শীলা মোস্তাফার কবিতা

Comments

জলকাব্যের ইতিকথা

আমাদের কথা হয়
ময়ূখ মীনাক্ষীর প্রেম-পরিণয় নিয়ে
আমাদের কথা হয়
কনক কঙ্কার বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে।
কথা হয় দেশ বিভাগ, নারীর স্বাধীনতা,
বামপন্থী রাজনীতিবিদদের অবক্ষয় নিয়ে।
তুমি আক্ষেপ করে বললে,
কেন আমরা অন্যদের কথা বলি,
আমাদের কথা কি ফুরিয়ে গেল!

তুমি জানো আমিও জানি
আমাদের প্রথম চুম্বনের মতোই অপ্রতিরোধ্য
আমাদের কথারা, 
তবু নির্বাক, মূক!
পৃথিবীর এক ভাগ স্থলের পিছনে লুকিয়ে থাকুক
তিন ভাগ জলের ইতিহাস!

আগুয়াস কালিয়ান্থেস

উন্মত্ত পানশালা থেকে বেরিয়ে
কিছু মানুষ একা হয়ে যায়
অজগরের মত সরু আঁকাবাঁকা রাস্তায়।
পাথরের পথে, পাথরের দেয়ালে
লেখা আছে ভুলে যাওয়া শহরের
নিজস্ব গোপন কান্নার গল্প।
তবু এইসব রাতজাগা প্রেত
ফিসফিস করে বলে যায়
মাতালের কানে কানে
Can you keep a secret?
Can you keep a secret?
পারে বৈকি,
সুরাসক্তের
প্রলাপে কার-ই বা আস্থা বলো!
পৃথিবীর নাভি থেকে উঠে আসা ইতিহাস
রাজাধিরাজের গল্প পিচ্ছিল সুড়ঙ্গ বেয়ে হারিয়ে যায়
সময়ের গহীন গহ্বরে।
সেই সাথে কিছু প্রেম,
কিছু হৃদয় ভাঙার নিঃস্ব নালিশ
কিছু তোমাতে-আমাতে বড় মাখামাখি।
কিছু রুজি রোজগার, রান্না-বাটি
কিছু শুধুই সময়ের অপচয়,
কিছু নতুন বছরের হালখাতা।
এইসব আটপৌরে জীবনের গল্পে
আধিপত্য আর জয়ের নেশা
জলে স্থলে অন্তরীক্ষে
নিশান উড়ানোর রক্তাত্ত হাত,
বড় সেকেলে মনে হয়।
অরণ্যের রহস্য শুধু অরণ্যই জানে !
পাথরের মসৃণ দেহে জেগে ওঠে
শীতল অক্ষর,
কেচুয়ার ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়
Can you keep a secret?
Can you keep a secret?
কতকাল আর গোপন অভিসারে
নিষিদ্ধ অরণ্যের হাহাকার?
তারচেয়ে বরং এই উরুবাম্বার গভীরে
বাস করা জলের সাথে
ভেসে যাক
শতাব্দীর ধুলো, কাদা, জল,
ঢেকে থাক কুয়াশা প্রদোষে নির্জন
আগুয়াস কালিয়ান্থেস।
শীতের হিম তুষার, বৃষ্টির অঝোর জলপ্রপাত
গ্রীষ্মের তাপদাহ, পলি জমে জমে
হোক সবুজ অরণ্য !
শীতের সকালে সেই অরণ্যে
টুপটাপ করে কান্নার মত জল ঝরে,
সেখানে
আজো প্রতিধ্বনিত হয়
আন্দিজ পর্বতমালার পাথরের কানে কানে
Can you keep a secret?
Can you keep a secret?
পাথরের হৃদয় চিরে
এক একটি দীর্ঘশ্বাসের গল্প আর
পতনের শব্দের সাথে মিশে থাক
কিছু কাম, প্রণয়, প্রলাপের মায়া
কিছু পবিত্রভূমির সূর্য প্রণাম
কিছু ক্ষমাহীন মৃত্যু , কিছু
স্বেচ্ছানির্বাসন…

সেপ্টেম্বর ১১, ২০২২। মাচুপিচু , পেরু।

জেট ল্যাগ

তোমার শহরে আজ সূর্যোদয়
দীর্ঘ দূরত্বের উড়ানের ক্লান্তি নিয়ে
অন্ধকারে নিমজ্জিত শহরে একা জেগে আছি।
এই শহরে কুকুরগুলো আমার মতই অসহায়।
এই দেশ, এই জন্মভূমি,
এই মাতৃভুমি
তবুও নিজের কোন ঠিকানা নেই,
চেনা বিছানা নেই,
নিজস্ব কোন চাবি নাই।
তবু ফিরে ফিরে আসি।
জানলায় মুখ রেখে বৃষ্টিজলে ভিজি।

বহুদিন পর ফিরে পাওয়া
বৃষ্টিকে প্রতি ফোঁটায় ফোঁটায়
দুহাতের দশ আঙ্গুলে জড়িয়ে ধরি।
জলের ঝাপ্টায় স্মৃতিরা ফিরে আসে
তুমুল বিস্ময়ে,
হিথরো এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনে দাঁড়িয়ে থাকা
অস্থির যাত্রীদের মতো, 
স্মৃতিগুলো সব যেন কানেক্টিং ফ্লাইট ধরার অপেক্ষা।
কাঁটাবন, পলাশী, হাতিরপুল,
আমাদের টিএসসির করিডোরে
ধুলোয় ভরা আড্ডায়
নিরবে ভালবাসা চেটেপুটে খাওয়া।
শিশু ফুলবালিকার হাতে ঝুলে থাকা
বকুল ফুলের মালার মত চেনা গন্ধ
তবুও বড় অচেনা।

এই শহরের সব বৃষ্টিজল কদম ফুল
দমচাপা ঘাম ক্রোধ
এই শহরের সব কোলাহল
একদিন দুজনেই ভাগাভাগি করে নিয়েছিলাম।
রিক্সার শহরেও পাখিরা ঘরে ফেরে।
আমাদের সূর্যাস্ত ছিল
আর একটুক্ষণ থাকার অনুনয়।
আজ এই শহরে তোমার
প্রশান্তঘুমের সূর্যোদয়ে
আমার শহরে অস্তাচল।
ঘরে ফেরার পালা
আমার অন্য এক ফ্লাইট ধরার অপেক্ষা।

এক শীতে

আর একটি শীত
আর একটি শীত কাটুক একসাথে
তোমার ভাবনায় আমি, আমার ভাবনায় তুমি
মুখোমুখি দুকাপ চা, দুটো কবিতা করচা
নির্ঘুম রাত,
দুজনার অস্থির স্পর্শ
তারপর চলে যেও।
জানি ভালোবাসা পুরনো হয়
ঠান্ডা চায়ের মত পড়ে থাকে টেবিলে
শীতের দিনগুলোর মত পাতাহীন নির্জন
হয়ে যায় ব্যস্ত নগর।
আরও কিছুক্ষণ ধরে থাকো,
আগলে রাখো। 
অনুভব করি নির্ভরতা কেমন হয়
একসাথে পায়ে চলা কাকে বলে।

তারপর
সেই পুরনো
এই চেনা ভিড়ে অচেনা হয়ে মিশে যেও
একই কফিশপে তুমি আসবে
ঠিক আমার পরপর,
আমি জানতেও পারবো না।
একই শহরে একই সূর্যাস্ত
দেখব ভিন্ন ভিন্ন চরে।

আমি নির্জন নিভৃতে আকুল কেঁদে নেবো
যতটা কাঁদলে
এক শীত থেকে আর এক শীতের
দুরন্ত ভালবাসা ভুলে যাওয়া যায়,
ভুলে যাওয়া যায়
“অপরূপা অন্তর” শুধু কথার কথা।
মুছে ফেলা যায় যে
“আমরা একে অন্যের প্রতিবিম্ব”,
এইসব কথার কথা।

এখনি আলগা করো না বাঁধন
ধরে রাখবে বলে ছেড়ে দিও না
আমার ফেলে আসা চাবির গোছা
ফিরিয়ে দিতে এসো
আমার রাগ ভাঙাতে এসো
বৃষ্টিজলে ভিজে কাক হয়ে
আরো একটি দিন রাস্তার মোড়ে
দাঁড়িয়ে থেকো
তারপর শীত আসুক
প্রচন্ড শীত!

উল্টোরথ

আমাদের আসা যাওয়া
উল্টো পথে উল্টোরথে
আমাদের জীবনযাপন
অনন্তরের অন্তরীক্ষে
আমাদের ঘর দুয়ারী
বেদনার শিথিল স্বপন।

চৌপর প্রহর শেষে
তুমিই গল্পকথা
তুমিই অমরাবতী
তুমিই স্বর্গবৃক্ষ
তুমিই অশ্রুবিন্দু
তুমিই কল্পতরু!

এবারের শারদ প্রাতে
গোপনে দিলাম ঢেলে
সাগরে, দিঘির জলে
কোঁচড়ে তুলে রাখা
বেদনার শিউলি ঝাঁপি!
হারানো তারার মত
অনন্ত অন্তরীক্ষে
বেদনার জলপ্রপাতে
ভেসে যায় শিউলি সকল!

শঙ্কা

– একদিন তুমি আর আমায় ডাকবে না
একদিন সন্ধ্যায় চায়ের পানি শুকিয়ে
কেটলি পুড়ে অঙ্গার হবে,
একদিন সব বইগুলোর ভাষা দুর্বোধ্য হবে
একদিন সন্ধ্যাতারা দূরবর্তী নক্ষত্র হবে।

– তা হবে
একদিন মহাবিশ্ব ভুলে যাবে পৃথিবীর ইতিহাস
একদিন
মান্দারিন সুদর্শন হাস ভাসবে না হ্রদের জলে,
একদিন ফড়িং ভুলে যাবে উড়াল
একদিন নদী মরে পড়ে থাকবে জনারণ্যে
তবু আমার ভেতরে যে তুমি আছো আর
তোমার ভেতরে যে আমি আছি তা তো থাকবেই

– ভয় হয়, খুব ভয় হয়।

– আমারও তো সে ভয় আছে , ভালবাসা আছে বলেই তো ভয়।

শুষে নাও কার্পাস তুলো

এই পৃথিবীতেই তুমি আছো,
এই কথা না জেনেই,
পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে অপেক্ষার সলতে।
অথচ,
তুমি আছো। 
তারা জ্বলে তারা নেভে,
আমার দিনগুলো মরা উটের পেছনে বসে কেটে যায়।
কতবার মরীচিকার কাছে নতজানু হয়েছি
এই ভেবে 
হয়তো
তুমি কান পেতে বসে আছো,
আমার অভিমান হলে অভিমানের কথা শুনবে বলে,
দুঃখ হলে দুঃখ,
বিষণ্ণ হলে বিষণ্ণতার কথা।

যদিও আমি শুধু তোমাকে আমার সুখের গল্প শোনাবো।
চোখে চোখ রাখলেই,
সবকটা লুকানো ডাইরি পড়ে ফেলবে বলে,
কোনদিন রাখবোনা চোখে চোখ।

তবুও অভিমানে শুকনো পাতার স্তূপ জমা হয় হেমন্তের শেষে,
কেন নিজ থেকে চেয়ে নিলে না!

রাগ করলে, চিরকুটে লিখে পাঠালে না
“তুমি আমার কার্পাস তুলো
সকল অভিমান বুকে নিয়ে নিশ্চুপ!”

আমরা দুজনেই একদিন আক্ষেপ করে বলবো,
– বড্ড দেরী করে এলে।

লেখক:
Sheela Mostafa
শীলা মোস্তাফা, কবি।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট