। আনোয়ার শাহাদাত ।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কী দেশ ছেড়ে চলে না গেলে পারতেন- যাকে ‘পালানো’ বলা হয়। হ্যাঁ তিনি পারতেন। কিন্তু তার ওই পারার পেছনে অনেক পূর্বশর্ত থাকতে হতো, অবশ্যই থাকা উচিত ছিল। যার প্রথম পূর্বশর্ত হচ্ছে রাজনৈতিক সততা। রাজনৈতিক সততা থাকলে হতেও পারত যে তার কোনো সিদ্ধান্ত বা অবস্থান ঐতিহাসিক বিবেচনায় ভুল; কিন্তু কথা হতো তখন যে তিনি তার ভুলে তাতে সৎ ছিলেন কি না। আমার মতে তা তিনি ছিলেন না। এটা তিনি ভালো করেই জানেন এবং জানতেন। ফলে তিনি চলে যাওয়া বা পালানোরই সিদ্ধান্ত নিলেন।
এর আগেও একাধিক গণঅভ্যুত্থানে সরকার ও শাসকের পতন হয়েছে এই বাংলা মূলুকে কিন্তু পতিত ওই শাসকরা চলে যাননি বা ওই অর্থে পালাননি (আইয়ুব খানের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য হবে না, যেহেতু তিনি এই ভূখণ্ডের বসবাসকারী নন) । তবে এরশাদ ও খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য হবে। এরশাদ আক্ষরিকঅর্থে স্বৈরশাসক হিসাবে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন কিন্তু তিনি চলে যাননি। খালেদা জিয়া কোনো অর্থে নির্বাচন বিবেচনায় স্বৈরশাসক ছিলেন না কিন্তু ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়া প্রশ্নে তিনি স্বৈরশাসকের আচরণ করেছিলেন। প্রথমবারে ৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচনের পর; দ্বিতীয়বারেও কেবল ক্ষমতা ছাড়বার সময়ে তার ওই একই আচরণ ছিল। দ্বিতীয়বারে খুবই মন্দ আচরণ ছিল ক্ষমতা ছাড়বার ব্যাপারে।
কিন্তু যখন ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হলেন তখন তিনি দেশ ছেড়ে চলে যাননি। তারেক জিয়াকে জোর করে বিদেশে পাঠানো হয়েছে এবং তিনি ক্ষমতার ‘কার্যকর’ ব্যক্তি ছিলেন না অতএব তার দেশান্তর আলোচ্য নয়।
শেখ হাসিনা আগেও ক্ষমতা ছেড়েছেন (৯৬ এর ক্ষমতা লাভ শেষে) তখন তার দেশত্যাগের প্রশ্ন আসেনি। যেহেতু তা ছিল নির্বাচন ও গণতন্ত্রের ফল। ঠিক একই ভাবে এক/এগারোতে এমন চেষ্টা হয়েছে যে তিনি দেশে ফিরতে পারবেন না। তিনি সে নিষেধাজ্ঞা বা ভীতি অমান্য করে দেশে গিয়েছেন কেননা তার রাজনৈতিক সততা ছিল তখন; সে কথাই শুরুতে বলেছি যে রাজনৈতিক সততা, আন্তরিকতা ওসব থাকলে- সৎ-সাহসিকতার প্রতিফলন দেখা যায়।
যদিও ক্ষমতা ব্যবহার করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকবার প্রথম উদাহরণ আসলে সৃষ্টি করেছিলেন খালেদা জিয়া। শেষের বার দু’দুইবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেছিলেন নিজের মনের মতন করে, তাও ক্ষমতা রাখতে পারেননি- যার ফলই হয়েছিল এক/এগারো। কিন্তু সকল দায় তার সৃষ্ট সেই জটিলতার যদিও কোনো একভাবে হয়ত তিনি বিশ্বাস করতেন (হয়ত) যে তিনি সৎভাবেই চাইছেন (তার বোঝাপড়ার মাপকাঠিতে)। এসব কারণে হয়ত তিনিও কখনো দেশান্তরী হতে চাননি।
শেখ হাসিনার চলে যাওয়ায় এই প্রশ্নটি ওঠে যে তিনি তার প্রয়োগকৃত ব্যবস্থার প্রতি সৎ ছিলেন কি না; ছিলেন না- অতএব এই যে তিনি জানেন তিনি কী ভাবে কী করেছেন যার জন্য তার চলে যাওয়া ‘পালানো’র সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়েছে। তাকে মিলিটারি জোর করে পাঠিয়েছে সেটা হতেই পারে এবং সত্যও ধরা যাক বা সত্যই। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করলেন কেন? মিলিটারি যে কাউকেই দেশ ছেড়ে চলে যেতে বললে অমনি তারা চলে যাবেন? আমার মনে হয় না যে মিলিটারিও সহসা কাউকে অমন করে বলে বা যাদেরকে বলে তারা চলে যায়। শেখ হাসিনা গেছেন। কারণ ততক্ষণে তিনি জানেন যে তার রাজনৈতিক সততা ও সৎ ব্যবস্থা গ্রহণের সকল আস্থা হারিয়েছেন। অগত্যা থাকে ওই পদ্ধতিই গ্রহণ করতে হয়। অর্থাৎ চলে যাওয়া। যাকে তার বিরোধীরা বলছেন ‘পালানো’।
বাংলাদেশের মিলিটারি কী ৭১ এর মিলিটারিদের চাইতেও খারাপ যে শেখ হাসিনা আস্থা রাখতে পারলেন না! হ্যাঁ বাংলাদেশের মিলিটারিদেরও খারাপ কাজের নমুনা আছে। ‘তারা’ [বিশৃঙ্খলিত মিলিটারি] দেশের দু’জন রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করেছে; তা কেবল যদিও সন্ত্রাস; কোনো রাজনীতির বিষয় নয় [এ আলোচনা ভিন্ন] কিন্তু এই আলোচনা বা অভিমত রাজনীতি নিয়ে, সন্ত্রাস নয়।
ওই হত্যা সন্ত্রাস বলে বিবেচিত হবে।
বঙ্গবন্ধু কিন্তু ৭১-এ পাকিস্তানী মিলিটারিদের হাতে গ্রেফতার হতে পারেন, তার জীবনাবসান হতে পারে সেসব জেনেও ‘চলে যাননি’ বা ‘পালাননি’। একদিন এই প্রসঙ্গেও আলোচনা হবে, গবেষণা হবে এই আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চলে যাওয়া নিয়ে যাকে অধিকাংশই ‘পালানো’ বলে থাকেন।
লেখক পরিচিতি:
আনোয়ার শাহাদাত
লেখক, গল্পকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা; নিউইয়র্ক