যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর মুক্তির দাবি ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা । আবু আফিয়া আহমদ

Comments

সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত একটি সংবাদ পড়ে বিস্মিত হলাম। বিশ্বব্যাপী যখন করোনাভাইরাসে আতঙ্কিত আর সমগ্র বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও যখন ব্যস্ত এই মহাবিপদ মোকাবেলায়, ঠিক সেই মুহূর্তে মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত অপরাধীদের মুক্তির দাবি তুলে ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের পাঁয়তারা করছে জামায়াতপন্থী ধর্মান্ধরা। ভাবতে কষ্ট হয় যে, কতকটা ধর্মান্ধ হলে আমরা যুদ্ধাপরাধী, ধর্ষক, রাজাকার দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তি দাবি করতে পারি।

বাংলাদেশ উলামা কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক সাইয়্যেদ কামালুউদ্দিন জাফরীসহ অন্যান্য আলেমগণের পক্ষ থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে দেখা যাচ্ছে তারা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তি দাবি করছেন। ৭১’এ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে যারা হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর অপরাধ করেছে, তাদের মৃত্যুই যেখানে সবার কামনা সেখানে তাদের পক্ষে জনমত গঠন করার শক্তি কোথা থেকে পায় তা আমাদের বোধগম্য নয়।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিন হাজারেরও বেশি নিরস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যা বা হত্যায় সহযোগিতা, নয়জনেরও বেশি নারীকে ধর্ষণ, বিভিন্ন বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট, ভাঙচুর এবং ১০০ থেকে ১৫০ হিন্দুকে ধর্মান্তরে বাধ্য করার মত কুখ্যাত অপরাধীর অপরাধের কথা ভুলে বসে আছি? যার অপরাধ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। আপিলে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়।

সাঈদী সেই কুখ্যাত রাজাকার যিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতা করার জন্য তার নিজ এলাকায় আলবদর, আলশামস এবং রাজাকার বাহিনী গঠন করেন এবং তাদের সরাসরি সহযোগিতা করেন। সে সময় তিনি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না। তবে তথাকথিত মওলানা হিসেবে তিনি তার স্বাধীনতাবিরোধী তৎপরতা পরিচালনা করেছেন। পবিত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে একজন ‘মওলানা’ হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে পুরো মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি নানা অপকর্ম করেছেন। পিরোজপুরে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, লুটতরাজসহ নানা যুদ্ধাপরাধের অন্যতম হোতা ছিলেন এই দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। নিজে নেতৃত্ব দেওয়া ছাড়াও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে গণহত্যা ও নির্যাতনে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছেন সাঈদী।

আমরা কি ভুলে গেছি সেই ঘটনার কথা, সাঈদীকে যখন মৃত্যুদণ্ডের আদেশ শোনানোর হয় তখন সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে গুজব ছড়িয়ে বগুড়া, রাজশাহী, নাটোর, জয়পুরহাট, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা ও চট্টগ্রামসহ ৩৪ জেলায় ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এ সহিসংতায় প্রথমদিনেই ২২ জন নিহত হয়। শুধু বগুড়াতেই নিহত হয় ১১ জন। এই সহিংসতায় সর্বমোট ৭৮ জন নিহত হন। পুলিশ ফাঁড়ি ও পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয়া ছাড়াও তারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে উপজেলা কার্যালয়েও হামলা করে।

এই রাজাকার কে ছিলেন? একাত্তরের আগে তিনি ছিলেন মুদি দোকানদার ও তাবিজ বিক্রেতা। মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে হয়ে গেলেন প্রথমে শান্তি কমিটির সদস্য ও পরে রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার। নিজে জড়িত থেকে, নেতৃত্ব বা সহযোগিতা দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং রাজাকার বাহিনী নিয়ে সংঘটিত করলেন হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ, লুট, ধর্ষণসহ জঘণ্যতম মানবতাবিরোধী নানা অপরাধ। আগের ‘দেইল্লা’ নামের সঙ্গে তাই রাজাকার যুক্ত হয়ে তাই কুখ্যাত হলেন ‘দেইল্লা রাজাকার’ নামে।

মুক্তিযুদ্ধের পরে দীর্ঘদিন পালিয়ে থেকে আবির্ভুত হলেন ‘আল্লামা, মাওলানা’ পরিচয়ে। ওয়াজ করে বেড়ালেন দেশে-বিদেশে। কালক্রমে হলেন যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের নায়েবে আমির। এভাবেই বাবা-মায়ের দেওয়া দেলোয়ার হোসেন শিকদার ওরফে ‘দেইল্লা’ বা ‘দেইল্লা রাজাকার’ নামক ব্যক্তিটি হয়ে গেলেন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। আজ এই কুখ্যাত রাজাকারের মুক্তির জন্য যারা দাবি তুলছেন তাদের প্রত্যেককেও বিচারের আওতায় আনা উচিত।

বড়ই দু:খ লাগে তখন যখন দেখি স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরেও মামুনুল হকসহ বিভিন্ন ধর্মান্ধদের মুখ দিয়ে আওয়াজ উত্থাপন করা হয় রাজাকার সাঈদীর মুক্তির বিষয়ে আর প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে নিশ্চুপ থাকে। লাখো প্রাণের আত্মহুতি, নারীর সম্ভ্রমহানি, সর্বস্তরের জনগণের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও ত্যাগের মধ্যে দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে বঙ্গোপসাগর বিধৌত বাঙালির স্বাধীন আবাসভূমী এই সোনার বাংলাদেশের। আজ যারা রাজাকার দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মুক্তির চাচ্ছেন তারা মূলত স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। এরা জামায়াতে ইসলামের অনুসারী। এই জামায়াতিরা মুখে নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চরিত করে ঠিকই কিন্তু অন্তরে শয়তানী চিন্তা আর সন্ত্রাসী কার্যকলাপে ভরপুর। যদিও জামায়াতের সাথে ইসলামের দূরতম সম্পর্ক নেই। জামায়াতে ইসলামির প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবুল আলা মওদুদী মিশরের ইসলামিক ব্রাদারহুডের তাত্ত্বিক হাসান বান্নার মডেলে গত শতকের তিরিশের দশক থেকে ভারতে যে ইসলাম প্রচার করেছেন তার সঙ্গে ধর্মের আধ্যাত্মিকতার কোন সম্পর্ক নেই। মওদুদীর ইসলাম আক্ষরিক অর্থেই ওহাবিদের রাজনৈতিক ইসলাম এবং তার দলও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতোই একটি।

এরা যেমনটি করেছিল মুক্তিযুদ্ধকালে রাজাকার, আলবদর, আলশামস প্রভৃতি নামে আজও তেমনই ভিন্ন ভিন্ন নামে অসংখ্য জঙ্গি সংগঠনের জন্ম ও লালন-পালন করছে জামায়াতে ইসলামিরা। এদের শত শত মাদ্রাসা রয়েছে, যেখান থেকে প্রশিক্ষণ পায়ে জঙ্গি তৎপরতা চালায়। একটি জঙ্গি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করলে পরের দিনই অন্য নতুন নামে কার্যক্রম পরিচালিত করছে তারা। আর এরাই রামুসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়, আহমদিয়া সম্প্রদায় এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্গাপূজায় হিন্দুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রতিহত করতে দেশব্যাপী তাণ্ডব চালানোর ইতিহাস সবারই জানা।

এদেশে এ পর্যন্ত যত জঙ্গি হামলা হয়েছে তার ইতিহাস যদি খতিয়ে দেখা হয় তা হলে দেখা যাবে জামায়াতে ইসলামির জঙ্গি সংগঠনগুলোই জড়িত। তাই আজ দেশের প্রতিটি সুনাগরিকের একটাই দাবি সকল যুদ্ধাপরাধীদেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা। সেই সাথে সচেতন মহলের দাবি যারা রাজাককার যুদ্ধাপরাধী কুখ্যাত দেলোয়ার হোসেন সাঈদির মুক্তি চায় তাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা।

লেখক: আবু আফিয়া আহমদ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত ও বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.