। প্রতিক্রিয়ায় কটাক্ষের সুরে ট্রাম্প টুইট করে লিখেছিলেন, ‘আগে তো জিতুন!’ এমনকি বিশ্বকাপ না জিতলেও দল হোয়াইট হাউসে যাওয়ার আমন্ত্রণ পাবে, জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। ছাড়ার পাত্রী নন মেগানও। বিশ্বকাপ জিতেও সাফ বলে দেন, ‘হোয়াইট হাউসে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। সতীর্থরাও কেউ ওখানে যাবে বলে মনে হয় না।’

মেগান কিন্তু এখানেই থেমে যাননি, তীব্র আক্রমণ শানিয়ে ট্রাম্পের শ্লোগান ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বিদ্ধ করে বলেন, ‘এই শ্লোগান আমেরিকার কিছু লোকের জন্য। সকলের জন্য নয়। বরং প্রেসিডেন্টের কাজের জন্যই আমেরিকার মান-সম্মান থাকবে না।’

রেস ইম্বোডেন

Players Protests_RaceImbodenGame

রেস ইম্বোডেন

আমেরিকার অলিম্পিকজয়ী ফেন্সিং টিম সদস্য রেস ইম্বোডেন জাতীয় সঙ্গীতের সময়ে মঞ্চে হাঁটু মুড়ে বসে প্রতিবাদ জানালেন। প্যান আমেরিকান গেমসে সোনা জয় করে পেরুর লিমায় পুরস্কার নিতে গিয়েছিল ফেন্সিং টিম। সেখানেই জাতীয় সঙ্গীতের সময়ে উঠে না দাঁড়িয়ে বর্ণবিদ্বেষ, অস্ত্র আইন, শরণার্থীদের প্রতি অবিচার এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান ইম্বোডেন।

Players Protests_RaceImbodenKneeling02

জাতীয় সঙ্গীতের সময় হাঁটু মুড়ে বসে রেস ইম্বোডেন

টুইটারে ইম্বোডেন লিখেছেন, ‘‘কিছু বিষয় আছে, যেগুলো নজরে আনা দরকার। এই মঞ্চে নিজের মুহূর্তটা বিলিয়ে দিয়ে সেই বিষয়গুলোর দিকে নজর কাড়তে চাইছি। অন্যদেরও বলছি, নিজের জায়গাটা ব্যবহার করে ক্ষমতায়ন ও পরিবর্তনের কথা বলুন।’’

আগষ্ট মাসের গোড়ার দিকে আর এক ফুটবলার (ফিলাডেলফিয়ার মিডফিল্ডার) আলেহান্দ্রো বেদোইয়া অস্ত্র হিংসা নিয়ে সরব হন।

একই ভাবে প্রতিবাদ জানান মার্কিন পুরুষদের বাস্কেটবল দলের প্রশিক্ষক গ্রেগ পোপোভিচ। তাঁর কথায়, ‘‘ক্ষমতায় থাকা লোকেরা যদি তাঁদের দম্ভ ঝেড়ে ফেলে কিছু করে দেখান…।’’

‘গোল্ডেন স্টেট ওয়ারিয়র্স’ বাস্কেটবল দলের প্রশিক্ষক স্টিভ কার বলেছেন, ‘‘আমাদের সহজেই আঘাত করা যায়, গির্জা-শপিং মল-সিনেমা হল-স্কুল যেখানে খুশি এমনটা ঘটতে পারে। মেরুদণ্ডহীন প্রশাসন এটা ঘটে যেতে দেবে – মার্কিন নাগরিকদেরই ভাবতে হবে, এর কোনও পরির্বতন তাঁরা চান কি না।’’

একটি সমাজে সামাজিক ও রাজনৈতিক অনাচারে ক্ষতিগ্রস্থ হন সাধারণ নাগরিক যারা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। স্বাধীন সমাজে প্রতিটি পেশার প্রতিটি মানুষের অধিকার রয়েছে সে দেশের নাগরিকের প্রতি সঙ্ঘটিত যে কোন অন্যায় অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক, রাজনৈতিক অন্যায়, অনাচারের কিম্বা মার্কিনী যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রনায়কদের নীতির বিরুদ্ধে এমন কি ভিনদেশে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আজকে নতুন নয়।

বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী পল রবসন কিভাবে মানুষের জন্যে সংগ্রাম করেছিলেন, উপনিবেশবাদ ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পল রবসন। গড়ে তুলেছিলেন জোড়ালো সংগঠন। পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন আন্দোলনের ঢেউ বিশ্বজুড়ে।

Protest_Paul Robeson

পল রবসন

তাঁর ‘ওল্ড ম্যান রিভার’ অবলম্বনে ভুপেন হাজারিকা গাইলেন ‘বিস্তীর্ণ দুপাড়ে’। বিপ্লবী কবি নাজিম হিকমত তাঁর কবিতায় পল রবসন স্মরণে লিখেছিলেন ‘ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না পল রবসন’। বস্তুত পল রবসনের রক্ত রয়েছে শোষিত মানুষের স্রোতে। তাঁকে জীবন যুদ্ধে প্রতিটি সময়ে মুখোমুখি হতে হয়েছিলো অপমান আর অত্যাচারের, সইতে হয়েছিল জেলজুলুম। তবুও মানুষের গান গেয়েছেন পল রবসন।

শিক্ষক, লেখক অসাধারণ বক্তা এঞ্জেলা ডেভিস। মার্কিন প্রশাসনের বর্ণবিদ্বেষ, এক চোখা নীতির বিরুদ্ধে আজও সোচ্চার এঞ্জেলা ডেভিসকেও সইতে হয়েছে জেলজুলুম। এঞ্জেলার লড়াই এক অসম রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যে ব্যবস্থায় নিজের ন্যায্য অধিকার দাবীর অপরাধে অসংখ্য কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ কারাকক্ষে দিনের পর দিন নির্মম নির্যাতন ভোগ করছে।

Protest_Angela Davis

এঞ্জেলা ডেভিস

৪০ বছর আগে যেমন ছিল পরেও সে অবস্থা কি বদলেছে? না, আজও আমেরিকার জেল ব্যবস্থার প্রধান শিকার সে দেশের কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক। ১৯৭২ সালে জেলে আটক এমন কালো মানুষের সংখ্যা ছিল তিন লাখ আর তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ লাখে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের মোট কৃষ্ণাঙ্গের প্রতি চারজনের একজন তাদের জীবনের কোনো না কোনো সময় কারাভোগ করছে। এঞ্জেলার ভাষায়, এই হলো আমেরিকার ‘প্রিজন ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স।’

বিশ্বজয়ী মার্কিন মুষ্টিযোদ্ধা ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লে জুনিয়র ওরফে মোহম্মদ আলী যিনি তার যুগে মুষ্টিযুদ্ধে একচ্ছত্র আধিপত্য করে গেছেন, তিনিও মার্কিন প্রশাসনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। কোন অন্যায়ের জন্যে নয়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার কারণে।

Protest_against_tache_Vietnam_War03

মোহম্মদ আলী

কিংবদন্তি এ বক্সার ১৯৬৭ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার অংশগ্রহণের বিরোধিতার কারণে মার্কিন সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান করতে অস্বীকৃতি জানান। এর কয়েকদিন পরে তাঁকে এই কারণে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁর বক্সিং উপাধি কেড়ে নেওয়া হয়। তিনি তাঁর জীবনের সেরা সময়ে পরবর্তী চার বছর কোন ধরণের বক্সিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেননি।

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধী বিচার আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন বা বিভিন্ন সামাজিক অসঙ্গতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাহিত্যিক-শিল্পী-সাংবাদিক-খেলোয়াড় তার সামাজিক এই দায়বদ্ধতা থেকে এক চুল সরে আসেননি। ৯০ এর দশকেও এঁদের রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা ছিল উচ্চকিত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে, গণতন্ত্রহীনতা, সংকীর্ণতা ও পশ্চাৎপদতা, ধর্মীয় উন্মাদনা ও অন্ধ গোঁড়ামির অনভিপ্রেত অপচ্ছায়া দূর করার জন্য বিগত শতাব্দীর সিংহভাগ জুড়ে আমাদের দেশে মানবমুক্তির ও মানসমুক্তির হাওয়া ছড়িয়ে দিয়েছেন সাহিত্যিক-শিল্পী-সাংবাদিক-খেলোয়াড় সকলেই।

আজ যখন সমাজ, দেশ এক অন্ধ গহ্বরে নিমজ্জমান, যখন অমুসলিম নির্যাতন, ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠী নিপীড়ন, নারী নির্যাতন, দুর্নীতি, খুন, গুম, ধর্ষণের এক উল্লাস মঞ্চে রূপ লাভ করেছে দেশ তখন সাহিত্যিক-শিল্পী-সাংবাদিক-খেলোয়াড়সহ বিভিন্ন পেশার মানুষের সেই ভূমিকা কোথায়? কোথায় সেই সামাজিক দায়বদ্ধতা? আজ কেন জাতি খুঁজে পায় না একজন সুফিয়া কামাল, কে এম সোবহান, কবীর চৌধুরী, ফয়েজ আহমদ, আহমদ শরীফ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে?

মন্তব্য প্রতিবেদক: সাগর লোহানী, সম্পাদক, বাঙালীয়ানা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.