সিংহ ঋতু
অচেনা লণ্ঠন থেকে ঠিকরে আসে গোপন আলোক
ক্রমে ক্রমে অর্দ্ধাচারী হয়ে ওঠে চতুর বিন্যাসে
কতোকাল কেটে গ্যালো পৃথিবীর মৌল অন্ধকারে
দিনান্তে মাতাল সব ফেরারীর হাতে কব্জা ক’রে
অটল মেঝের নিচে তাদের সমস্ত ভার জমা
কানগুলি উড়িতেছে বহুস্তর শব্দদের লোভে
কট্টর স্বরের লোভে আর
স্বপ্নে দেখি অবিকল উদর শোধনাগার জ্বলে
যেখানে কেশর পুড়ে তৈরি হয় প্রত্যহের ঘুম
জানি না কী ভুল থেকে শুরু হয় এই নিদ্রা তবে
বর্ষায় আমূল খোঁড়া সড়কের বেদনা অবধি
রক্তস্রোত আজো আছে প্রহর কম্পিত করা সুরে
হত লাল থাবার বঙ্কিম রেশ ঘোরে ফেরে ভেজা বারান্দায়
আমাকে বিশ্বাস করো আমি কোনো অপর জানি না
এই খেলা সেরে গেলে অন্য বহু অভিধা লাফায়
আর আলোক সংবেদ ভেবে ভুল আস্তরণে মাথা কুটে
এখন পাগলপারা স্রোতের বিপক্ষে লেনদেন
অনেক লালার স্বাদ লেপ্টে আছে কমনীয় ত্বকে
নখের চিহ্নের আঁচে উপত্যকা ঘুরে উঠে আসা
একটি অচল মোহ ডিঙিয়ে কাতর সেই ত্বক
সমস্ত সাধের বিনিময়ে শুধু প্রাণ ভিক্ষা করে
সমস্ত সাধ্যের বিনিময়ে আজ প্রাণ ভিক্ষা করে
সম্ভবত নৃশংসতা কেটে গ্যাছে মহুয়া প্রভাবে
আঠালো বলয় এসে এঁটে বসে রাতজাগা ঘাড়ে
এখন সমস্ত দেনা চুকে গেলে বড়ো ভালো হয়
এখন গভীর আর অতীত লেহন করা চকিত ভুলের
ক্ষমার অযোগ্য কথা ব্যথাতুর থাবাতে মিলায়
জানি না কী ভুল থেকে শুরু হয় এই ঘুমঘোর
আস্তে আস্তে সিংহপনা মিশে যায় অচেনা আভায়

এইখানে থামো ট্রেন
এইখানে থামো ট্রেন মাঠের পাশেই
একটু হিজলতলা একটু কাঁঠাল বন
তারপর খেলা শেষে পঙ্গপাল
গৃহে ফিরে যায় ধুলা মেখে
একে একে ছুটে আসে স্টেশনেরা
কিছুক্ষণ থেমে থাকে ফের ছোটে দূরে
আবছা দ্যাখার কথা খালি
জেগে জেগে থাকে
দ্রুতষ্মান আগের স্টপেজে
সোনাভান

শামীম কবীর
খুব ক্রূর মুখোশের মতো মনে হয় এই নাম। অতিকায়
রূপালী তিমির মতো–আমার মর্মমূলে এই খুব নিবিড়
আপন নাম নিদ্রিত রেখেছে এক বিশুদ্ধ আগুন (তন্দ্রায়
নিবে গ্যাছে তার সব তুখোড় মহিমা) এই প্রিয় সশরীর
নাম এক দাঁতাল মাছির মতো অস্তিত্বের রৌদ্র কুঁরে খায়
রাত্রিদিন; আষ্টেপৃষ্টে কাঁটাতার হোয়ে আছে–শামীম কবীর
এই তুচ্ছতর নাম : গোপনে, ত্বকের নিচে খুবনিরুপায়
এক আহত শিকারীর নামের মোহন ফাঁসে জড়ায় তিমির।
ইতিহাসে অমরতা নেই; পরিবর্তে রাশি রাশি বুলেটের
দক্ষ কারুকাজ করোটিতে, দগ্ধ লাশময় দীর্ঘ উপত্যকা
আর নীলিমার বোঁটা থেকে অনর্গল-নির্ভার নিঃস্বদের
জাতীয় সঙ্গীত ঝ’রে পড়ে। ক্যাবল কুচক্রী এইনাম-পাকা
নিকারীর মতো রোয়েছে অমর য্যান, আমার সকল পথে
অক্ষয় জালের ব্যূহ কোরেছে আরোপ কোন দুর্বার শপথে।

এই ঘরে একজন কবি
এই ঘরে একজন কবি আছে রক্তমাখা গালিচায় শুয়ে
কুয়াশার মতো–তার নিদ্রামগ্ন ভাসমান চোখে ধীরলয়ে
শীর্ণ এক নদীর প্রতিমা ফ্যালে সুরময় ছায়া, শতাব্দীর
শুদ্ধতম শিলাখণ্ড শিয়রে তার–ঠিক একগুঁয়ে
ধীবরের মতো: ছিন্নভিন্ন-ছেঁড়া জালে কৌশলে মরা নদীর
শ্রোণী থেকে অপরাহ্ণে রূপালী ইলিশ ছেঁকে নেবে; পঁচা ঘায়ে
গোলাপের মধু ঢালা-অভ্যেসে দাঁড়িয়েছে য্যান। ভীষণ অস্থির
হাতে সে ক্যাবল বিষণ্ণ খুঁড়ে চলে শব্দের গোপন তিমির।
কবির আঙুল থেকে অনর্গল রক্ত ঝরে আর মূর্তিবৎ
অন্ধকারে প’ড়ে থাকে সে–ক্যামন মর্মন্তুদ অদৃশ্য বল্কলে
ঢেকে অস্তিত্বের ক্ষত। অবশ্য মাঝে মাঝেই বদ্ধ ঘরময়
গলিত বাতাস কাঁপে অন্তর্গত সজীব গর্জনে: বাঁধা গৎ
ভুলে গিয়ে–নিদ্রিত কবির বীণা সহসা কী প্রখর আদলে
গড়ে সুরের প্রতিমা, অথচ খোলে না তার অন্ধচক্ষুদ্বয়।।

অনুসরণ
একজন অবিকল আমার মতোন লোক আজ সারাদিন
আমার সামান্য পিছে চলমান, যে রকম বিশ্বস্ত কুকুর
যে দিকেই যাই আমি, এলেবেলে ঘুর পথে, খুব শব্দহীন
পেছনে পেছনে সে-ও চলে; পার্কে, নদীর ধারে-শিষ্ট ময়ূর
য্যান পেখম গোপন কোরে আমার পেছনে চলে উদাসীন
পথিকের মতো। অকস্মাৎ পেছনে তাকালে দেখি, অল্পদূর
আনমনে ধরাচ্ছে সিগার সে, অথবা কখনো খুব মিহিন
রুমালে মোছে গরদানের ঘাম; বোঝে সে ক্যামন সুচতুর!
বুঝি না, সে কী কারণে এমন নাছোড় চলে, এ-তার ক্যামন
ব্যবহার: অবিকল আমার নকল কোরে মুখের গড়ন,
দৃষ্টির খরতা আর জটদার চুলের বহর, বেশবাস–
ক্যাবল ভিন্ন চলার প্রকৃতি তার; আমি চলি একা, আপন
খেয়ালে, আর সে আমার নিবিড় পেছনে ধায় জ্বলন্ত শ্বাস
কোরে সযত্ন গোপন, অদৃশ্য সঙ্গীন হাতে, নিজস্ব সন্ত্রাস।।

যে গ্যাছে, সে অন্য কেউ
যে গ্যাছে, সে–অন্য কেউ, আমি নই।
এতো তাড়াতাড়ি আমি যাবোনা এখান থেকে:
এতো তাড়াতাড়ি ক্লান্ত এই অবেলায়;
যে গ্যাছে, সে–অন্য কেউ আমি নই।
কোকিলের ঘুম ভাঙবার অনেক আগেই, অসমাপ্ত
যে বসন্ত চোলে গ্যাছে দৃষ্টির আড়ালে,
অন্যকোনো সীমিত বাতাসে—
সে আমাকে কানে কানে বোলে গ্যাছে, প্রতীক্ষায় থেকো:
—আবার শুকোবে জল, হলুদ পাতার শব্দে
সচকিত হবে বনভূমি গীর্জার চূড়োয় গাঁথা
ভগ্ন ক্রুশে সাদা চাদরের মতো
জমে যাবে মলিন তুষার, একজন
অবসন্ন পাদ্রী খুব কোমল আলোয় ঢাকা
চূড়ো থেকে পাঁচবার বাজাবেন তীব্র ঘণ্টাধ্বনি;
ভোর ঘুমে–তোমার চোখের কোনে অকস্মাৎ
জ্বলে উঠবে সঞ্চিত বারুদ।
কোনো একদিন ফের–বসন্তের চিঠি নিয়ে তোমার অচেনা
এক সম্পূর্ণ নোতুন গান গেয়ে উঠবে-তোমার বুকের মধ্যে
নিদ্রামগ্ন বিমূর্ত কোকিল;
শুধুমাত্র-পৃথিবীর শেষতম ভোরতক প্রতীক্ষায় থেকো—
আমিতো এখনো আছি সেই বসন্তের জন্যে অনন্ত উন্মুখ প্রতীক্ষায়
আমি কি অপর কোনো ফাল্গুনের কোলাহলে মগ্ন হোতে পারি?
অন্য কোনো কোকিলের গানে আমি হবোনা মাতাল।
অসমাপ্ত-সেই বসন্তের দ্যুতি চোখে নিয়ে, তারপরে যাবো আমি,
এখনতো নয়।
সমুদ্র দেখিনি আজো; শুধুমাত্র–সমুদ্র শঙ্খের
খুব ডোরাকাটা যোনিতে ঠেকিয়ে কান
তীব্র এক টাইফুন বোয়ে গ্যাছে সমস্ত শরীরে।
এক অসফল নাবিকের দৃঢ় হাতে হাত রেখে কথা দিয়েছিলাম :
আমিও আঁধার রাতে সামুদ্রিক ফ্যানা নিয়ে প্রবাল দ্বীপের
খুব গোপন রত্নের ঘরে হানা দেবো, একটানে ছিঁড়ে দেবো
মাস্তুলের-সমস্ত জালের মতো কীর্ণ দড়াদড়ি।
বৃদ্ধ নাবিক আজো উপকূলে বোসে আছে—
তীব্র দৃষ্টি, একা, হাতে ভাঙা হাল।
সূতরাং–সমুদ্র-শঙ্খের পেটে না ঢুকেই পালাবোনা আমি—
এতো তাড়াতাড়ি আমি যাবোনা এখান থেকে,
এই অবেলায়; অন্য কেউ চোলে গ্যাছে,
আমি নই; যে গ্যাছে, সে–অন্য কেউ।
পূর্বপুরুষের খুব মাটি মেশা জৈবসারে ভীষণ উর্বর
যে সমতল জমি—
সেখানে গহন এক তাজা বীজ পুঁতেছি গোপনে, নির্ঘুম রাতের শেষে
ঢেলেছি অঝোর বৃষ্টি, সোঁদা ঘাম, গাঢ় রৌদ্রকণা—
প্রকৃত স্বপ্নের মধ্যে
সে আমাকে বোলেছিলো, সোনালী ফসল দেবে, আমাদের
আঁধার বাড়িতে ফের জ্বলে উঠবে
শস্য গন্ধী নবান্নের আগুন।
সবেমাত্র নিদ্রিত বীজের পেটে কান রেখে অঙ্কুরোদগমের
খুব অভ্রান্ত মিহিন শব্দ শুনেছি ক্যাবল।
তার খুব বেড়ে ওঠা ফসলী শরীর আর
সূবর্ণ শস্যের শিষ না দেখেই চোলে যাবো আমি?
এই হিম জড় হাত-নবান্ন আগুনে সেঁকে, তারপরে
যেতে পারি, যাবো:
আঁধার কাটার আগেই–যে গ্যাছে, সে-অন্য কেউ, আমি নই।
আগুনে পোড়ার ভয়ে–যে গ্যাছে, সে-অন্য কেউ, আমি নই।।

লেখক:
শামীম কবীর (১৯৭১-১৯৯৫)
কবি; বগুড়া ও ঢাকা
নব্বই দশকের বাংলাসাহিত্যের আলোচিত ও মেধাবী কবি শামীম কবীর। ৭১ সালের ১৯ এপ্রিল যুদ্ধের এক দিনে বগুড়ার কালাইনাটাইপাড়া গ্রামে নানাবাড়িতে জন্ম। বাবার কর্মসূত্রে শামীম কবীর বেশীরভাগ সময় বগুড়াতেই কাটিয়েছেন । ক্লাস সেভেন থেকে রংপুর ক্যাডেট কলেজ এবং সেই সু্ত্রে কবিতার সাথে অধিক সখ্যতা। ক্যাডেট বন্ধু তাজুল হক সম্পাদিত নব্বইয়ের ছোট কাগজ ‘নদী’র সাথে সম্পর্ক শামীমের কবিতা প্রেমকে ইমাজিনেশন থেকে বাস্তবের পৃথিবীতে নিয়ে এসেছিল। মাত্র সতেরো বছর বয়সে ‘কোথায় দেবো রাজস্ব’ নামে কবিতার পান্ডুলিপি তৈরি করে শামীম। মাত্র ২৪ বছরের জীবন তাঁর। অল্পায়ু জীবনে বিচ্ছিন্নতা, নৈঃসঙ্গ্য কেন্দ্র করে অসাধারণ কিছু কবিতা লিখেছেন। তার কবিতায় উত্তর আধুনিকতার ছাপ স্পষ্ট, রংপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক এবং রাজশাহী সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
১৯৯৫ সালে আত্মহনন।
৯৭ এ দ্রষ্টব্য শামীমের অধিকাংশ লেখা নিয়ে প্রকাশ করে ‘শামীম কবীর সমগ্র’। ২০১০ এর ফেব্রুয়ারিতে নভেরা হোসেন এবং পিয়াস মজিদের সম্পাদনায় অ্যাডর্ন পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘নির্বাচিত কবিতা : শামীম কবীর’, এছাড়া ২০১৯ সালে উড়কি থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘নির্বাচিত কবিতা : শামীম কবীর’। ২০২৬ সালের একুশে বইমেলায় পুণ্ড্র প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘কী কথা উজানে দেবো: শামীম কবীর স্মরণ ও পাঠ’ গ্রন্থটি । বইটি সম্পাদনা করেছেন কবি ও কথাসাহিত্যিক নভেরা হোসেন।