। পল্লল ভট্টাচার্য ।
ফরাসি এই বাক্যাংশের (‘merci beaucoup’) অর্থ ‘অনেক ধন্যবাদ’। মে এবং সি-র মাঝের ‘র’ গলায় লুকিয়ে থাকে বলে কানে তা ‘মেসি’ হয়ে বাজে। ফ্রান্সের যেখানেই যাবেন সেখানে কথায় কথায় ‘মেসি’ শুনতে পাবেন।
তবে খেলোয়াড় মেসি-র নাম ফরাসিদের মুখে খুব একটা শুনতে পাবেন না। কারণ ওঁদের নিজেদের জুস্ত ফোঁতেন, প্লাতিনি, ক্যান্টোনা, জিদান, অঁরি ছিলেন এবং এখন আছেন এমবাপে, ডেম্বেলে, ওলিসে, চেরকি। একটিমাত্র বিশ্বকাপে (১৯৫৮) ছ’টি খেলায় ফোঁতেন-এর করা তেরোটি গোলের কীর্তি এখনো কেউ ছুঁতে পারেননি!
সমর্থকরা কীর্তিমানদের ‘স্বদেশী’ ভেবে গর্বিত হন; কেউ ভাবেন না ওঁরা সামগ্রিকভাবে বিশ্ব-ফুটবলেরই গর্ব। পেলেকে ব্রাজিল ‘জাতীয় সম্পত্তি’ ঘোষণা করে অবসরের আগে পর্যন্ত দেশের বাইরে খেলতেই দেয়নি। পঁচাত্তরে পেলের ‘কসমস’ (যুক্তরাষ্ট্র) এবং এখনকার মেসির ‘ইন্টার মিয়ামি’র মধ্যে গুণগত পার্থক্য চোখে পড়ার মতো।
নান্দনিক ফুটবল যাঁরা ভালোবাসেন তাঁরা ছাড়া ইউরোপে প্রায় কেউ মেসির নাম তো নেনই না, উল্টে কটাক্ষ করেন ‘পেসি’, ‘মাছি’ ইত্যাদি নামে; ইটালি সম্মান করে মারাদোনার যোগ্য উত্তরসুরী হিসেবে। ইউরোপের অন্যত্র ব্যঙ্গ, ‘কে মেসি?’ ইংল্যান্ডের সংবাদপত্রগুলোতে দেখেছি এই ব্যঙ্গ খুব বেশি।
প্যারিসে খেলার সময় তাই মেসিকে নিজ দলের (পিএসজি) সমর্থকদের ‘দুয়ো’ ধ্বনি শুনতে হয়েছিল; বিপক্ষ (ম্যানচেস্টার সিটি) ফ্রি কিক নেয়ার সময় ‘পাচিলের’ পেছনে মাটিতে শুয়ে থাকতে হয়েছিল। অঁরি, পেতি ধিক্কার জানিয়েছিলেন, কিন্তু মেসি-কে সেরা মেনেও জিদান কোনো প্রতিবাদ করেননি সেদিন।
মেসি বলেছিলেন, কাছে কেউ ছিল না বলেই তিনি নিজেই এমনটি করেছিলেন। বিস্মিত বিশ্ব সেদিন মেসির কথা বিশ্বাস করেনি। ইংল্যান্ডের রিও ফার্দিনান্দ এবং হারগ্রীভস একে ‘অবিশ্বাস্য অপমান’ হিসেবে ধিকৃত করেছিলেন।
একা মেসি নন, তাঁর আগে পিএসজি-তে এই দুয়ো শুনতে হয়েছিল রোনাল্ডিনো, নেইমার এবং জর্জ উইয়াকেও (লাইবেরিয়া)।
শুধু কি প্যারিসে, ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ ফাইনালে হারায় এবং তা সত্ত্বেও সেবারে ‘সেরা ফুটবলার’ স্বীকৃতি পাওয়ায় নিজের দেশেও মেসিকে কম ব্যঙ্গ শুনতে হয়নি। মারাদোনাও বলেছিলেন, এ ফিফা বাণিজ্য, যে কিছুই জেতেনি তাকে এটা দেওয়া উচিত নয়।
কেউ হয়তো মনে রাখেননি, মেসি অনুরোধ করেছিলেন তাঁকে যেন এই স্বীকৃতি দেয়া না হয়। কেউ হয়তো এও মনে রাখেননি যে ২০১৫-র কোপা আমেরিকায় চিলির কাছে হারার পরও মেসি সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
নিঃসন্দেহে মেসিদের বিশ্বকাপ জেতার সেরা সময় ছিল ২০১৪। শেষ মুহূর্তে মেসির বাড়িয়ে দেয়া পাসে যদি হিগুইয়ান পা ছোঁয়াতে পারতেন, জয় অবধারিত ছিল। মারাদোনার আটাশ বছর পর মেসি; প্রত্যাশার সে এক ভয়ঙ্কর চাপ। তাও যে হোল না তার জন্য একা মেসিকে দায়ী করা যায় না।
এই চাপ আঠারোতেও জয় করতে পারলেন না। বলা হয়েছিল তিনি বার্সেলোনার জন্যই খেলেন, বার্সেলোনাতেই থাকেন, আর্জেন্টিনায় থাকেন না, আর্জেন্টিনার জন্য খেলেনও না। মারাদোনাও একসময় বলেছিলেন আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা মেসির নেই। সেই শুনে মেসির কান্না বাড়লোই শুধু। তাও ২০২২-এর জয়কে মেসি ‘ফুটবলের ঈশ্বর’ মারাদোনাকে উৎসর্গ করেছিলেন।
কে বড়ো। পেলে, মারাদোনা না মেসি, এই প্রশ্নের জবাবে পেলেও একবার মেসিকে (২০১০) খোঁচা দিয়ে বলেছিলেন “আগে ও আমার মতো ১,০০০ গোল করুক আর তিনটা বিশ্বকাপ জিতুক তারপর আমরা এ নিয়ে কথা বলব।” পেলের বোধহয় মনে ছিল না পরবর্তী ব্রাজিল তারকা রোমারিও উনাকে ‘মিথ্যেবাদী’ বলেছিলেন এই হাজার গোলের তথ্য নিয়ে। ফিফার হিসেবে পেলের মোট গোল সংখ্যা ৭৬৭।
আমরা অবশ্য গোলসংখ্যা নিয়ে ভাবিত নই। মেসি নিজেও বলেছেন, “যে গোলে জয় নেই, সে গোল অর্থহীন।” যেমন ২০২২-এ এমবাপের হ্যাট্ট্রিকও বৃথা গেছিল।
বেঁচে থাকলে মারাদোনা দেখে যেতে পারতেন মেসির পরপর ছয়টি বিশ্বকাপ খেলা, চারবার নেতৃত্ব দেয়া, তিনটিতে ফাইনালে খেলা, একটিতে জয় এবং দু’বারের ‘সেরা খেলোয়াড়’ সেই যোগ্যতারই অসাধারণ উদাহরণ। ছ’টি বিশ্বকাপ জীবনে চৌত্রিশটা খেলায় একুশটা গোলসহ ষোলোবার ‘প্লেয়ার অফ দি ম্যাচ’ !
মেসিকে দ্বিতীয়বার কাঁদতে দেখেছিলাম বার্সেলোনা ছাড়ার সময় (২০১৮)। এই কান্না আমরাও সইতে পারিনি। তবু মেসির অনুসরণ আমরা এখনো ছাড়িনি। তাই আমাদের দেখা হয়েছে ২০২২-এ জয়ের আনন্দের কান্না এবং ২০২৬-এর পরাজয়ের কান্নাও।
রোনাল্ডিনোকে সবাই চিনবেন ব্রাজিল, বার্সেলোনা এবং তাঁর নান্দনিক নৈপুণ্যের সুত্রে; বার্সেলোনা থেকেই তাঁর খ্যাতির স্বীকৃতি। তাঁর হাত ধরেই মেসির বিশ্বজয়ের যাত্রা শুরু। বার্সেলোনার সিনিয়ার দলের হয়ে মেসির প্রথম গোলের (২০০৫) স্রষ্টা ছিলেন তিনিই। আনন্দে রোনাল্ডিনোর পিঠে চাপা মেসির হাসিমুখের সেই ছবি চোখে ভেসে আছে এখনো।
মেসির সংবাদ কানে আসছিলো ২০০৩-০৪ সাল থেকে। প্রথম গোল না দেখা পর্যন্ত মেসির খেলার দক্ষতা এবং সৌন্দর্য সম্পর্কে খানিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল মনে। রোনাল্ডিনো তখনো আমাদের দৃষ্টিতে নান্দনিক ফুটবলের সেরা প্রতিভূ। দু’জনের দুই বিশিষ্ট মিল চোখে পড়েছিল– মুখে লেগে থাকা ‘শিশুসুলভ হাসি’ এবং খেলার আনন্দ। ওঁদের হাসি দেখলেই আমার ‘হাসিখুসি শিশু ফুলফোর্ডের শিশু’ বিজ্ঞাপনটার কথা মনে পড়তো।
তার পরবর্তী ফুটবল আমাদের চোখে ‘মেসিময়’; কারণ ক্রুইফের কাল থেকেই আমরা ফুটবলকেও ‘শিল্প’ বলে মানতাম। অন্যান্য শিল্পকর্মের মতো এতেও থাকে সঙ্গীতের মতো তাল-লয়-ছন্দ, বুদ্ধি, দক্ষতা এবং নান্দনিক অভিজ্ঞতা। এই সবকিছুর সমন্বয়েই একজন ‘মেসি’র আবির্ভাব ও বিশ্বশাসন, এবং আমাদের আনন্দের জীবনযাপন।
সব শিল্পেরই এক বড়ো শর্ত তার আবেদন জনগ্রাহ্য হওয়া চাই। ফুটবলও তাই; তার সুন্দর ছন্দের সঙ্গে সঙ্গীতের যেমন মিল পাই, তেমনি মিল পাই মেধার। একে আমরা বলি ‘ফুটবলিং ইন্টেলিজেন্স’; তা না থাকলে মেসি হওয়া সম্ভব নয়।
ফুটবলকে কখনো রাজনীতির আলোয় বিচার করিনি, করেছি জীবন-আনন্দের আলোয়। খণ্ডাংশে আরো অনেকেই আমাদের এই আনন্দ যুগিয়েছেন বিগত পঞ্চাশ বছরে; এই রচনা মেসি এবং আমাদের আনন্দ সংক্রান্ত, তাই আর কোনো খেলোয়াড়ের সঙ্গে তাঁর তুল্যমূল্য বিচার করিনি।
মার্কিন মনোবিজ্ঞানী হাওয়ার্ড গার্ডনার মানুষের আট রকম বুদ্ধিমত্তার তত্ত্ব লিখেছিলেন ১৯৯৯ সালে (‘ফ্রেমস অফ মাইন্ড’), যার মধ্যে দু’টি ছিল স্থানিক বুদ্ধিমত্তা এবং শারীরিক-গতিবিষয়ক বুদ্ধিমত্তা। তখনো ফুটবল মাঠে মেসি পা রাখেননি। শারীরিক-গতিবিষয়ক বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে মেসির যে জুড়ি মেলা ভার অস্বীকার করি করে!
গার্ডনারের এই আবিষ্কার শিক্ষা-কেন্দ্রিক; সেগুলোকে আমি ফুটবলের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে দেখি এই তত্ত্ব মেসিই যে সেরা তাই প্রমাণ করে। যেমন– ১। আনন্দের জন্য খেলাধুলা; ২। ধাঁধা সমাধানে দক্ষতা (জমাট বাঁধা ডিফেন্স); ৩। মাঠের ছবির সার্থক উপলব্ধি (পজিশন); ৪। দৃশ্যকলার ধারণ (ভিশন); এবং ৫। আগে থেকেই খেলার প্যাটার্ন শনাক্ত করার ক্ষমতা।
মেসির এক উপলব্ধি চিরকালীন। মধ্যগগনে থাকাকালেই তিনি বলেছিলেন সব ম্যাচ জেতা যায় না। এবারের ফাইনালের আগেরদিনও এক অনুষ্ঠানে তিনি সেটাই আবার বলেছিলেন। বিশ্বকাপ জিততে (২০২২) তাঁর প্রায় আঠারো বছর সময় লেগেছিল; তাই বলেছিলেন কেউ রাতারাতি বিখ্যাত হতে পারে না।
এবারে স্পেনের শক্তি, নিজ দলের দুর্বলতা এবং নিজের ও কোচিংয়ের সীমাবদ্ধতা মাঠের ফাঁকফোঁকোরগুলোর মতো তাঁর অজানা ছিল না। হয়তোবা ফাইনালের আগের দিন তিনি আগামী দেখতে পেয়েছিলেন।
মেসির শেষ কথা, “আমি ফুটবলের শিশু। যখন দেখবো খেলে সেই আনন্দ পাচ্ছি না, আমি বিদায় জানাবো। আমি এভাবেই খেলে এসেছি আজীবন; পাল্টাতে হয়নি আমার খেলা।” আর মূল কথা, “আপনাকে খেলাটাকে ভালোবাসতে হবে।”
খেলোয়াড় জীবনের শুরুতে মারাদোনা নাকি মেসিকে বলেছিলেন “তুমি তোমার মতো করে খেলো এবং উপভোগ কোর”। এই উপদেশ মেসি চিরকাল মেনে চলেছেন এবং অন্যদেরও তাই শিখিয়েছেন।
এই যেমন ছাব্বিশের বিদায় বেলায় স্পেনের ইয়ামালকেও তিনি নাকি একই উপদেশ দিয়ে গেছেন। “তুমি নিজ পথে এগোও। (ফুটবলের) ভবিষ্যৎ তোমাদের প্রজন্মদের হাতে” (ইয়ামালের বক্তব্য)।
রেকর্ড নিয়ে মাতামাতির কোনো কারণ আমি দেখি না। ইতিহাসের মতো রেকর্ডও বদলে যাবে কালের নিয়মে। যেটা বদলাবে না সেটা হোল মন মাতানো ফুটবল। কেউ না কেউ আগামীতে মেসির জায়গা নেবেন। সুন্দর ফুটবলকে মেসির মতোই গুরুত্ব দেবেন। কেননা প্রকৃতি শূন্যের পক্ষ নেয় না।
আমার দৃষ্টিতে মেসি ‘নিত্যানন্দ’, যিনি ফুটবল খেলেন ‘শিশুর মত হেসে’। খানিক বেদনা রয়ে গেল, যা পেয়েছিলেন প্রথম দিনে (ফিফা যুব বিশ্বকাপ ২০০৫ ও অলিম্পিক্সে সোনা ২০০৮) এবং মাঝের দিনে (বিশ্বকাপ ২০২২) ‘তাই যেন পাই শেষে’ তাঁর পক্ষে সম্ভব হোল না বলে।
তবে তিনি যে দু’হাত দিয়ে বিশ্বকে, তথা সুন্দর ফুটবলের প্রেমিকদের হৃদয় ছুঁতে পেরেছিলেন তার জন্য মায়া রয়ে গেল মনে। ‘মেসি বকু’…।
লেখক:
পল্লল ভট্টাচার্য
সাংবাদিক, গদ্যলেখক, প্রাবন্ধিক; কলকাতা