লুইতের পুত্র ভাগীরথীর সন্তান । শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার

Comments

লুইতের পুত্র ভাগীরথীর সন্তান

শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার

ভূপেন হাজারিকার কথা মনে পড়লেই মনের ভেতর ভেসে উঠল ১৯৮২ সালের একটা সকালের স্মৃতি। শিলচরে একটি সাংস্কৃতিক উৎসবে এসেছেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। মহড়ার ফাঁকে স্হানীয় শিল্পী বুদ্ধিজীবীদের সাথে আলোচনায় উঠে এল ভূপেন হাজারিকা প্রসঙ্গ। কেউ একজন বোধহয় মৃদু সমালোচনা করেছিলেন ভূপেন হাজারিকার। রাগে ফুঁসে উঠলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। বললেন, ভূপেন যখন হারমোনিয়াম নিয়ে দাঁড়াবে, গাইতেও হবে না, কথা বললেই দশ হাজার মানুষ স্তব্ধ হয়ে যাবে। আর কে আছে এমন? ভূপেন হচ্ছে সত্যিকারের গণশিল্পী। রাজনৈতিক সামাজিক নানা প্রশ্নে একটি বিশেষ অবস্থান গ্রহণ করলেই একজন শিল্পী গণশিল্পী হয় না। সেই গণশিল্পী যে এই অবস্থান গ্রহণের সাথে সাথে সঙ্গীত বা শিল্পের মধ্যে দিয়ে তাঁর বার্তা মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে পারে অনায়াসে। এই গুণের জন্যই ভূপেন হাজারিকা একজন গণশিল্পী। প্রকৃতপক্ষে হেমাঙ্গ বিশ্বাস ছাড়া আর কে পারতেন ভূপেন হাজারিকার একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করতে। কলকাতার কাছে বা পশ্চিমবঙ্গের কাছে ভূপেন হাজারিকার পরিচয় একজন আধুনিক গানের স্রষ্টা হিসাবে। কিন্তু আসামের মানুষের কাছে ভূপেন হাজারিকা একটি কিংবদন্তীর মত যিনি জীবদ্দশাতেই পরিণত হয়েছিলেন একটি প্রতিষ্ঠানে। তাঁর অবদান সঙ্গীতস্রষ্টার পরিসর থেকে সাংস্কৃতিক যোদ্ধার যুদ্ধক্ষেত্র অবধি বিস্তৃত। আসামে ভূপেন হাজারিকার নাম উচ্চারণ করলেই অবধারিত ভাবে উঠে আসবে গণনাট্য সঙ্ঘের কথা। গণনাট্য সঙ্ঘের কথা বললেই উঠে আসবে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের নাম। ভূপেন হাজারিকার নামের সথে বাকি এই দু’টি নাম বাদ দিয়ে আলোচনা সম্পূর্ণ হতে পারে না। ১৯৬১ সালে যখন সারা রাজ্যজুড়ে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা দেখা দিয়েছিল, যখন আইন রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলিও কোনোভাবেই শান্তি আনতে পারছিলেন না, তখন পথে নেমেছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও ভূপেন হাজারিকা। উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যের শিল্পীদের নিয়ে তৈরি করেছিলেন এক শান্তির অভিযাত্রীদল। ঐতিহাসিক ‘হারাধন-রঙমন কথা’ গানের জন্মও এই সময়েই। যৌথভাবে এই গানটি লিখেছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও ভূপেন হাজারিকা। হারাধন একজন বাঙালি কৃষক, রঙমন অসমীয়া কৃষক। হারাধন কথা বলে ভাটিয়ালি সুরে, রঙমন বিহুর সুরে ও ছন্দে। হারাধন কথা বলে বাংলায়, রঙমন কথা বলে অসমীয়া ভাষাতে। দুজনই কথা বলে নিজের ভাষায়, গান গায় নিজের লোকায়ত সুরে। নিজের নিজের ভাষায় ও সুরে রচিত হয় একটি সাঙ্গীতিক সেতু দু’টি হৃদয়ের মধ্যে। ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গায় আক্রান্ত হারাধনের পাশে দাঁড়ায় রঙমন। নিজেদের দুঃখের কথা শোনায় একে অপরকে। তারপর বিহু ও ভাটিয়ালির মিলনে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় তাঁরা মিলিত হয় বসন্তোৎসবে। এই গানকে কন্ঠে নিয়ে সেদিন শিলং থেকে সদিয়া অবধি সংগঠিত হয়েছিল শান্তিযাত্রা। পুলিশ মিলিটারি লাঠি বন্দুক দিয়ে যে শান্তি আনতে পারে নি, আসামের গণনাট্যের দুই শ্রেষ্ঠ সন্তান হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও ভূপেন হাজারিকা সেদিন সেই অভাবনীয় কাজটি করেছিলেন। একের পর এক শহরে যখনি সেদিন শান্তিযাত্রা প্রবেশ করেছে, অবিশ্বাসের বাতাবরণ কেটে গিয়ে কাছাকাছি এসেছে বিবদমান দুই ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ। এভাবেই এই শান্তিযাত্রা যখন নগাঁও শহরে আসে, তখন সেখানে বসে ভূপেন হাজারিকা রচনা করেছেন তাঁর ঐতিহাসিক গান ‘মানুহ মানুহর বাবে’ গানটি, যা পরবর্তীতে তাঁর বেশিরভাগ গানের মত বাংলায় অনুদিত হয় ‘মানুষ মানুষের জন্য’ হিসেবে। তখন আসামের মানুষের মধ্যে প্রচার হচ্ছিল দেশভাগের বোঝা এই উদ্বাস্তুদের দায়িত্ব কেন নেবে আসামের মানুষ। সেই প্রচারের উত্তরেই ভূপেন হাজারিকা লিখেছিলেন, ‘দুর্বল মানুহ যদি / জীবনর কোবাল নদী / পার হয় তোমার সাহত / তুমি হেরুয়াবানো কি? (বল কি তোমার ক্ষতি / জীবনের অথৈ নদী / পার হয় তোমাকে ধরে দুর্বল মানুষ যদি)’। বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানবতার চিরন্তন বার্তাই পৌঁছে দিয়েছিলেন এই গানে। বাংলা অনুবাদে অনেক সময়ই মূলের আবেদনটি যথার্থ মাত্রায় হাজির হয় না। এই গানের ক্ষেত্রেও তাই। যে সময়ে এই গানটি লেখা হচ্ছে নগাঁও শহরে বসে তখন অসমীয়া বাঙালি পরস্পর একে অপরের বিরুদ্ধে দুটো আলাদা শিবিরে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। হেমাঙ্গ বিশ্বাস তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘…নগাঁও সম্বন্ধে আমাদের ভাবনা ছিল। কারণ নগাঁও-এ দাঙ্গা ব্যাপকতা লাভ করেছিল। … নগাঁও-এ আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন স্বনামধন্য নাট্যকার সারদা বরদলৈ, বিশিষ্ট সঙ্গীতবিদ ইক্রামূল মজিদ, তারিকুদ্দিন আহমেদ, প্রণতি সইকিয়া, চিত্রাভিনেতা তছদ্দুক ইউসুফ। … আমার স্পষ্ট মনে আছে, অনুষ্ঠানের পর তিনজন ছাত্র আমার কাছে এসে অনুতপ্ত স্বরে স্বীকার করেছিল যে তারা দাঙ্গায় যোগ দিয়েছিল’। তখন অসমীয়াও নয়, বাঙালিও নয়, মানুষের পরিচয়ে একে অপরকে কাছে আসার আবেদন রেখে ভূপেন লিখছেন, ‘মানুহে মানুহর বাবে / যদিহে অকনো না ভাবে / অকুনু সহানুভূতিরে ভাবিব কুনেনু কোয়া, সমনিয়া (মানুষ মানুষের জন্য, যদি এইটুকুমাত্রও না ভাবি, তবে সামান্য সহানুভূতি নিয়ে কে আর দাঁড়াবে বল, সুজন?)”। বাংলায় ‘মানুষ মানুষের জন্যে’-এর পর ‘জীবন জীবনের জন্যে’ যোগ করায় মনে হয় মঞ্চের ওপর থেকে কেউ ভাষণ দিচ্ছে, আর শ্রোতারা মঞ্চের নিচে বসে শুনছে। পক্ষান্তরে মূল অসমীয়াটি শুনলে মনে হয় কোনও সহমর্মী বন্ধু ভাবাবেগে চালিত কোনও বিপথগামী সহ-নাগরিকের পিঠে আলতো করে স্পর্শ করে সহৃদয় কথোপকথনে রত হয়েছ।

১৯৬১ সালের শান্তিযাত্রার মত ঘটনা বা সেই যাত্রার জন্য লেখা ‘হারাধন-রঙমন কথা’র মত গান ভারতবর্ষ্যের অন্য কোনো রাজ্যের গণনাট্য আন্দোলন বা সমধর্মী সংস্কৃতি আন্দোলনের ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি ঘটেছে কি না আমার সন্দেহ আছে। আমার দুঃখ হয় আসামের বাঙালি অসমীয়া কোনও সম্প্রদায়ই তাঁদের জাতির জীবনের এই মহৎ সৃষ্টিটি বা এই উজ্জ্বল ইতিহাসকে তেমনভাবে মনে রাখে নি। গত শতকের আটের দশকে অসমীয়া বাঙালির মধ্যে আবার অবিশ্বাস ও সংঘর্ষের বাতাবরণে এই গানটিকে গাইতেন ভূপেন-হেমাঙ্গ পরবর্তী যুগের গণনাট্য শিল্পী বিভু চৌধুরী ও ঘনকান্ত ডেকা। তাঁদের পথ অনুসরণ করে আমিও এই গানটি গেয়ে থাকি। কয়েক বছর আগে কলকাতায় গণসঙ্গীত মেলায় আমি ও ঘনকান্ত ডেকা এই গানটি গেয়েছিলাম। কলকাতার শ্রোতারা বিস্মিত হয়েছিলেন গানটি শুনে। অবশ্য ভূপেন হাজারিকা ও হেমাঙ্গ বিশ্বাস ১৯৬১ সালে কলকাতার রঞ্জি স্টেডিয়ামের গণনাট্য উৎসবে এই গানটি গেয়েছিলেন। সেও আজ এক বিস্মৃত ইতিহাস। অথচ এই গানটি শুধু গান নয়, এতে নিহিত আছে ভালোবাসা বোধের, সাংস্কৃতিক ঐক্যের সঠিক পথনির্দেশক সুগভীর বার্তা। প্রথমত, আজকের আসামে ওপার থেকে আসা মানুষমাত্রেরই প্রতি এক ধরনের বিরূপতার আদর্শকে মান্য করানোর প্রচেষ্টা হয়, এ গানে স্পষ্টতই তার বিপরীত মূল্যবোধের কথা। এখানে দেখা যায়, ভিটেমাটি হারিয়ে আসা ওপার বাংলার এক শ্রমজীবী উদ্বাস্তুর বন্ধুত্ব গড়ে উঠছে এই মাটির অসমীয়া শ্রমজীবীর। এখানে একজনকে আরেকজনের জীবন জীবিকা কেড়ে নিতে আসা মানবগোষ্ঠী হিসেবে প্রতিপন্ন করা হচ্ছে না। বরং বলা হচ্ছে, ‘তুমিয়ে মোয়ে দেশখন গড়তে, যদিহে কেচাঘাম সরে / দুয়োরে ঘামেরে মিলনে দেখিবা বুরঞ্জী রচনা করে (এই দেশকে গড়ে তুলতে গিয়ে তুমি আর আমি যে ঘাম ফেলি শরীর থেকে, সেই ঘামের মিলনে ইতিহাস রচিত হয়)’। এখানে দু’টি শ্রমজীবীর কর্মের ঐক্যে ঘর্মের মিলনে ইতিহাস রচনার কথা বলা হচ্ছে। আগের পংক্তিতে বলা হচ্ছে, ‘ভাষা না বুঝিও যুগে যুগে আহে / মানুহে মানুহর পিনে / মরমর ভাষারে আখর নাইকিয়া / বুঝিব খুঁজিলে চিনে / গঙ্গার চাপরির তলিতে দেখিবা লুইতর পলস আছে / তোমারে মোরে আইয়ে কান্দিলে একই চকুপানি মোছে (ভাষা না বুঝলেও মানুষ যুগে যুগেই একে অপরের দিকে হাত বাড়িয়েছে / কারণ ভালোবাসার ভাষার যে বর্ণমালা হয় না / গঙ্গার গর্ভে চলে গেলে ব্রহ্মপুত্রের পলিমাটি খুঁজে পাবে / তোমার আর আমার মা যখন কাঁদে তখন অভিন্ন অশ্রু ঝরে)’। আমাদের পারস্পরিক দেওয়া নেয়ার যে আবহমান ইতিহাস, তার থেকে সমাজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়ার আয়োজনই আজ চতুর্দিকে। এই গানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্যকে মর্যাদা দিয়ে ভ্রাতৃত্বের সংলাপ রচনা। এখানে হারাধন কথা বলে বাংলার ভাটিয়ালি সুরে, রঙমন কথা বলে অসমীয়াতে বিহুর সুরে। দুটি ভিন্ন ভাষা ও সুর তাদের দুজনের মধ্যেকার সংলাপ নির্মানে প্রতিবন্ধক নয়। একের সংস্কৃতি অপরের সংস্কৃতিকে গ্রাস করে না। বরং গানের শেষ পর্যায়ে দেখি বাংলা গানের বাণীতে মিশে যায় অসমীয়া বাচন, গানের সুর আরোহে ভাটিয়ালি থেকে অবরোহে বিহু হয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে তৈরী হয় একটি তৃতীয় সুর, যা আমাদের সকলের ইপ্সিত মিলনের সুর।

ভূপেন হাজারিকা গানের পথ ধরে আজীবন পাড়ি দিয়েছেন ঘর থেকে বাহির, দেশ থেকে বিদেশ, গাঁয়ের ছোট নদী বা ছোট্ট পাহাড়ি ঝর্ণা থেকে সাগরসঙ্গমে। তাঁর ‘মানুহ মানুহর বাবে’ গানের মূল অনুপ্রেরণার দিকে তাকালে দেখব, তাঁর গানের সফর শুধু ভূগোলের সফর নয়, এক ভাব থেকে অন্য ভাবেও। উনবিংশ শতকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার লোকগান টম ডুলি ছিল একটি ত্রিকোণ প্রেমের গল্প, যার নিষ্ঠুর পরিনতি, এক প্রেমিকার হাতে অন্য প্রেমিকার খুনকে নিজের কাঁধে বহন করে ফাঁসির কাঠে জীবন দান করা প্রেমিক টম ডুলির প্রতি শোকজ্ঞাপন। সেই গান হাজার হাজার মাইল পথ পেরিয়ে কত সাগর নদী পেরিয়ে ব্রহ্মপুত্র তীরে এসে হল ফাটলধরা মানুষের সমাজে সেতুবন্ধনের গানে। বলা বাহুল্য, ভূপেন হাজারিকা কেবলমাত্র তাঁর গানের প্রথম স্তবকেই টম মুডির ছায়া রেখেছেন। পরে গান এগিয়েছে, ভূপেনীয় সঙ্গীতের সহজাত সরণি বেয়ে একটি খাঁটি ভারতীয় সুরে। একই যাত্রা দেখেছি আমরা, রবসনের ‘ওল্ড ম্যান রিভার’ থেকে ‘বিস্তীর্ণ পাররে’, একটু ভিন্ন ভাবে। ‘ওল্ড ম্যান রিভার’ গানটি মিসিসিপি নদীর কৃষ্ণাঙ্গ মাঝির গান, যাঁর জীবননদীতে কোন পার নেই, কোনও আনন্দ নেই, আছে শুধু অন্তহীন পারাপার নদীর বুকে। শুধু অন্তহীন দাঁড় বাওয়া। ভূপেন হাজারিকার সৃষ্টিতে গানটি হল নদীর প্রতি নিবেদিত দুপারের মানুষের হাহাকারের গানে, যেখানে বর্ণিত হয়েছে মানুষের বঞ্চনার কথা, শোষণের কথা। নদীর কাছে ভূপেন হাজারিকা প্রার্থনা করেছেন লড়াইয়ে গর্জে ওঠার অনুপ্রেরণা। গানটি রচিত হয়েছিল গত শতকের আসামের খাদ্য আন্দোলনের সময়।

ভূপেন হাজারিকা অনন্য আরো বহু কারণে। অসমীয়া আধুনিক গানে যেমন তিনি উত্তর পূর্বের শেকড়ের সুর যুক্ত করেছেন। তাঁর গানে গোয়ালপাড়ার সুর থেকে শুরু করে কামরূপীয়া লোকগান, পাশ্চাত্যের সুরের সাথে মিশে যায় অরুণাচল প্রদেশের লোকসুর। আবার অবলীলায় কোথাও খুঁজে বাংলার লোকায়ত সুর। ভূপেন হাজারিকার গানের মধ্যে একই সাথে শেকড় আর বিশ্বের স্পন্দন শুনতে পাওয়া যায়। শুধু অসমীয়া গান কেন বাংলা আধুনিক গানের ক্ষেত্রে ভূপেন হাজারিকা এক যুগান্তরের কারিগর। ছোট ছোট মানুষের ছোট ছোট আশা নিরাশা দুঃখ সংগ্রাম পরাজয় মূর্ত হয়েছে তাঁর বাংলা ও অসমীয়া আধুনিক গানে। তিনি একই সাথে দু’টি ভাষার আধুনিক গানকে বিশ্বের প্রতিবাদী গানের সহ-পথিক করেছেন। সমকালীন অন্যদের মত চাঁদ জ্যোৎস্না তুমি আমি-র কারাগারে বন্দী করেন নি। ‘কোনও এক গাঁয়ের বধুঁ’র মধ্যদিয়ে বাংলা আধুনিক গানে চল্লিশের প্রতিবাদী গানের উত্তরাধিকার রচনার প্রচেষ্টা করেছিলেন সলিল চৌধুরী। কিন্তু পরে তিনি আর এই প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতা না রেখে সঙ্গীতের আধুনিকতা নির্মানে মনোনিবেশ করেন। বাংলা গানের তাত্ত্বিকেরা এই উত্তরাধিকারকে অনেক পরে আবিষ্কার করেন সুমনের গানে। কিন্তু ভূপেন হাজারিকা সম্পর্কে তাঁরা নীরব। অথচ ওই উত্তরাধিকার তো তিনি পাঁচের দশক থেকেই ক্লান্তিহীন রচনা করেছেন। সম্প্রতি একটি আলোচনায় কবীর সুমন মার্কুজকে উদ্ধৃত করে বলেন, একটি শিল্প তখনই যথার্থ রাজনৈতিক শিল্পের রূপ নেয় যখন সেখানে বিষয়টিই আঙ্গিক হয়ে উঠেছে অর্থাৎ যেখানে কনটেন্টটাই ফর্ম হয়ে উঠেছে। বাংলা গানের ক্ষেত্রে ভূপেন হাজারিকার গানের যে মর্মবাণী সেটাই কি তাঁর আঙ্গিক বা ভাষা হয়ে ওঠে নি? পাঁচটি দশক ধরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে যে গান গেয়ে এসেছেন সেখানে শ্রোতা পেয়েছিল একটি নতুন সুর, নতুন বাণী, নতুন কন্ঠ যেখানে শেকড়ের ঘ্রাণের পাশাপাশি বিশ্বের উদ্ভাস আছে। প্রকৃত আধুনিক সৃজনের আর কী চাহিদা থাকতে পারে? আমার এটা ভাবতে ভালো লাগে, বাঙালি তার গানে যে দু’টি নতুন ধরনের কন্ঠ শুনেছে দু’টি ভিন্ন সময়পর্বে, সেই দু’টি-ই উত্তর পূর্বের এবং যাঁদের সূত্রে এই শোনা তাঁরা জন্মসূত্রে কেউই বাঙালি ছিলেন না। একজন অসমীয়াভাষী ভূপেন হাজারিকা, আরেকজন ত্রিপুরার উপজাতি রাজপরিবারের রাজকুমার শচীন দেববর্মন।

তবে তাঁকে নিয়ে আমাদের মুগ্ধতা ও অহংকার নয়, দীর্ঘশ্বাসও ছিল। প্রথমটি যেমন সত্য, সত্য দ্বিতীয়টিও। ১৯৬১ সালের ভাষাদাঙ্গার সময় যিনি ভাষিক সংখ্যালঘু মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন কন্ঠে মিলনের গান নিয়ে আশির ‘বিদেশি বিতাড়ন’ আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন নীরব। শুধু নীরব ছিলেন কেন বলব, এই সময়ে রচিত তাঁর কিছু গান উৎসাহ যুগিয়েছিল উগ্র জাতীয়তাবাদীদেরই, যা তাঁর অজানা ছিল না। আশির এই উন্মাদনার সময় বৃদ্ধ বয়সেও আবার কলকাতা থেকে ছুটে এসেছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। চেয়েছিলেন ষাটের বন্ধুদের নিয়ে আবার শান্তিযাত্রায় বেরোবেন। তাঁকে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে যেতে হয়। শুধু ভূপেন কেন, সেদিনের সংগ্রামী সহ-পথিকদের অনেকেই রাজি ছিলেন না উগ্র জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগের বিরুদ্ধে পথে নামতে। তবে ইতিহাস তো সবসময় একইভাবে পুনরাবর্তিত হয় না। ফিরে ফিরে আসে, তবে অন্যরূপে, অন্য নায়কদের অভিষেক ঘটিয়ে। ষাটে পথে নেমেছিলেন গণনাট্যের শিল্পী সৈনিকেরা। তখন তাঁদের রাজনৈতিক সহ-পথিকদের প্রতিরোধ গড়ার মত সাংগঠনিক শক্তি ছিল না। কিন্তু আশিতে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। ভূপেন হাজারিকারা পিছিয়ে গেলেও পিছিয়ে ছিলেন না তাঁদের সাংস্কৃতির আন্দোলনের দ্বারা উদ্বুদ্ধ আসামের বামপন্থী ছাত্র-যুব আন্দোলনের কর্মীরা। ওই উন্মাদনার দিনগুলিতে বিভেদহীন ঐক্যবদ্ধ আসামের স্বপ্ন বুকে ধারন করে ভাষিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জীবন সম্পত্তি রক্ষায় তাঁরা নিজেদের জীবন দিয়েছেন অকাতরে। ষাটে ‘হারাধন-রঙমন কথা’ গেয়ে শান্তিযাত্রা করে ভূপেন হাজারিকা-হেমাঙ্গ বিশ্বাসরা। আশিতে ভূপেন হাজারিকা-হেমাঙ্গ বিশ্বাসদের সাংস্কৃতিক রাজনীতিকে বুকে ধারন করে কন্ঠে নয়, জীবনবীণায় ‘হারাধন-রঙমন কথা’ গেয়েছেন কয়েক শত বামপন্থী অসমীয়া ছাত্রযুবক। যেদিন সত্যিকারের মিলনবিহুর বসন্তোৎসব হবে অনাগতকালে সেদিন আবার সোনার রঙে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবেন আজকের ভুলে যাওয়া সেই শহীদেরা। এই অবিস্মরণীয় আত্মাহুতির সময় তাঁদের পাশে ছিলেন না ভূপেন হাজারিকা। প্রত্যক্ষভাবে না হলেও তাঁর মন খানিকটা ঝুঁকেছিল বিপরীত মেরুতে। এই নীরবতায় দুঃখ পেয়েছিলেন তাঁর পুরনো সতীর্থ ও তাঁদের উত্তরসূরীরা, তবু তাঁকে প্রত্যাখান করেন নি তাঁরা। শেষ বয়সে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দলের হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা মেনে নেয় নি রাজ্যের সাধারণ মানুষও। তাঁরই গানকে কন্ঠে ধারণ করে তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন তাঁরা। নির্বাচনী ফলাফলে দেখা গেল তাঁর গানের কাছে ব্যক্তি ভূপেন হাজারিকা পরাজয় বরণ করেছেন। পরে তিনিও বুঝতে পেরেছিলেন নিজের ভুল। সরে এসেছিলেন এই সর্বনাশা পথ থেকে। মৃত্যুর পর তাঁর গোটা জীবনকে আজ চোখের সামনে মেলে ধরলে দেখি এই স্খলনগুলি সত্ত্বেও তাঁর ব্যক্তিত্ত্বের প্রভা কখনো ম্লান হয় নি। তাঁর মহৎ কীর্তিগুলি অননুকরনীয়, যার জন্য জীবদ্দশাতেই তিনি পরিণত হন কিংবদন্তীতে। তাঁর মৃত্যুর দিনে কলকাতার বন্ধুদের বলেছিলাম, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর বাংলার মানুষ যেভাবে শোকস্তব্ধ হয়েছিল, অবধারিতভাবে আসামেও তাই হবে। তাই হয়েছিল। দিনের পর দিন দোকানপাট বন্ধ, মানুষ শোকস্তব্ধ, তাঁর নিজের গ্রামে প্রায় একমাস ধরে সামূহিক অরন্ধন – সামাজিক মানুষের শোকের বহিঃপ্রকাশের এমন দৃষ্টান্ত আসামের মানুষ ইতোপূর্বে দেখে নি। ভূপেন হাজারিকা কিংবদন্তীর পাশাপাশি ছিলেন স্বপ্ননায়কও। অন্যরাজ্যে চলচ্চিত্র অভিনেতারা পরিণত হন স্বপ্ননায়কে। যেমন বাংলায় উত্তমকুমার, তামিলনাড়ুতে এমজিআর, আসামে এই স্বপ্নপুরুষের আসন জুড়ে আছেন একজন গায়ক, গণনাট্য আন্দোলনের সরণি বেয়ে খ্যাতির শীর্ষে ওঠা একজন গণশিল্পী, যাঁর নাম ভূপেন হাজারিকা। আধুনিক আসামের তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ আইকন।

বাঙালীয়ানা/এমএ/জেএইচ

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.