মোস্তফা জামানের কবিতা

Comments

অবয়বহীন

আমার কেটেছে দিন অবয়বহীন
একটি গাছের ছায়ায় নিহেতু এবং নির্বাক

কোনো কথা না বলিয়া পার হয়ে গেছে শত মাস
আরো আরো দিন যাবে অনির্ণেয়, নির্বস্তুক!
আমার শোনার তরী ভাসিবে না কি
অবশেষে মর্মের অথৈ জলে?
কে বলিবে মোরে কি করিয়া শূন্য হতে মানুষ ফলে?

বহুকাল পর দেখিলাম এক মুখে অনন্তের ছায়া
এমন মেহমান বসে আছে আপন ঘরে নদী পার হইবার লাগি।

অক্ষরবৃত্তের আয়নায়

আমি তোমার গল্প হইবো বলে
নামিলাম পথে
রেখার মতন মন আর বৃত্তাকার সত্তা
দীনহীন এক সময়ের মধ্যে নিরীহ দুই পা
রাখিলাম এমন যেন কেউ আমারে না চিনে
আমার মুখের পানে চেয়ে
দেখিতে পায় তোমারেই
যে তুমি নির্জনে কষ্টের কাটা
পায়ের নিস্তব্ধ পাতা হতে
তুলে তুলে
রেখেছো মাটির পর
যেন তারা পৃথিবীর সবশেষ অত্যাচারীর
চিহ্ন হয়ে রয়ে যায় কবিতামহলে
অক্ষরবৃত্তের আয়নায়।

নাব্য নদীর পারে

একের পিছনে অধিক শূন্য
বারংবার ফিরে দেখিবার পর
ফোটে হাজার পাপড়ির এক ফুল–  
সকলে দেখিলো না তা,
তাহারা কি রস ভুলে রূপে মশগুল?

গতি ও প্রগতি যদি রাস্তা বিষয়ক
দেখা, নিশ্চিত সত্যবাদীর হক।

শূন্য থেকে পিছে ফিরে
দেখি এক-এ এ-জীবন স্থির
এমন ন-স্থানে দাঁড়ায়ে সে জন
যেন তার স্বয়ম্ভু প্রাণ,
ও তো এক বাক্যে শেষ ও শুরু,
এইখানে একই তরলের লাগি
পিপাসার্ত শিষ্য ও গুরু।

কি আছে অংকের পিছে
কে দাঁড়ায়ে থাকে প্রতি সংখ্যার পর?

দেহ যদি হয় আপনার একমাত্র ঘর
তার সুরত ও দশা, কাহার তরে
এমন সহজ হইলো আজ হঠাৎ বিজনে
বুঝিলাম নাব্য নদীর পারে
প্রেম অনন্ত শুধু খোদা তোমারই সনে।

অধস্তন ও অধিপতি

ঘটনার অধঃস্তন যত চিহ্ন
তাহাদের সরায়ে রাখো আজ
নীরব দুনিয়াদারি আমাদের ঐকান্তিক তরিকত।

নৌকা ভাসায় লোকে মাঠে-ঘাটে যত্রতত্র
তারা মঙ্গল চায়, তারা দৃষ্টি নিরোধক…

দিনকানাদের সাথে চলো সকালে উঠি
তাদের সাথেই ফের ঘুম যাই সন্ধ্যার পর…

কবি তুমি করো পাঠ নিভে গেল আজ যে আগুন
তোমার নামের যত আছিল অজানা সৎগুন
ঐসব ভুলে, এসো ঝরে যাই যেন মোরা প্রাত্যহিক পলাশ-বকুল।

এক তীরে তুমি থাকো অন্য তীরে ভাষা ও কবিতা…
বিফল দিনের পরও একই অর্থ তোমার বিরাজে
             তুমি অধিপতি এক, সশরীর প্রজ্ঞাপারমিতা।

ঠকবাজারে

ঠকবাজারে সওদা কিনে
ফিরে আসি এ কোন ঘরে,
   আয়নাতে আর যায় না কিছু চেনা।

কিশলয়ের সবুজ, সে যে
আমার লাগি থাকবে চিরকাল
অমন বাণী শুনবো আবার
আশার মেঘে জল দেখলাম,
     বর্ষা তো ঝরছে না।

পথের মতো দৃষ্টি আমার দেহের আগে চলে
পেলাম শেষে নিঃস্ব কোনো মানুর গতর
অনেক দিনের ধুলার পরে শুয়ে
স্বপ্ন দেখি মিথ্যায় হাত ধুয়ে
       সত্য আহার তুলে নিলাম পাতে,
এই কথাটা অনেকেই আজ বুজতেই চাচ্ছে না।

আসবে কি আর সময় ফিরে
ঘড়ির ভিতর কয়েকটা মন কাটার সাথে ঘোরে
আমার আশা আমার ঘরে
শূন্য লতার অগ্রে আছে জ্বলে…
এই সত্যই রইবে টিকে,
        বাকি কথার চিহ্নও থাকবে না।

নাগরিক একাঙ্কিকা

শহরের একাঙ্কিকা হতে
আমি তোমারে পেলাম
যে তুমি নায়িকা
চুলের অন্ধকার থেকে
বের করে আনো
অচেনা অসতর্ক আরো আরো মুখ…

আমি রূপ নেহারী সকলের
বুঝিলাম একাকীত্ব নায়কোচিত,
যেন নট ও নটির সূত্রে উৎপাদিত
সাংস্কৃতিক পরম্পরা এক,
তার মাঝে মানুষের সকল বাসনা
ভিন্ন আরেক মতবাদ।

আমার ত্রিকাল আমি এ-নাটকে
লুকায়ে রাখি ভাতের নলায়
খিদার মধ্যে আমি নিজেরে হারাই
শ্রমসাধ্য কাজে আমি দিন গুজরাই
যেন ঘামের পিছে, চোখের আড়ে
আমার কামনা সকল গচ্ছিত থাকে।

নগরের বাতচিত থেকে
মুক্তি নাই, প্রভু

যখন নাট্যকার কৌশলে সকল প্রলাপ
মুছে মুছে গড়ে তোলে তার দরবার
সে প্রপঞ্চ সরকারি, সে প্রপঞ্চ বিশুদ্ধ প্রতাপ
ঘামের লবনে তা-ও দ্রবণীয় মনে করি আমি
মানুষ আমি তো সদা মুক্তিকামী…

জানি তবু ভবিতব্য অজানা রয়,
সহজে যায় কি চেনা পুলসিরাত?
শ্রম বেঁচে আমরাই প্রতিরোজ অন্যের ভাত খাই
ভাবি, যে লিখেছে এ নাটক সে তো আমাদেরই নাগরিক সাঁই।

লেখক:
Mustafa Zaman
মোস্তফা জামান
কবি ও চিত্রকর, ঢাকা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট