লকডাউন, জুমা, তারাবী, খতমে তারাবী ও ব্যক্তিগত ধর্মচর্চা । আহমদ তবশির চৌধুরী

Comments

রমজান শুরুর বেশ কিছুদিন আগে থেকেই মসজিদে তারাবীর নামায নিয়ে নানা মহলে বেশ আলোচনা শুরু হয়। বাংলাদেশের একদল ‘আলেম’ এবং বাবুনগরীসহ কওমী পন্থীদের কোন কোন গ্রুপ রমজানে মসজিদ খুলে দিয়ে তাদের মতে “সুস্থ” ব্যক্তিদের জামাতে তারাবী ও জুমার নামায আদায়ের সুযোগ করে দিয়ে মসজিদ অবারিত করার জন্য সরকারে কাছে দাবী জানাতে থাকে। তারা এটা নিয়ে একটি ইস্যু তৈরীর এবং সরকারকে হুমকীও দিতে থাকেন। একদল ওয়াজী মৌলবীতো এমনও বলা শুরু করলো যে, করোনা মুসলামনের কোন ক্ষতি করবে না, এটা নাকি শুধু কাফেরদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে গজব ! আর যদি কোন মুসলমান আক্রান্ত হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে, সে প্রকৃত মুসলমান নয়, ‘মুনাফেক’ !

কেউ কেউ তো স্বপ্নেও অনেক কিছু পাওয়ার দাবী করে বসলো ! যাইহোক, তাদের সবার দাবী, যেকোন মূল্যে রমজানে তারাবী ও জুমার জন্য মসজিদ খুলে দিতে হবে। তাদের এই দাবীর পেছনে ধর্মীয় উদ্দেশ্য কতখানি তা স্বয়ং অন্তর্যামী আল্লাহই জানেন, তবে এর একটা জাগতিক কারণতো অবশ্যই আছে, যা কোনভাবেই অস্বীকার করা যায় না। রমজানে বাংলাদেশের অধিকাংশ মসজিদেই একাধিক হাফেজকে নিয়োগ দেয়া হয় খতমে তারাবী পড়ানোর জন্য। তাদেরকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে নিয়োগ দেয়া হয়। সাধারণ ইমামরাও এসময় বেশী আয় করেন। এছাড়া রমজানের আগে “শবে বরাত”, রমজানে মাসব্যাপী বিভিন্ন স্থানে মিলাদ, ইফতার পার্টি, ২৭ রমজানের রাত, জমাতুল বিদা, ইত্যাদিসহ বিভিন্ন উপলক্ষ্যে মৌলবী সাহেবদের বিরাট অঙ্কের টাকা আয় হওয়ার একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা আর লকডাউনে থাকলে এসব কিছুই হবে না।

এবার আসি তারাবী প্রসঙ্গে। তারাবী শব্দের আবিধানিক অর্থ হলো, আরাম বা বিশ্রাম। তারাবীর নামায ধীরে ধীরে এবং বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে অর্থাৎ প্রতি চার রাকাতের পর একটু বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে পড়া হতো বিধায় এর নামকরণ “সালাতুল তারাবীহ”। হাদিস এবং ইসলামের ইতিহাস পাঠে জানা যায় তাহাজ্জুদের নামাযটিই রমজানের রাতে আগে পড়ে ফেলা হতো। শেষ রাতে যেহেতু সেহরী খেতে হয়, তাই তখন তাহাজ্জুদ পড়ার মত যথেষ্ট সময় পাওয়া যায় না বিধায় মহানবী (সাঃ) এবং সাহাবীগণ এশার নামাযের পর সেটি আদায় করে নিতেন। সেহরীর সময় অবস্থা বুঝে সাহাবীগণ সংক্ষিপ্ত করে দুই বা চার রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ে নিতেন। সহীহ বুখারী ও তিরমিজী শরীফের হাদিস থেকে এটা অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, মহানবী (সাঃ), প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমরের (রাঃ) খিলাফতের প্রথম দিক পর্যন্ত সাহাবীগণ একা একাই মসজিদে বা নিজ গৃহে তারাবীর নামায আদায় করতেন। কোন কোন রেওয়ায়েতে জানা যায় যে, মহানবী (সাঃ) জীবনে চারবার জামাতে তারাবীর নামায পড়িয়েছিলেন, কিন্তু এরপর আর এরূপ করেন নি এই জন্য যে, তাহলে মুসলমানরা এটাকে রীতি হিসেবে ধরে নিবে। উক্ত হাদিসদ্বয়ে একথাও উল্লেখ আছে যে, একবার দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) রমজানে এশার নামাযের পর লক্ষ্য করলেন যে, সাহাবীদের মধ্যে কেউ কেউ ছোট ছোট জামাত অথবা কেউ কেউ এককভাবে তারাবীর নামায আদায় করছেন। এরূপ বিক্ষিপ্ত অবস্থা দেখে হযরত ওমর সবাইকে নিয়ে বা’জামাত তারবী পড়াতে শুরু করেন। বা’জামাত তারাবীর নামায পড়ার রীতি মূলত সেই থেকে। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, জামাতে তারাবী পড়ার ক্ষেত্রে কোন বাধ্য বাধকতা নেই, থাকলে স্বয়ং রসুলে করীম (সাঃ), প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রাঃ) এবং দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) শুরু থেকেই তা করতেন। অতএব, বর্তমান করোনা ভাইরাস আক্রান্ত সময়ে যারা তারাবীর নামায মসজিদে বাজামাত আদায় না করলেই নয় বলে যারা দাবী জানাচ্ছেন, তাদের এই দাবীর পেছনে ধর্মীয় কারণ কতটুকু তা ভেবে দেখার বিষয়।

দ্বিতীয় হচ্ছে, খতমে তারাবী। খতমে তারাবী হলো, পুরো রমজান মাসে তারাবীর নামাযে পবিত্র কুরআন সম্পুর্ণরূপে একবার পাঠ করে শেষ করা। অর্থাৎ ইমাম সাহেব, যিনি একজন কুরআনে হাফেয হবেন, তিনি সারা রমজানে তারাবীর নামাযে কুরআন শরীফ পাঠ করে শেষ করবেন। যেহেতু কুরআন পাঠ বা তেলাওয়াতের মধ্যে সওয়াব এবং ফজিলত আছে, সেহেতু রমজানে এটাকে একটি সুযোগ হিসেবে নেয়া হয়। তবে ব্যক্তিগত ভাবে কুরআন তেলাওয়াত এবং তা বুঝে পড়ার মধ্যে সওয়াব ও ফজিলত অনেক বেশি।

তাই, এবারের রমজানে মসজিদে না গিয়ে নিজ ঘরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তারাবীর নামাযসহ সব ওয়াক্তিয়া নামায এবং সম্ভব হলে নিজেরাই নিজ নিজ ঘরে জুমার নামায আদায় করা উত্তম। প্রতি পরিবারে স্বামী, স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে অন্তত তিনজন সদস্যতো আছেনই, এর বেশীও আছেন যাদের নিয়ে একটি জামাত সহজেই হয়ে যায়। একই ভাবে, আমরা পরিবারের প্রত্যেক সদস্য সারা রমজান মাসে ব্যক্তিগতভাবে কুরআন তেলাওয়াত, এর অর্থ বোঝা এবং কুরআন খতম দেয়ার চেষ্টা করতে পারি।

করোনার ফলে লকডাউন একদিকে যেমন পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘদিন পর একসাথে দীর্ঘক্ষণ সময় কাটানো, পারিবারিকবন্ধন বৃদ্ধিসহ নানারূপ ইতিবাচক অবস্থার সুযোগ এনে দিয়েছে, তেমনি এই সুযোগে আমরা সবাই নিজ ধর্ম বোঝার এবং তা প্রাক্টিস করারও একটা সুবর্ণ সুযোগ লাভ করেছি। আসুন, এ সুযোগ আমরা কাজে লাগাই পুরোপুরি।

লেখক:
Ahmad Tabshir Choudhury
আহমদ তবশির চৌধুরী, আইটি প্রফেশনাল এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা।

*প্রকাশিত এ লেখার মতামত ও বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.