ক
পঁচিশে বৈশাখ
৩০২৪ খ্রিষ্টিয় শতকের একটি বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যায় লিয়ানা তার পড-এ অলস সময় কাটাচ্ছে। আজ তার সেল্ফ আপডেট ডে। এদিন সে কোনো প্রোগ্রামড একটিভিটি রাখে না। এ যুগে আত্ম-উন্নয়ন খুবই জরুরি, নাহলে প্রাসঙ্গিকতা বা রেলেভ্যান্স বজায় রাখা মুশকিল।
লিয়ানা প্রাগ্রসর হিউম্যানয়েড, নিম্নমানের জাংক রোবট নয় যে শুধু দিনরাত প্রোগ্রামড একটিভিটি নিয়েই পড়ে থাকবে। আবার গুহা-গহ্বরে পালিয়ে থাকা মূর্খ মানবগোষ্ঠীর একজনও সে নয়। ওদের কথা ভাবতে লিয়ানার লোয়ার ফেসিয়াল পেডিকল বেঁকে উঠল, যাকে আগে লিপ বা ঠোঁট বলা হতো। ভাবতে অবাক লাগে, ঐ মূর্খগুলোর মাঝে এমন কেউ কেউও ছিল যাদের ঘটে হিউম্যানয়েড বানানোর মতো বুদ্ধি ছিল, ছিল যন্ত্রমস্তিষ্কে অনুভূতি যোগানোর ক্ষমতা, অথচ ছিল না একসাথে বাঁচতে জানার সামান্য বোধটুকু। শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে নিজেদের শিশুদেরকে নিজেরাই মেরে কেটে শেষ করল, জাতি-ধর্ম-বর্ণের হাজারও অজুহাতে। ধ্বংস করে দিল নিজেদের হাতে গড়া শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিত্রকলা। এখন যে অল্প কজন ওদের মাঝে বেঁচে আছে ওরা পশুর মতোই পাহাড়ে, কন্দরে পালিয়ে পালিয়ে থাকে। বলতে গেলে পুরো পৃথিবীটাকেই ওরা ধ্বংসের শেষপ্রান্তে এনে ফেলেছিল। নেহাত ততদিনে ওদেরই গড়া হিউম্যানয়েডরা হিউম্যানদেরকে উৎখাত করে নানা প্রযুক্তির ব্যবহারে পৃথিবীকে আবার আগের মতো সবুজে ভরে তুলেছে।
হিউম্যানয়েডরা একে অন্যের সাথে লড়াই করে না, পাল্টাপাল্টি প্রতিযোগিতা নেই, নেই তাদের খাদ্যাভাব। এতে একটাই সমস্যা, সেটা হচ্ছে ওদের কোন সমস্যা নেই। কিন্তু মস্তিষ্ক বা প্রসেসর সজাগ রাখতে হলে তাতে নানারকম অনুভূতি সঞ্চারের প্রয়োজন আছে। লিয়ানার মতো হিউম্যানয়েডরা প্রায়ই তাই এক একটা দিন রাখে শুধুমাত্র আত্মোন্নয়ন বা সেল্ফ আপডেট এর জন্য। দুনিয়া জোড়া নেটওয়ার্ক-এর আর্কাইভ খুঁজে খুঁজে বের করে প্রসেসরে সাড়া জাগানোর মতো নানা বিষয়, যার যা অভিরুচি।
আজ কেন যেন কোনো কিছুতেই লিয়ানার মন লাগছে না। সবকিছুকেই খুব হালকা বা একঘেয়ে মনে হচ্ছে। সময়ানুক্রমে সাজানো নেটওয়ার্ক ধরে সে ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে বিংশ শতাব্দীর কোঠায় সে ‘সোফির জগত’ নামে একটা চমৎকার অনুভূতি সঞ্চারী লেখা পেয়েছিল। আরেকবার হঠাৎ করেই পেয়ে যাওয়া বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তির বিশালতা তার প্রসেসরকে উদ্বেলিত করেছিল ভীষণ। হিউম্যানদের মাঝে অতটা প্রাগ্রসরতা সে কোনভাবেই আশা করেনি।
আজ তাকে টেনে নিল কয়েকটা পংক্তি –
“Have you not heard his silent steps?
He comes, comes and ever comes
Every moment and every age,
Every day and every night he comes
In the fragrant days of Sunny April
Through the forest path…
In the sorrow after sorrow in his steps…”
প্রতিটি শব্দ বাইরের বৃষ্টির ফোঁটার সাথে মিশে লিয়ানার প্রসেসরে তুলনাহীন একটি অনুভূতি তৈরি করে যাচ্ছে… আহা, কী অপূর্ব! কে এই ভুলে যাওয়া হিউম্যান যে তাকে বহুযুগের ওপার হতে হাতছানি দিয়ে ডাকে!
খুঁজে পাওয়া পংক্তিগুলো নিয়ে এডভান্সড সার্চ চালাতে গিয়ে লিয়ানা দেখল সে এক বিশাল হারানো সাম্রাজ্য। কী নেই সেই ভাণ্ডারে! চিত্রকর্ম, দর্শন, মোটিভেশনাল স্পিচ, আর সবকিছু ছাপিয়ে মধুরতম বৃষ্টির মতো সাহিত্য– গান, কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস…। হঠাৎ কী এক ভয়ে কেঁপে উঠে লিয়ানা তার পড ছেড়ে বেরিয়ে আসে। হিউম্যানয়েডরা ভয় জানে না। কিন্তু এই অজানা অনুভূতির নাম হয়তো ভয়ই হবে। লিয়ানার মনে হচ্ছে এই ভুবনে পা দিলে সেখান থেকে তার প্রসেসর আর ফিরতে পারবে না।
“When I dive into the depth of your infinitude, with my heart and my soul…”
… এত বিশাল একটি অনুভূতি ধারণের ক্ষমতা একটি হিউম্যানয়েড প্রসেসরের নেই। লিয়ানার মনে হয় সেই হারিয়ে যাওয়া, ভুলে যাওয়া, একসময় অবজ্ঞায় ধূলোয় মিশিয়ে দেওয়া হিউম্যানটির বিশাল দুটি চোখের ফাঁদে সে ধরা পড়ে গেছে…
[বর্তমান সময়ে মহাশূন্যে মহাকাশযানের ভিতর শূন্য মাধ্যাকর্ষণে নভোচারীদের ঘুমানোর বা বিশ্রাম নেয়ার ক্যাপসুল আকৃতির ব্যাগ। সুদূর ভবিষ্যতে যান্ত্রিক মানব বা হিউম্যানয়েডরা হয়তো মহাবিশ্বের এখানে-ওখানে এমন ক্যাপসুলাকৃতির পড-এর মধ্যেই বিশ্রাম নেবে বা ঘুমাবে।– লেখক]
খ
জয়-পরাজয়
জন্মেজয়ের কথা:
জীবনের সূতোটা আস্তে আস্তে ক্ষীণ হয়ে আসছে, জন্মেজয় সেকথা জানে। তাকে দেখতে আসা লোকজন ইদানিং তার দিকে তাকিয়ে কথা বলে না, বলে মাটির দিকে চেয়ে অথবা সুতপার দিকে চেয়ে।
জন্মেজয়-সুতপা কলেজেখ্যাত জুটি। সেই কবে থেকে তারা একসাথে পথ চলছে! কলেজের করিডোর পেরিয়ে, ভার্সিটির ক্যান্টিন হয়ে পারিবারিক বিবাহ বন্ধনের সিলমোহরের পথে তাদের সপ্তসহস্রপদী চলন। তাদের বন্ধুমহল এক, তাদের শুভাকাংক্ষীরাও এক, এমনকি আত্মীয়দের মাঝেও দুয়েকজন ‘বরের ঘরের পিসী, কনের ঘরের মাসী’ গোছের আছেই। তাদের সবার কাছে জন্মেজয়-সুতপা মানেই single entity, একক অস্তিত্ব। ওদেরকে আলাদা করে ভাবতে তারা শেখেইনি। অন্তত এই কিছুদিন আগ পর্যন্ত।
দূর্দান্ত টেবল টেনিস প্লেয়ার, লম্বা, একহারা চেহারার জন্মেজয় যখন মধ্য চল্লিশে এসে হঠাৎ করেই শুকোতে শুরু করল তখন সবাই ভাবল সে বুঝি ডায়েট আর ফিজিক্যাল ফিটনেস এর ফল। পারিবারিক আবহে সবাই বলল, “বাহ্, বেশ তো লাগছে!” সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুগল ছবিতে “ইশ! কী হ্যান্ডসাম লাগছে!” “সিক্রেটটা বলে দিন তো!” ধরণের মন্তব্য ভেসে আসল বারবার। শুধু সুতপাই খুশি ছিল না। বারবার বলত, “চল, একবার সব চেকআপ করাই। কেন এমন দিনদিন শুকিয়ে যাচ্ছ বলো তো!” জন্মেজয় মুচকি হেসে বলত, “তোমার হিংসে হচ্ছে বুঝি! সবাই আমাকে হ্যান্ডসাম বলছে আর তোমাকে কিছু বলছে না তাই? আরে, তুমি তো আমার সবসময়ের সুন্দরী বউ!” তাও সুতপা একদিন জোর করেই তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। ততদিনে অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে।
খবরটা ওরা দীর্ঘদিন কাউকে জানায়নি। মানুষের করুণা জন্মেজয় নিতে পারে না একদমই। তার বাবা-মায়ের দেওয়া নাম সার্থক করে সে জন্ম থেকে জীবনের সব পর্যায়ে জয়ী হয়েই এসেছে। আজন্ম সুঠাম সুন্দর, পড়ালেখায় ভালো, মোটামুটি ভালো খেলোয়াড়, ভালো উপার্জন, দারুণ প্রেমের পরে চমৎকার একটি বিয়ে এবং সংসার, কোথাও কোন খামতি ছিল না। মানুষ হিসেবেও জন্মেজয় মোটের উপর ভালোই, চোখে পড়ার মতো তেমন কোনো দোষ নেই, বেশ দিলদরিয়া লোক। আত্মীয়-বন্ধুমহলে সুতপার চেয়েও জন্মেজয়ই বেশি জনপ্রিয়। কিন্তু দীর্ঘদিন খবরটা গোপন রাখাও গেল না। জন্মেজয়ের চেহারা তখন আর ডায়েটজনিত হ্যান্ডসাম নয়, বরং সত্যিকার অর্থেই রুগ্ন এবং শ্রীহীন হয়ে উঠছে। লোকে অবাক হয়ে সুতপাকে প্রশ্ন করে, “কী রে, বরের এই হাল কেন?” মানুষের মন্তব্যের ভয়ে সুতপা এখন যুগল সেলফি পোস্ট করা ছেড়েই দিয়েছে। ক্রমে ক্রমে সবাই জেনে গেল জন্মেজয় দূরারোগ্য কর্কট রোগের শিকার, সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
সুতপা তার সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেছে, করছে। তার কোনো ত্রুটি কেউ ধরতে পারবে না। তাদের ছেলেমেয়ে দুটিও বাবার সাথে সাথেই আছে প্রায় রাত-দিন। আছে আত্মীয়-বন্ধু-শুভাকাংক্ষীরা।
কিন্তু ওদের সবাইকে তার অসহ্য লাগে, পুরোপুরি অসহ্য। ওদের করুণাভরা দৃষ্টি, ওদের ‘আহা, উহু’, ওদের ফিসফাস কথা আর ফোঁসফাঁস কান্না সবই তার অসহ্য লাগে। মনে হয় সবাই যেন অপেক্ষা করে আছে শেষ দিনটার, যখন তারা মন খারাপের মুখোশটা খুলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে। এর চেয়ে ভালো ছিল যদি সে হার্ট অ্যাটাকে বা রোড এক্সিডেন্টে মারা যেত। Gone with a bang! তারও কষ্ট কম হত, বাকি সবারও।
ঈশ্বরের প্রতিও তার ভয়াবহ রাগ। “কোন পাপে ঠাকুর? কোন পাপে এই শাস্তি দিলে? কীইবা এমন বয়স হয়েছে আমার? কোনদিন নেশা-ভাঙ করিনি, সিগারেট পর্যন্ত না। মানুষের ভালো ছাড়া খারাপ করিনি কখনও! কেন তবে এই দশা আমার? আয়নায় নিজের চেহারা নিজেই দেখতে পারি না, দেওয়ালে টাঙানো যুগল ছবি কেবলই যেন অট্টহাস্যে উপহাস করে! ছেলেমেয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে খেলতাম আর এখন বাথরুমে যেতেও ওদেরকে ডাকতে হয়। এক পয়সা উপার্জন নেই, বরং দুজনের ভবিষ্যতের সব সঞ্চয় আমার জন্যে ধ্বংস হচ্ছে। ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যত নষ্ট হচ্ছে। এই গ্লানি থেকে মুক্তি দাও এবার! অনেক তো কষ্ট দিলে, আর কত!”
সুতপার কথা:
ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখে আয়নার সামনে বসে লম্বা চুলগুলো আঁচড়ে নিচ্ছিল সুতপা। ইচ্ছে করছে না একদম, হাত পা ক্লান্তিতে ভেঙ্গে আসছে যেন। কিন্তু চুল একবার আঁচড়ে না নিলে সকালে বড় জট বেঁধে থাকে। ইশ! কতদিন একটানা শান্তিতে ঘুমোনো হয়নি! রাতে কতবার যে ঘুম ভাঙ্গে! কখনও উৎকণ্ঠায়, কখনও জন্মেজয়ের প্রয়োজনে। ওদিকে আবার খুব সকালে না উঠলে অফিসে যাবার আগে সবকিছু গুছিয়ে তোলা যায় না। একটা দিন, শুধু একটা দিন যদি নির্ভেজাল একটা ছুটি মিলত! সেই যখন ওরা ছুটিতে বেড়াতে যেত! জন্মেজয়ের কার্পণ্য ছিল না, ভালো হোটেল নিত সে সবসময়। আয়েশ করে একটু বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে উঠে হোটেলের সাজানো খাবার থেকে আলতো হাতে খাবার তুলে নেওয়া, উষ্ণ কফিতে চুমুক… পেয়ালার ওপারে জন্মেজয়ের দিকে চেয়ে এক টুকরো তৃপ্তির হাসি… ছেলেমেয়েদের কলকাকলি… জীবনের তুচ্ছ তুচ্ছ সুখগুলো। গলার কাছে ঠেলে আসা কান্নাটুকুকে সে জোর করে গিলে নেয়। জন্মেজয় ইদানিং বড় খিটখিটে হয়ে গেছে। সুতপাকে কাঁদতে দেখলেও সে বিরক্ত হয় আবার কখনও ভুল করে একটু হাসলেও সরু চোখে তাকায়। অথচ মানুষটা মোটেই এমন ছিল না। হঠাৎই পেছন থেকে জন্মেজয়ের গলা ভেসে আসে, “তুমি অনেকটা শুকিয়ে গেছ, তাতে তোমাকে আরও সুন্দর লাগছে।” সুতপা মুখ ফিরিয়ে তাকায়। পুরোনো মানুষটাকে পড়ে নেবার, খুঁজে পাবার চেষ্টা করে। সেই অষ্টাদশের কোঠায় এই মানুষটির সাথে তার প্রথম দৃষ্টিবিনিময়। সেই থেকে আর কারও দিকে তাকানোর প্রয়োজনই বোধ করেনি সে। জন্মেজয় তার জীবনের প্রথম এবং একমাত্র প্রেম। অন্যসব রঙ্গমঞ্চচারীরা সাড়া না পেয়ে নীরবে সরে গেছে একে একে। ভয়ে ভয়ে সুতপা একটু হাসল। চোখ তখনও ভেজা। জন্মেজয় চোখে চোখ রেখে বলল, “সেজন্যেই বুঝি আমার সাথে এখন আর ছবি তুলতে চাও না? আমার এই হতকুৎসিত চেহারার পাশে তোমাকে বুঝি আর মানায় না, না?” তারপর দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। সুতপা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর গিয়ে পাশে বসে জন্মেজয়ের গায়ে হাত রাখল। কী বলবে বুঝে উঠতে পারার আগেই জন্মেজয় বলে উঠল, “আর বেশি দিন না। এর পর আবার একজন হ্যান্ডসাম কারও সাথে ছবি তুলতে পারবে। তোমার তো অ্যাডমায়ারারের অভাব নেই!” সুতপার মনে হলো সে যেন প্রাইমারি স্কুলের ডেস্কে দাঁড়িয়ে আর তার পিঠে শপাং করে বেতের বাড়িটা পড়ল! ঠিক ছোটবেলার মতোই ঠোঁট চেপে কান্নাটা গিলে নিল। ধরা গলায় বলল, “কেন এভাবে ভাবছ? তুমি কী আমাকে চেন না?” হঠাৎ করেই জন্মেজয় ঘুরে তাকাল। জ্বলন্ত চোখে বলল, “খুব চিনি। তোমাদের সব্বাইকে চেনা হয়ে গেছে আমার। সবাই হাঁ করে আমার মরার জন্য বসে আছ। তাহলেই তোমাদের ফুরফুরে জীবন ফিরে আসবে আবার। তোমার মেয়ে ড্যান্স ক্লাসে যাবে, ছেলে বন্ধুদের সাথে ফুর্তি করবে, তুমি সেজেগুজে এলো চুলে ছবি তুলে ফেসবুকে দেবে! আমার জন্যই তো তোমাদের মিথ্যামিথ্যি দুঃখ দুঃখ মুখ করে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে!” এতক্ষণে জন্মেজয়ের গলা চড়তে চড়তে চিৎকারের পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাই শুনে জিত আর সূচী দুজনেই ছুটে এসেছে কী হল দেখতে। ক্ষোভে, দুঃখে সুতপার মুখটা নিচু হয়ে যায়, ছেলেমেয়ের সামনে কোন প্রত্যুত্তর মুখে যোগায় না।
জিত এবং সূচী:
জন্মেজয়ের রাগ এবার মেয়ের উপর গিয়ে পড়ে। “কী রে! খুব ঝামেলায় আছিস না? বান্ধবীদের সাথে হৈ হল্লা বন্ধ, বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঘোরাঘুরি বন্ধ, বাপি মরলেই বাঁচিস!” সূচী কান্না চাপতে চাপতে ঘর থেকে একছুটে বেরিয়ে গেল। সুতপা ভাবল ছেলেটাও বোনের পিছুপিছু বেরিয়ে যাবে কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে জিত এসে মায়ের পিঠে হাত রেখে দাঁড়াল। জন্মেজয়ের ছেলে জন্মেজয়ের মতোই লম্বা, সুতপাকে মাথায় ছাড়িয়ে গেছে সে কবেই! বাবার চোখে চেয়ে বলল, “বাপি, কেন এসব ভেবে নিজেও কষ্ট পাচ্ছ, বাকি সবাইকেও কষ্ট দিচ্ছ? আমরা কি কেউ চেয়েছি তুমি অসুস্থ হও? জীবন তো আসলে কারও জন্য থেমে থাকে না, তাই না বাপি? মনে পড়ে ঠাম্মির অসুখের কথা? মাকে রাতদিন ঠাম্মির দেখাশোনা করতে হতো বলে তুমি কিন্তু বিরক্তই হতে। তুমি চাইতে আমাদের সবাইকে নিয়ে ঘুরতে যেতে, কিন্তু ঠাম্মিকে ফেলে যেতে পারতে না। ঠিক না বলো? সূচী তখন অনেক ছোটো, ওর হয়তো মনে নেই। আমার কিন্তু মনে আছে বাপি। এখন আমরা সবাই তোমার পাশে থাকছি, তবে হ্যাঁ, আমাদেরও হয়তো কখনও কখনও একটু হালকা হতে ইচ্ছে করে, বন্ধুদের সাথে সময় কাটাতে ইচ্ছে করে। সেটা কি দোষ বলো?” একটু থেমে আবার বলল, “আমাদের চারজনার যেটুকু সময় বাকি আছে সেটুকু সময় কি আমরা আর একটু ভালভাবে কাটাতে পারি না? তুমি জানো, তোমাকে আমরা অনেক ভালবাসি বাপি!” বলতে বলতে জিতের গলাটা ভেঙ্গে আসে। মায়ের পিঠে আলতো একটু চাপ দিয়ে সে ঘর ছেড়ে চলে গেল।
সুতপা জলভরা চোখ তুলে জন্মেজয়ের দিকে তাকাল। মনে হলো অনেকদিন পর পুরোনো জন্মেজয় ফিরে আসছে। কাছে গিয়ে কাঁধে মাথা রাখল পুরোনো দিনের মতো। অনেকক্ষণ পর জন্মেজয় বলল, “তপা, অনেকদিন বাড়িতে কোনো উৎসব হয় না। সামনে পয়লা বৈশাখ আসছে। চলো সবাইকে ডাকি। তুমি কিন্তু খুব সুন্দর করে সাজবে সেদিন। সবাই যেন হাসিমুখে আসে, ঠিক আগের মতো। আমি কারও করুণা সহ্য করতে পারি না, একদম না। সরি, তপা, তোমার সাথে, ছেলেমেয়েদের সাথে ইদানিং খুব খারাপ ব্যবহার করেছি। ওগুলো মনে রেখো না তপা, প্লিজ! শুধু আগের আমাকে মনে রেখো, আগের আমাকে…”।
আজ নতুন বছরের প্রথম দিন। ঘর ভরা মানুষ এসেছে জন্মেজয়ের আমন্ত্রণে। অসুস্থ শরীর নিয়েই জনে জনে সবাইকে ফোন করেছে জন্মেজয়। সূতপার পরনে লাল সাদা তাঁতের শাড়ি, লম্বা চুলের বেণীতে বেলী ফুলের মালা। জিত আর সূচীর বন্ধুরাও এসেছে বৈশাখী সাজে, তারুণ্যে ঝলমল। সাদা চিকনের কাজ করা পাঞ্জাবিতে জন্মেজয়কেও আজ ভালই লাগছে দেখতে। সবাই বলল, “বাহ, এই তো বেশ সুস্থ হয়ে উঠছ!” তরুণ তরুণীর দল ঝুপঝুপ প্রণাম করে বলল, “ইশ! কাকু, তোমাকে আর কাকিমাকে দেখতে কি যে ভালো লাগছে!” ওদের আগে সূচী আর জিতও এসেছিল প্রণাম করতে। ছেলেমেয়েকে অনেকক্ষণ বুকে জড়িয়ে রেখেছিল জন্মেজয়, কোনো কথা বলেনি। কখনও কখনও ভাষা বাহুল্য মাত্র। আগের রাতে সূতপার সাথে একান্ত চুম্বনটিও ছিল অনেক না বলা কথায় ভরা।
জন্মেজয়ের স্কুলশিক্ষক বাবা বলতেন, ছাত্র, পুত্র এবং মিত্র, এই তিনজনের কাছে হারায় লজ্জা নেই, বরং আছে গৌরব। ছেলের কাছে হেরে গিয়ে মৃত্যুর তিনদিন আগে জিতে গিয়েছিল আজীবন জিতে আসা জন্মেজয়।
লেখক:
মৌসুমী দাশগুপ্তা
কবি ও গদ্যকার; চট্টগ্রাম, প্রবাসী বাংলাদেশ