মূর্তালা রামাতের কবিতা

Comments

সুখ

তোমাদের খুব তাড়াহুড়ো
এসেই বলো, মা বকবে, যাই-

চা-নাশতা প্রতিবার পড়ে থাকে
ঠাণ্ডা হয়ে মরে যায় ভাত-তরকারি-

মা নেই-
আমি তাই দুঃখের কাছেই থাকি…

যা কিছু থেকে যাচ্ছে

এই দুঃখ যাবে না;
থাকবে।

আমার খাটেই ঘুমাবে
পড়ে পড়ে, সিগারেট টানবে
কবিতাও লিখতে পারে দু’একটা-

আমার মতোই
সে জেগে থাকবে রাত, চা খাবে
একটু পরপর, চুপচাপ;

ছাদ থেকে অসংখ্যবার লাফ দেবার
ইচ্ছা হবে তার, কিন্তু সে বেঁচে থাকবে
ঘোলা চোখ আর
বড়ো বড়ো চুল-দাড়ি নিয়ে;

অনেক বছর পর
দেখা হলে চিনতেই পারবে না-

তোমাকে না পাবার এই দুঃখকে!

দূরবর্তী গ্রাম

দূরে থাকতে চাই।

ওখান থেকে মনে হয়
নদীতে আগের মতোই জল
কাশবনে ফুল ফুটেছে, আর আকাশ
তারা তারা।

কাছে গেলেই- চুপচাপ পথ;
চাকা গড়িয়ে যাওয়ার দাগে
চিঠির ভাঁজে ভাঁজে ধুলো।

মন খারাপ হয়ে যায়
মনে হয়, দূরে থাকলেই ভালো হতো।

অন্তত, দীর্ঘশ্বাসে বলা যেতো-
দূর থেকে খুব কাছে মনে হয়…

উড়ো-চিঠি

আপনাকে দেখলাম বাচ্চাকে চুমু
খাচ্ছেন, বরের হাত ধরে হাসতে
হাসতে যাচ্ছেন শপিংয়ে।

দেখলাম, ফুলগাছে পানি দিচ্ছেন,
বান্ধবীদের সাথে মেতে আছেন ছাদে;
আপনার চুল উড়ছে সুখী সুখী-

কল্পনা করে নিলাম আপনি ভাল আছেন
আগের চাইতে, ঘুমের ওষুধ ছাড়াই রাতে
ঘুমাতে পারছেন তাড়াতাড়ি, আজেবাজে
স্বপ্ন এসে জলে ডুবিয়ে দিচ্ছে না চোখ।

আরাম করে খেতে পারছেন,
গভীর মনোযোগে পড়তে পারছেন
নাটক-নভেল-সংসার, হাতের ভেতর
হাত রেখে পাগল হয়ে যাবার আকুতি
আপনাকে পেয়ে বসছে না আর।

ভেবে ভালো লাগলো খুব, দূরে যেতে
যেতে সত্যি জানবেন দুরন্ত কোনো
হাহাকার হলো না বরং
ইচ্ছা হলো বলে পাঠাই- ভাল থেকো…

মৃত প্রজাপতি, জীবিত মানুষ

এক সেকেন্ডকে এক কোটি
বছর করে দেয়া দুঃখ আমি
চাইনি।

আমি চাইনি, আমার রাতগুলো
কখনোই শেষ করতে না পারা
বইয়ের মতো হোক; দিনগুলো
অক্সিজেন ফুরিয়ে যাওয়া রোগীর
মতো খাবি খাক।

আমি চোখ খুলে ছোট্ট একটা ঘাসফুল
দেখে মরে যেতে চেয়েছিলাম; অসহ্য
রাস্তা ধরে ঠিকানা খুঁজে বেড়াতে
বেড়াতে নুয়ে পড়ার ইচ্ছা আমার
কোনোকালেই ছিল না।

আকাশ মাথায় নিয়ে যুগ
যুগ ধরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে
থাকা মানুষ নয়, আমি বরং
প্রজাপতির মতো মাত্র চৌদ্দটা দিন
কারো চোখের জলে
চোখ রেখে চলে যেতে চেয়েছিলাম…

মূদ্রার এপিঠ-ওপিঠ

ঈর্ষাটাকে টাকা বানাতে পারলাম না,
এই দুঃখ বয়ে বেড়াই, দীর্ঘশ্বাসগুলো
অন্তত খুচরো পয়সা হতে পারতো-

হলো না। স্বপ্নগুলো স্বপ্নই থেকে গেল;
ছেলেবেলার মার্বেলের মতো প্যান্টের
ছেঁড়া পকেট দিয়ে কখন যে পড়ে গেল,
টেরই পেলাম না- অন্য কেউ কুড়িয়ে
নিল তোমাকে

যে অনুভূতি বলার মতো নয়- সেগুলো
যদি শেয়ারের মতো বিক্রি করতে পারতাম
তা-ও হয়তো এতদিনে বন্ধুদের মতো
আমারও বাড়ি-গাড়ি হতো-

কিন্তু ইচ্ছাগুলোকে কিছুতেই ব্যাংক
ব্যালেন্স বানাতে পারলাম না, আফসোস-
ইচ্ছাগুলো অনেক অনেক অপেক্ষার ভেতর
রাতজাগা এক লাল চোখই রয়ে গেল!

পরের পৃষ্ঠা থেকে 

ভালো কিছু ঘটুক।

খুচরো নোটের মতো
ভালো কিছু আসুক
বড়ো এই দুঃখ ভাঙিয়ে।

ভালো লাগে না আর
এইসব মনমরা দিন,
মরে যাওয়া গাছ দেখে
ফুলের কথা ভেবে
কষ্ট পাওয়া-

পথের পাশে দাঁড়িয়ে
থেকে কোথায় গিয়ে
শেষ হয় সব,
ভাবার ভেতর কোনো
বেঁচে থাকা নেই-

এরচেয়ে নদীর মতো
সন্ধ্যার গ্রাম ঘেঁষে
চলে যাওয়া ভালো…

দূরে কোথাও গেলে যদি
ভালো কিছু হয়! 

থাকে শুধু অবহেলা 

জীবনে প্রথম যা অবলীলায় উপার্জন করি
তা অর্থ নয়- অবহেলা।

ভেবেছিলাম, মাকে দেবো
কিন্তু ও দিয়ে কি ওষুধ কেনা যায়?

ধুরু বোকা, একটা সিগারেটও পাবি না
আশীষ বিরক্ত হয়ে বলেছিল, যা ফেরত দিয়ে আয়-

কিন্তু অবহেলা তো আর কাগজের নোট নয়
যে মুখের ওপর দুদ্দাড় ছুঁড়ে দিয়ে এলাম!

অবহেলা হলো হুট করে ভেতরে ঢুকে পড়া কেউ
যাকে তাড়াতে গিয়ে বলি, আরেকটু বসে যাও….

লেখক:
Murtala Ramat
মূর্তালা রামাত, কবি, প্রবাসী

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট