রক্ত দিতে প্রবল সাহসী কিম্বা বীর হতে হয় না । সাগর লোহানী

Comments

ডেংগির কারণে সারা দেশে রক্তের প্রয়োজন অন্য সাধারণ সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুসারে সাধারণ সময়ে দেশে বছরে ৮/৯ লাখ ব্যাগ রক্তের চাহিদা থাকলেও রক্ত সংগ্রহ হয় ৬ থেকে সাড়ে ৬ লাখ ব্যাগ। ঘাটতি থাকে ৩ লাখ ব্যাগের বেশী। এর মধ্যে সংগ্রহকৃত রক্তের কত পরিমাণ আসে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের কাছ থেকে জানেন? মাত্র ৩০ শতাংশ! নিজের পরিবারের সদস্য, বন্ধু বা পরিচিতজন না হলে এখনো বেশিরভাগ মানুষ রক্তের জন্য নির্ভর করেন পেশাদার রক্তদাতার ওপর। রক্তের অভাবের কারণে প্রতিবছর বহু রোগীর প্রাণ সংকটের মুখ পড়ে।

আমরা যারা রক্ত জোগাড় করবার ক্ষেত্রে সকলকে সহায়তা করি তাদের প্রাণান্ত হতে হচ্ছে রক্তদাতা খুঁজে বের করতে। নিজে রক্ত দিচ্ছেন আর অন্য দাতা খুঁজছেন। আমাদের অনেক রক্তকর্মী সারারাত জেগে রক্তদাতার খোঁজ করছেন। নিজের কাজ, ক্লাস ইত্যাদি বাদ দিয়ে রক্তের খোঁজে ছুটে বেড়াচ্ছেন শহরের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ফোন আর ইন্টারনেটে সার্বক্ষনিক লেগে আছেন রক্তের জন্যে। এ কাজ তিনি করছেন সম্পূর্ণভাবে নিজ খরচে, কোন কিছু পাওয়ার আশায় নয়, এ কাজে কেউ তাকে কোন সার্টিফিকেট দেবে না, দেবে না কোন উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা। তবু কেন করছেন জানেন? তিনি সত্যিকার অর্থেই একজন মানুষ বলে। তার জীবনে তিনি “মানুষ মানুষের জন্যে” মন্ত্রটি ধারণ করেন বলে। একজন মানুষের জীবন বাঁচাবার যে মানসিক প্রশান্তি তা শুধু ডাক্তারদের পরে পান ঐ “রক্তকর্মী” যিনি মানুষ বাঁচাতে আপ্রাণ কাজ করে যাচ্ছেন।

যে হারে রক্তের প্রয়োজন বাড়ছে সে হারে রক্তদাতার সংখ্যা বাড়ছে না। রক্ত দানের ক্ষেত্রে এখনও ভীতি, পারিবারিক বাধা, কুসংস্কার মানুষকে রক্তদানে কার্যত বাধাগ্রস্থ করছে। রক্তদান করতে ‘বীর’ হতে হয় না। যে কোন মানবিক গুণ সম্পন্ন সুস্থ ব্যক্তি রক্ত দিতে পারেন। এতে রক্তদাতার কোন শারীরিক ক্ষতি হয় না।

Blood Donation

মনে রাখবেন, আপনার স্বজনের রক্ত লাগলে পরিবারের মধ্যে থেকে রক্ত সংগ্রহ করার ব্যবস্থা নিন। একান্তই যদি পরিবারে রক্ত না পাওয়া যায় কেবল তখনই বন্ধু বা বন্ধুর বন্ধুকে রক্তের জন্যে বলুন।

আপনার রুগীর সাথে রক্তের গ্রুপ না মিললে অন্যের কাছ থেকে তার জন্যে রক্ত সংগ্রহ করুন আর ঐ হাসপাতালে অপর কোন রুগী যার রক্তের প্রয়োজন তার সাথে আপনার রক্তের গ্রুপ মিলে গেলে তাকে আপনার রক্ত দান করুন। এভাবেই আমরা অপরের রক্তের প্রয়োজন মেটাতে পারি।

রক্তের গ্রুপ মোট ৮ ধরণের: এবি পজিটিভ, এবি নেগেটিভ, এ পজিটিভ, এ নেগেটিভ, বি পজিটিভ, বি নেগেটিভ, এবং ও পজিটিভ, ও নেগেটিভ।

রক্তদানে রক্তদাতার কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য রাখুন:
১. রক্ত দিলে রক্তদাতার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা একেবারেই নেই;
২. এক ব্যাগ রক্ত দিতে সময় লাগে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট;
৩. মাত্র ১৫ মিনিট সময়ে চাইলেই আপনি একজনের প্রাণ বাঁচাতে পারেন;
৪. ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সের মধ্যে শারীরিকভাবে সুস্থ নারী ও পুরুষ রক্ত দিতে পারে;
৫. রক্তদাতা পুরুষের ওজন হতে হবে অন্তত ৪৮ কেজি এবং নারীর অন্তত ৪৫ কেজি;
৬. রক্তদানের সময় রক্তদাতার তাপমাত্রা ৯৯.৫ ফারেনহাইটের নিচে এবং নাড়ির গতি ৭০ থেকে ৯০ এর মধ্যে এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকতে হবে;
৭. পুরুষদের ক্ষেত্রে রক্তের হিমোগ্লোবিন প্রতি ডেসিলিটারে ১৫ গ্রাম (15 g/dl) এবং নারীদের ক্ষেত্রে ১৪ গ্রাম (14 g/dl) হওয়া দরকার;
৮. রক্তদাতাকে অবশ্যই ভাইরাসজনিত রোগ, শ্বাসযন্ত্রের রোগ এবং চর্মরোগ মুক্ত থাকতে হবে;
৯. সাধারণত ৯০ দিন অর্থাৎ তিন মাস পর পর রক্তদান করা যায়;
১০. কোন কোন রক্তদাতার রক্তদানের সময় কিছুটা ঘাম এবং অস্বস্তি বোধ হয় যা স্বাভাবিক;
১১. প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষের শরীরে সাধারণত ৪ থেকে ৬ লিটার রক্ত থাকে আর প্রতিবার রক্তদাতা মাত্র ৩৫০ থেকে ৪৫০ মিলিলিটার রক্ত দেন;
১২. খালি পেটে রক্তদান বাঞ্ছনীয় নয়;
১৩. রক্তদানের পরে অন্তত আধ ঘন্টা হাঁটাহাঁটি না করে বিশ্রাম নিন;
১৪. রক্তদানের পর অন্তত আধ লিটার জল পান করুন, সম্ভব হলে ওর স্যালাইনসহ;
১৫. ৬ সপ্তাহের মধ্যে আপনার শরীরের লোহিত রক্তকণিকার মাত্রা পূরণ হয়ে যাবে;

রক্ত দিলে আপনার কী লাভ, তা কি জানেন?

১. এতে একজন মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব;
২. নিয়মিত রক্তদাতার ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে;
৩. বছরে তিনবার রক্ত দিলে শরীরে নতুন লোহিত কণিকা তৈরির হার বেড়ে যায়।;
৪. রক্তদাতার অস্থিমজ্জা সক্রিয় থাকে;
৫. দ্রুত রক্ত স্বল্পতা পূরণ হয়;
৬. রক্তে কোলেস্টরেলের মাত্রা কমে যায়;
৭. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে;
৮. হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়;
৯. রক্ত দিলে যে ক্যালোরি খরচ হয় যা ওজন কমানোর ক্ষেত্রে ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে;
১০. শরীরে হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, জন্ডিস, ম্যালেরিয়া, সিফিলিস, এইচআইভি বা এইডসের মতো বড় কোন রোগ আছে কি না, সেটি বিনা খরচে জানা যায়;
১১. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে;
১২. রক্তদাতার যদি নিজের কখনো রক্তের প্রয়োজন হয় তাহলে ব্লাড ব্যাংকগুলো তাকে রক্তের ব্যবস্থা করে দিতে অগ্রাধিকার দেয়;

তাই আসুন স্বজনের প্রয়োজনে নিজেরাই রক্ত দিই। অপরের জন্যেও এগিয়ে যাই। একবার রক্ত দিন দেখবেন এতে আপনি যে আনন্দ পাবেন জগতের অন্য কোন কিছুতেই সে আনন্দ পাবেন না।

লেখক:
সাগর লোহানী, সম্পাদক, বাঙালীয়ানা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.