শুভঙ্কর দাশের কবিতা

Comments

হাংরি আন্দোলনের তুঙ্গ সময়ে (১৯৬৩ সালে) জন্ম নেওয়া শুভঙ্কর দাশ; একজন ভিন্ন ধাঁচের ভিন্ন মাপের অপ্রাতিষ্ঠানিক ধারার কবি, লেখক, প্রকাশক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, সাহিত্যকর্মী ও সংগঠক; ব্যতিক্রমী পত্রিকা ‘গ্রাফিত্তি’র সম্পাদক। জীবনানন্দ ও অ্যালান গিন্সবার্গ অনুরক্ত এবং চার্লস বুকাওস্কি অনুপ্রাণিত, অনন্য এক সৃষ্টিশীল মানুষ। বাংলা ইংরেজি মিলিয়ে অন্তত ৩৫টি গ্রন্থ-সংকলনের রচয়িতা। অনুবাদ করেছেন গিন্সবার্গের কবিতা, বুকাওস্কি, ব্রাটিগানসহ আরো অনেক ভিন্নভাষী কবি-সাহিত্যিকের লেখা। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতার এক হাসপাতালে প্রয়াত হয়েছেন ২২ মে। সৃষ্টিশীল এই মানুষটির আকস্মিক প্রয়াণে যখন বাকরুদ্ধ সাহিত্যানুরাগীরা, সেই সময়ে তাঁরই কিছু কবিতায় তাঁর প্রতি নিবেদিত হলো বাঙালীয়ানার শ্রদ্ধার্ঘ্য।

কম পুঁজি

রোজ সকালে ডাবওয়ালা
যে ডাবটা দিয়ে যায়
রোজই দেখি তা ক্রমাগত ছোটো হচ্ছে।
যদিও সে কথা সে মানতে চায় না
দাম একই নেবে তা আর ছোটো হবে না।

দীর্ঘ দেহী জানোয়ার যেমন
বিলুপ্ত হয়েছে পৃথিবী থেকে
সেভাবেই দীর্ঘ  হৃদয়ের মানুষও
আর নেই গো
এ কথাও তো মানতে কষ্ট হয় আমাদের।

এখন শুধুই ছোটো জান
ছোটো প্রাণ
কম পুঁজি
কম বুঝির সময়।

যাক যেভাবে বৃষ্টি শুরু হলো
এই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে
তুমি আর কীভাবে চলে আসবে বল
চট করে যে ভাবে বলেছ।

আমি ভাবছি চাইছিও
আরেকটু বৃষ্টি হোক বরং।

চশমা

চারপাশের অসংখ্য চুপ
যখন চোখ বেয়ে নেমে আসে
তখন বুঝতে পারিনা তাতে
কতটা দুঃখ মিশে আছে 
আর কতটাই বা হাঁফ ছাড়ার আনন্দের কুচি।

সমস্তটা গোলমাল হয়ে যাচ্ছে দেখে
কী ভয় করছে আমার?
সংশয় যা আমার একান্ত আপন
যা আমি নাকের ডগায় ঝুলিয়ে রাখি   
চশমার মতো
তাও যদি পথ ছেড়ে সরে দাঁড়ায়
চোখ থেকে নেমে
শুয়ে থাকে পড়ার টেবিলে চুপচাপ
তখন কীইবা পড়ে থাকবে আর
যা দিয়ে ফের স্পষ্ট দেখা যাবে চারপাশ,
ইচ্ছে অনিচ্ছের গিঁট যা নাও খুলতে পারে।

চশমা খুললেই তো চোখ জানে
এখন ঘুমের সময়।
পাশবালিশ যা শুয়ে আছে আমার অপেক্ষাতে
এবার আমায় জড়িয়ে
আরামে ঘুমোবে।
তার কোনো সংশয় নেই ভাগ্যিস।

রাস্তাঘাটে

তুমি লিখেছিলে
থুকনা মানা হ্যায়।

তার উপরেই লুকিয়ে থুকে রেখেছে
যে অশান্ত বালক
তার গুটকার দাগ কী বলতে চাইছে আমাদের?
কোন ভোমরাকে জাগানোর চেষ্টা সে
করে গেছে সোনা কাঠি রূপো কাঠি ছাড়াই।

তার এই কাঠিবাজী তোমাকে বিরক্ত করছে খুব।
তুমি মুখ ঘুরিয়ে তাকাচ্ছ কোন সুন্দরীর দিকে?
যার কাঁধ কাটা জামায় জেগে আছে
একটা অযত্নের চামড়া,   
যার দিকেও তাকানো যায় না বেশিক্ষণ।

যত্ন শিখতে আমরা কোন ফুচকাওয়ালার কাছে যাব তবে?
যে খুব সময় নিয়ে হাত ধুয়ে
তেতুল জল ভরছে যত্নে
রোজ রোজ।

সে

আমার ঘরে এসে সে
আমার উপহার পাওয়া
ফসিল হাতঘড়িটা আপন করে
নিয়ে গেল।

সে এসে আমার টেবিলের ধুলো মুছলো
র‍্যাকের বইয়ের ধুলো ঝাড়ল
শুধু কফি খাইয়ে এই ভালোবাসা
কীকরে শুধব আমি।

ভালোই হয়েছে
ড্রয়ারের অন্ধকার কোণে দিনের পর দিন
কাটিয়ে এখন সে সূর্যকে চুমু খাবে রোজ।

কাউকে তো মনে করিয়ে দিতে পারবে
সময় বড় কঠিন বস্তু,
যা শুধু এগিয়ে যাওয়াই শিখেছে।

আর আমার সময় তো গলে জল হয়ে গেছে কবে
ওকে নিয়ে আমি আর কীইবা করতাম।

সেসব দিনগুলো

সেসব দিনগুলোতে তখনো
হাড়ের গলায় বাঘ ফুটে যেত অনায়াস
সেসব দিনগুলোতে বলা যেত
দেখে শুনে হাসি পায় রে
তোদের রক্ত-কারখানা।
একদিন সেই দেব শিশু
পড়ে ছিল পার্ক-স্ট্রিট বইমেলার ঘাসে
অমলিন।
আমরা তাকে আড়াল করে
বসে পড়লাম চারধারে।
আর হাসলাম এটা ভেবে যে
তার বাবাকে সে বলেছিল-
তুমি আরো একটা বিয়ে করো বাবা
আমরা একটা জয়েন্ট একাউন্ট খুলি।

নিজের ঘর

বাচ্চাটা আমায় বললো
তুমি তোমার নিজের ঘরে যাও।

কার থেকে ও শিখেছে এ সব?
নাকি এখন অনেক ঘর হয়েছে মানুষের?
অনেক দেওয়াল আপন হয়েছে
যাদের দিকে রাতদিন চুপ করে তাকিয়ে থাকা যায়?
আমাদের ছোটোবেলায় আমাদের নিজস্ব ঘর
ছিল না তো,
একটা ছাতের কোণ ছিল একান্ত আপন শুধু।
আর একটা পড়ার ঘর
আর একটা বই ভর্তি কাঠের টেবিল
আর দুটো ভারিক্কি কাঠের চেয়ার।

রাতে একটাই শোয়ার ঘরে শুতাম সবাই
বাবা মা দিদি আমি
আর বাবার নাকের সিংহ গর্জন
যা পাইচারি করে বেড়াত ঘরময়,
যা শুনে রাতের সব ভূত ঘেঁষতে
সাহস পেত না।

পরে যখন একটা একলা ঘর হলো
তার সাথে এলো সব একলা ভূতেরা
আর ইন্দ্রজাল কমিক্সের ফ্যান্টাসি
আমি ডায়না তুমি বেতাল।

অবশ্য আমার একলা ঘরে
এখন একটা টিকটিকি থাকে,
আর থাকে তার ওঁত পেতে বসে থাকার অপেক্ষা,
যা দেখে মনে হতে পারে
সে হয়ত ধ্যানে বসে আছে।

ফ্লেমেঙ্কো ডান্সার

এমন নয় যে স্পেনে গেলেই
মন ভালো হয়ে যাবে আমার।
এই যে এখন যাচ্ছি রাসবিহারী মোড়ে
এমন তো হতেই পারে
কোনো সুন্দরী্র পা দেখে মনে হলো
এই তো সেই ফ্লেমেঙ্কো ডান্সার
যে নেচেছি্ল ফ্রিডা কাহলোর সাথে।

আজ এসেছে এ শহরে আমাদের অল্প
ভালোবাসা ধার দেবে বলে।

ইস কেন যে আধার কার্ডটা করিনি আমি
তাহলে অন্তত বলা যেত
আমারও একটা আধার আছে হে সুন্দরী।

চাইলে

তুই চাইলে
তোর হাত ধরে
চলে যেতে পারি ব্যাবিলন
মাছ ভাজা খেতে।
তুই চাইলে
আরো কিছুদিন
মৃত্যু ঠেকিয়ে
তোর পাশে শুয়ে থাকতে পারি।
আরো কিছুটা দম নেওয়া যায়
হুমড়ি খাওয়া দেওয়াল এড়িয়ে।
ভেবে দেখ আমার এই জ্বর তুই
গায়ে মাখবি কি?

You lay so quite in the bed

You are lying in an unconscious sleep
The hospital tubes, the machines beeping around,
where we are not allowed to enter.
Where dreams are strictly forbidden.

Still, I remember the busy road at Rasbihari junction
Where we were trying to cross the road hand in hand
knowing that I have to let your hand go when we cross the road.

You wanted to hear my poems
but I never had a chance to recite them to you.
Now I am reading those poems aloud in a lonely room.
And I am thinking of that 31st December night
that never ending night.
-Don’t you understand?
I was holding a bucket to your mouth without answering
so you can vomit and be light.
Did we do a lip lock before that?
I don’t remember because my stomach also
was full with dark Rum.

Maybe you vomited all the love in the bucket that day.
It must be that because we did not see each other
anymore.
No poem was recited.

Memories

Combed hair is very annoying
at least to me,
even if it’s your hair.
Those who like the memory of those dead hairs
let them like it.

I can’t spend time
crawling on last night’s bed sheet
trying to find your lone hair
I’m sorry.

I like the smell of love,
the body odor which is lost
behind the scent of perfume
which reminds us that
we are still alive.

That cigarette, that half finished bottle of wine
knows that.
Your hanging mascara knows it too
and the tired walls around.
whose minds no one ever wanted to know.

লেখক:
Subhankar Das
শুভঙ্কর দাশ (১৯৬৩ – ২২ মে, ২০২৪)
কবি, সম্পাদক, লেখক, অনুবাদক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, সাহিত্যকর্মী ও সংগঠক।
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ।

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট