শিশুর মানসিক বিকাশ: পরিবারের আচরণ

Comments

নিজের সন্তানকে সমাজের একজন যোগ্যব্যক্তি হিসেবে আমরা সবাই দেখতে চাই। সবাই চাই আমাদের সন্তান হয়ে উঠুক অসাম্প্রদায়িক চেতনার একজন সচেতন ব্যক্তি। কিন্তু পরিবারের মাঝেই আমরা সন্তানকে ক্রমশ তুলনা করে যাচ্ছি অন্য কারো সাথে!

আপনার ভাষ্যমতে আপনি নিজে ও আপনার পরিবারের লোকজন কখনও নিজের বাচ্চার সামনে ছেলে-মেয়ে বৈষম্য বা বডি শেমিং ধরনের কোনো কথা বলেন না। অথচ বাচ্চাটার স্বাস্থ্য নিয়ে তাকে প্রতিনিয়ত বলছেন…

– ওর মতো হতে  পারিস না?
– দেখেছিস ওর ব্রেইন কি ভালো?
– ওর মাথার চুল কত লম্বা!
– ও এতো ভালো নাম্বার পায় পরীক্ষায়,  তুই পাস না কেনো? তরে কি আমরা খাওয়াই না?”

এই বিষয়গুলোই কিন্তু একটু একটু করে শিশুদের মাঝে বৈষম্যমূলক আচরণের জন্ম দিচ্ছে!

খেয়াল করে দেখুন তো আপনার ৪/৫ বছরের সন্তান কাজ, কথা, ক্ষমতা ইত্যাদি বিষয়গুলোতে ছেলে-মেয়ে শ্রেণীভেদ করছে কি না!

যেমন: সাইকেল তো ছেলেরা চালায়, বাসায় রান্না তো মেয়েরা করে, ছেলেরা তো শেফ হয়, ছেলেরা স্ট্রং হয়, সেতো অনেক মোটা, আমার মোটা কাউকে ভালো লাগে না, যে কোনো খেলায় হেরে যাওয়া ব্যাপারটা সে মানতে পারছে না!!!

মেয়েদের ক্ষেত্রে তারা নিজেদের গায়ের রঙ সাদা না হওয়ায় মন খারাপ করছে বা মোটা হওয়া নিয়ে এই বয়সেই আতঙ্কে থাকছে, একটু বেশিই ফ্যাশন সচেতনতা নিয়ে বেড়ে উঠছে!!!

অবাক লাগছে  বিষয়টা?

একজন অভিভাবক হিসেবে আপনার মনে হাজারো চিন্তা আসবে এই মূহুর্তে!

আসুন এখন একটা বিষয় মিলিয়ে দেখি!

বাচ্চাদের বিনোদনের একটা বড় মাধ্যম হচ্ছে কার্টুন। সুপারম্যান, স্পাইডারম্যান, ব্যাটম্যান, শিবা, রুদ্র, মোটু-পাতলু, সিন্ড্রেলা, রাপানজেল……

একটু খেয়াল করে দেখুন….  সবগুলো সুপার হিরো কার্টুন এ প্রধান চরিত্রে একজন ছেলে! যেকোনো সমস্যা, বিপদ বা চ্যালেঞ্জ আসুক তারা অবশ্যই জিতে এবং তাদেরই জয় দেখানো হচ্ছে!

আবার  যেসব কার্টুন এ মেয়ে চরিত্র আছে এরা প্রায় সবাই স্লিম ফিগার, সুন্দরী এবং একজন রাজপুত্র তাদেরকে পরবর্তী রানী বানাচ্ছে!

আবার ধরুন বাইরে ঘুরতে বা শপিং এ গিয়েছেন….ভারী ব্যাগগুলো শুধু বাবাই নিচ্ছেন। কারণ হিসেবে শিশু জানতে পারে ব্যাগ ভারী তাই মা নিতে পারবে না! মায়ের কষ্ট হবে!

কিছু ধরতে পারছেন?

জি, বৈষম্যমূলক আচরণজনিত সমস্যার সূত্রপাত ঠিক এখান থেকেই! আপনার কোমলমতি শিশুটি খুব অবচেতন ভাবে ছোটবেলা থেকেই এই বৈষম্যমূলক বিষয়গুলো সম্পর্কে জেনে যাচ্ছে যা ভবিষ্যতে তার মাঝে বিভিন্ন নেতিবাচক ধারণা যেমন  লিঙ্গবৈষম্য বা বডিশেমিং এর জন্ম দিতে পারে। যা পরবর্তীতে তার বিকাশের সময়গুলোতে আচরণ এর মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে।

সে ধরেই নিয়েছে সুপার হিরো শুধু ছেলেরাই হয়, মেয়েরা সুপারহিরো হয় না। সৌন্দর্য মানেই সাদা চামড়া আর স্লীম ফিগার!

জীবনে যখন সে প্রতিবন্ধকতা বা কোনো কিছুতে ব্যর্থ হচ্ছে তখন সেই ব্যর্থতা সহজে মেনে নিতে পারছে না কারণ তার মনে গেঁথে গেছে যারা হেরে যায় তারা সুপারহিরো হয় না!

যারা মোটা বা দেখতে অসুন্দর তাদের জন্য রাজকুমার আসে না! রাজকুমার একজন সুন্দরী মেয়েকেই বেছে নেয় রানী হিসেবে! তাই একটা মেয়ে বা ছেলে ধরে নিচ্ছে শারীরিক সৌন্দর্যই একটা মেয়ের আসল বিষয়!

আবার যেহেতু তার মায়ের ভারী কিছু বহন করতে কষ্ট হয় তার মানে মা দূর্বল!

আর এভাবেই এই ধারণাগুলো ধীরে ধীরে তার মনে গেঁথে যাচ্ছে যার ফলশ্রুতি বড় হয়ে সে লিঙ্গবৈষম্য, বডিশেমিং এর মতো বিষয়কে সাপোর্ট করছে!

২০১৪ সালে মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি কর্তৃক প্রকাশিত  Carrie Shrier এর গবেষণায়ও এ বিষয়টি সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে।

শিশুরা টিভিতে যা দেখে তা অনুকরণ করে কিনা তা দেখার জন্য করা একটি পরীক্ষায়, গবেষকরা ১৪ থেকে ২৪ মাস বয়সী ১২০ টি বাচ্চাদের পরীক্ষা করেছিলেন। অর্ধেক শিশুকে ছোট ভিডিও দেখানো হয় যেখানে তারা একজন অপরিচিত ব্যক্তিকে নতুন (যে খেলনা বাচ্চারা আগে দেখেনি) একটি  খেলনা নিয়ে খেলার সময় খেলনাটিকে একই গতিতে তিনবার আলাদা করে টেনে দেখেছে। বাকি অর্ধেক শিশু দুটি দলে বিভক্ত ছিল। একদলকে যে ভিডিও দেখানো হয় সেখানে অপরিচিত ব্যক্তিটি খেলনাটি একবারও টেনে দেখেননি এবং অন্য অর্ধেক শিশুকে ভিডিওটি মোটেও দেখানো হয়নি।

২৪ মাস বয়সী যারা খেলনাটিকে একই গতিতে তিনবার আলাদা করে টানতে দেখেছে, তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশ শিশুকে খেলনাটিকে ভিডিওতে থাকা ব্যক্তির মতো টেনে খেলতে লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে যে সব শিশু খেলনাটিকে নিয়ে কোনো ভিডিও দেখেনি, তাদের মধ্যে শুধুমাত্র ২০ শতাংশ শিশুদের খেলনাটিকে টানতে দেখা গিয়েছিল। এটি একটি স্পষ্ট লক্ষণ যে দুই বছর বয়সীরা টিভিতে যা দেখে তা অনুকরণ করতে পারে।

তাই অভিভাবক হিসেবে আমাদের নিজেদের আরো একটু বেশি সচেতন হতে হবে। এক্ষেত্রে বেশকিছু করণীয়  থাকতে পারে….

👉 একটি শিশু যখন মোবাইল বা টিভিতে কিছু দেখছে খেয়াল করুন সেখানে কি কি বিষয় দেখানো হচ্ছে।

👉যদি শিশুর কথাবার্তায় এধরনের আচরণের ইঙ্গিত খুঁজে পান তবে তা নিছক শিশুতোষ আচরণ ভেবে অবহেলা না করে শিশুটির কাছে তা ব্যাখ্যা করে সঠিক মূল্যায়ন বুঝিয়ে দিন।

👉পারিবারে বিভিন্ন কাজগুলো মা পারবে না, মায়ের কষ্ট হবে বা এইগুলো বাবার কাজ এভাবে না বলে বরং “এসো মাকে সাহায্য করি!  বা চলো মিলেমিশে কাজ করি ” এধরনের ইতিবাচক বাক্য ব্যবহার করা যেতে পারে।

👉পরিবারের ছেলে ও মেয়ে শিশুদের মাঝে খাওয়া, খেলার সময় বা মূল্যায়নে কোনো ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ প্রদর্শন থেকে বিরত থাকতে হবে।

👉যেকোন খেলা বা কাজে সফলতাই একমাত্র মাপকাঠি, এ বিশ্বাস থেকে বের করে নিয়ে আসতে হবে। যেকোনো কিছুতে জয়-পরাজয় বা সফলতা-ব্যর্থতা দুটোই হতে পারে এবং তা খুবই স্বাভাবিক ও সাধারণ এই মনোভাব তৈরি করতে হবে।

👉শিশুর অত্যধিক রাগ, জেদ, বায়না ইত্যাদি আচরণকে সবসময় শিশুসুলভ বলে হেসে উড়িয়ে না দিয়ে বরং সেই আচরণগুলো তখনই সংশোধন করে তাকে উচিত ও অনুচিত বুঝিয়ে দিতে হবে।

John Locke বলেছিলেন, ” Mind is a tabula rasa” অর্থাৎ “মন একটি সাদা ফলক”। শিশুদের ক্ষেত্রে এ উক্তিটি পুরোপুরি মিলে যায়। অনুকরণ প্রিয় শিশুরা তার চারপাশের পরিবেশ থেকেই সব দেখে নিজের মাঝে ধারণ করে।তাই অভিভাবক হিসেবে আমাদেরকেই তাদের সুস্থ বিকাশের পেছনে যত্নশীল হতে হবে।

গবেষণার সূত্র: https://www.canr.msu.edu/news/young_children_learn_by_copying_you

লেখক:
Fahmida Aktar
ফাহমিদা আক্তার, মনোবিজ্ঞান শিক্ষার্থী

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট