মিশুকের জন্য ভালোবাসা । কুর্‌রাতুল আইন তাহ্‌মিনা

Comments

(প্রথম আলোর ম্যাগাজিন ‘ছুটির দিনে’ ২০ আগস্ট, ২০১১ তারিখে প্রকাশিত লেখার ঈষৎ বিস্তারিত সংস্করণ – সম্পাদক)

আশফাক মুনীর। মিশুক মুনীর। মিশুক। মিশুক। মিশুক

আমাদের বড় প্রিয় ভাই। আমার প্রিয়তম বন্ধুদের একজন। মিশুকের কথা কোথা থেকে শুরু করব? শুরুটা ঝাপসা হয়ে যায়। শেষ হয়েছে, তা বিশ্বাস করি না। মনের মধ্যে আসা, থাকা আর যাওয়া মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। টুকরো টুকরো ছবির পর ছবি।

Mishuk03

মিশুক মুনীর

দারুল আফিয়া, ১৯৭১

দৃশ্যটা আমি নিজে দেখেছিলাম কি না মনে নেই। কিন্তু ছোটবেলা থেকে একটা ছবি মনের মধ্যে বসে আছে।

আমার চাচাত বোন লিপির খুব ছোটবেলায় ওর মা মারা যান। দেশ স্বাধীন হওয়ার অল্প পরে ঢাকার সেন্ট্রাল রোডে ‘দারুল আফিয়া’ নামে আমার নানুবাসায়, মিশুকের দাদাবাসায়, একদিন মিশুক লিপিকে বলে–“তোমার মা নাই, আমার বাবা নাই। আমরা এক রকম।”

এ বাসা থেকেই ১৪ ডিসেম্বর, আমার মেজোমামা মুনীর চৌধুরীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল আল-বদরেরা। মিশুক তাঁর মেজোছেলে। ২৫ মার্চের পর পর মুনীর মামারা মাসখানেকের মতো হাতির পুলের গলির ভেতরে আমাদের বাসায় থেকেছিলেন। পরে ওঁরা দারুল আফিয়ায় চলে যান।

লিপি বলছে, মিশুক কথাটা প্রথম বলেছিল খাওয়ার ঘরে, শোকাচ্ছন্ন ঘরভর্তি বড়দের মধ্যে গুনগুন করে বার বার। আমার মন যে ছবি দেখায়, সেটা নানুবাসার সামনের দরজার সিঁড়িতে বসে দুটি শিশুর আলাপের।

দলপতি ও বার্তাবাহক!

একাত্তরের মাঝামাঝির দিকে দারুল আফিয়ায় আমরা কাছাকাছি বয়সী ভাইবোনেরা–মিশুক, লালী, শম্পা, উপল, আমি, অতল–প্রায়ই একত্র হতাম। বড়দের জন্য তখনকার নির্মম জগতের বাইরে আমাদের নিজেদের বিরাট একটা জগৎ ছিল। নানুবাসার ভেতরদিকের বড় উঠানে আমরা বনবাসী সেজে শিকারে বেরোতাম। আমার পরই মিশুক আমাদের মধ্যে বড়। সে দলপতি হয়ে হুকুম করত আর কাজ করতাম আমরা!

একবার মিশুকের হাত ভাঙল। প্লাস্টার করা গলায় ঝোলানো সে হাতের মহিমায় ছোট ভাইবোনদের মধ্যে মিশুকের বিশিষ্ট আসনের দাবি তখন আরও জোরদার হলো!

আমার চেয়ে মাত্র তিন বছরের বড়, বয়স ওর তখন ১২ পোরেনি। কিন্তু মিশুক ছিল বড়দের জগতের সঙ্গে আমাদের যোগসূত্র। অনেক অত্যাশ্চর্য কথা সে শোনাত। আমরা চমৎকৃত হয়ে গিলতাম। একটা গুপ্ত কথা আমার খালাত-চাচাত বোন লালী আর আমার চিরকাল মনে থাকবে…। ওর বড় ভাই আহমেদ মুনীর–ভাষণ ভাইয়া–আর আরেক চাচাত ভাই শ্যামলদা কীভাবে যুদ্ধে গেছে, তার গল্প ওর কাছ থেকেই তখন আমরা শুনি।

ভাষণের চিঠি , ১৪ ডিসেম্বর

বিশ বছর বয়সী ভাষণ ভাইয়া একাত্তরের ৬ মে ইংরেজিতে একটি চিঠি লিখে রেখে যুদ্ধে চলে যায়। বাবা, মা আর ছোট দুই ভাই মিশুক ও শিশু তন্ময়কে সম্বোধন করে নিউজপ্রিন্টের পাতায় লেখা এ চিঠিতে ভাষণ তাঁর যুদ্ধে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। এক জায়গায় তিনি লিখছেন, “আমাদের স্লোগান, স্বাধীনতা অথবা মৃত্যু। কিন্তু স্বাধীন দেশে তোমাদের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য আমি বেঁচে থাকতে চেষ্টা করব।”

মিশুকের উদ্দেশে ভাষণ ভাইয়া লিখেছিল, “মিশুক আমার ভাই, হৃদয় আর মনের সঙ্গে শান্তিতে পোঁছানোর এই ক্ষণে আমি তোমাকে ভালোবাসি। বাবার কথা শুনবে আর পুরো পরিবারকে দেখে রাখবে। তুমি তাদের আশা-ভরসা।…”

Mishuk05

মিশুক

এ চিঠিটি লিলি চৌধুরী–ভাষণ, মিশুক ও তন্ময়ের মা–যুদ্ধের পুরোটা সময় পলিথিনে মুড়িয়ে সেফটিপিন দিয়ে ব্লাউজের সঙ্গে আটকে বুকের কাছে রেখে দিতেন। পুরোনো কাগজে পিনের ফুটো রয়ে গেছে। দেশ স্বাধীন হলো, ভাষণ ভাইয়া বেঁচে ফিরল, কিন্তু বাবাকে আর পেল না।

আমার নানু বাড়ি ছাড়তে চাননি। লিলিমামি আর অন্যান্য আত্মীয়বন্ধুদের বহু অনুরোধেও মুনীর মামা মাকে ঢাকায় রেখে ভারতে বা গ্রামে যেতে রাজি হননি। নিজের কোমর আর পিঠের ব্যথা নিয়ে ছুটতে না পারার কথাও তিনি বলতেন।

১৪ ডিসেম্বর দুপুর পৌনে বারোটার দিকে তালা দেওয়া বাইরের ফটক ঝাঁকড়ে ‘মুনীর স্যার আছে?” বলে বন্দুকধারী ঘাতকেরা আমার রুশো মামা–শামশের চৌধুরীকে তালা খুলতে এবং মুনীর মামাকে ডেকে আনতে বাধ্য করে।

দোতলা ওঠার সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে দেখা প্রতিটি মুহূর্ত লিলিমামির মনে গভীরভাবে আঁকা হয়ে রয়েছে।

মুনীর মামা সঙ্গে যেতে আপত্তি করলে তারা তাঁর পিঠে বন্দুকের নল ঠেকায়। তাঁর শরীর একবার ঝাঁকি দিয়ে ওঠে। দরজায় দাঁড়ানো রুশো মামা আজও কানে শুনতে পান, মিনিবাসে ওঠার মুখে তাঁর দিকে তাকিয়ে ভাই বলেছিলেন, “কী বলিস, যাই রে?”

তাঁদের মা, আমার নানু তখন ভাত বেড়ে ছেলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

লিলিমামির মনে আছে, মিশুক গেটের চাবি নিয়ে দরজায় গিয়েছিল। তারপর সে ওপরে চলে যায়। দোতলার বাইরের দিকের ব্যালকনির জাফরিকাটা দেওয়ালের ফোকর দিয়ে সে পুরোটা দৃশ্য দেখেছিল।

মাকে মিশুক পরে বলে, গেটে আসা জনা দুই ছাড়াও দূরে কালো কাপড়ে মুখঢাকা আরও বেশ কিছু ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। মিশুক এ দৃশ্য মনে করে রেখেছিল।

কাজের জীবনে সে একাত্তরের কাছে ফিরে গেছে বার বার। এত বছর পরে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ এগোচ্ছে, তখন মিশুকই রইল না।

Mishuk02

ক্যামেরা হাতে মিশুক

একাত্তরের পর

একাত্তর-পরবর্তী বছরগুলো পরিবারটির জন্য ভেতরে-বাইরে সংগ্রামের সময়। ভাষণ ২১-এ, মিশুক ১৩-তে আর তন্ময় পাঁচে পড়েছে মাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের পুরোনো ফ্ল্যাটটিতে থাকতে দিল আর দিল মাসিক কিছু ভাতা। বেসরকারি সংস্থাগুলোর সংগঠন–ইংরেজি আদ্যাক্ষরে অ্যাডাব–এর গ্রন্থাগারে চাকরি নিলেন লিলি চৌধুরী।

নিজের হতবিহ্বল নিঃসঙ্গতার মধ্যে জীবনধারণের জন্য সংগ্রাম ছিল। ছিল ছড়িয়েছিটিয়ে পড়া জীবনে বাবা-হারানো তিন ছেলেকে একত্রে ধারণ করে বাঁচার সংগ্রাম। যুদ্ধ থেকে ফিরে বাবাকে না পেয়ে বিভ্রান্ত-বিক্ষিপ্ত, ক্রুদ্ধ, ক্ষুব্ধ, বিদ্রোহী ভাষণ। মিশুকের কৈশোরের টানাপোড়েন। আর এ সবের মধ্যে ছোট্ট আসিফ মুনীর–তন্ময়ের বড় হয়ে ওঠা।

স্বামীর স্থায়ী আমানত আর বিমার টাকা একমাত্র সঞ্চয়। সেটা যক্ষের ধনের মতো বাঁচিয়ে রেখে তাই দিয়ে তিলে তিলে বনানীর একটুকরো জমিতে বাড়ি তৈরি করে ভাড়া দেন লিলি চৌধুরী। ভাষণ বৃত্তি জোগাড় করে দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় পড়তে গিয়েছিলেন। দেশে ফিরে ইংরেজি সাহিত্যে পড়া শেষ করে ধীরে ধীরে তিনি থিতু হন। সেটা অবশ্য অনেক পরের কথা।

মিশুক যখন দশম শ্রেণীর ছাত্র, সে ঘোষণা দিল আর পড়বে না–মজুরেরা পড়ে না, তারা কি মানুষ নয়?! তখনকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে (শেরাটন, রূপসী বাংলা হয়ে যা আবার ইন্টারকন্টিনেন্টাল) সে বেয়ারার চাকরির জন্য দরখাস্ত করল। চাকরি হয়েও গেল।

মা বললেন, “তুমি যদি সেখানকার মেঝে ঝাড়– দিতে পারো, আমাদের সিঁড়িটা ঝাঁট দেও না কেন?” ছেলে হেসে ফেলল। অবশেষে বেয়ারা হওয়ার খেয়াল দূর হলো।

এরই কাছাকাছি সময়ে ‘চিলড্রেন অব গড’ নামে একটি সংগঠন ঢাকায় আবির্ভূত হলে মিশুক সেটার টানে খুব মেতে ওঠে। সংগঠনটির সবকিছুর মধ্যে ঈশ্বরকে দেখা এবং শিশুর মতো নির্মল, সুন্দর, নিষ্পাপ হওয়ার বার্তা সে অনেক পরে স্ত্রী কানিজ ফাতিমা কাজী–আমাদের মঞ্জুলীর কাছে গল্প করেছে।

Mishuk_Mother_Brothers

মা লিলি চৌধুরী, ভাই আসিফ মুনীর (বাঁদিকে) এবং আহমেদ মুনীরের সাথে মিশুক।

পথপ্রদর্শক!

বড় হওয়ার স্বাভাবিক নিয়মে ছোটবেলার সেই সহজ খেলার সম্পর্কটায় হয়ত কিছু ধুলা জমেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়পর্বে আবার নানাবয়সী ভাইবোনদের বিশাল একটি দল জমে ওঠে, আমরা বলতাম ‘কাজিন-কুজিন সমিতি’।

মনে আছে, একবার দলেবলে বইমেলায় চায়ের স্টলে বসে আড্ডা দিচ্ছি। গুরুত্বপূর্ণ হাবভাবের অচেনামুখ একজনকে দেখি খুব ব্যস্তসমস্ত হয়ে ঘোরাঘুরি করছেন। বলি, “মিশুক, কে ইনি? নামকরা কেউ?” গম্ভীরমুখে মিশুকের উত্তর, “নাম একটা আছে, এখনও কইরা উঠে নাই!” কথাটায় কিন্তু কোনো খোঁচা ছিল না, ছিল নির্মল রসবোধ।

ও ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে বি.এ. সম্মান শিক্ষার্থীদের প্রথম দলের ছাত্র। মিশুক ঢুকেছিল ১৯৭৭ সালে। পরে ওর দেখাদেখি ঢুকি আমি। আমি হিসাব করেছিলাম মিশুক যখন এটা পড়ছে, নিশ্চয় ক্লাসে আটকাপড়া চাপ এখানে নেই! তারপর ঢুকল ত্রপা (মজুমদার), আমাদের সমিতির এক কনিষ্ঠ সদস্য। আর এখন মিশুকের একমাত্র ছেলে সুহৃদ–সিবাস্টিয়ান মুনীর গণযোগাযোগ পড়ছে।

আমার মামাতো, মিশুকের চাচাতো-খালাতো বোন শম্পার মেয়ে অরণিও সেই পথে যাচ্ছে। ভাষণ ভাইয়ার মেয়ে অর্পণ স্নাতক পর্যায়ে ফোটোগ্রাফি পড়ল। সুহৃদ এই সেদিন বাবাকে জানিয়েছিল, সামনে সে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়বে।

Mishuk06

ক্যামেরা কাঁধে মাঠে ময়দানে মিশুক

ছবি তুলতে তুলতে

আমরা স্কুলে পড়ার সময়ই মিশুককে দেখতাম পারিবারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ছবি তুলতে। ১৯৮০ সালে ও এক শিক্ষাকার্যক্রমে মাস তিনেক কানাডায় একটি জাদুঘরে শিশুশিক্ষা বিভাগে চিত্রগ্রাহক ও সহকারীর কাজ করেছিল। সেই সূত্র ধরে ১৯৮২ সালে ছাত্রাবস্থাতেই জাতীয় জাদুঘরের দৃশ্যশ্রাব্য শাখা গড়ে তোলার দায়িত্ব পায়, লেগে থাকে বছর সাতেক।

পাশাপাশি তথ্যচিত্র, টেলিছবি, টিভি নাটক, পাপেটচিত্র–ক্যামেরার পেছনে কাজ চলমান। মনে আছে, ওর ক্যামেরা ও সহ-পরিচালনায় ঢাকা টোকাই নামের ছবিটি ১৯৮৬ সালে জার্মানির ওবারহাউজেন উৎসবে পুরস্কার জিতেছিল।

প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় মিশুকের ফাঁকিবাজি কিংবদন্তিতুল্য। কিন্তু শিক্ষকদের মুখে ওর মেধার প্রশংসা শুনেছি। ১৯৮৯ সালে ও আর আমি সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতায় ঢুকি। মিশুক প্রায় ১০ বছর বিভাগের মিডিয়া সেন্টার প্রকল্পটি–চিত্রসাংবাদিকতা, ভিডিও সাংবাদিকতা আর কম্পিউটার ব্যবহার করে প্রকাশনা–পরিকল্পনা ও গড়ে তোলার কাজ করেছিল। ওর নিজের নিয়মছাড়া-নিয়মে নিরলসভাবে এ কাজটি করে যেতে দেখেছি ।

১৯৯২ সাল থেকে মিশুক বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের জন্য ফ্রিলান্স চলচ্চিত্র গ্রাহকের কাজ করেছে, দেশের বাইরে আঞ্চলিক পরিসরেও। আমি তখন বিবিসি বাংলা বিভাগের জন্য ফ্রিলান্স কাজ করি। কয়েক বছর ধরে আমরা একসঙ্গে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কাজে ঘুরেছি। ওর সঙ্গে ঘোরা যেমন মজার, তেমনি তা অনেককিছু শেখাত।

শিক্ষকতা ছেড়ে ১৯৯৯ সালে দেশের প্রথম বেসরকারি টেরেস্ট্রিয়াল টিভি চ্যানেল একুশের সূচনালগ্নে মিশুক এর সঙ্গে যুক্ত হয়। বার্তা কার্যক্রমের পরিচালক হিসেবে অনেককেই ও নিজের হাতে তৈরি করে।

২০০১ সালে ও অভিবাসন নিয়ে কানাডায় চলে গেল। টরন্টোয় কাজ শুরু করেছিল ফ্রিলান্স চলচ্চিত্রগ্রাহক ও চিত্রগ্রহণ পরিচালক হিসেবে। সে সময় আফগানিস্তানে ওর ক্যামেরায় তোলা রিটার্ন টু কান্দাহার ছবিটি ২০০৩ সালের সেরা তথ্যচিত্র হিসেবে জেমিনি পুরস্কার পায়।

Mishuk04

নিত্য সহচর ক্যামেরার সাথে

পরের বছর থেকে ছবিটির পরিচালক পল জের সঙ্গে মিলে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে ব্যতিক্রমধর্মী অনলাইন মাধ্যম দি রিয়্যাল নিউজ নেটওয়ার্ক–টিআরএনএন গড়ে তোলার কাজে নামে মিশুক। যখনই দেশে আসত কাজ নিয়ে মহা উৎসাহে গল্প করত। বিশেষ করে মনে পড়ে, প্যালেস্টাইনে ওর একটি কাজের গল্প।

প্রায়ই ও দেশে ফিরত তারেক মাসুদের বিভিন্ন ছবিতে কাজ করার জন্য। ১৯৮০র দশকের গোড়ায় শিল্পী এস. এম. সুলতানের ওপর তথ্যচিত্র আদম সুরত থেকে শুরু হয়ে তারেক ভাই ও মিশুকের বন্ধন-বন্ধুত্ব শেষ হওয়ার ছিল না। সোনার বেড়ি, মুক্তির গান, মুক্তির কথা, কানসাটের পথে, নরসুন্দর, রানওয়ে, নির্মিতব্য অন্য চোখে বাংলাদেশ ও কাগজের ফুল…।

কানাডায় অভিবাসনের সিদ্ধান্ত মিশুক নিয়েছিল মঞ্জুলীর স্বাস্থ্যগত কারণে। ২০১০ সালের শেষভাগে এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী ও সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে দেশে কাজ করার সুযোগ হলে, মঞ্জুলীকে সে বলেছিল “কয়জনের জীবনে তিনটা টিভি গুছিয়ে দাঁড় করানোর সুযোগ আসে? আমার এসেছে, ত্ইু না করিস না।” আর বলেছিল, মায়ের জীবনের এই প্রান্তে–লিলিমামির বয়স এখন ৮৩–সে তাঁর সঙ্গে থাকতে চায়।

মিশুককে নিগড়ে বাঁধা যায় না। একুশে টেলিভিশনের প্রথমযুগে ওর একটা সস্নেহ নাম দাঁড়িয়েছিল ‘আই-অ্যাম-অন-দ্য-ওয়ে’, আমি-আসার-পথে-আছি! ও কাজ করত সমস্ত প্রাণ দিয়ে, হিসাবের চেয়ে অনেক অতিরিক্ত কিছু ও তাতে সঞ্চার করত। আর এটিএন নিউজের যে কর্মীরা ওকে একুশে থেকে চেনেন, তাঁরা বলছেন এবার ও পুরোনো নামটি ঘুঁচিয়েছিল।

মঞ্জুলী আমাকে বলে, “আগে ভারী ভারী ক্যামেরা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কাঁধে নীল দাগ পড়ত। ও বলত, এটা থাকলে ভালো লাগে।” কানাডা যাওয়ার পর প্রথম দিকে কাজ মিলত অনিয়মিত। রিটার্ন টু কান্দাহারের জন্য টানা কাজ শেষে আফগানিস্তান থেকে টরন্টো ফিরে হাতের কড়া পড়ার চিহ্ন দেখিয়ে মঞ্জুলীকে ও উদ্ভাসিত মুখে বলেছিল, “দেখ্ দাগ ফিরে এসেছে!”

Mishuk_Manjuli Kazi

মিশুক আর সঙ্গে কানিজ ফাতিমা কাজী (মঞ্জুলী)

মঞ্জুলী

১৯৮৩ সাল। মঞ্জুলী তখন বাংলায় এম. এ. পড়ছে। মিশুকের সঙ্গে পরিচয় ও বন্ধুত্বের সূত্রপাত। বিয়ের পরও সম্পর্কটা রয়ে যায় বন্ধুরই।

ওদের বিয়ে হয় ১৯৮৫ সালের ২ আগস্ট। এ বিয়ের আনুষ্ঠানিক আলাপের পরদিন আমার নানু আফিয়া বেগম তাঁর রোজনামচায় লেখেন, “দোয়া করি আল্লাহ্ মিশুকের জীবন শান্তিপূর্ণ করুক। ও যে আমার মুনীরের ছেলে। মুনীর আরবি শব্দ; অর্থ উজ্জ্বল, প্রদীপ। খোদা তার ছেলের জীবন উজ্জ্বল, শান্তিপূর্ণ করুক এই দোয়া করি।”

মিশুকের বিয়ে আমাদের ভাইবোনদের স্মৃতিতে সম্ভবত সবচেয়ে বর্ণাঢ্য উৎসব। ওর গায়ে হলুদের কথা কোনোদিন ভোলার নয়। সকালে তন্ময়রা দলেবলে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে রিকশা বোঝাই করে দেবদারু পাতা আর লাল রঙ্গন ফুল নিয়ে এলো। সারাদিন আমরা সেই ফুলে মালা গাঁথলাম।

মিশুক আর মঞ্জুলী দুজনেরই বন্ধু শিল্পী নোটন, হাবীব, শামিমেরা ঘর সাজাল, নিমন্ত্রণপত্র আঁকল। ১৩ আগস্ট লিলিমামির বনানীর বাসায় বসার ঘরে এক কোনার একটি তাকে দেখি সে-সময় হাবীবের বিখ্যাত আল্পনা আঁকা একটি মাটির খোরা। জীর্ণ, বিবর্ণ, ধুলায় ঘষা-ঘষা চেহারা।

আমাদের মিশুক

একাত্তরের পর আট বছরের বড় ভাই ভাষণ হয়ে উঠেছিল মিশুকের নায়ক ও বন্ধু। ওর মুখে ভাষণ ভাইয়ার ছবি তোলা আর লেখা নিয়ে গর্বের কথা অনেক শুনেছি। ভাষণ এখন সিয়েরা লিয়নে জাতিসংঘে কর্মরত। মিশুকের দাফন শেষে ঘরে ফিরে ওর রুদ্ধকণ্ঠের একটা কথা কানে লেগে থাকে, “দ্য বেস্ট অব দ্য লট–আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালোজন…।”

ছোটভাই উন্নয়নকর্মী আসিফ মুনীর তন্ময় নাট্যকর্মী। বেড়ে ওঠার বয়সে মিশুক তাকে আগলে রাখত। ১৩ আগস্ট থেকে তাকে দেখছি, একের পর এক যন্ত্রের মতো প্রয়োজনীয় কাজগুলো করে যেতে। ওর মনের মধ্যে কী চলছে, কে জানে। আর লিলিমামি? মিশুকের যে তাঁর সঙ্গে আরও অনেকদিন থাকার কথা ছিল…

রান্না ছিল ওর নেশা। জুলাইয়ের মাঝামাঝি এটিএন নিউজের যন্ত্রপাতি কিনতে ও যুক্তরাষ্ট্র গিয়েছিল। বনানীর বাসায় ডিপ ফ্রিজে ও রাঁধবে বলে এখনো তোলা আছে গরুর মাংসের প্যাকেট। রয়ে গেছে নানা দেশি-বিদেশি মশলার মস্ত পোঁটলা।

আমেরিকা থেকে সে বড় এক ছুরি নিয়ে এসেছিল। মাস তিনেক হয় টরোন্টো থেকে ছুটি কাটাতে এসেছে মঞ্জুলী আর সুহৃদ; তাদের দিয়ে রান্নার কিছু পাত্র আনিয়েছিল। মঞ্জুলীকে ও প্রায়ই বলত, “আমি শেরাটনের শেফ আর তুই নীলক্ষেতের বাবুর্চি!”

Mishuk_Cooking

রান্নাঘরে ব্যস্ত মিশুক

মিশুক বাবার বিরল অকৃত্রিম আন্তরিকতা, সবার সঙ্গে মেশার গুণগুলো পেয়েছে–এ কথা পরিবারের অনেকেই বলছেন। মিশুকের প্রাণখোলা হাসিভরা চেহারা দেখলে সবসময় প্রথম মনে হতো, মানুষটা দেখতে বড় সুন্দর। দেখা হলেই ও জড়িয়ে ধরে, মন অনেক ভরসায় ভরে যায়।

গত ডিসেম্বরে আমাদের সবার অতিপ্রিয় আমার মা চলে গেলেন। তাঁকে যেদিন আমরা সম্মিলিত প্রার্থনা দিয়ে মনে করেছি, সেদিন বিদায় নেওয়ার সময় বরাবরের মতো মিশুক জড়িয়ে ধরে ওর গালটা বাড়িয়ে দিল। বলল, “এখন তো চুমু দেওয়ার কাজটা তোকেই করতে হবে!”

আমার জীবনশিক্ষার অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পর্বে মিশুক ভালোবাসা আর দিকনির্দেশনা নিয়ে এসে দাঁড়াত। একা একা ঘুরে কাজ করার সন্ধিক্ষণে সচেতনভাবে প্রয়োজনীয় বড় ধাক্কাটা দিয়ে সেই আমাকে ঠেলে পানিতে ফেলে সাঁতার শিখে নেওয়ার পথ দেখিয়েছিল। ১৯৯৫-৯৬য়ের দিকে খাগড়াছড়ির সার্কিট হাউজের সামনে এক সকালে আমাকে কাজের সঙ্গে একাকী রেখে ওর আর বিবিসির তখনকার প্রতিনিধি ফ্রান্সেসের ঢাকা রওনা হওয়ার ছবিটা স্পষ্ট মনে আছে।

আরেকবার আমার একটা ব্যক্তিগত সংকটের সময় মিশুক আমাকে পাকড়াও করে কথা বলতে বাধ্য করল। এখন যেকোনো কঠিন গোলকধাঁধায় ওর তখনকার একটা কথা আমার মনে পড়ে যায়–জীবন হচ্ছে জীবন, বিষ্ঠা হচ্ছে বিষ্ঠা। ও বলেছিল, যা সামনে আসে, তাকে খোলাখুলি সামনাসামনি করতে হয়। বাঁচতে হয়।

মিশুক জাতশিক্ষক। এটিএন নিউজের মুন্নী সাহা বলেন, এবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে ও বলেছিল এক শুক্রবার সব সাংবাদিককে কাঙ্ক্ষিত সাংবাদিকতা নিয়ে প্রশিক্ষণ দেবে। প্রতিষ্ঠানটির ক্যামেরা বিভাগের প্রধান মামুন হোসেন বলছিলেন, তাঁর মতো হাতেকলমে-কাজ-শেখা মানুষেরা কীভাবে প্রতিষ্ঠান নির্বিশেষে যেকোনো সময় মিশুকের দ্বারস্থ হলে ও কাজটা শিখিয়ে দিত।

Mishuk_Shurid

ছেলে সুহৃদের সাথে খুনসুটিতে

মামুন আমাকে বলেন, “আমাদের তো আর এমন ক্যামেরা-জানা শিক্ষক নাই।” তরুণ প্রতিবেদক রাজীব ঘোষ বলেন, মিরসরাইয়ের সাম্প্রতিক মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটির রিপোর্ট করার সময় ফোনে মিশুক কীভাবে যন্ত্রপাতির ব্যবহার থেকে নিয়ে ভুক্তভোগীদের প্রতি আচরণ ও প্রতিবেদন পরিকল্পনার পরামর্শ দিয়েছিল।

মিশুক মানুষকে ভালোবাসত, তারই সুবাদে সাংবাদিকতাকে ভালোবাসত একনিষ্ঠভাবে। মিশুক সবাইকে নিয়ে বাঁচতে ভালোবাসত। ঢাকায় ১৯৫৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ওর জন্ম। রুশি রূপকথায় ছোট্ট ভালুকের নাম থেকে লিলিমামি ওর নাম রেখেছিলেন মিশুৎকা। সেটাই কখন হয়ে গেল মিশুক। আর মিশুক হয়ে গেল সবার সুহৃদ, যে নামটা ও আর মঞ্জুলী মিলে ছেলের জন্য বেছেছিল।

জুন-জুলাই জুড়ে সুহৃদ এটিএন নিউজে শিক্ষানবিশি করেছে। আগস্টের গোড়ার দিকে ও অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিল। বাবা রাতে ওর সঙ্গে থাকতেন। সেদিন ভোরে বাবাকে ও শেষ বিদায় জানায় হাসপাতালের বিছানা থেকেই। সুহৃদ বলে, “বাবা তো বাবার মতো ছিল না, ছিল আমার বড় ভাই বা বন্ধুর মতো–যাকে নিয়ে আমি গর্ব করতাম, যার ওপর ভরসা করতাম, যার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। সে ছিল এমন, যা আমি হতে চাই।”

আমাদের একটা বন্ধুদল ছিল–মিশুক, মঞ্জুলী, শাহেদ কামাল স্যার, গোলাম রহমান স্যার, সুব্রতদা (সুব্রত শংকর ধর) আর আমি। নানা সময়ে ভারতভ্রমণ আর নৈশ আড্ডার টুকরো টুকরো অনেক কথা-ছবি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। হাসি আর আনন্দ-আমোদ কাকে বলে, তা মিশুক জানত। সেই রেশ সে রেখে গেছে আমাদের মনে।

আগস্টের ৬ বা ৭ তারিখে প্রথম আলোয় যাচ্ছি। মোড়ের কাছে ফুটপাতে ভিড়ের মধ্যে মিশুকের সাদাচুলের ধ্বজা দেখতে পেয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেলাম। টিপ টিপ বৃষ্টির মধ্যে হা হা করে হাসতে হাসতে মিনিট ১৫ পার!

মাসতিনেক ধরে আমরা সাধারণ মানুষের আত্মশক্তি ও সৃজনশীলতা তুলে ধরার বিশেষ প্রিয় একটা কাজের পরিকল্পনা করছিলাম। ফুটপাতে দাঁড়িয়েই সেটার কথা হলো। আর ও মহা উৎসাহে বলল, এটিএন-নিউজের জন্য নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসার কথা। গ্রামগ্রামান্তরের তথ্যকল্যাণীদের নিয়ে ওদের শুক্রবারের কানেকটিং বাংলাদেশ অনুষ্ঠানটিতে আরও নতুনত্ব এসেছে, দেখতে বলল।

ছাত্রাবস্থায় মিশুক যখন শিক্ষাকার্যক্রমে কানাডা যায়, ওর বাবার ব্যবহারজীর্ণ একটা সাদা খদ্দরের চাদর সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল। মঞ্জুলী সেদিন বলছিল, “মিশুক বরাবর ওর বাবার অভাব বোধ করত। আমি ভাবি, নিশ্চয়ই এখন বাবার সঙ্গে ওর দেখা হয়েছে।”

মুনীর মামার জন্ম হয়েছিল মানিকগঞ্জে, তাঁর বাবার জন্মস্থলে। ১৩ আগস্টের দুর্ঘটনাটি ঘটল মানিকগঞ্জেই।

শেষ না হওয়া কথা: তারেক ভাই ও মিশুকের সঙ্গে নিহত হয়েছেন তাঁদের মাইক্রোবাসের চালক মোস্তাফিজুর রহমান, তারেক ভাইয়ের দুজন সহকারী জামাল হোসেন ও ওয়াসিম। গুরুতর আহত হয়েছেন চিত্রশিল্পী ঢালী আল মামুন। সেদিনই আরেকটি সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচজন নিহত হন।

পত্রিকায় রোজই এভাবে প্রাণ চলে যাওয়ার অনেক খবর পড়ি। তার অর্থ যে কী, কতজনের জন্য তা কত কঠিন সময় নিয়ে আসে, তা এবার নিজেদের ওপরে এসেছে বলে অনুধাবন করছি।

মিশুক চলে যায়নি। ও আমাকে শেখাবে, এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার কী দায়িত্ব পালন করা দরকার। আমি, আমরা, যারা এ দায়িত্ব স্বীকার করব–ওকে সঙ্গে পাব।

লেখক:
Qurratul Tahmina
কুর্‌রাতুল আইন তাহ্‌মিনা, সাংবাদিক, মিশুক ্মুনীরের বোন

*এই লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.