মা ও মুক্তিযুদ্ধ

Comments

। আবদুল মতিন ।

আমার মা ছিলেন অন্যান্য বাঙালির মতো একজন সাধারণ গৃহিনী। বাসার কাজকর্ম, ছেলেমেয়েদের মানুষ করা নিয়েই তাঁর ব্যস্ততা। বাবা রাজনীতির সাথে কিছুটা জড়িত হলেও মা’র এ বিষয়ে খুব একটা আগ্রহ ছিল না। দেশে কি হচ্ছে বা হবে এগুলি তাঁর সিলেবাসের বাইরে। কিন্তু হঠাৎ করে মা ৭০ সালে দেশের পরিস্থিতি, রাজনীতি এগুলি জানার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠলেন। কারণও ছিলো। আমার বড়ো দুই ভাই ঢাকায় অধ্যায়নরত। একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, আরেকজন ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে। দেশজুড়ে তখন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির অধিকার আদায়ের তীব্র আন্দোলন চলছে। মা’র ভয় ঢাকায় অধ্যয়ানরত দু’ছেলেকে নিয়ে। তখন চট করে যোগাযোগ কিংবা সহজে কারো সাথে কথা বলার সুযোগ ছিল না। চিঠিই ছিলো একমাত্র ভরসা।

মা দেশের বিশেষ করে ঢাকার পরিস্থিতি জানতে সর্বদা উদগ্রীব। কিন্তু মাকে এ বিষয়ে জানানোর জন্য বাসায় তখন আমি ছাড়া কেউ নেই। আমি তখন চট্টগ্রাম শহরের একটি নামকরা স্কুলের ছাত্র। প্রতিদিন মিছিল বের হয়। আমিও সেই মিছিলে যোগ দিই দেশের জন্য কিছু একটা করার তাগিদে। মা জানলে রাগ করবেন কিংবা পিঠে কয়েকটা বেত্রাঘাত হবে এ ভয়ে কিছু বলি না। হঠাৎ মা নিজেই একদিন জিজ্ঞাসা করলেন, “দেশে কি নিয়ে এত আন্দোলন। কীসের জন্য প্রতিদিন এত মানুষ মিছিলে মারা যাচ্ছে”। আমি খুব উৎসাহিত হয়ে উঠলাম। এ বয়সে কেউ আমাকে রাজনীতি, আন্দোলন, দেশ– এসব নিয়ে প্রশ্ন করছে। তাও আবার মা, যার কড়া শাসনে আমাদের বেড়ে ওঠা। এই প্রথম নিজেকে আমার একজন বড়ো মাপের রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে হলো। মা এখন আমার কাছ থেকে নিয়মিত আন্দোলনের খবর পান, শেখ সাহেবের কি অবস্থা, রাজনীতি কোন দিকে যাচ্ছে এগুলি নিয়ে তাঁর জানার আগ্রহ এখন প্রবল। আমি বন্ধু-বান্ধব বা পত্রিকা মারফত যা জানি তাই বলি। এদিকে দেশে সাধারণ নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে।

মা’র ভোটের প্রতি কখনও আগ্রহ ছিল না। শুধু ফাতেমা জিন্নাহ্কে ভোট দেয়ার জন্য বাবা অনেকটা জোর করে মাকে মামার হাত ধরে ভোট কেন্দ্রে পাঠিয়েছিলেন। সে ভোটে ফাতেমা জিন্নাহ 

আইয়ুব খানের কাছে পরাজিত হলে মা কষ্ট পেয়েছিলেন বৈকি। এখন আস্তে আস্তে মা’র রাজনীতি বিষয়ে জানার আগ্রহ দিনদিন বাড়ছে। প্রতিনিয়ত মা আমাকে নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। যা জানি তাই বলি, মাঝে মাঝে মাকে খুশি করার জন্য একটু বাড়িয়ে বলি। যে মাকে সবসময় ভয় পেতাম সে মা হঠাৎ করে আমার বন্ধু হয়ে গেল। আমি হয়ে গেলাম তাঁর কাছে একজন রাজনীতি বিশারদ।

আস্তে আস্তে ৭১এর মার্চ চলে আসলো। উত্তাল পুরো দেশ, উত্তাল পুরো চট্টগ্রাম। প্রতিদিন আমাদের এলাকায় মিছিল হয়। বাবা সেই মিছিলের নেতৃত্বে থাকেন। আমিও থাকি। আমাদের এই বয়সে মিছিল মিটিংয়ে যাওয়ার দরকার নেই বলে কেউ ধমকও দেয় না। ইয়াহিয়া খানের ছবিতে জুতার মালা ঝুলানো প্ল্যাকার্ড বহনে অতিরিক্ত আনন্দ। মার্চের প্রথম সপ্তাহে বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড জনসভায় ভাষণ দিলেন। মায়ের কাছ থেকে সহজে অনুমতি পেয়ে সেই জনসভায় গিয়েছিলাম। জনসভা শেষে বাসায় ফিরলে মা জানতে চাইলেন বঙ্গবন্ধু কি বলেছেন সে বিষয়ে। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে আসলো মাওলানা ভাসানী! সেই একই বক্তব্য দেশের মানুষের মুক্তি চাই। জনসভা শেষে বাসায় ফিরলে ভাসানী কি বললেন সে বিষয়ে মার নানা প্রশ্ন। আমি খুব আগ্রহ ভরে জবাব দিই। এই প্রথম পরিবারে নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে। মা এখন প্রতিদিন সময় করে সবার সাথে বিবিসি আর ভয়েস অব আমেরিকা শোনেন। মা এখন অন্য রকম মা। দেশের প্রতি মায়ের অন্য রকম আগ্রহ।

মা এখন অনেক কিছু জানেন, মতামত দেন। এদিকে আমি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের ভর্তি পরিক্ষায় সুযোগ পেয়েছি। ২৫ শে মার্চ ভাইভা। দেশের এই পরিস্থিতিতে ভাইভা হবে কিনা সবাই সন্দিহান। বন্ধুর বাসা থেকে টেলিফোন করে জানার চেষ্টা করি। উত্তর আসে পরে জানানো হবে। মা সাফ জানিয়ে দিলেন দেশের এ দুঃসময়ে তিনি আমাকে ক্যাডেট কলেজে দিবেন না।

চট্টগ্রাম শহরের বেশ কিছু জায়গায় বিহারীদের বাসা। এরা রেলওয়েতে চাকুরি করে। অনেকগুলি বিহারী কলোনী। হঠাৎ বাঙালি বিহারী দাঙ্গা শুরু হয়ে গেছে। বাসার পিছনে পাহাড়। পাহাড়ে উঠে দূরে দেখার চেষ্টা করি। দূরে মাঝে মাঝে শুধু আগুনের শিখা আর ধোঁয়া ছাড়া কিছু দেয়া যায় না। পাড়ার বড়োদের কাছ থেকে জেনে মাকে জানাই।

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সে ভাষণ দিয়েছেন। ঐতিহাসিক ভাষণ। রেডিও টিভিতে সরকার সম্প্রচার করতে দেয়নি। পত্রিকা পড়ে জানলাম বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার কথা বলেছেন। আমাদের ফুটবল খেলার মাঠ হচ্ছে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সামনে, এখন যেখানে শিশু পার্ক আছে সেখানে। ৮ মার্চ ৭১ এর বিকেলে ঐ মাঠে ফুটবল খেলছি। হঠাৎ করে স্টেডিয়ামে নিচের মিউজিকের দোকান খেকে বঙ্গবন্ধুর সে পরিচিত ভরাট কণ্ঠের আওয়াজ ভেসে এলো। আমরা খেলা বন্ধ করে সেই ঐতিহাসিক ভাষণ শুনলাম। ইথারে ভেসে এলো সেই অমোঘ বাণী, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। সেই আওয়াজ রক্তে যেনো এক নাচন তৈরি করল। খেলা শেষে বাসায় ফিরে মাকে বললাম। মা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাইলেন বঙ্গবন্ধুর ভাষণে আর কি কি আছে। যা মনে ছিলো তাই বললাম। বললাম বঙ্গবন্ধু বলেছেন, যার যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকার জন্য। মা মরিচের গুঁড়া নিয়ে এসে আমাদের মাঝের ঘরে রাখলেন। আমার মা মনে হচ্ছে এখন আর সাধারণ গৃহিনী নন। একজন প্রীতিলতা দাঁড়িয়ে আছেন, যিনি দিব্যদৃষ্টিতে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড দেখতে পাচ্ছেন। ধীরে ধীরে দেশের আন্দোলন নতুন জোয়ারে প্লাবিত। মিছিল মিটিংয়ে সয়লাব দেশের প্রতিটি অঞ্চল। যথারীতি আমি মায়ের সংবাদদাতা। ২৫শে মার্চ দিন গড়িয়ে রাত। হঠাৎ করে চট্টগ্রামের আকাশে কেয়ামতের আলামত। আকাশ জুড়ে আগুনের কুন্ডলী। চারদিকে কামানের গোলার শব্দ। আমাদের বাসাটা পাকা বিল্ডিং। পাড়ায় পাকা বিল্ডিং আছে এধরনের মাত্র তিনটা৷ গোলাগুলির শব্দ শুনে আশেপাশের প্রায় সবাই আশ্রয়ের খোঁজে আমাদের বাসায় হাজির। মা আর বাবা মিলে মহিলা আর পুরুষ সবাইকে আলাদা আলাদা কামরায় নিরাপত্তার জন্য মাটিতে বসার ব্যবস্থা করে দিলেন। সবাই আল্লাহ’র নাম জপতে জপতে সেই কাল রাত পার করলো। সকালের আলো ফুটতেই গোলার শব্দ কমে এলে সবাই যার যার বাসায় চলে গেল। মা বাবা সবাইকে বলে দিলো, যদি প্রয়োজন হয় আবার যেন আসে।

হঠাৎ করে খবর পেলাম আমাদের বাসার পিছনের পাহাড়ে চারজন সেনাসদস্য চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। পাহাড়ের দুরত্ব আমাদের বাসা থেকে প্রায় তিন শত গজ। খবর পেয়ে চলে গেলাম। সাথে ছিলো পাড়ার আরো অনেকেই। তাঁদের কাছ থেকে জানলাম সেনানিবাসে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে। পাকিস্তানী সেনারা প্রচুর বাঙালি সদস্যদের হত্যা করেছে। তাঁরা কোনভাবে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসেছেন। একজন আবার অসুস্থ। বাসায় ফিরলে মা ঘটনা জানতে চাইলেন। বললাম। মা ওনাদের জন্য কিছু খাবার দিয়ে দিলেন। দুপুরের খাবারেরও কিছু ব্যবস্থা করে দিলেন। দিন গড়িয়ে রাত আসলো। আবার রাতের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা। পরদিন সকালে বিভিন্ন জনের কাছে শুনলাম বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। স্বাধীন শব্দটি শুনে মনের মধ্যে সে কি এক শিহরণ। মায়ের চেহারায় অন্য এক প্রকাশ। মাকে এখন আর চেনা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে তিনি স্বাধীনতা পেয়ে গিয়েছেন। ছাদে বোনের বানানো মানচিত্রখচিত বাংলাদেশের পতাকা উড়ছিল মার্চের শুরু থেকেই। ৩০ মার্চ ৭১ এ খবর এলো কিছু মুক্তিবাহিনী আমাদের পিছনের পাহাড়ে অবস্থান নিবে এবং ওখান থেকে সার্কিট হাউস আক্রমণ করবে। আমাদের বাসা থেকে সার্কিট হাউজের দুরত্ব আনুমানিক ৫০০ গজ। এ কারণে বলা হলো সবাই যেন নিরাপদ জায়গায় চলে যায়। বাবা মা মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন শহরের বাইরে অবস্থিত আমার মামার বাড়িতে যাওয়ার। ইতোমধ্যে আরও কয়েকটি পরিবার আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছে। ঠিক করা হলো বড়োরা কেউ যাবে না। শুধু মহিলা আর ছোটো বাচ্চারা যাবে। তাড়াতাড়ি করে হাতের কাছে যে যা পেলো তাই নিয়ে তৈরি। মা আমাকে বললেন ছাদ থেকে বাংলাদেশের পতাকাটা যেনো নামিয়ে এনে তাঁকে দেই। তাই করলাম। এরপর শুরু হলো যাত্রা। প্রায় ৩০/৩৫ জনের কাফেলা। রোড দিয়ে গিয়ে যখন চট্টেশ্বরী রোডে উঠলাম, তখন দেখি আমরা একা নই। রাস্তায় হাজার হাজার বিভিন্ন বয়সের নারী, পুরুষ, শিশু অজানা গন্তব্যে ছুটছে। মুখে ভয়ের ছাপ। অনেকের সাথে হাঁসমুরগিসহ অন্যান্য গৃহপালিত জন্তু। অনেক বয়সের ভারে ন্যুব্জ মহিলা পুরুষ অন্যের কোলে চড়েছে। চকবাজারের মোড়ে পৌঁছে দেখলাম বেশ ক’জন স্বেচ্ছাসেবক তীর, ধনুক, লাঠি আর দু-তিনটা গাদা বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে মানুষকে বুঝানোর চেষ্টা করছে যেন কেউ শহর ছেড়ে না যায়। শহর শত্রুমুক্ত আছে। কারো কিছু হবে না। কিন্তু কে শুনে কার কথা। দুপুর প্রায় একটার দিকে মামার বাসায় পৌঁছালাম। তখন মোবাইল টেলিফোন ছিল না। তাই আগে খবর দেয়া হয়নি। কিন্তু আমাদেরকে দেখে মামা বাড়ির সবাই খুশি। সাথে সাথে রান্না শুরু হয়ে গেলো। মামা ইতোমধ্যে বাইরে থেকে কিছু নাস্তার ব্যবস্থা করেছেন। শুরু হলো উদ্বাস্তু জীবন, গাদাগাদি করে থাকা, কাজ ভাগ করে নেয়া– সে এক অন্য রকম সময়।

সুযোগ পেলে রেডিও শুনি। বড়োদের কাছ থেকে পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করি। মা এখন সব কিছুতেই বিভিন্ন কাজে হাত লাগায়। আশেপাশে অন্যান্য ভাইবোনদের বাসায় যায়। যুদ্ধের গল্প করে, রাজনীতির আলাপে অংশগ্রহণ করে। পরিস্থিতি আমার সাধারণ মাকে কেমন যেন অসাধারণ করে তুলেছে। ধীরে ধীরে শহর এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসলে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, সবাই যার যার বাড়িতে ফিরে যাবে। সেই অনুযায়ী একদিন ফিরে আসলাম আপন ঠিকানায় মামার অনিচ্ছা সত্ত্বেও।

পাড়ায় পৌঁছে দেখি এ এক অচেনা জায়গা। আমাদের বাড়ির সামনে পেছনে অনেক বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। শুনলাম পাকিস্তানী সেনাদের গোলার আঘাতে এই অবস্থা। ভাগ্যক্রমে আমাদের বাসার কিছু হয়নি। বাসায় আসার পর বাবা মাকে বললেন, তিনি আমাদের বাসায় প্রায় ১০ জন হিন্দুকে আশ্রয় দিয়েছেন। এর মধ্যে একজনকে ৫০ টাকা ঘুষ দিয়ে পাকিস্তানী সৈন্যের হাত থেকে রক্ষা করে নিয়ে এসেছেন। মা বললেন সমস্যা নাই। আমাদের খাওয়ার যা থাকে তা ওদের সাথে ভাগ করে খাবো। তখন বাজারে তেমন কিছু পাওয়া যায় না। মিষ্টি কুমড়া, আলু, ডাল, ভাত রুটি দিয়ে চলে আমাদের নিত্যদিনের আহার। আমরা ছেলেরা রুটি সেঁকার কাজটা করি। ভালোই লাগে। প্রতি রাতে উঠোনে রেডিও শোনার আসর বসে। স্বাধীন বাংলা বেতার, আকাশবাণী, বিবিসি আর ভয়েস অব আমেরিকা। পাড়ার লোকজন শুনতে আসে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক মাহবুব উল আলম সাহেবও আসেন। আমি আর মেজো ভাইয়ের ওপর দায়িত্ব দিয়েছেন– প্রতিদিন পাশের স্কুল থেকে বেঞ্চ নিয়ে আসা, রেডিও পরিচালনা করা। মা মাঝে মাঝে চা-নাস্তার ব্যবস্থা করেন। তিনিও আড়াল থেকে যুদ্ধের খবর শোনেন। ভালো খবরে আনন্দে আপ্লুাত হন। দুঃসংবাদে মন খারাপ করেন। প্রতিনিয়ত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য দোয়া করেন। ইতোমধ্যে যে ক’জন হিন্দু আমাদের বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলো তারা আস্তে ভারতে চলে গেল। মা বাবাকে বলে তাদের কিছু পথ খরচাও দেয়ার ব্যবস্থা করলেন। তখন টাকা পয়সার বেশ টানাটানি চলছে। কোনো আয় নেই। মা তার গয়না বাবাকে দিয়ে বললেন এগুলি বিক্রি করে টাকার ব্যবস্থা করতে। বাবা বললনে, এগুলি কেনার মতো লোক এখন পাওয়া যাবে না।
ধীরে ধীরে শীতকাল চলে এলো। যুদ্ধের গতি এখন মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে। সব জায়গায় যুদ্ধ জয়ের সংবাদ। চট্টগ্রামের আকাশে কয়েকদিন মিত্র বাহিনীর বিমানের দেখা মিলল। সিআরবি এলাকায় একাধিকার বোমাবর্ষণ করল। বুঝা যাচ্ছে জয় অতি সন্নিকটে। পরিস্থিতি মুহূর্তে মুহূর্তে বদলাচ্ছে। আসলো সেই কাঙ্ক্ষিত ১৬ ডিসেম্বর, রেডিওতে ঘোষিত হলো ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পনের কথা। মনে হলো নতুন ঈদের সংবাদ এসেছে। চারিদিকে আনন্দের উল্লাস স্বাধীনতার স্বপ্নপূরণের এক নতুন অনুভব। চট্টগ্রাম তখনও পাকিস্তানীদের দখল। বিকেলে মা আমায় ডাকলেন, আস্তে আস্তে কাপড়ের ভিতর থেকে সবুজ রংয়ের কি যেন একটা বের করলেন। আমার হাতে দিয়ে বললেন “যা এটা ছাদে উড়িয়ে দিয়ে আয়, সাড়ে নয় মাস এটা সাথে নিয়ে ছিলাম এই সময়টির জন্য। কখনও এটা হাতছাড়া করিনি। বুকের মধ্যে আগলে রেখে ছিলাম। এটাই আমার ভালবাসার স্বাধীনতা”। হাতে নিয়ে খুলে দেখি মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা। এক দৌড়ে ছাদে গিয়ে দেখলাম দূরে সার্কিট হাউস দেখা যায়। যেখানে পাকিস্তানের পতাকা উড়ছে। আমি আনন্দের আবেগে মায়ের, আমার আর আমাদের স্বাধীনতার পতাকাটি উড়িয়ে দিলাম। মা নিচে তাকিয়ে দেখছে। মায়ের চোখে তখন আনন্দের অশ্রু।

লেখক:
Abdul Matin
আবদুল মতিন
সৌখিন লিখিয়ে, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা; ঢাকা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট