মাস্টারদা, আমাদের সাহস । সাগর লোহানী

Comments
পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে সফল আক্রমণের পরে মাস্টারদা আত্মগোপনে চলে যান। ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী চট্টগ্রাম থেকে ১০ মাইল দূরে পটিয়া থানার গৈরিলা গ্রামের ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িতে সূর্যসেন আত্মগোপন করে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ব্রজেন সেন, কল্পনা দত্ত ও মনি দত্ত। নগেন সেন নামের এক বিশ্বাসঘাতক এ খবর পৌঁছে দিল বৃটিশ পুলিশের কাছে। পুলিশ-বাহিনী বাড়িটি ঘিরে ফেললো। শুরু হল লড়াই। অবশেষে পুলিশ গ্রেফতার করলো মাস্টারদা ও ব্রজেন সেনকে। কল্পনা দত্ত ও মনি দত্ত পুলিশের বেষ্টনী ভেদ করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেন। গ্রেফতারের পর মাস্টারদা ও ব্রজেন সেনের ওপর চললো অমানুষিক বর্বর অত্যাচার। হাত-পা শিকলে বেঁধে মাস্টারদাকে পুলিশ নিয়ে গেল চট্টগ্রামে। ২০ ফেব্রুয়ারি মাস্টারদা ও ব্রজেন সেনকে জেলে পাঠানো হল।

“যুগান্তর” দলের চট্টগ্রাম শাখার নতুন সভাপতি তারকেশ্বর দস্তিদার মাস্টারদাকে চট্টগ্রাম জেল থেকে ছিনিয়ে আনবার পরিকল্পনা করেন কিন্তু প্রস্তুতি কালে ফাঁস হয়ে যাওয়ায় সে পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। গ্রেফতার হন তারকেশ্বর দস্তিদার, কল্পনা দত্তসহ আরো অনেকেই। বিশেষ আদালতে সূর্যসেন, তারকেশ্বর দস্তিদার, কল্পনা দত্তের বিচার শুরু হয়। ১৯৩৩ সালের ১৪ আগস্ট মাস্টারদা সূর্যসেন, তারকেশ্বর দস্তিদারকে মৃত্যুদন্ড এবং কল্পনা দত্তকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়।

Surya_Sen_01

মাস্টারদা সূর্যসেন

১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারী রাত ১২টা ১ মিনিটে ফাঁসী কার্যকরের আগে মাস্টারদার উপর আবার নেমে আসে নির্যাতনের ষ্টীম রোলার। হাতুড়ি দিয়ে তাঁর দাঁতগুলো ভেঙ্গে ফেলা হয়, হাতের কব্জি-কনুই, পায়ের পাতা-হাঁটু ভেঙ্গে ফেলা হয়, হাতের প্রতিটি নখ উপড়ে ফেলা হয়। এরপর অর্ধচেতন মাস্টারদাকে টেনে হিঁচড়ে তোলা হয় ফাঁসীর মঞ্চে। ফাঁসী দিয়েও ক্ষান্ত হয়নি বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী নরপিশাচেরা, মাস্টারদার মৃতদেহ সৎকারের সুযোগ তো দেয়ইনি বরং তাঁর দেহ লোহার খাঁচায় ভরে বঙ্গোপসাগরের গভীরে ডুবিয়ে দেয়।

১৮৯৪ সালের ২২ মার্চে চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়া গ্রামের রাজমণি সেন ও শশীবালা সেনের চতুর্থ সন্তান সূর্যকুমার সেন, যার ডাক নাম কালু, চট্টগ্রামের বিপ্লবী ইতিহাসের মহানায়ক, ভারতের মুক্তি আন্দোলনের পথিকৃৎ বিপ্লবী বীর মাস্টারদা সূর্যসেন চট্টগ্রাম জেলে ফাঁসির কয়েক ঘন্টা আগে লিখে গেলেন বাংলার মুক্তিকামী মানুষের জন্যে তাঁর শেষ বাণী যা এদেশের তরুণদের আজও জোগায় সাহস, শক্তি আর দেখায় মুক্তি আর স্বাধীনতার স্বপ্ন:

“আমার শেষ বাণী- আদর্শ ও একতা। ফাঁসির রজ্জু আমার মাথার উপর ঝুলছে। মৃত্যু আমার দরজায় করাঘাত করছে। মন আমার অসীমের পানে ছুটে চলছে। এই ত সাধনার সময়। বন্ধুরূপে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার এই ত সময়। ফেলে আসা দিনগুলোকে স্মরণ করার এই ত সময়। কত মধুর তোমাদের সকলের স্মৃতি। তোমরা আমার ভাই-বোনেরা তোমাদের মধুর স্মৃতি বৈচিত্রহীন আমার এই জীবনের একঘেঁয়েমিকে ভেঙে দেয়। উৎসাহ দেয় আমাকে। এই সুন্দর পরম মুহূর্তে আমি তোমাদের জন্য দিয়ে গেলাম স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন। আমার জীবনের এক শুভ মুহূর্তে এই স্বপ্ন আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। জীবনভর উৎসাহভরে ও অক্লান্তভাবে পাগলের মতো সেই স্বপ্নের পেছনে আমি ছুটেছি। জানি না কোথায় আজ আমাকে থেমে যেতে হচ্ছে। লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগে মৃত্যুর হিমশীতল হাত আমার মতো তোমাদের স্পর্শ করলে তোমরাও তোমাদের অনুগামীদের হাতে এই ভার তুলে দেবে, আজ যেমন আমি তোমাদের হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছি। আমার বন্ধুরা- এগিয়ে চল, এগিয়ে চল- কখনো পিছিয়ে যেও না। পরাধীনতার অন্ধকার দূরে সরে যাচ্ছে। ঐ দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতার নবারুণ। কখনো হতাশ হয়ো না। সাফল্য আমাদের হবেই। ভগবান তোমাদের আশীর্বাদ করুন।

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম ইস্টার বিদ্রোহের কথা কোনও দিনই ভুলে যেও না। জালালাবাদ, জুলখা, চন্দননগর ও ধলঘাটের সংগ্রামের কথা সব সময় মনে রেখো। ভারতের স্বাধীনতার বেদীমূলে যেসব দেশপ্রেমিক জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের নাম রক্তাক্ষরে অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে লিখে রেখো। আমাদের সংগঠনে বিভেদ না আসে- এই আমার একান্ত আবেদন। যারা কারাগারের ভেতরে ও বাইরে রয়েছে, তাদের সকলকে জানাই আমার আশীর্বাদ। বিদায় নিলাম তোমাদের কাছ থেকে।

বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক
বন্দেমাতরম”

লেখক:

সাগর লোহানী
সম্পাদক, বাঙালীয়ানা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.