যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে । ফারদিন ফেরদৌস

Comments
করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে এইসময় চায়নাকে শাপশাপান্তের অন্ত নাই। মানুষের বিপদে যেখানে মন ও মননে সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও মঙ্গলচিন্তা কাজ করবার কথা, সেখানে আমরা চীনাদের খাদ্যাভ্যাসের কারণে খোদার গজবকে যৌক্তিক পরিণতি মানছি।
কী ভয়াবহ বিকৃতিতে আক্রান্ত আমরা। গোঁড়ামিতে আড়ষ্ট আমাদের নষ্ট মগজ আর মৌলবাদদুষ্ট পঁচে যাও হৃদয়! মানসিকতার এমন ভয়াল অধঃপতন নিয়ে সভ্য বিশ্বসমাজে আমরা মুখ দেখাই কী করে?
মডারেট বাঙালি মুসলিম যারা ‘ধর্মেও আছে আবার জিরাফেও’ আছে তাদের প্রতিক্রিয়া মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এরা নিজেদের ছাড়া পৃথিবীর আর কাউকে মনুষ্য শ্রেণীভুক্ত মনেই করে না। চায়নাতে গজব নেমেছে এতে তারা খুশি। সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছে চায়নার প্রতি বিষোদগারে। চায়নার একদের্শী রাজনীতি ও পুঁজিবাদের ভয়াল থাবা সেটা আলোচনার ভিন্ন প্রেক্ষাপট। এই মুহুর্ত পর্যন্ত চায়না আমাদের উন্নয়নের বড় অংশীদার। চায়নার সাথে আমাদের ব্যবসায়ীদের লাখো কোটি টাকার বাণিজ্যিক বন্ধন রয়েছে। এমন বাস্তবতায় চায়না মরে গেলে নামকাওয়াস্তে মুমিন বাঙালি তুমি কি পৃথিবী নামের গোলক ধাঁধায় নিজেরে টিকায়ে রাখতে পারবা?
প্রথম আলোর সিনিয়র সাংবাদিক শুভংকর কর্মকার নিজেদের পত্রিকার প্রথম পাতায় ‘করোনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দেশের উদ্যোক্তারা’ শিরোনামে আজকে সংবাদ পরিবেশন করেছেন। চীনে ব্যাপকভাবে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় দেশটির অধিকাংশ কারখানা ও অফিস বন্ধ। তাদের পণ্য সরবরাহব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে। চীন থেকে আমদানি করা কাঁচামাল সময়মতো না পাওয়ার জেরে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যেও মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। চীনে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তৈরি পোশাক, চামড়া ও পাটজাত দ্রব্য শিল্প বিরাট ঝুঁকির সম্মুখীন। পোশাক শিল্পের ৬০-৬৫ ভাগ ওভেন কাপড় চায়না থেকে আমদানি করা হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চীন থেকে ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়েছে। চায়নার ওপর বাংলাদেশের শিল্প নির্ভরতা এই হিসেব থেকেই সহজে অনুমেয়। এসব কারখানায় বাংলাদেশের লাখো শ্রমিক কাজ করেন, শত শত শিল্পপতি ব্যবসা-বাণিজ্য করেন, সরকারকে ট্যাক্স পে করেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি সচল থাকে।
এমন বাস্তবতায় সামান্য বোধবুদ্ধিও যাদের ঘটে অবশিষ্ট আছে তারা কি চায়নার মানবিক বিপর্যয়ে উল্লাস করতে পারে? মগজে যদি মনুষ্যত্ব বোধের ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট থাকে তার তো উচিৎ আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করা যে, ‘প্রভু তুমি পৃথিবীর সকল বিপদ কাটিয়ে দাও’।
জানি কম্যুনিস্ট চায়নার জন্য ভেকধারী মুমিনের প্রার্থনার দ্বার খুলবে না। এরা ইউরোপীয় ভাবধারায় জিন্স-জ্যাকেট পরে বিরাট কোহলি স্টাইলের দাঁড়ি রেখে মুসলমান হওয়ার ভাণ ধরবে। ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইউটিউব, স্মার্টফোন ও মাইকের শব্দদূষণে আসক্ত এরাই এই সকল প্রযুক্তি প্রোভাইডার পশ্চিমা ইহুদি, খ্রিস্টান ও বৈধার্মিকদের দিনরাত গালিগালাজ করবে। এদের কাছে ধর্ষণ, ছেলে শিশু বলাৎকার, ঘুষ, দুর্নীতি, বিদ্বেষ, ঘৃণা, চাপাবাজি, ওয়াজের নামে ট্যাক্স ফাঁকিবাজ আজহারীদের কোটি টাকার ধর্মীয় বাণিজ্য কোনো পাপাচার না। যত পাপ শুধু চায়নিজদের। এজন্যই নাকি তাদের ওপর করোনার গজব। করোনার গজব যে বঙ্গালমুলুককেও ধসিয়ে দিতে পারে সেই হিসাব কি রাখো হে মুসলমান? ধর্ম আর জিরাফে আর কতকাল একসাথে থাকবা বাহে?
‘ধর্মেও আছো জিরাফেও আছো’ ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত ভারতীয় বাঙালি কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অমর কাব্যগ্রন্থ। অন্যদিকে ধর্মাচার ও জিরাফনামা নিয়ে একটি সত্য গল্পও আছে।
সেকালে জয়পুরের মহারাজ একবার জাহাজে করে আফ্রিকা থেকে একটি জিরাফ আনান তার চিড়িয়াখানার জন্য। এইরকম অদ্ভুত দর্শন বিশাল আকৃতির জীবের নাম জয়পুর কেন আশেপাশের কেউ কখনও শোনেনি, দেখা তো দূরের কথা। জয়পুর এবং আশপাশ থেকে দলে দলে সেই চিড়িয়াখানায় ভিড় জমাতে শুরু করলো অদ্ভুত দর্শন সেই জন্তু দেখতে। আশেপাশের দেশীয় রাজারা ঈর্ষান্বিত হয়েই কিছু ধর্মীয় গোঁড়া পন্ডিত বা মৌলবাদীর মাধ্যমে রটিয়ে দিল যে, এই রকম অদ্ভুত দর্শন জন্তুর উল্লেখ হিন্দু , মুসলমান বা ঈশাই ধর্মগ্রন্থে কোথাও নেই। তাই এই জন্তুটি ঈশ্বরের সৃষ্টি না, অতি অবশ্যই শয়তানের সৃষ্টি। একে দেখাও পাপ। জিরাফ দেখলে তাকে নরকে বা দোজখে যেতে হবে। এই ফতোয়াতে দর্শনার্থী প্রথম চোটে অনেকটা কমে গেলেও আস্তে আস্তে আবার দু’এক জন করে আসতে লাগল। মানুষের কৌতূহলের জোর ধর্মীয় ফতোয়ার জোরের থেকেও বেশি শক্তিশালী।
তখন জয়পুরের মহারাজ একটু চালাকি করে রাতের দিকেও অনেকক্ষণ চিড়িয়াখানা খোলা রাখার ব‍্যবস্থা করলেন। ক্রমশ দেখা গেল যেসব পন্ডিত বা মোল্লা দিনের বেলায় জিরাফবিরোধী ফতোয়ার কথা মন্দিরে-মসজিদে ভক্তদের বোঝায় তারাই আবার অন্ধকার হলে চুপিচুপি সপরিবারে জিরাফ দেখতে চিড়িয়াখানায় যায়। এসব ভন্ড মৌলবাদীদের‌ই জয়পুরের লোকেরা বলত এই ব‍্যাটারা দিনের বেলায় ধর্মে আছে রাতের বেলায় জিরাফে। ফতোয়া একসময় ওঠে যেতে বাধ্য হলো। প্রবাদ বাক্যটা এখনকার বাঙালির জন্য হৃদয়ে লেখা রয়ে গেল।
ধর্মে দ্বিচারিতার স্থান থাকতে পারে না। মিথ্যাচার ও অসাধুতা কোনো ধর্ম না। তোমা কর্তৃক অন্যের অনিষ্ট চিন্তা প্রকারন্তরে তোমারই ললাট লিখন। কবিগুরু রবিঠাকুরের ‘গীতাঞ্জলি’র ১০৮ নাম্বার ভার্সটা তাই অমোঘ সত্য-
যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে
পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।
অজ্ঞানের অন্ধকারে
আড়ালে ঢাকিছ যারে
তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান।
অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।
সবশেষে যথারীতি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কুরআনের দু’টি মহিমান্বিত ভার্স-
∆  ‘হে ঈমানদারগণ! এক কওম যেন অন্য কওমকে বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। আর নারীরাও যেন অন্য নারীদের বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারাই এদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অপরকে বিদ্রূপ করো না এবং পরস্পরকে খারাপ নামে ডেকো না।’ সূরা হুজরাত, ১১ নাম্বার আয়াত।
∆  ‘সৎ কাজ ও অসৎ কাজ সমান নয়। তুমি অসৎ কাজকে সেই নেকি দ্বারা নিবৃত্ত করো যা সবচেয়ে ভালো। তাহলে দেখবে যার সঙ্গে তোমার শত্রুতা ছিল সে অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গেছে।’ সূরা ফুসসিলাত, ৩৪ নাম্বার আয়াত।
০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২০

লেখক:
Fardin Ferdous
ফারদিন ফেরদৌস, সংবাদকর্মী, মাছরাঙা টেলিভিশন

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত ও বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.