মার্কো পোলো: ফাদার অব ট্র্যাভেলার্স

Comments
মার্কো পোলো ছিলেন ইতালির ভেনিস শহরের বিখ্যাত পর্যটক, বণিক, লেখক ও অনুসন্ধানকারী। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই দুর্গম ও বিপজ্জনক পথে পৃথিবী চষে বেড়িয়েছেন। হেঁটেই জয় করেছিলেন পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ। পাশ্চাত্য দেশগুলো থেকে সর্বপ্রথম যে ক’জন পর্যটক এশিয়ায় এসেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম নাম মার্কো পোলো। ইউরোপীয়দের কাছে চীনের তৎকালীন নাম ছিল ক্যাথে। মার্কো পোলো চীনের সিল্ক রোড দিয়ে এশিয়ায় পোঁছান। এছাড়া তিনি সর্বপ্রথম ইউরোপীয় হিসেবে মঙ্গোলদের সাম্রাজ্যে পদার্পণকারীদের অন্যতম। আমেরিকা জয় করার পেছনে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের অনুপ্রেরণা ছিল মার্কো পোলো’র দুঃসাহসিক জীবনের ঘটনা নিয়ে তার নিজের লেখা বই ‘দ্য ট্র্যাভেলস অব মার্কো পোলো’।
মার্কো পোলো: ফাদার অব ট্র্যাভেলার্স

মার্কো পোলো। (ছবি-ফ্যাক্টইনএট ডট কম )

ইতিহাসে মার্কো পোলো’র জন্ম নিয়ে নানান রকম মত আছে, তবে ১২৫৪ সালের কথা সবখানেই আলোচিত হয়েছে। ইতালির ভেনিস শহরের একটি সম্ভ্রান্ত বণিক পরিবারে জন্ম মার্কো পোলো’র। জন্মের বছর খানেক আগে তার বাবা নিকোলো পোলো ও চাচা মাফফেও লম্বা সময়ের জন্য ব্যবসায়িক অভিযানে বের হন। মার্কো’কে ছোট্ট রেখেই মারা যান তার মা আনা ডিফিউসে। তার বাবা ও চাচা প্রথম ছয় বছর কাটান কনস্টান্টিনোপলে (বর্তমান ইস্তাম্বুল, তুরস্ক), যা তখন ল্যাটিনদের নিয়ন্ত্রণে চতুর্থ ক্রুসেডের আধীনে ছিলো। এরপর দুই ভাই ফিরে আসেন সলদিয়ায়, (বর্তমান সুদাক, ইউক্রেন) যেখানে তাদের নিজেদের একটি বাড়ি ছিলো।

মার্কো’র বয়স যখন পনের বছর তখন তার বাবা ও চাচা ফিরে আসেন চীন থেকে। ভেনিসে নিজ বাড়িতে দুই বছর কাটান মার্কো’র বাবা। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, আবারও পাড়ি দেবেন সেই দুঃসাহসিক পথ। তবে এবার সতের বছর বয়সী মার্কো হবেন সফর সঙ্গী। এখান থেকেই মার্কো পোলো’র পৃথিবী ভ্রমণের যাত্রা শুরু হয়। এই শুরুর মাধ্যমেই মার্কো পোলো পরবর্তীতে পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা পর্যটকে পরিণত হন। অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের মধ্য দিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছান আকর বন্দরে। জেরুজালেম শহরের কাছে এটি অবস্থিত। সেখানে একজন যাজকের সঙ্গে দেখা করেন তারা। যাজকের সাথে দেখা করার পেছনে কারণ ছিল।

মার্কো পোলো: ফাদার অব ট্র্যাভেলার্স

মঙ্গোল সম্রাট কুবলাই খান। ( ছবি-সংগৃহীত)

মোঙ্গল সম্রাট কুবলাই খান তখন চীনের শাসক ৷ চীন অঞ্চলে কুবলাই খান শুধু ক্ষমতাবান ও শক্তিশালীই ছিলেন না, তাঁর জ্ঞানও ছিল অগাধ। বাইরের জগৎ সম্বন্ধে খুব আগ্রহ ছিল তার। ইউরোপের সভ্যতা ও সংস্কৃতির ব্যাপারেও ছিল তার প্রবল আগ্রহ। মার্কো’র বাবার কাছে সে অঞ্চলে প্রচলিত খ্রিস্ট ধর্ম সম্পর্কে শুনে এর প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন কুবলাই খান। তারা যখন চীন থেকে ইউরোপ ফিরে আসে, তখন তাদের কাছে একটি চিঠি দিয়ে দেন তিনি। এটি সেখানকার পোপকে দিতে বলেন কুবলাই খান। চিঠিতে ইউরোপ থেকে একশো জন শিক্ষিত যাজক পাঠানোর অনুরোধ করেন তিনি।

কিন্তু দেশে ফিরে এসে তারা দেখেন, সেখানকার পোপ মারা গেছে। নতুন পোপ নির্বাচন হলে তারপর চিঠি দিতে হবে। কিন্তু দুই বছর পার হয়ে গেলেও পোপ আর নির্বাচন হয় না। তাই যাজক না নিয়েই রওনা হয়ে গেলেন তারা। পথে জেরুজালেমে থিউব্যাল্ডের কাছে চিঠি উপস্থাপন করেন। কিন্তু তিনিও যাজক দিয়ে কোনো সাহায্য করতে পারেননি। তবে জেরুজালেমে এসে অন্য একটি দিক থেকে সুবিধা হয়। জেরুজালেমের সেপলক্যার গির্জা থেকে বিশেষ এক তেল চেয়েছিলেন কুবলাই খান। তিনি শুনেছিলেন সেপলক্যার গির্জায় হাজার বছর ধরে একটি প্রদীপ জ্বলে চলছে, কখনো নিভছে না। এই প্রদীপকে বছরের পর বছর জ্বালিয়ে রাখছে যে তেল, তার এক বোতল নমুনা দেখতে চেয়েছিলেন তিনি।

মার্কো পোলো: ফাদার অব ট্র্যাভেলার্স

মার্কো পোলো’র ভ্রমণ পথ। (ছবি-হিস্টোরি)

শুরু হল তাদের এক কষ্টকর দীর্ঘ ভ্রমণ। তখন স্থলপথে যান্ত্রিক কোনো বাহন ছিল না। কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো খচ্চরে চড়ে, কখনো বা উটের পিঠে করে যেতে লাগলেন তাঁরা। রাত কাটাতে লাগলেন খোলা আকাশের নিচে। মার্কো’র জন্য কষ্টের অভিজ্ঞতা এটাই প্রথম ৷ তবে মার্কো সেটা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উপভোগ করার চেষ্টা করেছেন। যাত্রাপথের সব অভিজ্ঞতা সযত্নে টুকে রাখতেন। মার্কো এক অদ্ভুত জায়গার বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, তেলের ঝর্ণা রয়েছে সেখানে। মাটি ফুঁড়ে তেল বেরুচ্ছে ফোয়ারার মতো। দিন-রাত অবিরাম ঝরছে। ভোজ্যতেল নয়, জ্বালানি তেল। দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসে এ তেল নিতে। সেই অদ্ভুত জায়গা এখন বিখ্যাত ‘বাকু তেলক্ষেত্র’ নামে পরিচিত। বিশ্বজুড়ে বিমান ও মোটরযানের জ্বালানি তেলের বিপুল চাহিদা মেটাচ্ছে এ তেলক্ষেত্র।

তেল নিয়ে মার্কো পোলো’রা রওনা দিলেন আয়াসের পথে। সেখান থেকে যেতে হবে চীন দেশে। তবে সেখানে গিয়ে শুনলেন নতুন পোপ নির্বাচিত হয়েছেন গ্রেগরি দশম। তাই তারা গেলেন তার কাছে। চিঠি পেয়ে পোপ খুব খুশি হলেন এবং সম্রাটের জন্য অনেক উপহার প্রদান করলেন। কিন্তু একশো জন যাজক দিতে পারেননি তিনি। কোনোক্রমে দুজনকে পাঠিয়েছিলেন তাদের সাথে। তা’ও মাঝপথে ভয়ে তারা পালিয়ে চলে আসেন।

তখন স্থলপথে যান্ত্রিক কোনো বাহন ছিল না। পায়ে হেঁটে, খচ্চরের পিঠে, উটের পিঠে কিংবা ঘোড়ায় চড়ে পথ চলতে হতো। দূর ভ্রমণে পথিকদেরকে ঘুমাতে হতো খোলা আকাশের নীচে। সে অভিজ্ঞতা অবশ্যই কষ্টকর। তবে মার্কোর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন। রুক্ষতার মাঝেও ফুলেল সৌন্দর্য খুঁজে নিতে পারতেন তিনি।

এরপর হেঁটে হেঁটে তারা এলেন বাগদাদ শহরে। সেকালে বাগদাদই ছিল বিশ্বের সেরা নগরী। বাগদাদের পর্ব শেষ করে তারা রওনা হলেন কেরমান শহরের দিকে। কেরমান থেকে চীন যাবার পথ দুটি। একটি গিয়েছে আফগানিস্তানের উপর দিয়ে, আরেকটি হরমুজের উপর দিয়ে। তারা হরমুজের পথ বেছে নিলেন। কিন্তু হরমুজে গিয়ে বাঁধলো বিপত্তি। তাদের হিসেবকৃত পথে কোনো জাহাজই যাবার উপযুক্ত নয়। যে যে জাহাজ ছিল, তাদের কোনোটিই দীর্ঘ ভ্রমণের উপযুক্ত নয়। যেগুলো ছিল, সেগুলো নিয়ে যাত্রা করলে যেকোনো সময় হয়ে যেতে পারে অকেজো। সামান্য আঘাতে হয়ে যেতে পারে চুরমার। এসব আশঙ্কায় তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, অনিশ্চিত পথে দ্রুত যাবার চেয়ে নিশ্চিত পথে দেরিতে যাওয়া ভালো। তাই তারা ফিরে গেলেন কেরমানে, যেখানে চীন যাবার পথ দু’ভাগে ভাগ হয়েছিল।

মার্কো পোলো: ফাদার অব ট্র্যাভেলার্স

মার্কো পোলো’র জাহাজ। (ছবি-সংগৃহীত)

সেখান থেকে যাত্রা করে তারা পাড়ি দেন পামির মালভূমি। বিস্তৃত এই মরুভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থিত বলে একে পৃথিবীর ছাদ বলে ডাকা হয়। সেখানে পোলো’রা শীতের কষ্টে পড়েন। পাশাপাশি তারা খেয়াল করেন, রান্নার জন্য খাবারগুলোকে সেদ্ধ করা যায় না সেখানে ভালোভাবে। তখন এর পেছনের কারণ জানা ছিল না তাদের। মার্কো পোলো’রা এর পেছনে প্রচণ্ড শীতকে দায়ী করেছিলেন। তবে বিজ্ঞানের কল্যাণে এখন আমরা জানি, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশি উঁচু স্থানে বায়ুর চাপ কম থাকে, ফলে পানি দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে যায়। অল্প তাপমাত্রাতেই পানি বাষ্প হয়ে যায় বলে খাবার সেদ্ধ হবার জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা তৈরি হতে পারে না। এ কারণে খাবার কাঁচা থেকে যায়।

পামির মালভূমি পেরিয়ে তারা রওনা হন কাশ্মীরের দিকে। সুন্দরতম এই শহর শেষে তারা রওনা হন তাংগুত প্রদেশের উদ্দেশ্যে। সেখানে এসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন তারা। দ্রুত তাদের আগমনের খবর পাঠানো হলো কুবলাই খানের কাছে। তখন দ্রুত খবর পাঠানোর বিশেষ ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। স্থানে স্থানে ডাকঘর বসানো থাকতো। সেখানে কেউ চিঠি প্রদান করলে একজন ঘোড়সওয়ার তা নিয়ে দ্রুত গতিতে পৌঁছে দিতেন পরবর্তী ডাকঘরে। সেখানে চিঠি দেওয়া মাত্র সেখানকার ঘোড়সওয়ার রওনা হতো চিঠি নিয়ে। এভাবে ধাপে ধাপে খুব দ্রুত সময়ে চিঠি বা বার্তা পৌঁছে দেয়া যেত। এতে করে বৃহৎ রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ খবর অল্প সময়ে চলে আসতো কেন্দ্রে।

কুবলাই খানের কাছে উপহার সামগ্রী ও বিশেষ তেল তুলে দিলেন তারা। তিনি বেশ খুশি হলেন তাতে। আর এদিকে মার্কোর জ্ঞান ও অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাকে খুব পছন্দ করেন সম্রাট। ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হয়ে যায় তাদের সম্পর্ক। সম্রাট রাজ্য সংক্রান্ত নানা ধরনের কাজ দিতে থাকেন মার্কোকে। একসময় রাজ্যের কূটনৈতিক কাজের দায়িত্বও দিলেন তাকে। এসবের পেছনে অণুঘটক হিসেবে কাজ করেছে তার সততা ও বিশ্বস্ততা।

মার্কো পোলো: ফাদার অব ট্র্যাভেলার্স

ভেনিস থেকে চীন যাত্রা। (ছবি-সংগৃহীত)

ভেনিস থেকে চীন পৌঁছতে প্রায় তিন বছরের মতো সময় লেগে যায় মার্কো’দের। দীর্ঘদিনের এ সফরে তাঁরা যে শুধু একটানা চলার ওপর ছিলেন তা নয়, বাণিজ্য ছিল তাঁদের মূল লক্ষ্য। কাজেই কোনো শহরে ব্যবসা করার সুবিধা হলে সেখানে কয়েক সপ্তাহ বা দু-তিন মাসও থেকেছেন। এছাড়া মার্কো পোলো অসুস্হও ছিলেন দীর্ঘদিন। তিন পোলো যখন চীন পৌঁছেন মার্কো তখন বিশ বছরের তরতাজা তরুণ। সেখানেই কেটে যায় সতেরটি বছর। চীন পৌঁছে কয়েকটা মাস কুবলাই খানের গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদে কাটান মার্কো। এ সময় সম্রাটের সঙ্গে শিকারে যেতেন তিনি। চীনের মূল রাজধানী ছিল খানবালিক, যা বর্তমানে বেইজিং নামে পরিচিত। গরমকালটা শিকার এবং আমোদ-প্রমোদে কাটিয়ে নিজের আসল প্রাসাদে ফিরে আসেন কুবলাই খান। মার্কোও আসেন তাঁর সঙ্গে। সততা ও বিশ্বস্ততার গুণে মার্কো শিগগিরই কুবলসি খানের আস্হাভাজন হয়ে ওঠেন। কুবলাই খান পরবর্তী সময়ে তাঁকে কূটনৈতিক কাজে নিয়োগ করেন। এর অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কাজে তিন বছর হ্যাংচাউয়ে কাটান তিনি।

সতের বছর চীনে কাটানোর পর প্রচুর ধনসম্পদের মালিক হয়ে যান মার্কো পোলো। এবারে ভেনিসে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেন ৷ মার্কোর বয়স তখন ৩৮। তাঁর বাবা ও চাচাও প্রায় বৃদ্ধ হয়ে গেছে। যদিও কুবলাই খান তাঁদেরকে যেতে দিতে রাজি ছিলেন না। অনেক চেষ্টার পর সুযোগ পেয়ে গেল মার্কো’রা। ১২৯২ সালে দেশের পথে রওনা হলেন তাঁরা। পারস্য পৌঁছতে দু বছর লেগে যায়। অবশেষে ১২৯৫ সালে ভেনিসে পৌঁছেন তাঁরা। বাড়ি ফেরার পর শুরুতে ঝামেলায় পড়তে হয় মার্কো’দের। এতদিন পর তাঁদের দেখে আত্মীয়স্বজন কেউ চিনতে পারেন নি। তা ছাড়া দীর্ঘভ্রমণে সবার বেশভূষাও মলিন হয়ে গিয়েছিল। তবে যে উদ্দেশ্য নিয়ে পোলো’রা দেশ ছেড়েছিলেন এতে তাঁরা সফল হন ষোলোআনা। মূল্যবান রত্নসহ অনেক দামি জিনিস নিয়ে ফেরেন। অল্প সময়ের মাঝেই ভেনিসের ধনকুবের হিসেবে খ্যাতি ছড়ায় তাঁদের।

মার্কো পোলো: ফাদার অব ট্র্যাভেলার্স

মার্কো পোলো’র ৪০০ বছর পরের ভেনিস শহর। (ছবি-সংগৃহীত)

১২৯৫ সালে মার্কো পোলো যখন ভেনিসে ফিরলেন তখন ভেনিসের সাথে জেনোয়ার (বর্তমানে ইতালির উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত একটি বড় শহর) যুদ্ধ চলছিল। মার্কো পোলো জন্মভূমি ভেনিসের হয়ে এক রণতরীর নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধ চলাকালে মার্কো পোলো বন্দি হন জেলে। জেনোয়ার এডমিরাল ল্যাম্বা ডি’ওরি ভেনিসিয়ান একটি জাহাজ ক্রোক করে এবং এর সকল ক্রু ও যাত্রীদের বন্দি করেন। তাদের মধ্যে মার্কো পোলোও ছিলেন। কয়েক মাস ধরে জেলে বন্দি থাকাকালীন আর একজন বন্দি রুস্টচিলো দা পিসাকে তিনি তার ভ্রমনের অভিজ্ঞতা খুলে বলেন। পরবর্তীতে রুস্টচিলো দা পিসা মার্কো পোলো’র ভ্রমনের অভিজ্ঞতার সাথে তার নিজের এবং চীন সম্পর্কে শোনা অন্যান্য গল্প একত্রিত এবং সংকলিত করে সেই সংকলনের একটি বই বের করেন যার নাম ছিল “দ্যা ট্রাভেলস অফ মার্কো পোলো” এই বইয়ে মার্কো পোলো’র এশিয়া হয়ে চীন যাবার গল্প ছিল যা ইউরোপীয়ানদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয় এবং এশিয়া ও আরো দূরবর্তী পূর্ব এশিয়া যেমন চীন ও জাপান সম্পর্কে ইউরোপীয়ানদের আগ্রহী করে তোলে।

মার্কো পোলো: ফাদার অব ট্র্যাভেলার্স

বৃদ্ধ বয়সে মার্কো পোলো।  (ছবি-সংগৃহীত)

১২৯৯ সালের আগস্ট মাসে বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান এবং ভেনিসে ফিরে যান মার্কো। যেখানকার কন্ট্রাডা সান গিয়োভানি শহরে তার বাবা এবং চাচা বৃহৎ আকারের একটি কোম্পানি কিনে রেখেছিল। তাদের সেই কোম্পানি ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে মার্কো পোলোও অনেক বিত্তশালি হয়ে ওঠেন। তিনি এশিয়া এবং চীন অভিমুখে অনেক অভিযান পরিচালনার জন্য অর্থায়ন করেছিলেন কিন্তু নিজে আর কখনো ভেনিস ত্যাগ করেন নি। ১৩০০ সালে ভেনিসিয়ান ব্যবসায়ী ভিতাল বাদোরের মেয়ে দান্তা বাদোরকে বিয়ে করেন।

মার্কো পোলো’র এশিয়া হয়ে চীন পৌঁছানোর দুঃসাহসিক এই অভিযানের গল্প ইউরোপীয়ানদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। এই ভ্রমণবৃত্তান্তটি মধ্যযুগের একটি দলিল হিসেবে গণ্য করা যায়। এজন্যই মার্কো পোলো আজকের যুগের অন্যতম এক পথপরিদর্শক। মার্কো পোলো’র ভ্রমনকাহিনী বইটি লেখার ১৭৫ বছর পর কলম্বাস অ্যাটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেবার পরিকল্পনা করেন। কলম্বাস ভেবেছিলেন তিনি মার্কো পোলো বর্ণিত জাভা, সুমাত্রা ও অন্যান্য পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছেছিলেন। আসলে তা নয়। তার বদলে কলম্বাস ক্যারিবিয় সমুদ্রের হাইতি ও কিউবা আবিষ্কার করেছিলেন। কাজেই কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পেছনে মার্কো পোলো’র অবদানকে অস্বীকার করা যায়না।

মার্কো পোলো: ফাদার অব ট্র্যাভেলার্স

‘দ্য ট্র্যাভেলার্স অব মার্কো পোলো’ বই। (ছবি-সংগৃহীত)

মার্কো পোলো’র ভ্রমণ ও অন্যান্য কাহিনী নিয়ে বিতর্ক আছে। যেমন; অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, যেসব যুদ্ধের কথা প্রচলিত আছে সেরকম কোনো যুদ্ধই সংঘটিত হয়নি ইতিহাসে। তার উপর তিনি এমন কিছু ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন, যার বাস্তব অস্তিত্ব কখনোই থাকতে পারে না। যেমন- তিনি নাকি এমন এক পাখি দেখেছিলেন, যেগুলো হাতিকে পর্যন্ত খেয়ে ফেলতে পারে। এরকম আরো বেশ কিছু ত্রুটি থেকে বোঝা যায়, মার্কো পোলো এসব বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলেছেন। কোনো কোনো গবেষক এমনও দাবি করেন, মার্কো আসলে কখনো চীন ভ্রমণ করেননি, এর আগে যারা ভ্রমণ করেছিল তাদের কাছ থেকে বর্ণনা নিয়ে লিখেছিলেন এই বই।

মার্কো পোলো: ফাদার অব ট্র্যাভেলার্স

নেটফ্লিক্স অরিজিনাল সিরিজ ‘মার্কো পোলো’র পোস্টার। (ছবি-আইএমডিবি)

অনেকের অনেক মত থাকলেও ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই সমাদৃত হয়েছেন মার্কো পোলো। এই ঐতিহাসিক চরিত্রকে নিয়ে ২০০৭ সালে নির্মিত হয়েছে টিভি-ফিকশোন ‘মার্কো পোলো’। এছাড়াও ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালে নেটফ্লিক্সের জন্য নির্মিত হয় অরিজিনাল টিভি সিরিজ ‘মার্কো পোলো’। মোট ২০ এপিসোডের এই টিভি সিরিজে মার্কো’র চরিত্রে অভিনয় করেছেন লরেঞ্জো রিচলমি, কুবলাই খানের চরিত্রে ছিলেন বেনেডিক্ট অং।

একজন মার্কো পোলো’র ইতিহাস, মানব সভ্যতা বিকাশের ইতিহাস। মার্কো পোলো’র ভ্রমণকাহিনীতে তাঁর যুগের প্রাচ্যের জীবনধারা সবিস্তারে লেখা হয়েছে। আর এ বই লিখেই  ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি ৷ বিশ্বের সর্বকালের সেরা পর্যটকদের তালিকায় চির উজ্জ্বল হয়ে আছে তাঁর নাম।

 

তথ্যসূত্র: হিস্টোরি ডট কম, ফ্যাক্টইনএট, ইতিবৃত্ত ডট কম, উইকিপিডিয়া, বায়োগ্রাফি ডট কম।

বাঙালীয়ানা/টিএইচ/

 

আরো পছন্দ করতে পারেন:

মেরিলিন মনরো: যে আবেদনময়ী সৌন্দর্যের মৃত্যু নেই

আনোয়ার হোসেন: আনু ভাই থেকে মুকুটহীন নবাব

আশা ভোঁসলে থেকে আশাজি

 

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.