। পল্লল ভট্টাচার্য ।
খনা বলেছিলেন, “…ধন্য রাজার পুণ্য দেশ।” যদি অঘ্রাণে বর্ষায়, রাজা যায় ভিক্ষায়! গেল মাঘে বর্ষণ হয়নি; দেশও হয়তো তাই ধন্য হোল না। যে দেশে আঠারো মাসে বছর হয় সে দেশে পুণ্য ‘দূর-অস্ত’-ই রয়, ভিক্ষের থালাও বড়ো হতে থাকে।
বলেছিলেন, “মাঠে গিয়ে আগে করো দিক নিরুপণ/পূর্বদিক হতে হল করহ চালন।” তা না করে দেশ গেলো পশ্চিমের মাঠে। ফসল যা ফললো তা অন্য কেউ গিললো। খনার কথা কেউ শুনলো না।
কে এই খনা, কেন শুনবো তাঁর কথা? তাঁকে আমি প্রকৃতি বিশারদ বাঙালি বলেই জানি; ভাষা তাঁর বাংলা; তাই শোনা। বাংলার প্রকৃতি বাঙালি ছাড়া ভালো আর কে চিনবে!
বলেছিলেন তিনি এও, “শোন ওরে চাষীর বেটা, মাটির মধ্যে বেলে যেটা…” তার বুকেই “বুনিস পটল”। পটল বোনা হোল বটে কিন্তু তার কারণে এতো এতো মানুষ যে পটল তুললো! ধর্ষণ ও কর্তনের পন্থায় এই পটল তোলানো এখনো চলছে যেন!
“বামুন বাদল বান, দক্ষিণা পেলেই যান।” খনার বচনে এই দক্ষিণা ছিল ‘হাওয়া’; এখনকার বচনে তা হয়েছে কড়ি; হাতে পড়লে যেমন ইচ্ছে তেমন কান্ড করি।
ডান-বামের কাজিয়ায় খনার পক্ষপাত দেখি ডানে; বামে যা কিছু ঘটে তার প্রায় সবই অশুভ! যেমন “বাঁ হাত কাঁপলে বিরোধ, ডান হাত কাঁপলে শক্তি বৃদ্ধি”!
যে বছরটা হারিয়ে গেল, দেশে তাতে তেমনটাই দেখা গেলো। আগামী বছরগুলোও যদি এমন যায়? “আদর কর বাঁদরকে/বাঁদর যদি কামড়ায় তো/করবে তোমায় আদর কে” (অন্নদাশঙ্কর)। ‘আদরে বহু দোষ, তাড়নে বহু গুণ’, এ ছিল চাণক্যের প্রাচীন ধুন। বলদ আমরাই, দোষ দিই কাকে!
দেশে কতো কতো বলদ, আগেও ছিলো, গেলো আঠারো মাসেও ছিলো, তাও চাষ সঠিক হোল না। খনা বলে রেখেছিলেন, “বলদ থাকতে করে না চাষ, তার দুঃখ বারোমাস”। কেউ ভেবে দেখলো না। দেশ দুঃখ বয়ে বেড়ালো। আগামীতেও যে এই দুঃখ কমবে তার নিশ্চয়তাও দেখি না।
ফাগুন বুকে আগুন ছড়ায়, প্রতি ফাল্গুনে আমরা দ্বিগুণ হই। তবু ফাল্গুনেই ঝরা পাতা পোড়াতে হয়, চৈত্রে মাটি ফেলতে হয়, তবেই “বাঁশ বলে শীঘ্র শীঘ্র উঠি” (খনা)। আসন্ন বৈশাখে কী বাঁশ উঠবে ভেবে জাগে শঙ্কা! ফুল ফুটবে বলছো? “আমি ভাবি পটকা!”
আমাদের বিশ্বাস কাউকে পিছু ডাকলে তার ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়ে। খনা কিন্তু বলছেন মা যদি পিছু ডাকে সে ডাক শোনা চাই। ছড়াতেও আছে তাই, “খোকন খোকন করে মায়…” (যোগীন্দ্রনাথ)। মাতৃভূমির এই ডাক শুনেই তো বাঙালি ‘অস্ত্র হাতে’ লড়তে শিখেছিল।
যুদ্ধের প্র-কৌশলী লাও ৎসু এবং চাণক্য, পরে মেকিয়াভেলি। “শত্রুর শত্রু আমার মিত্র” ওঁদের নীতির অংশ। প্রয়োজনে ছড়াও সন্ত্রাস; এও ওঁদের মতি। যুদ্ধবাজরা এখনো এই মতির অনুসারী।
চাণক্যের আরো আছে শিক্ষা যার সূত্র ছয়টি প্রাণী; এদের আমরা সিংহ, বক, কুকুর, গাধা, কাক এবং মোরগ নামে চিনি। এদের গুণ– উদ্যম, একাগ্রতা, প্রভুভক্তি, স্বল্পে খুশি, সজাগ দৃষ্টি এবং ভোরে ভোরে নিজে জাগা ও অন্যদেরও জাগানো (‘গাধা, কুকুর, মোরগের কাছ থেকেও শেখার আছে’, আনিসুল হক; সম্পাদকীয়, ‘কিশোর আলো’; আগস্ট ২০২৩)।
প্রাণীদের কাছে থেকে অনেক কিছু শেখার আছে বৈকি, কিন্তু নিজ স্ত্রীজাতিকে রক্ষার শিক্ষাটা মানুষ মোরগদের কাছ থেকে শেখেনি এখনো। অন্যদের জাগানোর পন্থাটাও রপ্ত করতে পারেনি।
পিঁপড়েদের সংগঠিত জীবনযাপন এবং আসা-যাওয়ার পথে মন দেয়া-নেয়া “তুমি দেখেছ কি?” আর “শুনেছো কি মানুষের কান্না?… নীল আকাশের নীচে এই পৃথিবী/আর পৃথিবীর পরে ঐ নীল আকাশ,/তুমি দেখেছ কি?” (গৌরীপ্রসন্ন)
আমাদের রাজাধিরাজরা এসব দেখতে নারাজ; ওঁরা “চকিতে ঘটিয়ে” দেন “ভোলবাজি ভেল্কি”। “খিলারির খেলার ঘুঁটি” কে যে ‘পাকান’ কে যে ‘কাঁচান’ (অন্নদাশঙ্কর), কার সাধ্য সাধারণকে বোঝান।
গেলেন যে ‘আঠারো-মাসী’ রাজা অঙ্গীকার ছিল তাঁর বৃষ্টি নামাবার। অন্য অঙ্গীকার ‘সংস্কার’। “বোলতা, ভিমরুল এবং মৌমাছিদের সঙ্গে” সন্ধিচুক্তি হয়েছিল “কাঠপিঁপড়ে, ডেয়োপিঁপড়ে এবং লালপিঁপড়েদের”। এই চুক্তিতে ‘কালোপিঁপড়েদের’ জায়গা হয়নি। ওরা তাই বলেছিল, “আমাদের কিছুই বলার নেই।/আমরা কাউকে কামড়াই না/শুধু সুড়সুড়ি দিই” (‘আণবিক সুড়সুড়ি’, তারাপদ রায়)।
প্রমথ চৌধুরীর মত, সংস্কারের ভার মানুষের হাতে নয় “… সময়ের হাতে, অন্ধ প্রকৃতির হাতে” (‘বীরবলের হালখাতা’)। সুড়সুড়িতে কাজ হয় না বলে নিরুপায় মানুষ সময়ের হাতেই তার ভাগ্য তুলে দেয়।
ভাগ্য, দূর্ভাগ্য এসব মগজ গোলাবার বচন; গানও শুনি তেমন– “ভাগ্যের পথটা যে বক্র/নাম তার ভাগ্যচক্র” (সতীনাথ, উৎপলা)। এই চক্রে বিশ্বাস রাখলে জীবনচক্র অনিশ্চিতই থাকে।
মৃত্যুর আগে আগে নাকি খনা লিখেছিলেন, “আলো হাওয়া বেঁধো না, রোগ ভোগে মরো না” (উইকিপিডিয়া)। পড়ি তাই, “আর অন্ধকার নয়, আর নয় অবাঞ্ছিত ছায়া…” (বিনয় মজুমদার)। আর যেন না হয় আঠারো মাসে বছর গোনা।
(৫ মার্চ, ২০২৬)
লেখক:
পল্লল ভট্টাচার্য
সাংবাদিক, গদ্যলেখক, প্রাবন্ধিক; কলকাতা