মুক্তচিন্তার ওপর আবার আঘাত: আক্রান্ত কবি শ্রীজাত । শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার

Comments

আমন্ত্রিত হয়ে ভাষাশহীদের শহর শিলচরে গিয়েছিলেন কবি শ্রীজাত। উপলক্ষ্য ছিল একটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর আনুষ্ঠানিক যাত্রারম্ভের। দু’বছর আগে লেখা একটি কবিতার একটি শব্দকে অজুহাত করে সেখানে হামলা চালায় শহরের বিজেপি-র জনৈক নেতার নেতৃত্বে বজরং দলের কিছু উন্মত্ত যুবক। গোটা ঘটনাটিই ছিল সুপরিকল্পিত। কয়েকদিন ধরে সামাজিক গণমাধ্যমে কবি শ্রীজাত সম্পর্কে কুৎসিৎ প্রচার চালানো হয়। ধর্মীয় উন্মাদনার জিগির তুলে ওয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুকে প্রচার চালানো হয়। একটি বিশেষ ফেসবুক পেজ থেকে ঘটনার কয়েক ঘন্টা আগে থেকেই জমায়েত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। বলা হয়, ধর্মরক্ষার্থে ওই বিশেষ জায়গায় জমায়েত হতে হবে। শুধু এটাই নয় ঘটনার দিন কয়েক আগে ওই উগ্র ধর্মান্ধতার প্রচারক ওই সংগঠন জেলা শাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে শিলচরে কবি শ্রীজাতর অনুষ্ঠান বন্ধ করার দাবি জানায়। জানা যায়, জেলা প্রশাসনের চাপে অনুষ্ঠানকে পূর্ব নির্ধারিত সরকারি অতিথিশালা থেকে স্থানান্তরিত করে একটি হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। এই নিয়ে শহরে একটি চাপা উত্তেজনা ছিল। প্রশাসনের তরফে অনুষ্ঠানটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করায় সহযোগিতা করার তেমন প্রত্যক্ষ উদ্যোগ ছিল না। অনুষ্ঠানের অনেক আগে থেকেই ওই হোটেলের বাইরে মোতায়েন ছিল বিশাল পুলিস বাহিনী। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও অনুষ্ঠানস্থলে নির্বিঘ্নেই পৌঁছে গিয়েছিল হামলাকারীরা। যার নেতৃত্বে এই ঘটনাটি ঘটে তিনি সুপরিচিত হলেও এবং ওই অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে তার পৌঁছনোর উদ্দেশ্য সম্পর্কে কারো কোনো সন্দেহ না থাকলেও ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিসবাহিনী বা তাদের কর্মকর্তারা হামলাকারীদের বাধা দেওয়ার কোনো চেষ্টাই করেন নি।

যারাই শ্রীজাতর কবিতার সাথে পরিচিত তারাই জানেন, সমস্ত ধরনের ধর্মীয় উন্মত্ততা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে তিনি এক নাগাড়ে কবিতা লিখে চলেছেন বিগত কয়েক বছর ধরেই। বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার সংস্কৃতিকর্মীরা যখনই আক্রান্ত হয়েছেন তখনই ঝলসে উঠেছে শ্রীজাতর কলম। অভিজিৎ রায়ের হত্যার পর তিনি মৌলবাদের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ কবিতা লিখেছেন। একইভাবে ভারতেও যখনই মুক্তচিন্তার বৌদ্ধিক কর্মীরা আক্রান্ত হয়েছেন বা উগ্র হিন্দুত্বের রাজনৈতিক কারবারীরা উন্মত্ত আস্ফালন করেছে তখনই প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে শ্রীজাতর কলম। শিলচরে ধর্মীয় মৌলবাদীদের আক্রমণের অজুহাত ছিল তেমনই একটি কবিতা। উত্তরপ্রদেশের গেরুয়া বসনধারী মুখ্যমন্ত্রী বিজেপি নেতা যোগী আদিত্যনাথ একটি জনসভায় প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছিলেন, প্রয়োজনে কবর থেকে তুলে এনে মৃত মুসলিম নারীকেও ধর্ষণ করার জন্যে। এই বীভৎস বিকৃতিতে শিউরে উঠেছিল ভারতের সর্বস্তরের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। ওই সময়েই শ্রীজাত একটি কবিতায় যতদিন ধর্মান্ধদের চীৎকৃত আস্ফালন থাকবে কবর থেকে তুলে এনে ধর্ষণ করার ততদিন তাদের ত্রিশূলে পরিয়ে রাখবেন কনডম। মৌলবাদীদের আপত্তি ছিল কনডম শব্দের ব্যবহারে। তখনই সামাজিক গণমাধ্যমে কবি শ্রীজাতকে নিয়ে কুৎসিৎ আক্রমণের বন্যা বয়ে গিয়েছিল। উত্তরবঙ্গের একটি আদালতে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ দায়ের হয়েছিল একটি মামলাও। স্বাভাবিক ভাবেই যোগী আদিত্যনাথের মৃত মহিলাদের ধর্ষণ করার আহ্বানের মধ্যে কোনো ধর্মীয় অবমাননা বা তার পরনের গেরুয়া বসনের অসম্মান দেখতে পায় নি ধর্মীয় উন্মত্তকারীরা। শ্রীজাতর বিরুদ্ধে মামলা ও তার বিরুদ্ধে নোংরা আক্রমণের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের সুস্থ চেতনা সম্পন্ন সমস্ত মানুষ প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিলেন। দু’বছর পর ওই মিইয়ে যাওয়া বিষয় নিয়েই শিলচরে জিগির তোলে হিন্দুত্ববাদীরা। জেলা প্রশাসনের নীরব সমর্থনে সুপরিকল্পিত রচিত এই আক্রমণে চমকে ওঠেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত শহরের সাহিত্য সংস্কৃতিপ্রিয় মানুষ। প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে তাঁরা প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠেন। শহরের একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও বামপন্থী রাজনৈতিক নেতার জোরালো প্রতিবাদের মুখে অনুষ্ঠানস্থল থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হয় আক্রমণকারীরা। যদি এই পিছুহটার আগে ওরা অনুষ্ঠানের মাইক কেড়ে নিয়ে নিজেদের উন্মত্ত ভাষণ অবধি রেখেছিল সেখানে। পুলিস এতকিছুতেও কোনো ভূমিকা নেয় নি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত মহিলা শ্রোতা দর্শকেরা কবি শ্রীজাতর ওপর শারীরিক আক্রমণের আশঙ্কায় তাঁকে ঘিরে বলয় তৈরি করেন। এত কিছু হয়ে যাওয়ার পরও পুলিস কোনো ভূমিকা পালন করে নি। হোটেলের বাইরে জমায়েত হওয়া আক্রমণকারীরা এরপর ভাঙচুর ও ঢিল ছুঁড়তে শুরু করে। চার ঘন্টা ধরে অবরুদ্ধ করে রাখে হোটেলকে। আটকা পড়ে যান কবি শ্রীজাত সহ প্রায় কয়েক শ মানুষ। পুলিসের চোখের সামনেই চলতে থাকে ইঁট বৃষ্টি ও কাঁচের দেওয়াল ভেঙে ফেলা। ইতিমধ্যে সামাজিক গণমাধ্যমের মাধ্যমে সারা দেশে চাউর হয়ে যায় এই সংবাদ। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে নিন্দায় মুখর হয়ে ওঠেন সমাজের সর্বস্তরের মানুষ। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সহ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষেও কবি শ্রীজাতর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। ঘন্টা চারেক পর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র অবধি খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর সক্রিয় হয় পুলিস ও প্রশাসন। তবুও কোনো বলপ্রয়োগ না করেই অশান্তি সৃষ্টিকারীদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পুলিসের কড়া নিরাপত্তায় কবি শ্রীজাতকে সরকারি অতিথিশালায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পরের দিন সকালবেলা পুলিশী নিরাপত্তায় কলকাতাগামী বিমান ধরিয়ে দিতে বিমানবন্দর নিয়ে যাওয়ার পথেও আবার অবরোধ করার চেষ্টা করে হিন্দুত্ববাদী হামলাবাজরা। এই ঘটনায় প্রতিবাদের ঝড় ওঠে সর্বত্র। শহর শিলচরে সঙ্গে সঙ্গে সেভাবে প্রতিবাদ সংগঠিত না হলেও দিন কয়েক পর প্রতিবাদে সাংবাদিক সম্মেলন করে শহরের সমস্ত সাংস্কৃতিক সংগঠনের মিলিত মঞ্চ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ। তবে ঘটনার পর শুধু মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল দলের কয়েকজন নেতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একটি নিবন্ধ লেখায় কবি শ্রীজাতর একপেশে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনে ক্ষুব্দ হয় বামপন্থী সংস্কৃতিকর্মীদের অনেকেই। পশ্চিমবঙ্গে যখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণের একই ধরনের ঘটনা কয়েক বছর ধরেই ঘটছে এবং একাধিক বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী ও রাজনৈতিক কর্মীকে একের পর এক মিথ্যামামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে, তখন সেই আবহে শিলচরের ঘটনার সাথে প্রতিতুলনায় পশ্চিমবঙ্গে এ ধরনের ঘটনা একেবারেই ঘটে না বলে দেওয়া কবি শ্রীজাতর বিবৃতিতে অসন্তোষ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকেই। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, সারা দেশে মৌলবাদী আক্রমণ নিয়ে শ্রীজাত ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার হলেও পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যস্তরে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী নিয়ে তিনি সাধারণভাবে নীরবই থেকেছেন।

লেখক পরিচিতি:
শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার, গণসংগীত শিল্পী
Subha Prasad Nandi Mojumdar

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.