শিমুল মোহাম্মদের কবিতা

Comments

পৃথিবী আমাদের আমরা পৃথিবীর

আমরা পরস্পর পরস্পরের হলে
সমুদ্র বিলাবে জল, চিবুক চাইবে প্রেম
সূর্য প্রভাত ফিরে পাবে অনন্ত দিন
ভূমির শরীর দেবে ধান, আকাশ সাজাবে মেঘ
বৃষ্টি শেখাবে বজ্রপাতের মানে
ঝরাপাতায় আর হবে না স্মৃতি

আমরা পরস্পর পরস্পরের হলে
নষ্ট সময়ে জড়াবে না তারুণ্য
ভুল লিখতে ভুল হবে না কারো
কোনটা ফুল কোনটা কাঁটা
এমনিতেই শুদ্ধ হবে দৃষ্টি বৃষ্টিপাতে।

আমরা পরস্পর পরস্পরের হলে
মারিজুয়ানায় শিথিল হবে না চোখ
চিমনির ধোঁয়ায় উড়বে লবণাক্ত ঘাম
বস্ত্রহীনার যৌবনে লেপ্টে যাবে না লোভ
সবার জীবন থেকে উবে যাবে অক্ষমতা

আমরা পরস্পর পরস্পরের হলে
সমুদ্রসীমান্তে পৌঁছে যাবে নদী
কোকিলও বাঁধবে ঘর কৃষ্ণচূড়া ডালে
নাঙলের ফলা বুঝে নেবে শ্রম

আমরা পরস্পর পরস্পরের হলে
পৃথিবী আমাদের হবে, আমরা পৃথিবীর।

হে ঈশ্বর, তবে কি তুমিও অন্ধ!

যেতে যেতে থেমে যাওয়া মৃত্যুর নামান্তর ছাড়া কিছু নয়
উজানে বাইতে গিয়ে ভাটির টানে ফিরে আসা সেও কি ভিন্ন
কোথায় লুকিয়ে রাখি, চারদিক উন্মুক্ত বড়, কোথাও আড়ালটি নেই।

পরাজিত হতে হতে একদিন জয়ী হয় হয়তো অনেকে
জানি না কোন্ ভ্রমে; পরাভবে আমার নারীর চোখে
শোকার্ত লোবান পোড়ায়।
কীভাবে লুকাবো, কোথায় লুকাবো আমি…
পরিত্রাণ কোথাও নেই।

যেমন শীতার্ত দিন দিবসের সূর্যটা তড়িঘড়ি রাত্রি নামায়তেমনি বড় বেশি
ক্ষিপ্ত হয়ে আসে সব।ক্ষয়িষ্ণু মোম পোড়ে।
চারপাশের অন্ধকার আয়োজন বড় বেশি শঙ্কা ছড়ায়কেউ কি দেখতে পায়
মার বুকের ক্ষত!

হে ঈশ্বর, তবে কি তুমিও অন্ধ!
তুমি কি দেখতে পাও আমার বেদনা-চোখ। মানুষ তবুও কেন তোমাকে
অন্তর্যামী বলে ডাকে
আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না।
হে ঈশ্বর, তুমি কি শুনতে পাও হাহাকার!
আর্তনাদ তোমার কাছে পৌঁছতে কতটা পথ
পাড়ি দেবে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি স্রোত।

তুমি কি দেখতে পাচ্ছো মরে আসা চোখের পাতা
পূর্ণিমা থাকার দিনে কেন আজ কৃষ্ণপক্ষ।
বেঁচে থাকা আর জীবনের দূরত্বটা তবে কি ব্যাংক নোট।
বৃদ্ধাঙ্গুলি তর্জনীর চেয়ে ছোট হয়েও তবু সে কেন বৃদ্ধাঙ্গুলি।
হায় ঈশ্বর, তোমাকে একবার বড় দেখতে ইচ্ছে হয়!
মুখোমুখি দেখতে ইচ্ছে হয়। একবার দেখা পেলে তবেই
শুধাতাম—তুমি কেন আমাকে করোনি মুহাম্মদ!

বোধ – ১

একাত্তরে তখন আমি অনেক ছোট
মৃত্যু বুঝি যুদ্ধ বুঝি না
এখন আমি একটু বড়
যুদ্ধ বুঝি মৃত্যু বুঝি না…

বোধ – ৪

ভুল লিখতে ভুল করেছো।
ভুল করতে ভুল করোনি।

বোধ – ৬

এখানে
      অযুত
      মানুষ
অথচ কে কার?
উত্তরে লোকেই বলে
      শুধুই
      একার!

বোধ – ৭

(নির্মলেন্দু গুণ অগ্রজ কবিকে)

আমরা
অজস্র
হবো
সহস্র
প্রজন্মে

বোধ – ১৪

রমণীর স্বামী হয় সাহসী পুরুষ
পুরুষের স্বামী আজ কড়কড়ে নোট!

একত্রে আছি সহবাসে নেই

দৃষ্টির বাইরে আকাশ সুনীল হলেই রোদ্দুর
জলের শরীরে জলের পতন হলেই তরঙ্গ
শীতার্ত চোখে চোখ রাখলেই উত্তাপে ধূপ
তোমার আড়ালে আমি… তোমাকে ছোঁবার ছলে
এসব আমার কাছে মহুয়া নিশুতি রাত।

মাটির উদর জুড়ে ধুলো
ধুলোর শরীর ছুঁয়ে ঘাস।

বেলা যেতে যেতে একা বিপরীতে অজস্র একক
সমুদ্র-গহিনে ঝিনুক, দৈব ঝিনুকে রেণু মতি
মাস্তুলে দক্ষিণা বাতাস, শঙ্খচিলের মেঘ
কল্পতরুর সবুজ পালকে চোখের দ্যুতি
কাজল পরশে ডাল অন্তিমে সহিষ্ণু মুখ।

একত্রে আছি সহবাসে নেই বলেই
কৃষ্ণচূড়ার রঙে অবনী বিদ্ধ হবে।

আমি আকাশের দিকে এগুলেই আকাশ দেখি
দেবদারুর মাথা পেছনে পড়ে থাকে আমিহীন
সবুজাভ হরিদ্রাভ হয় সময় ক্ষরণে তবু
আমি আমার মতো তুমিও তোমার মতোই
নিজের ভেতরে বুদ্বুদেই কাটাচ্ছি বেলা।
ধবল চোখের কাছে ঋণী হলে
রমণীরা শঙ্কাবিভোরে লাজুক।

উদ্যানের মাঝামাঝি জোনাকির ওড়াউড়ি সুখ
আঁধারে আলোর চলন তুমিহীন চলিষ্ণু সাথি
তোমাকে কাছে টানতেই নিকোটিন টর্পেডো
ঘুমহীন তন্দ্রাভূক রাত্রিতে উদ্বাস্তু ঝড়
এমনিতেই তুমিও তখন ফিরিয়েছো চোখ।

অরণ্য ছোট হতে হতেই কাঁটালতা
আমিও অবিরত পত্রহীন দ্বিপদী।

এরই মাঝে গ্রন্থিতে প্রেমহীন বিলাসী বাসর
রক্তকণার কাছে অনুভবে হৃদপিণ্ড চাওয়া
তীক্ষ্ণ সুচের ডগা, সোহাগী আঙুল পরশ
কায়াহীন বসবাসে ভালোবাসা কররেখা
অহেতুক টানটান বিরুদ্ধ টঙ্কারে কথা।

আমি
তোমারই কাছে সড়কের চাবি রেখে বাড়ি খুঁজি
তুমি
আমার কাছে দুচোখের দ্যুতি রেখে ঘরে থাকো একা।

স্বপ্নবিদ্ধ বিনতার চোখ

(যারা যুদ্ধে যায় অথচ ফেরে না তাদের উদ্দেশে)

বিনতা দুচোখে জল নিয়ে ঘুমোয় এখন
গণন নক্ষত্রের আলোকচ্ছটা নির্ঝর
বেদনার মানচিত্র আঁকে অপূর্ব অলিন্দে।/
পাখির অস্থিরতা বিনতার দুচোখের পর
নিদারুণ শীতের আড়ষ্টতা ওর হৃদয়ে
একান্ত রয়ে গ্যাছে সেই,
কতকাল থাকবে এমন
বিনতা জানে না, বোঝে না কোনো অবসরে।

দৃষ্টির শেষ সীমায় কৃষ্ণচূড়া নেই
সেখানে কাশফুলের অজুত সম্ভার,
বিনতার হৃদয় আকাশে গোধূলির রঙ
নিষ্প্রভ আবেগে বিনতার আকাশ ধূসর।

দূরবর্তী কোন স্টেশনে যাবার কথা ছিল ওর
নামহীন স্টেশনে যাবে একদিন ঠিকই
এমনি কথা ছিল, যেমন পৌঁছে যায় অন্য সবাই।

নামহীন অথচ চেনা স্টেশন
আসে না দৃষ্টির কাছাকাছি আর
কারণ এখানে বিশাল দেয়াল
সাদা কারুকাজ রয়েছে অটুট।

প্রতীক্ষার শেষ নেই কোনো
অথচ বিনতা জেনে গ্যাছে সব
প্রতীক্ষা মৃত্যুর চেয়েও কষ্টের।

যতনে লালন করা পিকাসোর চিত্রকর্ম
নেরুদার কাব্যকল্প পলকবিহনে চোখ
বিনতার অরণ্য আঁধার
দেখে দেখে হয়ে যায় শুধুই পাথর।

দৃশ্যত তারও ছিল প্রেমিক পুরুষ
এখন সে কারাগারে নিভৃতে হয়তো
অথবা হারিয়ে গেছে বহুদূর জনহীন
রূপালি নৌকার যাত্রী হিসেবে সত্যিই।

উল্কা পতনের মতো—
একদিন সহসা এলো
সবুজাভ পোশাক পরা
বেজন্মার দল…

তীক্ষ্ণ নখরে রক্তাক্ত হলো তার প্রেমিক পুরুষ।
পড়ে আছে সর্বস্ব রক্তিম মলাটের বই, ছবি,
ফেস্টুন, ব্যানার, লিফলেট, কাগজ, কলম, বিনতা
রাজনীতি, মাটি আর মানুষ একাকী।

বিনতার আঙুল পরশে মমতা ছড়ায়
মনে পড়ে একটি দৃষ্টির অন্তরালে
অস্ফুট ভাষা—এবার আসি…

সেই কথা শেষ কথা হয়
বিনতা এখন একা
খুব বেশি একা।

লেখক:
Shimul Mohammad01
শিমুল মোহাম্মদ, (২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৩ – ২০ অক্টোবর ২০০৭)
কবি, লেখক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট