‘যুক্তিবাদী বেয়াদব’ অর্ঘ্য বিশ্বাস, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও স্বদেশ । ফরিদ আহমেদ

Comments

ফাতেমা তুজ জিনিয়া নামের একজন ছাত্রীর সাথে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর খোন্দকার নাসির উদ্দিনের একটা অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে। সেই ক্লিপে শোনা যায় ভাইস-চ্যান্সেলর মহোদয় অকথ্য ভাষায় তাঁকে গালিগালাজ করছেন, অপমান করছেন। তাকে বেয়াদবসহ নানাবিধ অশালীন গালমন্দে ভূষিত করছেন। এমনকি তার বাবাকে নিয়েও অসৌজন্যমূলক মন্তব্য করেছেন।

এই ক্লিপটা সবার জন্য শক হিসাবে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভাইস-চ্যান্সেলর দীর্ঘ শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে আসেন। একজন শিক্ষকের মুখে রাস্তার মাস্তানদের মতো ভাষা বা আচরণ, এর কোনোটাই আমাদের সমাজে এখন পর্যন্ত গ্রহণ করার মতো মানসিকতা তৈরি হয়নি। সে কারণে এই ঘটনা তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে দেশে এবং বিদেশে।

ভাইস-চ্যান্সেলর মহোদয় জিনিয়াকে শুধু গালমন্দ এবং অপমান করেই ক্ষান্ত হননি, তাঁর প্রশাসন জিনিয়াকে তাঁর ফোনের আইডি হ্যাক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ওয়েবসাইট হ্যাক করার পরিকল্পনাসহ নানাবিধ গুরুতর অভিযোগে বহিষ্কারও করে। এর প্রতিবাদে জিনিয়ার সহপাঠীরা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলনে নেমে পড়ে। জাতীয় গণমাধ্যমগুলোও নড়েচড়ে বসে। একাত্তর টিভিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে লাইভে আনা হয়। জিনিয়ার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা এবং যে পদ্ধতিতে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে সেটা কতোটুকু স্বচ্ছ, সে বিষয়ে কোনো সদুত্তরই তিনি দিতে পারেননি। ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে তাকে বহিষ্কারের মতো বড় ধরনের শাস্তি তারা দিতে চেয়েছিলো, সেরকমটাই মনে হয়েছে।

জিনিয়ার ভাগ্য কিছুটা ভালো। তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করায় এবং এ বিষয়টা জাতীয় মনোযোগের বিষয় হবার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পিছু হটতে বাধ্য হয়। জিনিয়া ক্ষমা চেয়েছে এই তথ্য দিয়ে তার বহিষ্কারাদেশ তুলে নিয়েছেন তাঁরা। জিনিয়ার ভাগ্য ‘কিছুটা ভালো’ বললাম এ কারণে যে বেকায়দায় পড়ে প্রশাসন তার শাস্তি তুলে নিয়েছে আপাতত। ভবিষ্যতে এই প্রতিহিংসাপরায়ণ প্রশাসন যে তার আরো বড় ক্ষতি করবে না, সে নিশ্চয়তা কে দেবে? প্রশাসনের মতো এক সর্বগ্রাসী দৈত্যের শক্তির তুলনায় এই বাচ্চা মেয়েটার একক শক্তি যে নগণ্য। এর জীবন ভবিষ্যতে দুর্বিসহ করে দেবার ক্ষমতা তাদের আছে।

জিনিয়ার ভাগ্য ‘কিছুটা ভালো’ হলেও, অর্ঘ্য বিশ্বাস নামের এক সদ্য তরুণের ভাগ্যটা এমন ভালো ছিলো না। তাকেও জিনিয়ার মতো বেয়াদব আখ্যা দিয়েছিলো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন। সেই বেয়াদবির তকমা মাথায় নিয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছিলো সে। আসুন, করুণ পরিণতির শিকার হওয়া অর্ঘ্য বিশ্বাস নামের এক তরুণের গল্প শুনি আজ।

এখন থেকে দুই বছর আগের ঘটনা এটা। অর্ঘ্য বিশ্বাস কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলো। ক্লাসে উপস্থিতির হার কম হওয়ায় তাকে দ্বিতীয় সেমিস্টারের চুড়ান্ত পরীক্ষায় বসার অনুমতি দেওয়া হয়নি। স্বাভাবিকভাবে শিক্ষকদের কাছে যায় সে। ক্লাসে কেনো অনুপস্থিত ছিলো তার ব্যাখ্যা দেয়। সেই ব্যাখ্যা তাঁরাতো গ্রহণ করেইনি বরং তাকে যুক্তিবাদী বেয়াদব তিরস্কার করা হয়।

Arghya Biswas

অর্ঘ্য বিশ্বাস

অর্ঘ্যর এই পরিস্থিতিতে তার বাবা আসে বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার বাবার সামনে তাঁকে ভাইস-চ্যান্সেলরের কাছে ক্ষমা চাইতে বলা হয়। অর্ঘ্য ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানায়। তার আর পরীক্ষা দেওয়া হয় না। পুরো শিক্ষাজীবন পড়ে যায় অনিশ্চয়তার মধ্যে।

এই তিরস্কার, অপমান এবং পরীক্ষা না দিতে পারার হতাশায় ভেঙে পড়ে অর্ঘ্য। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসের ১৪ তারিখে ছয়তলার ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করে সে। আত্মহত্যা করার আগে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস লিখে রেখে যায় অর্ঘ্য। তার আত্মহত্যা যে বিশ্ববিদ্যালয়সৃষ্ট সমস্যা থেকে এসেছে, এটা সে পরিষ্কার ব্যাখ্যা করে যায়। অর্ঘ্য তার স্ট্যাটাসে লিখেছিলো,

“তোমার মেরুদণ্ডহীন সিস্টেমের কাছে শেষপর্যন্ত হার মানলাম। বোকার মতো শিরদাঁড়াটা সোজা রেখে জীবনটা পার করার যে-জেদ ছিল সেটা তোমার মেরুদণ্ডহীনতার তন্ত্রে হার মেনে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি থেকে এবং সিজিপিএ’র জন্য পড়াশোনা করে মেধাবী তকমা পাওয়া কিংবা দুর্ঘটনায় বা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর পর মিডিয়ার প্রচারের স্বার্থে মেধাবী খেতাব নেওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না। শুধু শুধু গাধার মতো কোনো ইস্যু পেলে চেঁচিয়ে বারবার তোমার মেরুদণ্ডহীনতা বোঝানো ছাড়া বোধ হয় আমি আর কিছু পারতাম না।

তোমার মেধাবী সূর্যসন্তানদের দেখে আমার বড়ো আফসোস হয়। দেখ, কীভাবে তারা তাদের মেধাগত যোগ্যতাবলে তোমার সিস্টেমের সাথে সুন্দরভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। তারা আমাদের কী বলে জানো? যুক্তিবাদী বেয়াদব। আমরা ডিপার্টমেন্ট-এর বদনাম করি, দল করে সুন্দর-সাজানো একটা ডিপার্টমেন্টকে নষ্ট করি। সিনিয়র ভাইদের সাথে ঘুরে ঘুরে স্যারদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করি।

কাল সারারাত অনেক ভাবলাম, বুঝলে। সত্যি বলতে কী, আমার এখন মনে হচ্ছে আমরা, এই ‘যুক্তিবাদী বেয়াদবেরা’ আসলেই তোমার ক্ষতি করছি। পদ্মা ব্রিজ হচ্ছে, দেশে কর্মসংস্থান বাড়ছে, আধুনিকায়ন হচ্ছে। সুশাসন এবং আইন ব্যবস্থায় গুম, হত্যা, সংখ্যালঘু নির্যাতন হচ্ছে, কোটি কোটি টাকা লোপাট হওয়ার পরও মন্ত্রী মহোদয় সেটা হাতের ময়লার মতো উড়িয়ে দেন। প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। দলীয় এবং নিয়োগবাণিজ্যের কল্যাণে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা বিশালসংখ্যক ডিপ্রেসড শিক্ষার্থী তৈরি করছেন। গর্ব করার জন্য বহির্বিশ্বে তোমার বংশদ্ভূত সন্তানেরা রয়েছেন, যারা নিজেদের উন্নতির স্বার্থে তোমাকে ত্যাগ করে অন্যদেশকে আপন করে নিয়েছে।

তোমার মেরুদণ্ডহীন বিদ্বান সূর্যসন্তানেরা তোমার এত উন্নতি করছে, সেখানে আমি তোমার কী উপকার করছি বল? তোমার টাকায় পড়ে, খেয়ে তোমার সিস্টেমের বিরোধিতা করছি, তোমার সাথে বেইমানি করছি। দেখে নিও, আর করব না। সেদিন ভিসি স্যার এবং চেয়ারম্যান স্যারের কাছে মাফ চাইনি। আজ তোমার কাছে মাফ চাইছি। তোমার আর কোন ক্ষতি করব না। আর তোমার বিরোধিতা করব না। সোজা হওয়া এই মেরুদণ্ড ভেঙে নোয়াতে পারব না। সেটা আমার দ্বারা হবে না। সেজন্য অন্য পথটা বেছে নিলাম।”

একটা তরুণ ছেলে পৃথিবীতে পদচারণা করে অমিত সম্ভাবনা নিয়ে। বয়স স্বল্পতার কারণে, অনভিজ্ঞতার কারণে, তারা সেটা জানে না। আমরা যারা বয়ষ্ক, আমরা যারা তাদের শিক্ষক, আমরা যারা তাদের অভিভাবক, তারা জানি এই অমিত সম্ভাবনা আর সুন্দর সোনালি ভবিষ্যতের কথা। আমাদের তাই দায়িত্ব থাকে তাদের হাত ধরে সঠিক পথের নির্দেশনা দেওয়ার, আমাদের কর্তব্য থাকে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে অনিশ্চিত সময়টাকে তারা যাতে সুন্দরভাবে অতিক্রম করতে পারে সেটা নিশ্চিত করা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা ছেলে বা মেয়ে যখন আসে, সেটা খুবই ভালনারেবল একটা সময়। কৈশোর আর তারুণ্যের সীমারেখায় দাঁড়িয়ে থাকে তারা। এদের অধিকাংশ এই প্রথম পরিবারের নিশ্চিত অবস্থান থেকে অনিশ্চিত এই পৃথিবীতে পা রাখে। এ রকম একটা নাজুক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং শিক্ষকদের দায়িত্ব বেড়ে যায় হাজার গুণে। তাঁদের সামান্য একটু মমত্ববোধ, বিবেচনাবোধ এবং সহনশীলতা এই বাচ্চাগুলোকে বিশাল চ্যালেঞ্জ নেবার যে গুরুদায়িত্ব সেটাকে সহজ করে তুলতে পারে। এর বিপরীতটা হলে ধ্বংসের মুখে পড়ে যেতে পারে তাদের শিক্ষাজীবন এবং ব্যক্তিজীবনও। এর জ্বলন্ত প্রমাণ হচ্ছে অর্ঘ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের মমত্ববিহীন, ভালবাসাহীন নিষ্ঠুর আচরণ এবং কঠোর আইনের স্বীকার হয়েছিলো সে।

অর্ঘ্য তার স্ট্যাটাসে আরো লিখেছিলো, “ভয় পেয় না। ধর্মান্ধতায় অন্ধ, ক্ষমতাবলে ভীত, অর্থমোহে ঘুমন্ত এই বালির নিচে মাথা ঢুকিয়ে থাকা উটপাখিসদৃশ জাতি কোনোদিনও তোমার ভেঙে-পড়ে-থাকা মেরুদণ্ড সোজা করার চেষ্টা করে তোমাকে যন্ত্রণা দিবে না। আমার মতো যেসব ‘বেয়াদবেরা’ তোমার সিস্টেম বাগের কারণে ভুল করে জন্মেছে তারাও আস্তে আস্তে তোমার সিস্টেমের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে। আশা করি পৃথিবীতে তুমি তোমার উন্নতির ধারা বজায়ে রাখবে। ভাল থেক।”

অর্ঘ্যরা কি আসলে সিস্টেম বাগ, নাকি এই ভ্রান্ত সিস্টেমটাই আসলে সিস্টেম বাগ? অর্ঘ্য কিংবা জিনিয়ার মতো ‘বেয়াদব’-রা আমাদের কাম্য হওয়া উচিত। প্রশ্নহীন ভেড়ার পাল তৈরি করে আদব প্রতিষ্ঠা করা যাবে হয়তো সমাজে, কিন্তু, তাতে সমাজের কোনো উন্নতিই হবে না। বরং এই প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া, প্রতিনিয়ত বদ্ধ সিস্টেমের বিরুদ্ধে বারুদ ছুড়ে দেওয়া বেয়াদব প্রজন্মই পারে অচলায়তন ভেঙে রাঙা অরুণকে মুক্ত করে আনতে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা অচলায়তনের বিরুদ্ধে অবিরাম আন্দোলনে নেমেছে। অসুর বধ করে অতলান্ত এক আনন্দযজ্ঞ শুরু করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে তারা। শুভ কামনা রইলো মুক্তিপিয়াসী তরুণ-তরুণীদের জন্য।

লেখক:
Farid Ahmed
ফরিদ আহমেদ, প্রবাসী, প্রাক্তন শিক্ষক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.