। ইরাজ আহমেদ।
১
একটা অস্বস্তি গলার কাছে দলা পাকিয়ে গিয়ে আটকে আছে। অমিতের ফিরে এসে ফোন করার কথা। দুপুর থেকে ফোনটাকে কেন্দ্রে রেখে একটা বৃত্ত কেটে ঘুরছে শম্পা। বিছানার পাশে ছোটো টেবিলে রাখা কালো আর ভারী ফোনটার কিন্তু কোনো উদ্বেগ নেই। থাকার কথাও নয়। মানুষের কথা আদানপ্রদানের সে এক রহস্যময় ডাকঘর।
দুপুরের পরে আর কেউ ফোন করেনি। কয়েকবার রিসিভার তুলে কানে লাগিয়ে দেখেছে শম্পা– লাইন সচল আছে কি না। অমিতের এতোক্ষণে ঢাকায় ফিরে আসার কথা। ভোর থাকতেই রওনা হয়েছে ওরা। তারাবো ঘাট পার হয়ে বাসে ঢাকা থেকে নরসিংদী পৌঁছানো। সেখান থেকে লঞ্চে মানিক নগর। তারপর ঘন্টা দেড়েকের হাঁটা পথ পার হয়ে শাহবাজপুর। যাত্রা পথের বিবরণটা শুনতে সহজ মনে হলেও শম্পা জানে ১৯৭১ সালের এই মে মাসে পুরো পথটাই ভীষণ বিপজ্জনক হয়ে আছে। অমিত আব্বা-আম্মাকে গ্রামে পৌঁছে দিয়ে আবার ঢাকায় ফিরবে। শম্পা বলেছিল রাতটা থেকে পরদিন সকালে ফিরে আসতে। কিন্তু অমিতের ঢাকায় কী যেন একটা জরুরি কাজ আছে। ওকে ফিরতেই হবে।
অমিত তার একমাত্র মামার ছোটো ছেলে। ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর এই মামাই ঢাকায় রয়ে গেছে। দুই খালা আগেই শাহাবাজপুরের পৈত্রিক বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। আব্বা-আম্মা দুজনকেই গত মাস থেকেই ঢাকা থেকে সরিয়ে দেয়ার কথা ভাবছিল শম্পা। কিন্তু আব্বার অনিচ্ছার কারণে দেরি হলো। ঠিক হয়েছিল জাফর তার গাড়ি ড্রাইভ করে সবাইকে পৌঁছে দেবে নরসিংদী পর্যন্ত। বাকি পথ লঞ্চে সঙ্গে যাবে অমিত। কিন্তু শেষ মুহূর্তে জাফর যেতে পারেনি। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে তাদের পত্রিকার সম্পাদক ঢাকায় আসছে, তার পক্ষে নরসিংদী যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবুও শম্পা প্ল্যান বাতিল করেনি। মামার সঙ্গে কথা বলে দুজনের যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু এখন সবার জন্য ভীষণ দুশ্চিন্তা হচ্ছে। বড়ো একটা ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছে। অমিতকে সঙ্গে পাঠানো ঠিক হয়নি। পথে পথে পাকিস্তানী সৈন্যরা বাস থামিয়ে চেক করছে। মানুষকে নামিয়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারছে। বেছে বেছে যুবক দেখলেই আটক করছে। ওদের বেশি রাগ তরুণদের ওপর। এরাই এখন দলে দলে সীমান্ত পার হয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিচ্ছে। সৈন্যদের ভাষায়, এই তরুণরাই আসল গাদ্দার। অমিত মেডিক্যাল কলেজের থার্ড ইয়ারের ছাত্র। ওকে নিয়েই এখন চিন্তা হচ্ছে বেশি।
ভাবতে ভাবতে বারান্দায় আসে শম্পা। বাইরে বিকেলের মৃত আলো ছটফট করছে। বৃষ্টি নেই। উঠানের গাছপালা থেকে কেমন শুষ্ক একটা গন্ধ ভেসে আসছে। মে মাসের সন্ধ্যার অন্ধকার গলা টিপে মারতে চাইছে বিকেলটাকে। একটু পরেই অন্ধকারের তলায় চাপা পড়বে এই শহরের মানুষের বেঁচে থাকার সব চিহ্ন। সাপের মতো মাটিতে শরীর ঘষে ঘষে এগিয়ে আসবে ভয়। কারফিউর শহরে একটু একটু করে আবারও দমবন্ধ হয়ে মরে যেতে থাকবে মানুষের মন।
এই একতলা বাসার বারান্দা থেকে খুব কিছু একটা দেখার নেই। দেখতে পায়ও না শম্পা। গ্রিল ঘেরা বারান্দার দরজা খুলে বের হলে সামনে দেয়াল ঘেরা উঠান। তারপর কাঠের মূল ফটক। মধ্য ঢাকার বেইলি রোডের এই বাসা জাফর ভাড়া নিয়েছে মার্চের শেষে। তার আগে নয়াপল্টনে কয়েক বছর। বিয়ের পর ওই বাসাতেই শম্পা প্রথম এসে ওঠে। কয়েক বছরে জায়গাটার জন্য কেমন একটা মায়া পড়ে গিয়েছিল। ছেড়ে আসার সময় কষ্ট লেগেছিল বুকের মধ্যে। ছোট্ট একটা মাঠের চারদিক ঘিরে কয়েকটা বাড়ি। বাসিন্দারা সবাই কাছের মানুষের মতো জীবন কাটাতো। ভাবীদের সঙ্গে খাবার আদানপ্রদান, একসঙ্গে সিনেমা দেখতে যাওয়া… জাফরের অফিস থেকে ফিরতে রাত হলে বাসার খোলা বারান্দায় বেতের চেয়ার পেতে বসে থাকতো শম্পা। সেই মাঠে অন্ধকারে ক্রমাগত ডাকতে থাকা ঝিঝি পোকারাও তার একলা সময়ের সঙ্গী হতো।
২৫ মার্চ ভোরের দিকে পাশের বাসায় এসে আঘাত করে পাকিস্তানী সেনাদের ট্যাংক থেকে ছোঁড়া মেশিনগানের গুলি। সৈন্যরা তখন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের দিকে যাচ্ছিলো পুলিশ হত্যাযজ্ঞ চূড়ান্ত করতে। গুলিতে পাশের বাসার কামাল সাহেবের ভাগ্নে রনি আহত হয়। ২৬ তারিখেই বাসা ছাড়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে জাফর। ভয় পেয়েছিল জাফর, ভীষণ ভয়। সেই ভয়ংকর রাতটা তার জন্য শম্পাকেও বাসার স্টোর রুমে কাটাতে হয়েছিল। বাইরে ভয়ংকর গোলাগুলির শব্দ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সারা রাত দুই কানে হাত চাপা দিয়ে বসে ছিল জাফর। বারবার অস্ফুট স্বরে শুধু বলছিল, বিশ্বাসঘাতক, বিট্রেয়ার…। কাকে বিট্রেয়ার বলছিল জাফর?
সে নিজে ভয় পায়নি? পেয়েছিল, তবে জাফরের মতো ভীষণ আতঙ্কে জমাট হয়ে যায়নি। শুধু দাঁতে দাঁত চেপে অপেক্ষা করেছিল ভোর হওয়ার। বড়ো ধরনের একটা বিপদ যে ধেয়ে আসছে শম্পার মনে হয়েছিল। দেশের ক্রমশ উত্তাল হয়ে ওঠা রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর ৭ মার্চে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুনে সেই মনে হওয়াটা তার বিশ্বাসে পরিণত হয়েছিল। এই ইঙ্গিতটা টের পায়নি কেন জাফর! সে বড়ো একটি ইংরেজি দৈনিকের বার্তা সম্পাদক। পাকিস্তানী শাসকদের হাতের মুঠি যে শিথিল হয়ে যাচ্ছে, তারাও যে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে এটুকু তো জাফরের অনুমান করা উচিত ছিল। প্রশ্নটা শম্পার মনের মধ্যে মাঝে মাঝেই চঞ্চল একটা মাছির মতো উড়ে এসে এখানে-সেখানে বসে। আজকাল এই শূন্য বাসাটায় ঘুরপাক খেতে খেতে প্রশ্নটা নিয়ে নিজের মনে নাড়াচাড়া করে শম্পা। অস্বস্তির পরিমাণটা তাতে আরও বেড়ে যায়।
আজকে অবশ্য ভোর থেকে দুশ্চিন্তা তার গলা টিপে ধরে আছে। অমিত ফিরে এসে খবর না দেয়া পর্যন্ত দুশ্চিন্তার এই ঘন মেঘ কাটবে না। আম্মা তাকেও সঙ্গে যেতে বলেছিল। কিন্তু জাফর ঢাকা ছেড়ে এখন যাবে না। তাই যাওয়া হয়নি শম্পার। একবার মনে হয়েছিল শাহবাজপুর চলে গেলে হয়তো একদিক থেকে ভালোই হতো। এই মৃত শহরে বেঁচে থাকার যন্ত্রণা থেকে এক ধরনের মুক্তি পাওয়া যেত হয়তো। কিন্তু গ্রামগুলোও কি শান্ত?
বারান্দা থেকে ঘরে ফিরে আসে শম্পা। মনে হচ্ছে আজও জাফরের ফিরতে রাত হবে। আজকাল বাসায় বেশ দেরি করেই ফেরে। জানতে চাইলে বলে, এখন অফিসে অনেক কাজ, মাথা তোলার সময় নেই। কিন্তু শম্পা টের পায় প্রতি রাতেই ড্রিংক করে আসে জাফর। এপ্রিল মাসে জাফরের এই মদ্যপানের বিষয়টাকে তার মনে হয়েছিল হতাশা আর যন্ত্রণা কাটানোর অবলম্বন। কিন্তু মে মাসে এসে শম্পা বুঝে গেছে জাফরের নতুন একটা অ্যাসোসিয়েশন গড়ে উঠেছে। পূর্বাণী হোটেলের বারে প্রতি রাতে জাফর নিশ্চয়ই ফ্রাস্ট্রেশন আর যন্ত্রণার মুখোমুখি বসে থাকতে যায় না। এই অবরুদ্ধ শহরে রাত নেমে এলে হত্যাকারী পাকিস্তানী সেনাদের ট্রাক বের হয়ে আসে। এখনো বিভিন্ন জায়গায় মানুষের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে ওরা। মানুষ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ওদের দোসর বিহারীরা মোহাম্মদপুর, মিরপুরে বাঙালিদের ধরে ধরে জবাই করছে বলে খবর আসছে। আর সেই শহরে তার স্বামী জাফর ফয়সালের প্রতি সন্ধ্যায় পানশালায় গিয়ে আড্ডা দেয়ার বিষয়টা শম্পার জন্য আরও একটা জটিল খটকা।
হঠাৎ রান্নাঘরে হাঁড়ি-কড়াই পড়ে যাওয়ার শব্দে চমকে ওঠে শম্পা। নিঃশব্দ বাড়িটাতে এটুকু শব্দই গ্রেনেড বিষ্ফোরণের মতো মনে হয়। নিশ্চয়ই ইঁদুরগুলোর কাজ। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এই সময়েই ইঁদুরগুলো আসে। কিছুদিন ধরে এই উপদ্রব শুরু হয়েছ। জাফরকে বলেছে ইঁদুর মারার ওষুধ আনার কথা। কিন্তু তার হাতে সময় কোথায়। বিরক্ত হয়ে রান্নাঘরের আলো জ্বালে শম্পা। বেশ মোটাসোটা একটা ইঁদুর মানুষের সাড়া পেয়ে এক পাশে চুলার আড়ালে ঢুকে যায়। গা ঘিন ঘিন করে শম্পার। ছোটোবেলা থেকেই ইঁদুর ভয় পায়। ছোটো ছোটো প্রাণীগুলো এই মরে যাওয়া শহরে নির্বিকার ভাবে তাদের বংশবৃদ্ধি করে যাচ্ছে। হিংস্র দৃষ্টি তাদের ছোটো ছোটো চোখে। ইঁদুর মারার ওষুধ কেনা আছে ঘরে। বাসার দারোয়ানকে দিয়ে কিনিয়ে রেখেছে শম্পা। দেয়া হয়নি মনে করে। আজই দিতে হবে। রান্নাঘর থেকে বের হয়ে আসার সময় শম্পা শুনতে পায় বেডরুমে ফোন বাজছে। এক দৌড়ে গিয়ে রিসিভার তুলে অন্যপ্রান্তে জাফরের গলা শুনে দমে যায় মনে মনে।
‘কী অবস্থা তোমার?’
প্রশ্ন শুনে অবাক হয় শম্পা।
‘কী আবার অবস্থা হবে! যেরকম দেখে গেছ সকালে সেরকমই আছি।’
‘শোনো, রাতে একজন মেহমান থাকবে সঙ্গে; তুমি এক কাজ করো, পোলাও আর গরুর মাংস রান্না করে ফেলো; পারবে না?’
‘কে আসবে? হঠাৎ পোলাও…!’ শম্পার গলায় বিষ্ময়।
‘সারপ্রাইজ আছে তোমার জন্য। তুমি তো গরুর মাংশ দারুণ রান্না করো, আমি গেস্টকে বলেছি তোমার রান্নার কথা; দুজনের মতো করলেই হবে।’
অবাক হয় শম্পা। এই সময়ে কাকে পোলাও, মাংস খাওয়াতে চাচ্ছে জাফর?
‘শোনো, আমরা দশটার দিকে চলে আসবো। তুমি রেডি করে ফেল।’
কথা শেষ করে লাইন কেটে দেয় জাফর। শম্পা ধীরে ক্রেডেলের ওপর রিসিভার নামিয়ে রাখে। জাফরের হঠাৎ এই সময়ে বাড়িতে গেস্ট ডেকে পোলাও খাওয়ানোর ইচ্ছা হলো কেন? মেজাজ খারাপ হয় তার। আগে থেকে কিছু না জানিয়ে আচমকা এভাবে বাসায় গেস্ট নিয়ে আসা… আর এখন কি পোলাও খাওয়ানোর সময়!
আবার ফোনটা বেজে উঠতেই বিরক্তি নিয়ে শম্পা তাকায়। এবার জাফর হয়তো আরও একটা কিছু রান্নার অর্ডার করবে।
‘হ্যালো…।’ বিরক্তি ঝরে পড়ে শম্পার কণ্ঠে।
ফোনের অপরপ্রান্তে অমিতের গলা শুনে তার সমস্ত বিরক্তি এক লহমায় কেটে যায়।
‘আপা, এই ফিরলাম। সবাই ঠিক আছে। আব্বা বলছিল, তুমি খুব টেনশনে আছ।’
শম্পার বুক থেকে অনেক ওজনের একটা পাথর নেমে যায় অমিতের কথায়। আরও কিছুক্ষণ অমিতের সঙ্গে রাস্তার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলে রিসিভার নামিয়ে রাখে শম্পা। লম্বা একটা নিঃশ্বাস টেনে আবার ছেড়ে দেয়। তারপর উঠে রান্নাঘরের দিকে যায়। তার এখন অনেক কাজ।
২
শম্পা ভাবতেই পারেনি তার জন্য জাফরের নিয়ে আসা সারপ্রাইজের নাম শাফায়াত নূর, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর এক মেজর। তারা দুজনেই মদ খেয়ে ফিরেছিল। শাফায়েতের সঙ্গে ছিল একটা দামী হুইস্কির বোতল। শম্পার জন্য গিফট। কিন্তু ভাবী পান করে না শুনে হতাশা প্রকাশ করেছিল লোকটা। জাফর অবশ্য তাকে কয়েকবার অনুরোধ করেছিল একটা পেগ নেয়ার জন্য। এটা নাকি ভদ্রতা। শম্পার তখন খুব ঘেন্না হচ্ছিলো। কার ওপর ঘেন্না বোধ হচ্ছিলো তার? নিজের স্বামীর ওপর? নাকি নিজের ওপর? জাফর এই লোকের সঙ্গে বসে প্রতি সন্ধ্যায় মদ্যপান করে, এই লোকটা ওর বন্ধু! রাগে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল শম্পার মন। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেলেছিল। তার শরীর কাঁপছিল অসহায় ভাবে।
এখন অবশ্য শম্পা আর কাঁদছে না। হেলান দিয়ে বসে আছে ড্রইংরুমের একটা সোফায়। তার শক্ত হয়ে যাওয়া মুখের প্রতিটি রেখা বলছে সে বেঁচে নেই। সত্যিই কি শম্পা বেঁচে নেই? মাথার উপরে তীব্র গতিকে সিলিং ফ্যানটা ঘুরছে। টেবিলে দাঁড়িয়ে আছে হুইস্কির বোতলটা। গ্লাস দুইটা পাহারা দেয়ার ভঙ্গিতে দুই পাশে, সিগারেট বুকে উপচে ওঠা একটা কাঠের তৈরি অ্যাশট্রে স্থির হয়ে আছে বোতল আর গ্লাস নামক দুটি চরিত্রের পাশে। আর মেঝেতে অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে আছে বমি। ঘরের মধ্যে বমির টক গন্ধ ফ্যানের বাতাস সরাতে পারছে না। শম্পা যেখানে বসে আছে সেখান থেকে উল্টো দিকে আরেকটা সোফায় মাথা হেলিয়ে পড়ে আছে মেজর শাফায়েত নূর। তার সাদা টি-শার্টে বমির দাগ, ঠোঁটের দুই পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়া সাদা ফ্যানার দাগ। এই লোকটা যে মারা গেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। জাফর বসে আছে শম্পার ঠিক উল্টো দিকে। তার শরীরটা শক্ত হয়ে গেছে আরও আগে। অথচ এখন থেকে ঘন্টা খানেক আগে শম্পাকে মেজর বন্ধুর সঙ্গে গল্প করতে বলে সে বের হয়ে গিয়েছিল। তখনও বেঁচে ছিল সে। কোথায় গিয়েছিল জাফর? উঠানে পায়চারি করছিল? বৃষ্টি না হওয়ার কারণে উঠানের গাছপালা থেকে উঠে আসা এক ধরনের শুষ্ক গন্ধ নাকে টেনে নিচ্ছিলো? নাকি কারফিউর মধ্যে বের হয়ে রাস্তায় চলে গিয়েছিল?
জানা যায় না, অনেক ঘটনার আদ্যোপান্ত সব সময় জানা হয়ে ওঠে না। শুধু অনুমান করা যায় কিছু ঘটনা। কোনো মানুষের মাথার ভিতরে কখন হত্যাকাণ্ড ঘটানোর তীব্র ইচ্ছা জেগে ওঠে তা-ও আগে থেকে অনুমান করা যায় না। আরও মদ খেতে থাকা দুই ব্যক্তির জন্য পোলাও আর মাংস বাড়তে বাড়তে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ঠিক কখন তাদের খাবারে ইঁদুর মারার জন্য আনা ওষুধটা মেশানোর ইচ্ছা হয়েছিল শম্পার? মনে হয় জাফর তাকে রেখে বাইরে যাওয়ার পর মেজর শাফায়েত যখন তাকে একা পেয়ে কাছে টানার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠেছিল তখনই পরিকল্পনাটা মাথায় এসেছিল। শাফায়াতের স্পর্শে তার শরীর একটা পুড়ে যাওয়া কাঠের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছিল প্রথমে। তারপর ভেঙে পড়েছিল অসহায়ের মতো। ঠিক তখনই তার মনে পড়েছিল ইঁদুর মারার ওষুধটার কথা। আশ্চর্য, জাফরের মুখ তার মনে পড়েনি, আব্বা-আম্মার মুখও না। মেজর শাফায়াত তাকে গ্লাসে ঢেলে মদ খাওয়াতে চেষ্টা করেছিল। শম্পা মাথা ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করেছিল। জাফর ফিরে আসার পর সে উঠে রান্নাঘরে চলে গিয়েছিল। জাফরও গিয়েছিল তার পেছন পেছন। সে কী বুঝতে চেষ্টা করছিল পাক সেনাবাহিনীর মেজর তার স্ত্রীর ওপর কতোটা অধিকার প্রয়োগ করেছে? এই শহরে নিরাপদে বসবাসের ছাড়পত্র হয়তো শাফায়াত তাকে দিয়েছিল। হয়তো তাকে আরও কোনো বাড়তি সুবিধা দেয়ার কথা বলেছিল। সব সময় সব ঘটনার পূর্বাপর বোঝা যায় না। শম্পাও বোঝেনি। তার মনের মধ্যে তখন একরোখা বিষধর সাপের মতো ফণা তুলছিল হত্যাকাণ্ডের ইচ্ছা। খাবারে ওষুধ মিশিয়ে দিয়েছিল শম্পা। পরিণতিতে দুজন মানুষের মৃত্যু। জাফর অথবা মেজরের মৃত্যু কি শম্পার কাছে রান্নাঘরে ইঁদুরদের বিষ দিয়ে মেরে ফেলার চাইতেও ভয়াবহ এখন? হয়তো না। শম্পার মাথার ভিতরে ভাবনাগুলো গুলিয়ে গেছে।
এখনও সোফায় বসে আছে শম্পা। বাইরে ১৯৭১ সালের মে মাসের নিঃশব্দ রাত্রি জমাট হয়ে আছে। তার শরীর পুড়ে যাওয়া কাঠের মতো শক্ত হয়ে গেছে। আগুন নিভে গেলে ছাই উড়ছে ঘরের ভিতরে। ফ্যানের বাতাসে ওড়া অদৃশ্য ছাই ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।
লেখক:
ইরাজ আহমেদ
কবি ও কথাসাহিত্যিক; ঢাকা