। ফরিদ আহমদ দুলাল ।
১.
পাকার আগেই কালচে-সবুজ আমগুলো সিঁদুরে লাল হয়ে উঠেছে; আমের সিঁদুরে আভা-ই যেন বারবার ডেকেছে কিশোর বকুলকে ঘনিষ্ঠ হতে; গাছ ভরা অগণন আমের কাছে পৌঁছে যাওয়া মোটেই কঠিন ছিলো না, কারণ গাছটা পুকুর পাড়ে জলের ওপর এমনভাবে হেলে পড়া ছিলো, চাইলেই তরতর করে উঠে পড়া যায় হেঁটে হেঁটে।
আম পেড়ে ভর্তা করে খাবার খুবই ইচ্ছে হলো বকুলের, কিন্তু গেন্দু মুখ বিকৃত করে বললো, “আম পাইড়া কাইজ্জা কিননের কাম নাই!” গেন্দুর কথার অর্থ বুঝতে পারে না বকুল, গেন্দুর দিকে প্রশ্ন নিয়ে তাকায়। গেন্দু তখন কিছুটা সুর পাল্টে বলে, “বাপরে বাপ! যে চুক্কার চুক্কা! ঐ আম খাইলে মাথার উকুন নাইম্যা যায়! ঐ গাছে না উডাই বালা!” ওদের কথার মাঝে আরও একজন যোগ হলো, “তর সমস্যা কী গেন্দু? অরা আমগর গেরামের মেমান, সব বাড়ির গাছই মেমানের লাইগ্যা; দুইডা আম খাইবার চাইছে, খাক না!” গেন্দু এবার যুক্তিবাদী হলো, “দুইডা আমের লাইগ্যা দুই বাড়ির মদ্যে কাইজ্জা বাজানির কুনু মানে আছে! তাও আবার ঐরম চুক্কা আম! গেরামের কুন গাছটায় এত আম আছে! লও যাই, তুমারে অন্য গাছেত্যে আম পাইড়া দেই?” বকুল প্রসঙ্গ পাল্টাতে চায়, “আম খাওয়ার দরকার নাই, চল যাই নতুন দীঘি খুদার কাম দেখি গা?” প্রসঙ্গটা পাল্টায় বটে, কিন্তু মন থেকে প্রশ্নটা সরে না বকুলের, “দু’টি আমের জন্য দুই বাড়িতে ঝগড়া বাঁধার কারণটা কী?”
কয়েকদিন আগেই বকুলরা সপরিবারে এসেছে এখানে। শহরের কাছাকাছি হলেও এখানে জীবন অন্যরকম। এ কয়েকদিনেই বিস্মৃত হয়েছে সবাই বিগত ক’দিনের সমস্ত উত্তেজনা আর উদ্বেগ; গ্রামের মুক্ত বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে, দল বেঁধে ছুটে যাচ্ছে শূন্য মাঠে, কখনো আম পেড়ে খাচ্ছে, কখনো কাঁঠালের মুছি পেড়ে তেঁতুল মিলিয়ে ভর্তা করে খাচ্ছে, কখনো মাছ ধরছে, কখনো সাঁতার কাটছে টলটলে জলের পুকুরে; আবার কখনো পাখির স্বপ্ননীড় রচনার কৌশল শিখে নিচ্ছে, অথবা শিখে নিচ্ছে বাঁশের সদ্য কেরুলকে মাটির কলসে বন্দি করে সব্জি তৈরির কলা। আর প্রতিদিন সন্ধ্যায় বহির্বাটির ঘরে নাটকের মহড়ায় মিলিত হওয়া। এক সপ্তাহ আগের জীবনপ্রবাহের সাথে উদ্বেগবিহীন এ জীবনের সামান্য মিলও নেই!
কিছু উত্তেজনা, কানাঘুষা, স্লোগান-মিছিল ছিলোই নির্বাচনের পর থেকে, কিন্তু মার্চে এসে পরিস্থিতি কেমন যেন থমথমে হয়ে উঠলো; বকুলের বয়স কম, পরিস্থিতির আদ্যোপান্ত না বুঝলেও উত্তেজনা বুঝতে পারে ঠিকই। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু যখন ঢাকার রেসকোর্সে ভাষণ দিলেন, তখন সে-ও সবার সাথে অপেক্ষায় ছিলো রেডিওর সামনে; কিন্তু ভাষণ সম্প্রচার করা হলো না! সন্ধ্যার সড়কে কী একটা গুমোট ভাব দেখা গেল; মানুষের মুখে মুখে বিচিত্র বার্তা শোনা গেল; পরদিন সকালে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে রেডিওতে প্রচারিত হলো বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। ভাষণের পর কারো কোন নির্দেশনা নয়, যার ঘরে যা ছিলো তাই নিয়ে শহরের মানুষ নেমে এলো পথে। শেখ মুজিব যেন হ্যামিলনের বংশীবাদক; তাঁর বাঁশির এক ফুঁয়ে সমস্ত বঙ্গজনপদ ফুঁসে উঠলো একসাথে! নিরস্ত্র মানুষ যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করলো মাঠে মাঠে; সবার মুখে একই কথা, বাঙালির স্বাধীনতা! শহরের মোড়ে মোড়ে, চায়ের দোকানে উত্তেজনা! কী হচ্ছে ঢাকায়? কিশোর চোখে বকুল উদ্বিগ্ন সময় দেখেছে; সহজেই জড়িয়ে গেছে যে-কোনো উত্তেজনায়। ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে ঢাকায় যখন নির্বিচারে গণহত্যা শুরু হলো, ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে শেখ মুজিব ঘোষণা করলেন স্বাধীনতা; বকুল তার বালক বুদ্ধিতে বুঝতে পারে না; সব খবর এত দ্রুত কীভাবে ছড়িয়ে যায়! বকুল বুঝতে পারে না, আনুষ্ঠানিক ঘোষণার কী প্রয়োজন? বঙ্গবন্ধু তো ৭ মার্চেই বলে দিয়েছেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম! এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম!” ২৬ মার্চ সকালে ঘুম থেকে জেগে দেখে বাসার সামনে বেশ বড় জটলা; জটলায় জড়িয়ে যেতে সময় লাগে না বকুলের। মাঠের নিঃসঙ্গ খেজুর গাছটি কাটা হয়ে গেল পলকে; শহরের প্রধান সড়কে দীর্ঘদিন মুখথুবড়ে পড়ে থাকা বিপন্ন ট্রাকের নষ্ট যন্ত্রপাতি আর সদ্য কাটা খেজুর গাছ দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি হলো। অভিনব এক ব্যারিকেড! ট্রাকের সাইলেন্সার পাইপটাকে এমনভাবে সংযুক্ত করা হলো, তাতে পিছনে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে দিলে সামনে উপর দিয়ে বকবক করে কালো ধোঁয়া বেরোয়; দূর থেকে দেখে বিপজ্জনকই মনে হয়। নিজেরা বানিয়ে নিজেরাই সৃষ্টির মহানন্দে বুক ফুলিয়ে হাঁটছিলো; ভাবখানা এমন, যেন দূর থেকে ঐ ব্যারিকেড দেখলেই পাকিস্তানি বাহিনী মূর্ছা যাবে! বালক বকুলের বুকে সেদিন যুদ্ধের উন্মাদনা। কিন্তু ব্যারিকেড নির্মাণের উত্তেজনা তার থেমে যায় একদিন পরেই। ২৭ মার্চ রাতে খাগডহর ইপিআর ক্যাম্পে শুরু হয়েছিলো বাঙালির প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ। যুদ্ধটা প্রথম শুরু হয়েছিলো বাঙালি আর অবাঙালি সৈনিকদের মধ্যে; ভোর থেকে যুদ্ধটা আর সৈনিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, ক্রমশ ছড়িয়ে যায় আশপাশের গ্রামে, অতঃপর ময়মনসিংহ শহরেও। বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধের একজন সামান্য সৈনিক হিসেবে সেদিন আরও এক নতুন উত্তেজনা যোগ হয়েছিলো বকুলের জীবনে। হতাহতদের হাসপাতালে নেবার জন্য ব্যারিকেড সরিয়ে সেখানে সেবা কার্যক্রম চালু করা হলো– ক্লান্ত সৈনিকদের ডাবের জল দেয়া; এভাবেই উত্তেজনাপূর্ণ মার্চ কেটে গেল বকুলের জীবনে।
২.
এপ্রিলে যোগ হলো উদ্বেগ। প্রতি রাতে ক্রমাগত গোলার শব্দ ভেসে আসা। সে শব্দ যে প্রতিদিন ক্রমান্বয়ে নিকটবর্তী হচ্ছে, তা-ও স্পষ্ট, শব্দের তীব্রতায়। শহরে বার্তা আসছে বিভিন্ন দিক থেকে; আর শোনা যাচ্ছে বাঙালির অসম সাহসিকতার খবর। বকুলরা ক’জন তখন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রেললাইন থেকে পাথর কুড়িয়ে এনে কোমরে বেঁধে ঘুরছে, হানাদার বাহিনী চলে এলে যখন মরতেই হবে, তখন অন্তত একটা পশুকে আঘাত করে যেন মরতে পারে! গোলার শব্দ যখন আরও তীব্র হলো, যখন খবর এলো রেলপথে মশাখালি আর সড়কপথে মধুপুরের বনে যুদ্ধ চলছে। এ সময় বকুলের বাবা শহর ছেড়ে সপরিবারে চলে এলেন শহরতলী দাপুনিয়ায়। এখানেও গোলার শব্দ আসে; কিন্তু শহরের দৈনন্দিন উত্তেজনা আর উদ্বেগ এখানে নেই। কয়েকদিনেই উত্তেজনা আর উদ্বেগের কথা ভুলে কিশোর বকুল গ্রামীণ প্রকৃতির সাথে মিশে যায়।
সেদিন সবাই যখন নাটকের মহড়ায় ব্যস্ত, কেউ কেউ অভিনয় করছে, বাকিরা দর্শক; বকুল এক ফাঁকে পুকুর পাড়ের সিঁদুরে আম গাছটাতে চড়ে বসে। আমের ডাল পুকুরের মাঝ বরাবর বিস্তৃত। গাছে চড়ে আম পাড়ে না বকুল, গাছে বসে পর্যবেক্ষণ করে চারপাশ। পূর্বপাড়ে বিশাল ফাঁকা দহলিজ, উত্তর পাশে মেঠোপথ চলে গেছে পাকা সড়কের দিকে, দক্ষিণ পাশে বকুলের সগনবাড়ির গোহালঘর, কলতলা আর কলাবাগ এবং পশ্চিমে খোন্দকার বাড়ির পারিবারিক কবরস্থান, বাঁশঝাড় আর কলারছুবা। হঠাৎ বকুলের দৃষ্টি পড়ে পশ্চিমের কলারছোপে; এক কলাগাছে হেলান দিয়ে, অন্য গাছে ডান পায়ে ভর দিয়ে ছিপ দিয়ে মাছ ধরছে ফুটফুটে এক ছোট্ট বালিকা। বড়শি ফেলছে আর তুলছে, টপাটপ তুলে আনছে পুঁটি মাছ। মাছ তুলছে আর পাশে রাখা কাঁসার ঘটিতে ভরছে। হঠাৎ বড়শি পানিতে রেখেই বালিকা দক্ষিণে আড়ার দিকে দৌড়ে গেল, বালিকার পায়ের নূপুর রুমঝুম করে বেজে উঠলো। নূপুরের শব্দ মৃদু ঝংকার হয়ে বকুলের কানে বেজে উঠলো। আম গাছে বসে বকুল বালিকার চলাচলে দৃষ্টি রাখছে; একটু পরেই বালিকা দুই হাতে দু’টি হাঁসের ডিম নিয়ে ফিরলো এবং পায়ের নূপুরে ধ্বনি তুলে খোন্দকার বাড়ির অন্দরের দিকে ছুটে গেল। পুকুর পাড়ে পড়ে রইলো তার ছিপ আর কাঁসার ঘটি।
পরদিন দুপুরে বকুল কাউকে কিছু না জানিয়ে আবার আম গাছে উঠে বসে রইলো, দৃষ্টি তার খোন্দকার বাড়ির দিকে। কয়েকটি রাজহাঁস বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে, পেছনে নূপুরে মৃদু গুঞ্জরণ তুলে বেরিয়ে এলো চন্দ্রাবতী বালিকা। বালিকার ছুটে বেড়ানো দেখে কিশোর বকুলের বুকে অজানা এক সুর বেজে উঠলো। অস্থির হয়ে ওঠে কিশোর বকুল। রাজহাঁসেরা পুকুরে নেমে গেলে, চন্দ্রাবতী পুনর্বার পায়ের নূপুরে সুর তুলে বাড়ির ভেতরে চলে যায়। মুখগহ্বরে ক্রমবিলীয়মান সুস্বাদু প্রিয় আহার্যটি নিঃশেষ হয়ে যাবার মুহূর্তে আনন্দ-বিষাদের যে মিশ্র অনুভূতি হয়, বালিকার চলে যাওয়াতে কিশোর বকুলের মনে তেমনি একটা অনুভূতি দোলা দিয়ে গেল। তৃপ্তির আনন্দ আর ফুরিয়ে যাবার বিষাদ!
নাটকের মহড়ায় প্রতিদিন দু’একজন শিল্পীর অনুপস্থিতি মহড়াকে অসম্ভব করে তুললো। বিভিন্নজনের কথায় বকুল বুঝতে পারে, যারা হারিয়ে যাচ্ছে, তারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চলে গেছে সবাই। বকুল গোপনে খোঁজ নিয়ে জানতে চেষ্টা করে, কীভাবে কোথায় যোগাযোগ করলে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া যায়; খোঁজ মেলে না।
গোলার শব্দ সেদিন এতোটাই প্রকট হয়ে উঠলো, মনে হলো যেন পাশের বাড়িতে কামানের গোলা পড়ছে। সেদিন রাতে খাওয়ার পর বাড়ির গুরুজনেরা বৈঠকে বসে সিদ্ধান্ত নিলো, আজই এখান থেকে সরে পড়তে হবে। এ গ্রাম নিরাপদ নয়; শহর থেকে আর মূল সড়ক থেকে এ বাড়ি এতো কাছে, যে কোন সময় আর্মি চলে আসবে এখানে; আজ ওরা শহরে ঢুকে পড়েছে! হয়তো আগামীকাল অথবা পরশুই চলে আসবে এদিকে। আর যখন এ শহর নিয়ন্ত্রণে নিতে ওদের প্রায় এক মাস লেগে গেছে, নিশ্চয়ই এ অঞ্চলের মানুষকে সে বিলম্বের খেসারত দিতে হবে! সেদিন রাতেই বাড়ি-ঘর ফাঁকা করে প্রায় সবাই বেরিয়ে পড়ে। রাতের অন্ধকারে একটা হারিকেন জ্বালিয়ে পায়ে হেঁটে বকুলদের পরিবার রওনা হয়ে যায় দাপুনিয়া থেকে ছ’মাইল পশ্চিমে খেরুয়াজানী গ্রামের দিকে; অন্ধকারে নিরালোক ছায়া হয়ে আরও অনেক মানুষ যাচ্ছে, কার গন্তব্য কোথায় কে জানে!
৩.
খেরুয়াজানিতে বকুলের বাবার মামাবাড়ি; আগে এ গ্রামের নাম ছিলো চন্দেরগাঁও, চন্দবাড়ির নামে নাম। এখনো গ্রামের সাধারণ মানুষ চন্দেরগাঁও নামই বলে, কিন্তু মুসলিম লীগ সমর্থকরা বলতে চায় না। যে কোন হিন্দু অনুষঙ্গে তাদের এলার্জি। সত্তরের নির্বাচনের পর মুসলিম লীগাররা চুপচাপ। বকুলের দাদা, মানে বাবার মামা এলাকার চেয়ারম্যান, প্রকাশ্যে না হলেও মনে মনে পাকিস্তানপন্থি, গ্রামে এ পরিবারেরও প্রভাব-প্রতিপত্তি কম নয়। এখানে এসে বকুলের জীবনচিত্র আবার বদলে গেল; এ বেলায় বাঁশের বেতি তুলে বাইর-বোচনা-খালই বানায় প্রায় সমবয়সী চাচার সাথে; ও বেলায় উড়াজাল বুনন শেখে আরেক চাচার কাছে; তো অন্য বেলায় পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরে; আর সারাক্ষণ বুকে তার চন্দ্রাবতীর নূপুর বেজে চলে। এখানে যুদ্ধের কোন বার্তা নেই। সন্ধ্যার পর বকুল পুকুর পাড়ে বাঁশের মাচায় শুয়ে চাঁদ দেখে; চাঁদের আলোয় ভিজে তখন চন্দ্রাবতী নেমে আসে, পাশে দাঁড়িয়ে খিলখিল হাসে। একদিন মেঘে ছেয়ে যায় আকাশ, চন্দ্রাবতী যেন কোথাও হারিয়ে যায়, তখন শেষ-বৈশাখে প্রবল বৃষ্টি নামে। পরদিন বকুল মাঠে যায়, ক্ষেতে ধানের জালা বোনে, পাট ক্ষেতে নিড়ানি দেয়। এতোসব কাজের ব্যস্ততা থাকে বকুলের হাতে, তার মধ্যেও চন্দ্রাবতী আসে পায়ের নূপুরে ঝংকার তুলে।
সেদিন সকালে বকুল একা বসে ছিলো পুকুর পাড়ের মাচায়। হন্তদন্ত হয়ে আসে আমান। আমান বকুলের ফুপাতো ভাই, ওদের পরিবার এখন জীবন বাঁচাতে শহর ছেড়ে কাতলাসেন আছে, নিজেদের গ্রামের বাড়িতে। সাইকেল চালিয়ে এসেছে আমান পাঁচ মাইল। অস্থির আমান কোন ভূমিকা না করেই বলে, “জরুরি কথা আছে!” আমানের চোখে অস্থিরতা দেখে বকুল বললো, “এতোটা পথ সাইকেল চালিয়ে এলি, আগে তো বিশ্রাম নে, পরে কথা হবে।” আমানের অস্থিরতা কাটে না, এবার সে জোর দিয়ে বলে, “বিশ্রামের খেতা পুড়ি! বিশ্রামের সময় অহন না! আমি জরুরি একটা খবর নিয়ে আইছি! তুই কি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চাস কি-না? আমি কাইল চইলা যামু যুদ্ধে! তুই যাইতে চাইলে ক!” বকুলের বুকে হঠাৎ ঝড় ওঠে। বুকের ভিতর বেজে ওঠে চন্দ্রাবতীর নূপুর, সে নূপুরে অন্যরকম উত্তেজনা। মুহূর্তে বকুলের চিন্তায় নাড়া দিয়ে যায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, “আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকেদের হত্যা করা হয়, তোমাদের ওপর আমার অনুরোধ রইলো, ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলো! মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো! এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ! এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম! এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম! জয় বাংলা!” বকুলের ভাবনার সুতো ছিঁড়ে দিয়ে কথা বলে আমান, “কী হইলো কথা কস না ক্যা! তুই যাইবি কি-না ক! আমার হাতে সময় নাই! বাড়িত কাউরে কিছু না জানাইয়া আইছি; কাইলও কাউরে কিছু না কইয়া ভাগতে অইবো।”
পরদিন প্রত্যুষে সবাই যখন নামাজখানায়, বকুল তার জাল বুননের ওস্তাদ রিয়াজুদ্দিন চাচার সাইকেলটা চুরি করে নিয়ে পালিয়ে গেল। কেউ জানতেও পারলো না বকুলের পালিয়ে যাবার কথা; সকালেই জানাজানি হয়ে গেল রিয়াজুদ্দিনের সাইকেল চুরি হয়ে গেছে ঘর থেকে।
পথে নামতেই বৃষ্টি এলো মুষলধারে। অগত্যা খেরুয়াজানি বাজারে আশ্রয় নিতে হলো বকুলকে। বৃষ্টিতে আটকা পড়েছে আরও ক’জন, তারা বাজারের মসজিদে নামাজ পড়ে ফিরছিলো। একা একাই বকুল বললো, “আষাঢ় মাইসা বৃষ্টি কখন যে থামে!” পাশ থেকে এক মুরুব্বি বলে উঠলেন, “না গো বাজান, সকালের ইষ্টি আর সকালের বিষ্টি বেশিক্ষণ থাকে না।” মুরুব্বির কথাই সত্যি হলো। বৃষ্টি থামলে আবার বকুলের যাত্রা শুরু হলো; নিজেকে কেমন যেন বীর-বীর মনে হচ্ছে তার। যুদ্ধযাত্রা তার। আমান অপেক্ষায়ই ছিলো কাতলাসেন-এ। ফুলবাড়িয়া যাবার এটাই পথ। ওরা দু’জন দুপুরের অনেক আগেই পৌঁছে গেল রাঙ্গামাটিয়া বনের কাছে। আমান বলেছিলো রাঙ্গামাটিয়ার জঙ্গলে মুক্তিযোদ্ধারা আছে, কিন্তু কোথায় মুক্তিযোদ্ধা! কী-ভাবে যোগাযোগ করতে হবে, কোন পথে যেতে হবে কিছুই ওরা বুঝতে পারে না। কাউকে কিছু প্রশ্ন করতেও সাহস হয় না। ছোট্ট একটা ছনের ঘর, চারদিক সুনসান, সপ্তাহে দু’দিন এখানে হাট বসে, সে দু’দিন সমাগম হয়, বাকি সময় শুধুই নীরবতা। দু’জন নিঃসঙ্গ ঘরের কাছেই গেল সঙ্গ পেতে। জানা গেল, ওটি একটা দোকান, বিড়ি-সিগারেট, মুড়ি-চিড়া-বাতাসা-কদমা, তেল-নুন-কুকিজ বিস্কুট আর কেরসিন তেল পাওয়া যায়। হাটের দিন অবশ্য বাড়তি অনেক কিছুই পাওয়া যায়। দোকানি এখন বিশ্রামে আছে, তাই বিকি-কিনি বন্ধ। খিদেও পেয়েছে খুব বকুলের, কিন্তু পকেটে পয়সাকড়ি নেই। বকুলের পকেটে দুইআনা, আমানের পকেট শূন্য। উত্তেজনায় খেয়াল করেনি, বকুল বুঝতে পারে ভুল হয়ে গেছে! কিছু টাকাকড়ি পকেটে নিয়েই পথে বেরুনো উচিত ছিলো। বোকার মতো দু’জন দাঁড়িয়ে আছে, এ সময় লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরা মুখভর্তি দাড়িগোঁফ লম্বা একজন মানুষ এসে দোকানের সামনে দাঁড়ালেন। উচ্চস্বরে ডাকলেন দোকানিকে, “কাদু মিয়া কি ঘুমাও না-কি?” কাদু মিয়া ধড়ফড় করে উঠে বসে। “কী কন মকবুল বাই! আপনে আইলে কি কুনু কতা অবার পায়? কী লাগবো হেইডা কইন?” মকবুল ভাই হেসে কথা বলেন, “বগুলা সিগারেট আছে তো?” কাদু মিয়া আকাশ থেকে পড়ে যেন, “এল্লা মকবুল বাই সিগ্রেটের বংশ নাই! কাইল গেছিলাম ফুলবাড়িয়া, অনুকাও পাইলাম না। কয়েক প্যাক রমনা পাইছি, তাই লইয়া আইলাম। রাজ্যের দাম! এক প্যাকের দাম পড়লো এক টেহা চাইরানা!” হাসেন মকবুল ভাই, “পাঁচানার সিগারেট পাঁচসিকা!” কাদু মিয়াও হাসে, “পাচসিকা ত আমার কিনা দাম ম্যেবাই! বেচন লাগে দেট্টেহা আর খুচরা বেচি তিনানা কইরা। আপনে কিনা দামই দেইন ম্যেবাই!” কথা বাড়ান না মকবুল ভাই, “কিনা দাম রাহনের কাম নাই, দেট্টেহাই রাহ ভাই!”
বকুল আর আমান দাঁড়িয়ে ছিলো এতক্ষণ; দু’জনেই চেনে মকবুল ভাইকে। মকবুল ভাই ছাত্র ইউনিয়নের নেতা, একই মহল্লায় থাকতেন। বকুলও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী। মকবুল ভাই বেরুতেই দু’জন তাঁর সামনে দাঁড়ালো। এবার মকবুল ভাই দু’জনকে দেখলেন, “আরে বকুল, আমান, তোমরা এখানে! কেন এসেছো, কোথায় এসেছো?” একমুহূর্ত ইতঃস্তত করে বকুল নিজেদের মনের কথা সব খুলে বললো মকবুল ভাইকে। মকবুল ভাই কিছুই বললেন না, শুধু প্রশ্ন করলেন, “তোমরা কি কিছু খেয়েছো?” আমান মাথা নেড়ে জানালো, খায়নি। মকবুল ভাই ‘এসো’ বলে সামনে এগিয়ে গেলেন। ওরাও পিছনে হাঁটলো। বনের মধ্যে ঢুকে যাবার পর মকবুল ভাই আবার কথা বলতে শুরু করলেন। ওদের সব কথা শুনতে শুনতে বনের গহিনে মুক্তিসেনা ক্যাম্পে পৌঁছালেন। দু’জনকে খিচুড়ি খাইয়ে কথা বলতে বসলেন। “দেখ বকুল, আজ হাতে সময় নেই, তোমাদের সংক্ষেপে কয়েকটা কথা বলি। তুমি ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী, আমার বিশ্বাস আমার কথা তুমি বুঝবে। বাড়ি থেকে তোমরা কাউকে কিছু না জানিয়ে এসেছো; সেটা কোন সমস্যা নয়, অনেকেই না জানিয়ে আসে। সমস্যা অন্য জায়গায়। যুদ্ধ করার জন্য যতটা শক্তি-সামর্থ্য প্রয়োজন, যতটা বয়স প্রয়োজন, তোমাদের সেটা এখনো হয়নি। তারপরও তোমরা দেশের প্রয়োজনে যুদ্ধ করবে! অবশ্যই করবে! এই যে আমাদের যুদ্ধ শুরু হয়েছে, এমন কিন্তু নয় যে, তিনমাস-ছয়মাস-নয়মাসে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে; হতে পারে এ যুদ্ধ আমাদের আগামী তিনবছর, পাঁচবছর, দশবছর ধরে করতে হবে! আজ আমরা যারা যুদ্ধ করছি, তাদের অনেকেই হয়তো মরে যাবো; কিন্তু আমাদের এ যুদ্ধ কি থেমে যাবে? না এ যুদ্ধ চালিয়ে নিতে হবে! যতদিন বাংলার মানুষের মুক্তি না আসে, ততদিন আমাদের এ যুদ্ধ চালিয়ে নিতেই হবে! তোমরা আগামী বছর, অথবা তার পরের বছর যোগ দেবে যুদ্ধে। মনে রাখতে হবে, বিজয় না আসা পর্যন্ত এ যুদ্ধ আমাদের চালাতেই হবে।” একটানা কথাগুলো বলে থামলেন মকবুল ভাই, দু’জনের কারো মুখেই কথা নেই, মাথা নিচু করে বসে আছে। একটুক্ষণ চুপ থেকে উঠে দাঁড়ালেন মকবুল ভাই, দু’জনের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “আজ তোমরা বাড়ি ফিরে যাও, কিন্তু মনে রাখবা তোমরা যুদ্ধের সাথেই আছো প্রতিদিন। আগামীর যুদ্ধে আমি তোমাদের নাম লিখে রাখলাম। বাড়ি যাও আজ। মন খারাপ করো না! বড়ো যুদ্ধের কথা ভেবেই আজ তোমাদের বিদায় করে দিলাম! নিশ্চয়ই আমাদের যুদ্ধের মাঠেই দেখা হবে।”
মকবুল ভাইয়ের মুখের উপর দু’জন কোন কথাই বলতে পারলো না। মাথা নিচু করে বেরিয়ে এলো। মকবুল ভাই একজন মুক্তিযোদ্ধাকে বললেন, দু’জনকে বন থেকে বের করে রাস্তায় তুলে দিতে।
বিষাদ নিয়ে আবার দু’জন সাইকেলে উঠলো। কিছু দূর যেতেই দেখলো রাস্তায় আর্মির দু’টি পিকআপ ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। ওদের দু’জনকে দাঁড় করালো মিলিটারির লোকেরা। দুশ্চিন্তায় রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে গেল, “কী করে ওরা সব জেনে গেল!” মিলিটারিরা আরও দু’জন পথচারীকে দাঁড় করালো; এবং কী-সব যেন বললো, ওদের সব কথা বুঝতে না পারলেও সবাই বুঝলো, ওদের একটা গাড়ি বিকল হয়েছে, সারাতে সময় লাগবে; বিকল গাড়ির সামানগুলো অন্য গাড়িতে তুলে দিতে হবে। প্রতিবাদ করার সুযোগ যেহেতু নেই, কাজে লেগে পড়াই ভালো। ছোটো ছোটো প্যাকেট হলেও অনেক ওজন। ঘণ্টা দুই কঠোর পরিশ্রম করে ওদের মাল শিফটিং শেষ হলো, মাঝে প্রবল বৃষ্টি নামলো, কিন্তু কাজের কোন বিরাম নেই। কাজ শেষে মাটিতে বসে পড়লো দু’জন। অন্য দুই পথচারী পালিয়ে বাঁচলো। ওদের দুরবস্থা দেখে মনে হয় পিশাচদের বুকে দয়া হলো, ওরা ওদের দু’জনকে দু’টি আপেল ধরিয়ে দিলো। বকুলের বুক ভেঙে কান্না এলো, কিন্তু শব্দ করে কাঁদতে পারলো না। নিঃশব্দে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো গালে। ঘাম আর বৃষ্টিজলে মিশে গেল অশ্রুবিন্দু, তাই কেউ জানতেও পারলো না ওর কষ্ট। একটা গাড়ি রওনা হলো, অন্য গাড়ির মেরামতি কাজ চললো। মিলিটারি গাড়ি ছাড়ার পর ওরা দু’জনও যাত্রা করলো। শরীর এতোটাই দুর্বল সাইকেল যেন সামনে যেতেই পারে না। কিছু পথ গিয়ে পকেট থেকে আপেলটা বের করে পাশের জলাশয়ে ছুড়ে ফেলে দিলো বকুল, ওর দেখাদেখি আমানও একই কাজ করলো।
৪.
কাতলাসেন এসে আমান থেমে গেলে বকুল একা। সন্ধ্যা আসন্ন। বুক ভেঙে কান্না পাচ্ছে বকুলের। বকুলের কান্না আড়াল করতে আবার বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টি ঝরছে, বকুলের সাইকেল চলছে। অন্ধকারে অচেনা পথে একা সাইকেল চালানোর কথা ভেবে আবার কান্না পেলো বকুলের। তারপরও বুকে সাহস সঞ্চার করে এগিয়ে চললো বকুল; ভয় কী! সে না মুক্তিযোদ্ধা! শরীর কেঁপে কেঁপে শীত লাগছে; তবু পৌঁছাতেই হবে তাকে।
সকালে সবাই রিয়াজুদ্দিনের সাইকেলের বিষয়টাকে চুরি বলেই ধরে নিয়েছিলো, কিন্তু দুপুর থেকে বকুলকে খুঁজে না পাওয়া আর সাইকেল হারিয়ে যাওয়া, পরস্পর সম্পর্কিত মনে করলো কেউ কেউ; সন্ধ্যা নাগাদ ও বাড়ির আলোচ্যসূচিতে সাইকেল আর থাকলো না, বরং বকুলের জন্য বাড়িতে কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেল। সারাদিনের সমস্ত ধকল শরীরে আর বুকে ধারণ করে বকুল যখন বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালো, তখন এশার আযান হয়ে গেছে, কেউ কেউ ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেও, মা-কে দেখা মাত্র ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত বকুল শিশু হয়ে গেল, হাউমাউ করে কেঁদে উঠে মা’র কোলে লুটিয়ে পড়লো। মা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেই বুঝতে পারলেন, সমস্ত শরীর কেঁপে কেঁপে বকুলের জ্বর আসছে। সবাই ধরাধরি করে ঘরে তুললো তাকে; ভেজা জামাকাপড় পাল্টে লেপ দিয়ে ঢেকে বিছানায় শুইয়ে দেয়া হলো। বকুলের ঘোরগ্রস্ততায় বাড়ি শুদ্ধো সবাই অস্থির যখন; বকুলের বুকে তখন বেজে চলেছে চন্দ্রাবতীর নূপুর; জ্বরের ঘোরে বকুল প্রলাপ বকছে– “এ যুদ্ধ আমাদের আগামী তিনবছর, পাঁচবছর, দশবছর ধরে করতে হবে!………….যতদিন বাংলার মানুষের মুক্তি না আসে, ততদিন আমাদের এ যুদ্ধ চালিয়ে নিতেই হবে……..”।
লেখক:
ফরিদ আহমদ দুলাল
কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার; ময়মনসিংহ, ঢাকা