লায়লা হাসান: ‘ও আলোর পথযাত্রী…’

Comments

। সঙ্গীতা ইমাম ।

এম এ আউয়াল ও লতিফা আউয়ালের সাত সন্তানের মধ্যে তৃতীয় রোজী। গোলাপের মতো ফুটফুটে নাতনিকে দেখে বড়ো দাদু খান বাহাদুর আলী আহমদ নাম রাখেন রোজী। পোশাকি নাম লায়লা নার্গিস। বড়ো ভাই আর বড়ো বোনের মনু ( এফ আর এম হাসান) আর খুকু (ডেইজি), তারপর পিঠাপিঠি বেবি (নাজমা), ভাই বাবুল (তারেক আহসান), খোকন, সব শেষ আদরের বোন টুকটুক (মাসুমা)।

বৈতালিকের শাপমোচনের দৃশ্যে লায়লা হাসান

পুরো পরিবারই সংস্কৃতিমনা। বাবা এম এ আউয়াল সঙ্গীত প্রিয় মানুষ কো-অপারেটিভ কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজের আনন্দে বাঁশি বাজাতেন, মায়ের ডাক নাম আনারকলি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কন্যা; ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খাঁর ছাত্রী, শিখতেন সেতার। ছেলে মেয়েদেরকে তৎকালীন স্বনামধন্য সঙ্গীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে ভর্তি করে দেন। রোজি শিখতেন নাচ।

লায়লা হাসান

তবে নাচ শেখার বহু আগে থেকেই তিনি আয়নার সামনে নেচে নেচে নিজেকে দেখতেন। তাঁর প্রথম নৃত্য পরিবেশনা আড়াই বছর বয়সে। স্টেজে অতো ছোটো মানুষকে দর্শকরা দেখতে পান না বলে বড়ো একটা টেবিলে তুলে দেওয়া হয় এবং সেখানেই তিনি তাঁর পরিবেশনা দেখান। ছোটোবেলার পাড়ার পরিবেশটাও ছিল সংস্কৃতিচর্চার অনুকূল। থাকতেন প্রথমে টিকাটুলি, পরে হাটখোলায়। ফুল তুলতে যেতেন কবি সুফিয়া কামালের বাড়িতে। তাঁর ছেলেমেয়েরা ছিলেন খেলার সাথী। হাটখোলার বাড়ির পাশে থাকতেন মোহাম্মদ মোদাব্বের এবং কবি হোসনেয়ারা দম্পতি; তাঁদের সন্তানদের সাথেও ছিল এ পরিবারের সন্তানদের সখ্য। এক অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে কেটেছে রোজির শৈশব। কোনো এক বছর দুর্গাপূজার অষ্টমীতে কুমারী পূজায় তাঁকে প্রতিমা সাজানো হয়েছিল। এমনই ছিল তখনকার সময়টা। 

টিকাটুলির বাড়িটিতে খান বাহাদুর আলী আহমদ থাকতেন তাঁর এক ছেলে, এক মেয়ে এবং তাঁদের পরিবার নিয়ে। রোজির একমাত্র মামা অধ্যাপক খান সরওয়ার মুরশিদ, মামী রাজনীতিক নুরজাহান মুরশিদ। তাঁদের চার সন্তান। বাড়িতে রোজির বড়ো দাদুর (আলী আহমদ) প্রেসও ছিল। এই প্রেস থেকে নিয়মিত পত্রিকা প্রকাশ হতো। 

বিয়ে ১৯৬৫

বাবা এম এ আউয়াল তাঁর সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক পাশ করেন। তাই তিনি ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন। ছেলেরা পড়তেন সেন্ট গ্রেগেরি স্কুলে। ডেইজি, রোজি, বেবি প্রথম ভর্তি হন নারীশিক্ষা মন্দিরে, পরে কামরুননেসা স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেন। রোজি ইডেন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে বিএ পড়তে ভর্তি হন বদরুন্নেসা কলেজে। পড়াশুনার পাশাপাশি চলতে থাকে নাচ শেখা; মুকুল ফৌজের সদস্য ছিলেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করতেন , দেশ-বিদেশে নৃত্যশিল্পী হিসেবে ডেলিগেট হয়ে গিয়েছেন । রেডিওতে নাটক করতেন । ইউএসআইএস-এর নাট্যশিল্পী হিসেবেও নাটক করতেন। এখানেই পরিচয় হয় তখনকার চিত্রজগতের জনপ্রিয় নায়ক সৈয়দ হাসান ইমামের সাথে। ১৯৬৫ সালের ৩০ জুন তাঁরা শুরু করেন তাঁদের যুগলজীবন।

কন্যার প্রথম জন্মদিনে

এই বিবাহিত জীবনে তিনি প্রবেশ করেন লায়লা হাসান হয়ে। শাশুড়ি সৈয়দা সঈদা খাতুনের আদরের রোজি বিভিন্ন মহড়ায় অনুষ্ঠানে যেতেন শাশুড়ির সাথে। এর মধ্যে টেলিভিশন আসে দেশে। টেলিভিশনে নাচ ও নাটকের শিল্পী হিসেবে নিবন্ধিত হন। শহিদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী অনূদিত টেলিভিশনের একটি ঐতিহাসিক নাটক উইলিয়াম শেক্সপিয়রের মুখরা রমনী বশীকরণে অভিনয় করেন।

বিয়ের পরে বিএ পরীক্ষা দেন। বিএ পরীক্ষার পড়া নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বাইরের ঘরে আলাদা পড়ার ঘর করে দেওয়া হয়েছিল। হাসান ইমাম নিজে পড়াতেন স্ত্রীকে। গাড়িতে পরীক্ষার হলে নিয়ে যেতে যেতে সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর আলোচনা করতেন। বিএ পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে এমএ পড়তে ভর্তি হন। এরই মধ্যে কন্যা সন্তানের জননী হন। শুরু হয় স্বাধীনতা আন্দোলন। সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এই আন্দোলনে। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ছিলেন। বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থার পবিরেশনায় নৃত্য পরিচালনা ও পরিবেশন করেন।

দেশ স্বাধীন হলে নৃত্যশিল্পী ও নৃত্য-পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান লায়লা হাসান। ছায়ানটে নৃত্য  শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন কিছুদিন। সংসার সন্তান তাঁর প্রথম অগ্রাধিকার বলে তিনি চাকরি করেননি কোনোদিন। এরই মধ্যে আরো এক কন্যা ও এক পুত্রের জননী হন লায়লা হাসান। যৌথ পরিবার সন্তান শাশুড়ি ও বৃহত্তর পরিবারের দায়িত্ব পালন করেও বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন ও আছেন এখনও । তিনি ‘বৈতালিক’ নামে একটি সংগঠনের সভাপতি ছিলেন। বৈতালিক ৭৮-৮০/৮১ সাল পর্যন্ত মহিলা সমিতি, গাইড হাউজে দর্শনীর বিনিময়ে নৃত্যনাট্য পরিবেশন করতো নিয়মিত। এসময় তাঁর নৃত্য নির্দেশনায় রবীন্দ্রনাথের শাপমোচন, শ্যামাচন্ডালিকা ইত্যাদি এবং নজরুলের শিল্পী নৃত্যনাট্য নিয়মিত শো হতো। এসব নৃত্যনাট্যে তিনি অংশগ্রহণও করতেন। ৮১ সালে তিনি বিটিভিতে শিশুদের নৃত্যশিক্ষার নিয়মিত অনুষ্ঠান ‘রুমঝুম’ শুরু করেন, যা তিন প্রজন্মের প্রিয় অনুষ্ঠান হয়েছিল। পরবর্তীকালে ‘নটরাজ’ নামে সংগঠন গড়ে তোলেন। নটরাজ তাঁর পরিচালনায় নৃত্যের পাশাপাশি নিয়মিত নাটক পরিবেশন করতো ঢাকার মঞ্চগুলোতে। পরবর্তীকালে তিনি খেলাঘরের প্রেসিডিয়াম মেম্বার হন। আজও তিনি খেলাঘরের সাথে একইভাবে যুক্ত।

শাশুরির সাথে

শিশুকিশোরদের মানসিক বিকাশের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শহিদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলনে ছিলেন সক্রিয়। এছাড়াও, নৃত্যশিল্পী সংস্থার সভাপতি এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহ-সভাপতি  হিসেবে শিল্পীদের নানা অধিকার আদায়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃত্যকলা বিভাগ শুরু হয়। তিনি একুশে পদকের প্রাপ্ত অর্থ নৃত্যকলা বিভাগের তহবিলে প্রদান করেন। বর্তমানে তিনি নৃত্যশিল্পী ফেডারেশন বাংলাদেশের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

আজ তাঁর জন্মদিন। ৭৯ বছরে এসেও তিনি বাংলার সংস্কৃতিকে জাগরুক রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশপ্রেমী এই মানুষটি সারাজীবন অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা করেছেন, করছেন। মানবতার অমোঘ বাণীই তাঁর জীবনের পাথেয়, তাঁর শিক্ষার অবলম্বন।  মানুষের বিপদে যথাসম্ভব পাশে থাকার চেষ্টা করে যান আজও, এবং এই বোধ নিয়ে তিনি তাঁর ছাত্র-ছাত্রী ও তরুণ প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছেন প্রেরণা।

২৫তম বিয়ে বার্ষিকী

এভাবেই বহু মানুষের শুভ কামনায় ছেলে মেয়ে বউ নাতি নাতবউ এবং চতুর্থ প্রজন্মের কন্যা নিয়ে সুস্থ-সুন্দর জীবন কাটছে তাঁর। দেশপ্রেমিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী নৃত্যসারথি লায়লা হাসান দেশের এই ক্রান্তিকালে আজও চেয়ে থাকেন নতুন সূর্যের দিকে। জন্মদিনে অফুরান শুভেচ্ছা। শুভকামনা। এমনি করেই আমাদের সকলকে আগলে রেখে আমাদের শিল্পে-সংগ্রামে তিনি প্রেরণা যুগিয়ে যাবেন আরও বহুকাল। শুভ জন্মদিন, প্রণম্য লায়লা হাসান। 

লেখক পরিচিতি:
Sangita Imam
সঙ্গীতা ইমাম
কন্যা, লেখক, শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী; ঢাকা

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট