মুহম্মদ বদিউজ্জামান দিদারের কবিতা

Comments

আপন

দুহাতের বাঁধন ছাড়িয়ে 
নিলে যারে কাছে জড়ায়ে
সে কি হয় সবসময় আপন
সরায়ে মনের পাথর
জুরায় হৃদয়ের দহন। 

কেন বাঁধো ঘর, কেন ভালোবাসা 
নিঝুম চরাচরে কিসের মরণ নেশা
কি সুখের তরে রাখো গোপন 
হৃদয়ের গহিনে পোড়া এক জীবন
আপন যে ঘর, সেওতো হয় পর
পড়ে যখন টানাপোড়েন স্বার্থের কারণ। 

নিকষ আঁধারে যে কথা রাখো সবার অগোচরে 
গোপন হৃদয় মাঝে
তব অন্তর মম ধন্য তারই সুবাসে।

ভালোলাগা

মাঝে মাঝে মেঘলা আকাশ
গুমোট বৃষ্টির আনাগোনা
কখনো ঝলমলে জোছনার আকাশ
বারান্দায় এলোমেলো বাতাস
নারকেল আর কাঁঠাল পাতায় হুটোপুটি 
উত্তরের খোলা বারান্দায় 
দূর দেশের হিমেল বাতাস
কাঁটা দিয়ে যায় সারা গায়ে
ভালো লাগে।

মাঝে মাঝে তুমি অনেক দূরে
মনে হয় আমায় ছাড়িয়ে কোথাও
কখনো ভীষণ কাছে তুমি
যেন জোছনা ছড়াও
নয়তোবা বাতাসে তোমার গায়ের সুঘ্রাণ 
ভেসে আসে দূর হতে।
ভালো লাগে।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি একাকী
একা একা আকাশ দেখি
রাতের পাখির ডানা ঝাপটানো দেখি
কখনো তাও ভালো লাগে।

হীরার আংটি

ঘরের কাজে বিরক্তির কারণ
শাড়ির আঁচলে, ওড়নার শেষ মাথায়
মাঝে মাঝেই অস্বস্তি।

কখনো খুব প্রয়োজনে আসিনি
অনামিকায় পড়ে থাকি অবহেলায়
অথচ আমি এক দীর্ঘ জীবনের স্মৃতি
পরমাত্মীয়ের মতো রয়েছি দিবারাত্রি, যত্নহীন।

ভালোবাসার দিনে, অথবা ভীষণ খরায়
প্রয়োজন হয়নি কিছুরই
শুধু রয়ে গেছি সাথে সাথে, আঙুল জড়ায়ে
কোনোদিন হয়তো বিস্মৃত হয়ে 
বুলিয়ে দিয়েছো হাত।

হারিয়ে গিয়ে আজ অনেক দাম আমার
খুঁজে ফিরে এখানে-সেখানে 
আলো আর আঁধারিতে, ঘরের কোনায়
বাথরুমের সোপ কেস, কাচের শেলফ বা অন্য কোথাও 
কোথায় যে রেখেছিলে খুলে ভীষণ অবহেলায়, 
যেভাবে রয়েছিলাম এতগুলো বছর ধরে 
অথচ আমি তো ছিলাম অনামিকায়।

পথ

পথটা এখনো হয়নি পুরোনো 
এখনো নয়তো কেউ হয় পথচারী !
ভেবেছিলাম এখন হয়তো অব্যবহারে
বৃষ্টিতে পানি জমে হয়েছে এবড়োখেবড়ো 
নুড়ি বের হয়ে এখন লাল ইট
যেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে রক্তাক্ত 
অথচ, সব কিছুর পর এখনও দেখি মসৃণ-মোহনীয় এ পথ
কেউ না কেউ এখনো করে পায়চারি
আমার শুধু সময় হয়ে ওঠে না
ভাবি সব হয়েছে পুরোনো, জরাজীর্ণ।
জানি এ পথ দিয়ে চলা হবে না আর কখনো
অফুরন্ত আর অবশিষ্ট সময় কিছুই নেই হয়তো 
তবুও লেগে থাকা ধুলোগুলো
মনে হয় সে-পথ হতে উড়ে আসা
অথচ ঝড় উড়িয়ে নিয়েছে কবে সব
এখন ভুলেও হয় না সে পথে পায়চারি এখন আর সময় হয়ে ওঠে না।

ফিরে দেখা

এভাবেই বদলে যায় সব
ভোরের সূর্য পরশ বুলায় না চোখের পাতায় অনেকদিন
শিশিরে ভিজে না পদযুগল 
মাঝ রাতের তুমুল বৃষ্টিতেও গায়ে জড়াই না
আদুরে কাঁথা
ঘর হিম থাকে গ্রিন ইনভার্টারে।
জানালার গ্লাসে এখনো কী
বৃষ্টি আসে উথাল-পাথাল?
মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে দেখি না বালিশ ভিজেছে
ফোঁটা ফোঁটা ঘামে।
কতদিন ছাদে উঠে দেখি না
পৃথিবী ভেসেছে কিনা রূপোলি থালার আলোয় 
নিকষ আঁধারে খুঁজি না মাতাল নিশি।
একটু একটু করে বদলেছে সব
টের পাইনি কিছু
হঠাৎ পিছনে ফিরে দেখি বদলেছে 
একটা জীবন।

প্রয়োজন

চলে যায় দীর্ঘ রজনী নিঃসঙ্গ
দিবস দারুণ ব্যস্ততায়
কখনো থেমে থাকিনি
জীবন থেমে যায়নি
থামার হলে, থমকে যেতাম।

আমি চলে যাবো, ভেবো না
এতটা পথ একা যখন এসেছি
রাস্তাটা আছে চেনা।
থামবো বলে পথ চলা শিখিনি
গন্তব্য আমাকে হাতছানি দেয় না কখনো
আমি শুধু চলতে জানি।

আমায় শুধুশুধু ডেকো না
থামতে বলো না,
আমি আমার পথে আছি
থামার হলে আমি নিজেই থামব
পথ আমারও আছে জানা।

অভিমান নাই কিছুতেই আমার
আমি চলি জীবনের টানে
পথ আমাকে পথ চেনায়নি
চিনেছি নিজের প্রয়োজনে।

এক জীবন

শুনশান নীরবতা, নিস্তব্ধ চারিদিক
বাতাসের শব্দ যেন মুহুর্মুহু গর্জন
খোলা আকাশ, সাদা মেঘ করে খেলা
পুরোনো ঘাস, কোথাওবা জবা-পাতাবাহার
সবুজ শ্যাওলার পুরোনো প্রাচীর চারিধার
ভেজা মাটির গন্ধ, গন্ধ গোলাপ জল-আগরবাতির
জেগে নেই কেউ, দুপুরের ভাতঘুমে যেন সব!
নেই একাকীর অভিযোগ, 
কোন দীর্ঘশ্বাস, অতৃপ্তি-অনুযোগ 
নেই অপ্রাপ্তির হাহাকার
নেই আরেকটুখানি পাশে থাকার আহ্বান
নেই অভিমান দূরে থাকার।
প্রত্যাশার হতাশা নেই কোনো
উদ্বিগ্নতা নেই দিন শেষের
নেই কোনো পিছুটান
নেই হতাশা অকারণ
নেই আকুতি ঘর বাঁধার
নেই অভিনয় ভালো থাকার
নেই স্বপ্ন আঁটোসাটো জীবনের।
সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা-মাঝরাত
শুধুই ভীষণ একঘেয়ে দারুণ নিস্তব্ধ
এ যেন ভীষণ তৃপ্ত-এক জীবন সমাপ্ত।

লেখক:
Muhammad Badiuzzaman Didar
মুহম্মদ বদিউজ্জামান দিদার
কবি ও  গল্পকার, ঢাকা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট