রোমেল চৌধুরীর অনুবাদ কবিতা

Comments

আগুন ও বরফ

এই দেহটির প্রয়াণ কোথায় ওরে-
চিতাগ্নি নাকি বরফ শীতল ঘরে,
যতটা জেনেছি বাসনার সুরা পিয়ে
তাতে বলা যায় এটুকু সুনিশ্চিত,
“আগুনে পুড়েই যেতে চাই আমি মরে”।
কিন্তু যদিবা দ্বিতীয় মৃত্যু হয়
ততদিনে আমি ডুবেছি গভীর ঘৃণায়
“চলবে, এটাও নিছক মন্দ নয়,
মৃত্যু মোহন, বরফের বিছানায়”।

[মূল: ফায়ার এণ্ড আইস – রবার্ট ফ্রস্ট]

মেট্রো স্টেশনে

জনতার ভিড় ত্রস্ত অধীর ছমছমে ছায়া ঘন;
সিক্ত কালো ডালের বৃন্তে পাপড়ি যেন।

[মূল: ইন আ স্টেশন অব মেট্রো – এজরা পাউণ্ড]

গণিকা গমন

তুমি রোস্ট বিফ পয়সা খসিয়ে তোমায় কিনেছি আমি
একান্ত সুখে পেঁয়াজ মিশিয়ে তোমায় রাঁধবো আমি।

তুমি যে নৌকো তোমায় কিনেছি ঘণ্টা চুক্তি করে
তীরে ভিড়বার লগ্ন অবধি লগি ঠেলে যাই জোরে।

তুমি সুডৌল মসৃণ কাঁচ ভাঙতে দারুণ সুখ
থুতুতে ভিজিয়ে গিলে গিলে খাই আমি যে সর্বভুক।

যতক্ষণ ভরা তোমার শরীর টসটসে মধুরসে,
ঘষে লুটে নিই সবটুকু ওম মত্ত নেশার বশে।

রমণ বমন সব শেষ হল নিথর ক্লান্তি আসে
কাঁচুলির তলে স্তনের গভীরে মায়ের গন্ধ ভাসে।

[মূল: বাইং দ্য হোর – অ্যানা সেক্সটন]

ইগনাসিও সানচেজ মেজিয়াসের জন্য শোকোচ্ছ্বাস

আলোড়ন ও মৃত্যু
তখন ঘড়িতে বিকেল পাঁচটা বাজে।
কাঁটায় কাঁটায় বিকেল পাঁচটা বাজে।
সাদা থান নিয়ে অমল বালক এক
এলো ঠিক ঠিক বিকেল পাঁচটা যবে।
ঝুড়ি ভরে রাখা আছে সাদা সাদা চুন
ঘড়িতে তখন বিকেল পাঁচটা বাজে।
শুধু মৃত্যুর, মৃত্যুর পথ চেয়ে
গোধূলি আলোয় থেকে থেকে উঠে নেয়ে।

বাতাসে ওড়ায় পেঁজা তুলো ছিল যতো
ঘড়িতে তখন পাঁচটা বাজার সুর।
অক্সাইড ছাড়ে স্ফটিক-নিকেল কিছু
হলো বেলাবেলি, বিকেল পাঁচটা বাজে।
ঘুঘু আর চিতা সমানে লড়াই করে
পাঁচটার ক্ষণে, ঠিক পাঁচটার ক্ষণে।
একটি উরু বিষণ্ন শিংয়ের সনে
যুদ্ধে মেতেছে, ঠিক পাঁচটায়, রণে।
আর্সেনিকের ঘন্টা এবং ধোঁয়া
পাঁচটায় জেনো, পাঁচটায় ঠিকঠাক।
চারপাশে জমে স্তব্ধতা নির্বাক
ঘড়ি ধরে ধরে বিকেল পাঁচটা বাজে।
বুনো ষাঁড় শুধু ভীষণ উল্লসিত!
পাঁচটা বেজেছে, ঘড়ির কাঁটায় মাপা।
যে সময়ে দেখা দিল তুষারের ঘাম
ঘড়িটা জপছে ঠিক পাঁচটার নাম,
যে সময়ে ঢাকা বুল রিং আয়োডিনে
ঘড়ির কাঁটাটি পাঁচের ঘরটি ছোঁয়।
ক্ষতের কোটরে মৃত্যু পেড়েছে ডিম
বিকেল পাঁচটা বিকেল পাঁচটা বাজে।
গুনে গুনে ঠিক বিকেল পাঁচটা বাজে।

চাকাঅলা এক কফিন শয্যা তাঁর
ঘড়ির ঘন্টা পাঁচটার বোল তোলে।
হাড় আর বাঁশি তাঁর কানে বাজে ফের
সময় গড়ায় বিকেল পাঁচের কোলে।
এখন ষাঁড়ের গর্জন ভরা রোষ
ঠিক পাঁচটায় খুঁজে পায় যত জোশ।
রামধনু রঙে ঘর হলো জ্বালাময়
জানি পাঁচটায় বিকেলের হবে ক্ষয়।
বহুদূর হতে ক্ষতের পচন আসে
বিকেল পাঁচটা বুদ্বুদ তুলে কয়।
সবুজ কুচকি তূর্যধ্বনিতে নাচে
ঘড়িতে তখন পাঁচটাই লিখা আছে।
ক্ষত জ্বলে উঠে সূর্যের তেজ নিয়ে
বিকেলের বুকে পাঁচটি গোলাপ যেন।
এবং জনতা ভাঙে জানালার কাঁচ
ঘড়িতে হেনেছে পাঁচটা বাজার বাজ।
পাঁচটা বেজেছে, বিকেল পাঁচটা ঠিক।
বিকেল পাঁচটা বেজেছে দিগ্বিদিক!
আহা, ভয়াবহ বিকেল পাঁচটা আজ!
সব ঘড়িতেই প্রেতায়িত বাজে পাঁচ!

[মূল: ল্যামেন্ট ফর ইগনাসিও সানচেজ মেজিয়াস – ফ্রেডেরিক গার্সিয়া লোরকা]

আরক্তিম আপেল, সোমত্ত নারী, জ্বলন্ত চাঁদ

আরক্তিম আপেল, সোমত্ত নারী, জ্বলন্ত চাঁদ,
সামুদ্রিক শৈবালের প্রগাঢ় গন্ধ, পিষ্ট কাদা ও চূর্ণ আলো,
কি গোপন প্রজ্ঞান লেপ্টে আছে তোমার সুকোমল দুই থামের মাঝে?
কোন আদিম রাত্রির স্পর্শ পায় পুরুষ-চেতন?
আহা, প্রেম সে এক মোহন ভ্রমণ জল আর তারার ভেতর,
দমবন্ধ বাতাসের ভেতর, শস্যকণার তীক্ষ্ণ ঝটিতি ঝড়ের ভেতর;
ভালবাসা হলো আলো জ্বালাবার যুদ্ধ,
আর এক মাধুরীতে মিশে গিয়ে দুটি দেহের ধ্বংস হয়ে যাবার খেলা।
চুমোয় চুমোয় আমি ছুঁয়ে যাই তোমার ছোট্ট অতল,
তোমার দেহপ্রান্ত, তোমার নদী, তোমার ছোট্ট গ্রাম,
আর আনন্দে রূপান্তরিত একটি যোনির আগুন,
সুগন্ধি এক নিশি উৎসবে অধঃক্ষিপ্ত হবার নেশায়
রক্তের সুচিক্কণ স্রোতধারায় পিছলে পিছলে যায়
আর অন্ধকারে শুধুই আলো হতে চায়।

[মূল: আরক্তিম আপেল, সোমত্ত নারী, জ্বলন্ত চাঁদ – পাবলো নেরুদা]

হেমন্ত

পাতা ঝরে যায়, পাতা ঝরে যায়, ওই উঁচু থেকে―
সুদূর আকাশে অনেক বাগান মরে মরে যায়।
না পাওয়ার ব্যথা শোকে দুলে উঠে প্রতি পলে পলে।

আজ রাতে ফের পৃথিবী হয়েছে ঠিকানাবিহীন
হাজার তারার বাঁধন ছিঁড়ে সে একা হয়ে যায়।

আমরাও ঝরি। এই হাত ঝরে, আরটিও দেখো
ঝরেছে এখানে। সকলের প্রাণে ঝরা বকুলের
গান বেজে ওঠে। তবু আছে জানি, কোনো একজন
হাত দুটি যার শান্ত কোমল; পতন ঠেকায়।

[মূল: অটাম – রাইনার মারিয়া রিলকে]

নিগ্রো নদীর কথা বলে

নদীকে চিনেছি আমি:
জেনেছি, নদী এই পৃথিবীর সমান বয়সী এবং প্রাচীন
ধমনী শিরায় প্রবহমান রক্তের স্রোতধারা থেকেও পুরনো।

নদীর মতোই গভীর হয়েছে আমার আত্মার তলদেশ।

প্রভাতের পুরোভাগে আমি স্নান করলাম ইউফ্রেতিসের জলে।
ঘর বাঁধলাম কঙ্গো নদীর তীরে, বিভোর ঘুম পাড়ানিয়া গানে।
চোখ মেলে দেখি নীলনদ, সেখানে গড়লাম আকাশছোঁয়া পিরামিড।
মানবতার মহান পথে আবে লিঙ্কন নিউ অরলিন্স অবধি হেঁটে গেলেন।
আমি কান পেতে শুনলাম মিসিসিপির উদাত্ত সংগীত
আর বিস্ময়ে দেখলাম,
গোধূলির আলোকচ্ছটায় কর্দমাক্ত লহরীর ভাঁজে ভাঁজে
কিভাবে একটি সোনালী স্বপ্নের বীজ অঙ্কুরিত হতে চলেছে

নদীকে চিনেছি আমি:
চিনেছি আবহমান, কাজল নদীকে।

নদীর মতোই গভীর হয়েছে আমার আত্মার তলদেশ।

[মূল: দ্য নিগ্রো স্পিকস অব রিভারস – ল্যাঙস্টোন হিউজেস]

লেখক:
Md. Golam Mostofa
রোমেল চৌধুরী, শিক্ষক, লেখক ও অনুবাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট