রুনা লেইসের কবিতা

Comments

সকলি দাহ্য জেনো

এখান থেকেই ফিরে যেতে হবে তোমাকে 
এটাই শেষ সীমারেখা, এরপর তোমাকে কেউ দেবে না 

বন্ধ দরোজার ওপাশে যাবার অধিকার, 
গোপন কুঠুরি থেকে খুঁজে নিয়েছিলে সবগুলো চাবি 
সংখ্যার হিসেব কষে কষে সব কম্বিনেশন লকের নম্বর মিলিয়ে নিয়েছো 
পেয়ে গেছো সোনালি আপেল বৃক্ষ, পাহারায় আগুনমুখো ড্রাগন, 
সময়ের ঘরে ঘণ্টা মিনিট সেকেন্ডের কাঁটা বসাতে বসাতে জেনে গেছো 
অচিন পারের সোনার পাখির সোনার খাঁচায় আসা-যাওয়ার খবর,
সকল সময়ের সূক্ষ্ম হিসেবনিকেশ–   

অবশেষে পেয়ে গেছো কস্তুরী ঘ্রাণ, ঘন অরণ্যের ভেতর 
পল্লবিত পদ্মের বৃক্ষ কি দেখেছিলে–যেখানে প্রজাপতিদের 
তুমুল ওড়াউড়ি, ভ্রমরের গুঞ্জরণ মৌমাছিদের মেলা 
তার পাড়েই তোমার-আমার একসাথে পথচলার শেষ গন্তব্য ।

এরপর আর কোন দায় নেই কারো 
তোমার নশ্বর দেহের সুরক্ষার ভার নেবার,
তোমার অন্তরের কলুষতা তোমাকেই ধুলায় মেশাতে হবে 
চরণ চিহ্ন এঁকে যেতে হবে সবুজ ঘাসের প্রান্তরে–
চিনে নিতে হবে নীল জলে ধবল রাজহাঁস 
পুবে-পশ্চিমে দীর্ঘ রেখা আঁকা হয়ে গেলে 
মিলিয়ে নিও যুগল ধনুর পূর্ণ-বৃত্ত, 
তোমার দক্ষিণ কখনোই নেবে না উত্তরের দায়ভার,

প্রিয়তম হে দেবশিশু, একবার জেগে ওঠো–  
তোমার নিজেকে এখন নিজেরই বহন করতে হবে এই নির্জন পথে। 

“সিদরাতুল মুনতাহা” অতিক্রমকালে 
আলোর তৈরি জিব্রাইলের ডানার পালকও পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

দূরের গোলাপ

প্রতিবার গোলাপ বাগান
অতিক্রম করে যাবার সময় দেখি
তোমার ভাবনাগুলোও 
অতিক্রম করে গেছি… 
তাই, রোজ রোজ আমাকেই
ফিরে আসতে হয়,
তোমার ভাবনার ভেতর 
রোজ রোজ গোলাপ ফুটবে বলে।

চন্দ্রিমা মধুরেণ

আমাদের মধুচন্দ্রিমার জন্য তুমি নতুন কোনো শহর বেছে নিও,
রোম কিংবা প্যারিস অগণিত যুগলের মিলনের উৎসবে পুরোনো হয়ে গেছে
প্রাচীন হয়ে গেছে টোকিও, সিডনী কিংবা রিও। 
ব্যাঙ্কক, দুবাই, লাস ভেগাসের মতো প্রমোদনগরীগুলো
পরিণত হয়েছে অপবিত্র পতিতালয়ে।

আগ্রার তাজমহল কিংবা গিজা পিরামিডের সমুখে হাস্যোজ্জ্বল দম্পতির
যুগল ছবির চেহারার পিছনে ভেসে উঠছে মমতাজ আর নেফারতিতির
বীভৎস আত্মার করুণ আর্তনাদ।
তুমি কখনোই ভেবো না আমরা সুইজারল্যান্ডের মতো শীতল দেশে
কিংবা সাহারা মরুভুমির কোনো মরুপ্রান্তরের উচ্চ উষ্ণতার শহরে
প্রথমবার মিলিত হবো
দ্বীপ রাষ্ট্রগুলির সামুদ্রিক বাতায়নে মধুরাত উদযাপন
বড় সেকেলে হয়ে গেছে  
ভাসমান বোটে বা রিসোর্টগুলোতে 
গর্জনশীল তরঙ্গমালার মাঝে
আমাদের মধুরাত যাপিত হবে 
এমনটাও আমার অপছন্দ,
সমুদ্রপৃষ্ঠ নয়, তুমি বরং খুঁজে নিতে পারো
নদীর তীরবর্তী কোনো পুষ্পশোভিত উপত্যকা
কিংবা হ্রদের পাশে চিরহরিৎ বনভূমি 

তবে ভেবে দেখো, ওসব জায়গায়
বহুবার প্রণয়পর্ব শেষে মিলনের
মধুরাত্রি সম্পন্ন করে গেছে
আমাদের পূর্ববর্তী কেউ কেউ। 

আমাদের মধুচন্দ্রিমা যাপনের কালে
তুমিই হবে প্রথম আদিপুরুষ
এবং স্রষ্টা যাকে কেবলি তোমার জন্য
সযত্নে সহস্তে সৃজন করেছেন সেই আমি
তোমার চিরদিনের শয্যাসঙ্গিনী ঈভ, 

মনেরেখো, আমাদের মিলনের প্রতিটি মূহূর্ত হবে কেবলি তোমার-আমার
এবং কোনো অত্যাধুনিক সংযোগস্থাপনকারী
যন্ত্রের সংস্পর্শ থেকে আমরা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থেকে
মেতে উঠব মগ্নতায়–আদিম উল্লাসে
যেখানে দেহ মন চেতনার কোথাও নিজেরা দুজন ছাড়া
আর কোনো তৃতীয়ের ধারণা স্থান পাবে না 
এবং কোনোরকম জন্ম নিরোধক 
কিংবা প্রতিবন্ধক কিছুই ব্যবহার করবো না

কেননা, আমাদের মিলনের প্রথম উৎসবে 
তুমিই আমাকে দেবে সেই গর্বিত গর্ভবতীর
সম্মান, আর সেখান থেকেই জন্ম নেবে
আমাদের মতোই প্রাণচঞ্চল প্রেমময় বুদ্ধিদীপ্ত যুগল শিশু।

বিভেদ বিষয়ক

আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে একটি মেঘময় দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে
সূর্য আর পৃথিবীর মাঝখানে কুয়াশার মায়াবী পর্দা ঝুলে আছে।

ফাল্গুন আর অঘ্রাণের ভিন্নতা ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন রবি ঠাকুর
ঘুচে গিয়েছিল বসন্ত আর হেমন্তের সকল বিদ্বেষ সেকালেই। 

আমাদের কালে এলে সব কাল শুভকাল হবে
এমন প্রতিশ্রুতি ধারণ করে ধরণী বর্ণময়, 

 নির্বাহী লেফাফা যোগে সার্বোভৌম হবার
 পূর্ণ প্রত্যাদেশ আসবার প্রতিশ্রুতিও ছিল,

অথচ তার বদলে অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে বলছে বাতাস 

দৃশ্যান্তরের যাপন

সব দৃশ্যরা দর্শনে আসে না,
লুকিয়ে থাকে অন্ধকারে অদৃশ্যের অভ্যন্তরে,
সব কথারা মুখে আসে না
জমে থাকে কথাদের আড়ালে গহিন কন্দরে।

সেসব জানো বলেই বুঝি
শুভ্র আলোর বিভাজনে খুঁজে বেড়াও
রঙিন এবং গোপন দৃশ্যাবলি? 
শব্দের ভিড়ে কান পেতে রাখো
কোলাহলের ভিড়ে মৌনতার ভাষা পড়ে নিতে চাও? 

তোমার তীর্থযাত্রার স্থানগুলো দুর্গম 
প্রায় পথবিহীন, কণ্টকাকীর্ণ, 
তেমনি তোমার সীমান্ত জুড়ে অপরূপ বসন্তবাগানে 
ফুটে থাকা অমরাবতী পুষ্পরাও লজ্জাবতীর মতন, 
ওপারে কুহেলি বিভ্রমে মেঘের মিনার 
এপারে মহুয়াবন, জলতরঙ্গে পাখিদের অভয়াশ্রম। 

সকাল-সন্ধ্যা তোমার বিচরণ চন্দ্র-সূর্যের ঘরে
অহরাত্রি অভিসার তোমার জল-আগুনের সাথে
মানুষ পুড়ে গেলে ছাই থাকে অবশেষে
পোড়ে না তোমার আত্মার অভিলাষ,
তারারা পোড়ে না, কবিতার সঙ্গে তারপর
অমরত্বে বাঁচে কবির জীবন।

না-দাবিনামা

আমার হৃদয় উষ্ণতা হারালে 
তোমার পৃথিবী হবে বরফ শীতল 
নদীরা শুকনো বালিয়াড়িতে থেমে গেলে 
মরুময় জীবন তোমারই হবে 

কেমন জলদস্যু তুমি 
জলকেই ভয় পাও 
কেমন আগুন তুমি 
আগুনের যজ্ঞ জানো না 
কেমন বাতাস তুমি 
শোনো না বাতাসের আকুল বারতা   

ভূমিহীন কৃষকের মতো ভূমি দস্যু হতে চাও 
অথচ তোমার নিজের পাললিক মৃত্তিকা 
শূন্য তেপান্তরের মাঠ হয়ে বসে থাকে,
জেগে থাকে তার চোখ অবারিত ফসলের প্রত্যাশায় 

যে নদীকে জোয়ারে জাগাতে জানে না 
যে বেঁধে রাখতে জানে না স্বপ্নকে বুকের কাছে 
তার কাছে নেই তবে আর স্বপ্নের কোন দাবি।

কালপৌণিক

একই সময়ে বর্তমানের ক্রিয়া হয়ে
ত্রিকালের চারটি ঘটনা ঘটমান 
আমাদের সুবর্ণ লগ্ন ঘিরে থাকে, 

শুধু পার্থক্য হলো
সে অনুভব করে 
তুমি বলতে পারো, 
আর আমি ধরে রাখি।

দৃশ্যমান জীবনকে ছাপিয়ে
খুব বেশি আলোড়নময় হয়ে ওঠে
আমাদের রংচঙে ছবিগুলো
অদৃশ্য রুপালি পর্দার জীবন
নেচে গেয়ে ভরে তোলে আকাশ বাতাস
ঈশ্বর-কণারা কেমন বর্ণ চোরা 
অদৃশ্যেই সবটুকু পরিপাটি বিন্যস্ততা
অদৃশ্যেই তাদের চঞ্চল চলাফেরা

তুমি তাদের স্বপ্ন আঁকো 
সে দেয় পূর্ণতার স্বাদ, 
আমি ধারণ করে নিই তাদের সকল পরিণতি।

লেখক:
Runa Lais
রুনা লেইস, কবি, লিখিয়ে ও আঁকিয়ে

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট