শ্রমিকের মতো শ্রমিক কমরেড তাজুল । নাছিমা ইসলাম

Comments

বিপ্লবের লাল ফুল কমরেড তাজুল

ঝড়ো হাওয়ায় হারিয়ে গেল আমার সবচেয়ে প্রিয় এবং নিরাপদ আশ্রয়টি। পারিবারিক শত ঝড়েও যাকে আমি হারিয়ে যেতে দেইনি। প্রকৃতি সব জেনেও আমাকে লণ্ডভণ্ড করে দিল। সেই কথাই আজ বলতে চাচ্ছি।

সিক্স সেভেন এই দুই ক্লাসে আমি পড়েছি পুরনো ঢাকার আগামসি লেনের মুসলিম গার্লস হাই স্কুলে। থাকতাম আগাসাদেক রোডে। ’৬৭ সালে আমি যখন সেভেনে পড়ি টেলিভিশনে তখন মেধাবী ছাত্রদের নিয়ে একটা অনুষ্ঠান হতো ‘বলুনতো দেখি’। এই অনুষ্ঠান আরম্ভ হতেই দেখি তাজুল প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। এই ৩৯ বৎসর পরে আজও মনে আছে তাজুলের উত্তরগুলি। আব্বাকে টেনেনিয়ে এসে তাজুলকে দেখালাম। আব্বা হাসতে ছিলেন। তখন বুঝিনি এই হাসির অর্থ। এর মাত্র কয়েকদিন পরেই জানলাম তাজুলের সাথে আমার বিয়ের কথাবার্তা পাকা করার জন্য মুরুব্বীরা আমাদের বাসায় আসছেন। ’৬৭-র এপ্রিলের এক বিকেলে কথাবার্তা পাকা হয়ে গেল। দু’জনের পড়াশুনা হয়ে গেলে বিয়ে হবে। বিয়ে করবো না বলে ভীষণ কেঁদেছিলাম। কাজ হয়নি। তাজুলকে আমরা মতলববাসী হিসাবে ছোটকাল থেকেই চিনতাম। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র হিসেবে তাজুল ৫ম ও ৮ম শ্রেণির বৃত্তিতে চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে প্রথম হয়েছিল এবং মেট্রিকে যে সে স্ট্যান্ড করবে এটা প্রধান শিক্ষক হতে আরম্ভ করে যারা তাকে চেনেন সবাই আশা করেছিলেন। কিন্তু পরীক্ষার কাছাকাছি সময়ে টাইফয়েড জ্বর হওয়াতে ইনজেকশনের মাধ্যমে জ্বর কমিয়ে তাকে বিশেষ ব্যবস্থায় পরীক্ষা দিতে হয়। ঐ অবস্থায় পরীক্ষা দিয়েও ৩টি লেটারসহ ফাস্ট ডিভিশনে পাশ করেন। তাজুলেরও ছোট বয়সে মা মারা যান। তাজুলের শৈশব কেটেছে ভীষণ কষ্টে। ওদের সম্ভ্রান্ত পরিবার, মিয়াবাড়ী হলেও অর্থনৈতিকভাবে ওরা ভীষন কষ্ট করেছে, পরে জেনেছি, কষ্টেরও সীমা থাকে, কিন্তু তাদের কষ্টের কোনো সীমা ছিল না। এত কষ্ট করে একটা ছেলে এত ভালো রেজাল্ট করতে পারে তা অবিশ্বাস্য। মেট্টিকের পর তাজুল ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি হন অর্থনীতিতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই তাজুল ছাত্র ইউনিয়নের সাথে ব্যাপকভাবে কাজ করতে থাকেন। এক সময় কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক হিসাবে তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। আমি তখন ইডেন কলেজে ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। রোজার ঈদের ছুটিতে বাড়িতে যাওয়ার পর বাবা মাকে বললেন তাজুল যেভাবে নাওয়া-খাওয়া ভুলে পার্টির সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করছে তাতে আমি ভীষণ চিন্তিত। বিয়েটা আমি এখনই দিয়ে দিতে চাই। সংসারের দায়িত্ব পড়লে সব ঠিক হয়ে যাবে। সেই ছুটিতেই আমাদের বিয়ে হয়। বাবার ধারণা ভুল প্রমাণিত করে তাজুল বিয়ের ভোর রাত্রেই ঢাকা চলে আসেন ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলনের প্রস্তুতিমূলক কাজের জন্য।

প্রথমে বিয়ে করতে রাজী না হলেও পরবর্তীতে তার বুদ্ধিমত্তা, ব্যক্তিত্ব আমাকে দারুণভাবে আকর্ষণ করে, আমি তাকে ভালভাবে জানার সুযোগ পাই। তাই বিয়েতে আর আপত্তি ছিল না। বিয়ের ৩/৪ মাস ঝামেলাবিহীন ছিলাম। তারপর বাবা আমাকে ভীষণ চাপ দিতে থাকেন তাজুলকে ছাত্র ইউনিয়ন এবং পার্টি থেকে সরিয়ে নিয়ে আসার জন্য। আর না ছাড়লে তাজুলকে ডিভোর্স দিতে হবে এই হুমকির কথা জানালেন।

আমি নিজেও ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত। তবুও বাবার ইচ্ছানুসারে তাজুলকে আমি চাপ দিচ্ছিলাম এবং বলছিলাম পার্টি থেকে সরে আসার জন্য। তাজুল যখন শুনছিল না এবং আব্বাও যখন তার কথা থেকে এক পা-ও পিছাবেন না তখন আবদুল কাইয়ুম মুকুল ভাইয়ের সাথে বসলাম এই সমস্যা নিয়ে (তাজুল কাইয়ুম মুকুল ভাইকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন)। মুকুল ভাই আমাকে বললেন, ‘খুকু তাজুল ব্যবসা অথবা চাকুরি করে কি করবে! এদেশের শ্রমিকশ্রেণির মুক্তির সংগ্রামে আমাদের তাজুলের মত লোকের উপস্থিতি বেশি প্রয়োজন’। আমাকে দেশ নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখালেন মুকুল ভাই।

তবুও তাজুলকে বলেছিলাম, ‘পার্টি ছাড়ার জন্য’। তাজুল আমাকে একদিন বলল, ‘খুকু আমি শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত একটা গাছ। শিকড় বহু নিচে। তুমি যদি গাছটা টেনে উঠাও দেখবে দুই দিনে গাছটা শুকিয়ে মরে গেছে। তখন শুকানো গাছটা নিয়ে তুমি কি করবে’। ঐ কথার পর আমি তাজুলকে আর একদিনের জন্যও পার্টি ছাড়তে বলিনি। বলিনি কোনোদিন কোনো প্রয়োজনের কথা। যতটুকু পেরেছি সার্বিকভাবে কেবল সহযোগিতা করেছি। শুধু তাকে নয়, আদমজীতে কোনো শ্রমিক সমস্যায় পড়লে তার পাশেও দাঁড়াতে চেষ্টা করেছি। তাজুলকে সহযোগিতা করতে যেয়েই বাবার রোষ দৃষ্টির শিকার হই। বাবা প্রথমে পড়াশোনার খরচ বন্ধ করে দেন। তারপর ত্যাজ্য মেয়ে করেন। সামনে অনার্স সাবসিডিয়ারী পরীক্ষা, তখন পার্টির কমরেড বেলা নবীর বাসায় থেকে পরীক্ষা দেই। পরীক্ষা দিয়েই নানীর বাড়িতে চলে যাই। সেখান থেকে মতলব আইডিডিআরবিতে চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দেই এবং চাকরি পেয়ে যাই।

তাজুলকে তার রাজনৈতিক জীবনে সহায়তা করার জন্য পড়াশোনা বাদ দিয়ে চাকরি নিয়ে মতলব চলে গেলাম। তখন তাজুল ছাড়াও তাজুলের দুই ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করি। এর মধ্যে একজনের পড়াশোনার দায়িত্ব। বাবা তাতেও ভীষণ বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘এবার আমার সম্মানটা ধুলায় মিশানোর জন্য মতলবে চাকরি নিয়েছে মেয়েটা’।

তাজুলের মধ্যে যে আদর্শ, ন্যায়পরায়ণতা বোধ ছিল সেটি কিন্তু ছোটবেলা থেকেই। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি আপন ভাই, চাচাতো ভাই সবার পড়াশোনা যাতে হয় তার ব্যবস্থাও করেছেন নিজে। সে জন্য স্কলারশীপের পাশাপাশি নিজের ক্লাসের ছাত্রদেরও পড়াতেন।

তাজুল বরাবরই ক্লাসে প্রথম হতেন। শিক্ষাজীবনে ছাত্র হিসাবে সুনাম অর্জন করেছেন যেমন, তেমনি ক্রীড়াজগতেও তিনি স্কুলের হকি টিমের অধিনায়ক ছিলেন। তাজুল এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং কম কথা বলতেন। সকল কাজেই ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ়চেতা। এমনি করেই তাজুল সকল ছাত্রদের কাছে সেই কিশোর বয়সেই হয়ে উঠেছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র, শিক্ষকদের স্নেহাস্পদ।  এই বিষয়টা আরো বিস্তৃত বলতে পারবেন ট্যানারীর শ্রমিক নেতা আবুল কালাম আজাদ।

তাজুল একদিকে ছিলেন দারুণ মেধাবী, অন্যদিকে নীতির প্রতি অবিচল। অন্যায়ের সাথে কোনোদিন আপোষ করেননি। তার জীবনে প্রতিটা ক্ষেত্রে তা প্রমাণ করে গেছেন। যা বলতেন তা বিশ্বাস করতেন- আর তা চর্চা করতেন।

এস এম হল ছিল তৎকালীন সময়ে প্রতিক্রিয়াশীল ছাত্রদের আস্তানা। নিজামুদ্দীন আজাদ, তাজলুরা ঐ হলে বিরূপ স্রোতের মাঝে ভীষণ কষ্ট করে ছাত্র ইউনিয়নকে অনেকটুকু এগিয়ে নিয়েছিলেন। ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তাজুল ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়ন-কমিউনিস্ট পার্টির যৌথ গেরিলা বাহিনীতে যোগদান করেন, যুদ্ধ শেষে নয় মাস পর দেশে ফিরে আসেন। শ্রদ্ধেয় মুস্তারী শফীর বই ‘স্বাধীনতা আমার রক্ত ঝরা দিনগুলোতে’ পড়েছি আগরতলায় ক্রাফটস হোস্টেলে কিভাবে ওনার ছেলে মেয়েদের প্রিয় মামা হয়েছিলেন তাজুল। যুদ্ধ শেষে মতলবে ছাত্র ইউনিয়নকে দাঁড় করাতে উঠে পড়ে লেগে গেলেন তাজুল। আরো পরে এস এম হলে যখন তাজুলরা ছাত্র ইউনিয়নকে শক্তিশালী করছিলো তখন প্রতিক্রিয়াশীলরা আবারও তাজুলকে আক্রমণ করে। এ আক্রমণে তাজুল রক্ষা পেলেও তাজুলের চাচাতো ভাই হারুন, ছাত্র ইউনিয়নের কাশেম ভাই ও সবুজ আহত হন। তখনও তারা তাজুলের নাম ধরে জিজ্ঞেস করেছিলো ‘তাজুল’ কোথায়। আরো পরে ছাত্র ইউনিয়নের কাজে তাজুল ও তার বন্ধু বর্তমান টেনারী শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদসহ মতলবে যাচ্ছিলেন, পথিমধ্যে ঘোড়াদারি নামক গ্রামের কাছে তৎকালীন সরকারের ২০/২৫ জন পেটোয়াবাহিনী তাদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে ঘিরে ফেলে। মৃত্যুর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে যান তারা। কালাম ভাইয়ের কথায় জানা যায় তিনি কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তাজুল অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে কালাম ভাইকে বলেছিলেন, ‘কমরেড মৃত্যু অনিবার্য, সুতরাং প্রাণ ভিক্ষা নিরর্থক। মরতে যখন হবেই তখন বীরের মতই মরবো। কমরেড আমরা দু’জনে গলা জড়িয়ে থাকবো। যখন ওরা বেয়োনেট চার্জ করবে বা গুলি করবে তখন চিৎকার করবো না। আমরা জোরে জোরে ‘ইন্টারন্যাশনাল গাইব’, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ শ্লোগান দিব। আমাদের মৃত্যু যেন ওদের ভীত কাঁপিয়ে দেয়। আমরা মরে আমাদের পার্টিকে করে যাব গর্বিত’। এর মধ্যে তাজুল কালাম ভাইকে বলেছিল, ‘আসুন শেষ চেষ্টা করি বাঁচার জন্য’। চেষ্টা করতে যেয়েই গ্রামবাসীর সহযোগীতায় ওরা প্রাণে বাঁচলো। এ ব্যাপারে তথ্য আমি কালাম ভাইয়ের মাধ্যমেই পেয়েছি।

তাজুল ছিলেন বীরোচিত মনোবলের। আমি তখন আদমজীর কাছে সিদ্ধিরগঞ্জ থাকি, আমার ফুফাতো দুলাভাই, তখন উনি মেজর জেনারেল এবং আর্মি মেডিকেল কোরের ডিরেক্টর জেনারেল। আমাকে ডেকে বলেছিলেন, ‘এমন বাবার মেয়ে হয়ে এত কষ্ট করতে পারো ভাবতে অবাক লাগে। আমি কোনোদিন কোনো নীতি বহির্ভূত কাজ করিনি। কিন্তু তোমার জন্য করবো। তাজুলকে বুঝায়ে রাজী করাও। একটা টেন্ডার দাখিল করতে বলো। ও রাজনীতি করুক, তুমি বাচ্চাদের নিয়ে বেশ কিছুদিন চলতে পারবে। তোমার চিন্তায় মামা রাতভর ঘুমাতে পারেন না’। বাসায় আসার পর তাজুল আমাকে জিজ্ঞেস করল, দুলা ভাই তোমাকে ডেকেছিলো কেন?আমি তাকে ডাকার কারণটুকু বললাম। তখন তাজুল আমাকে বলল, ‘তোমাকে আরো যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। লোভকে জয় করতে হবে’। বলেছিলাম, আমি তো মা, ছেলেদের মুখে একটু দুধ তুলে দিতে পারি না- তখন তাজুল বললো, মাসে তো ৮/১০ দিন তোমার ছেলেরা মুখে দুধ তুলতে পারে, শ্রমিকদের কথা ভাবো, তাদের ছেলে মেয়েদের কথা ভাবো। আমার সংগ্রাম তো তাদের জন্যই। তাদের নিয়ে চলতে হবে- তাদের কথা ভাবতে হবে’।

আমার ছোট ছেলের বয়স যখন এক মাস তখন আমি নিপোর্টের রিসার্চ প্রজেক্টে চাকরি নিয়েছিলাম। আজ চট্টগ্রাম থাকিতো কাল ময়মনসিংহ। বাসায় আসতাম ২৫/২৬ দিন পর পর। তাজুল বেশ কষ্ট করে দুই বাচ্চা এবং পার্টির কাজ নিয়ে হিমসিম খেয়েও চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আর সম্ভব হচ্ছিল না বলে পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঝিগাতলা থেকে সিদ্দিরগঞ্জে বাসা নিয়ে চলে যাই। আমাদের অর্থনীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাসা পাচ্ছিলাম না বলে তখন কিছুদিন কালাম ভাইয়ের বাসায় ছিলাম। অর্থনৈতিক কারণে সিদ্ধিরগঞ্জেও যখন থাকা সম্ভব হলো না তখন বাবার বাড়িতে যেয়ে উঠলাম। বাবা কিছুই বলেননি, তবে আমার বড় ছেলেকে যেহেতু খুব আদর করতেন তখন বুঝতাম বাবা আমাদের গ্রহণ করেছেন। এই যখন অবস্থা, তখন বেশ কিছুদিন আগে ইন্টারভিউ দেওয়া সরকারি প্রাইমারী স্কুলের চাকরির নিয়োগপত্র পাই। বেতন সামান্য তবু তো পায়ের নিচে মাটি পেলাম।

তাজুল আদমজীতে এক যুগ কাটিয়েছেন শ্রমিক হয়ে, নিজ হাতে তাঁত চালিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকারের সংগ্রামে নিজের জীবনকে বাজী রেখে। একবার তো তাঁত চালাতে চালাতে অল্পের জন্য রক্ষা পেল তার জীবন। তার খাদ্য ছিল চাল, আলু, কখনও ডাল একত্রে নরম করে সিদ্ধ করে খাওয়া। স্কুল ছুটি হলেই ছুটে যেতাম আদমজীতে। তাজুলের পাশের বাসার শ্রমিকলীগের চান্দু ভাই গেলেই বলতেন, ‘ভাবী এসেছেন ভাইকে একটু ভালমন্দ রেঁধে খাওয়াবেন। ভাই যে কি খায় খুব কষ্ট লাগে’। তাজুল মনে প্রাণে শ্রদ্ধা করতেন নানা মতের ব্যক্তিদেরও। তাই বুঝি তাজুল ছিলেন সবার মিলনকাঠি। অনেক নেতার ঘটনা শুনি যে, নিজেদের গ্রামে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নেই। কিন্তু তাজুল ছিলেন বিরল। সব জায়গাতেই সবার কাছে তার খুব বেশি গ্রহণযোগ্যতা ছিল। আমি মতলব আইসিডিডিআরবিতে চাকরি করার সময় নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা অলিউর রহমান মলতবে যেয়ে আমার সাথে দেখা করে বলেন, ‘তাজুল ভাইয়ের সাথে আমি মতলব স্কুলে পড়েছি একই ক্লাসে। ভাবী আমি মনে করেছি তাজুল ভাই বিরাট কোনো পোস্ট নিয়ে বিরাট কোনো জায়গায় আছেন। কিন্তু একজনের কাছে শুনে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমাদের সময়কার সেই রাজপুত্রটি আমার বাড়ির পাশে আদমজীতে শ্রমিক হয়ে কাজ করছে। ভাবী বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল তাই আপনার সাথে দেখা করে পুরোটা জেনে নিলাম। তাজুল ভাই আমাকে পড়াতেনও’।

অনেক সময় তাজুলের সাথে আমার দেখা হতো ৬/৭ মাস পর পর। অনেক সময় মর্তুজা খান ভাইয়ের বাসায় আসতাম, এসে ওর ব্যাপারে খবরা খবর নিতাম। কখনো আমার সাথে দেখা হতো, কখনো বা হতো না। আমার বড় ছেলে হওয়ার ২১ দিন পর তাজুল গিয়েছিলো দেখতে। পরবর্তীতে ছেলে হওয়ার পর দ্বিতীয় বার দেখা হয় আমার বড় ভাইয়ের বাসায় যখন ছেলে বসতে পারে। তখন আমার ছেলের সাথে ভাবীর বোনেরও এক বাচ্চাকে একসাথে বসিয়ে ভাবী তাজুলকে বলেছিল কোনটা আপনার বাচ্চা কোলে নিন। বাচ্চাদের জন্য তার অফুরন্ত ভালবাসা ছিল। তবুও বাচ্চাদের জন্য সময় রাখতে পারতেন না।

আমি তাজুলের কাছে আদমজীতে সর্বশেষ যাই ’৮৪-র ফেব্রুয়ারি ১৫ তারিখে। আমি বাচ্চাদের নিয়ে যাবার পর সে যে কি খুশী হয়েছিল। কখনো তাকে শ্রমিক ভাইদের সামনে এভাবে উচ্ছসিত হতে দেখিনি। আর এটা ছিল ওর স্বভাব বিরুদ্ধও। তো আমি গিয়েছিলাম শিক্ষকদের একটা মহাসম্মেলনে প্রতিনিধি হয়ে অংশগ্রহণ করতে। মহাসম্মেলন শেষে ২২ ফেব্রুয়ারি চলে আসি স্কুলে। কিন্তু তাজুল আমাকে ২২ ফেব্রুয়ারি চলে যেতে দিতে চায়নি। বলেছিল নানা প্রোগ্রামে ছেলেদের সময় দিতে পারিনি। ১ মার্চ হরতাল। এবার মনে হয় ওরা আমাকে ছাড়বে না। জেলে ঢুকাবেই। জেল থেকে এসে ছেলেদের কবে দেখি, তুমি আর দু’টা দিন পরে যেও। কিন্তু আমাদের স্কুলে হেড মাষ্টার সাহেব ছিলেন না বলে কিছু বাড়তি দায়িত্ব নিতে হয়েছিল এবং স্কুলের জন্য কিছু জরুরি জিনিসপত্র কিনেছি। তাই জোর করেই চলে গিয়েছিলাম। তবে বলেছিলাম ২ মার্চ শুক্রবার আমি আসবো (এই চলে যাওয়াটার জন্য আমি কোনোদিন ক্ষমা করতে পারিনি নিজেকে)। ’৮৪-র ২ মার্চ শুক্রবার ছিল, বলেছিলাম তাজুলকে, যদি সম্ভব হয় নারায়ণগঞ্জ লঞ্চঘাটে ১২টার দিকে থেকো, আমি আসবো। আসলে পরবর্তীতে আদমজীতে যেতে আমার ভালো লাগতো। কারণ তাজুল যে আদমজীতে খেয়ে না খেয়ে শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করতো দলমত নির্বিশেষে তাদের সেটা উপলব্ধিতে এসেছিল। তাই তার যে কোনো কর্মসূচি ছিল তাদের ব্যাপক উপস্থিতি। আদমজীতে একতা পত্রিকা চলতো ১০০ কপির উপর, শ্রমিকদের ইয়াং গ্রুপের মধ্যে অনেকেই নিজেরাই উৎসাহী হয়ে স্বেচ্ছায় তাজুলের নিরাপত্তাবর্ম হিসাবে, বডিগার্ড হিসাবে কাজ করতো। তাজুল মারা গেলে ওরা কাঁদছিল আর বলছিল রাত ৯টায় আমরা ভাইকে বলে খেতে গিয়েছিলাম, বলেছিলাম ‘আমরা না আসা পর্যন্ত আপনি বের হবেন না। কিন্তু ভাই আমাদের কথাকে গুরুত্ব দিলেন না’।

কিছুকাল আগে আদমজী চটকলটি বন্ধ করে দিলে আমি আদমজীতে যাওয়ার পর দলমত নির্বিশেষে শ্রমিক ভাইয়েরা আমাকে বলছিল আর কাঁদছিল- আজ তাজুল ভাই বেঁচে থাকলে আদমজী মিল বন্ধ হতে দিতো না। ভাবী আজ আমাদের তাজুল ভাইয়ের মত নেতার বড় বেশি প্রয়োজন ছিল। ভাবী, তাজুল ভাইয়ের রক্তের অভিশাপে আদমজী ছারখার হলো। ঐ অবস্থায় তাদেরকে আর বলতে পারিনি যে, তাজুলতো তাদের অভিশাপ দিতে পারেন না। কারণ নিজের ন্যূনতম মৌলিক প্রয়োজনীয়তা বাদ দিয়ে, জীবন-যৌবন দিয়ে যে শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা করতে চেয়েছিল, সেই শ্রমিকদের তো তাজুল অভিশাপ দিতে পারেন না। তিনি তো মেকি নেতা নন। আদর্শের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ উজাড় করে দিয়েই তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তাজুল।

খুব ছোট্ট-নিচু-আদমজীর বাসায় তাজুল গরমে খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। সেবার তা দেখে যাওয়ায় ফ্যান কিনে দেওয়ার চিন্তা করি। আমার অল্প অল্প জমানো এক হাজার টাকা বৃহস্পতিবার ১ মার্চ ব্যাংক থেকে উঠালাম এবং ও যে গাছের বরই পছন্দ করে সেই বরই পেড়ে কাপড় চোপড়ের সাথে গুছিয়ে রেখে স্কুলে গিয়েছিলাম ক্লাস নেওয়ার জন্য। ৩টার দিকে খবর পেলাম, বাবা বললেন তাজুল এক্সিডেন্ট করেছে, ঢাকা মেডিকেলে আছে। আমি বললাম এখনই যাব, বাবা বললেন হরতাল তো কিভাবে যাবে। আমি বললাম হেঁটে হলেও যাব। এর মধ্যে বাবার কাছে খবর এসেছে তাজুল মারা গেছেন। তাই বাবা আর আমাকে যেতে দেননি। পরদিন তার কাছে যাব বলে সব রেডি করে রেখেছি, আর সেই কিনা বিনা নোটিশে চিরদিনের জন্য চলে এলো আমার কাছে। আজও আমি কাস্তে হাতুড়ি খচিত লাল পতাকা অথবা সভাগুলো দেখলেই অসুস্থ হয়ে পড়ি। আর এ জন্য আমি নিজেকে নিজে খুব বেশি সমালোচনা করি।

তাজুলের মৃত্যুর বছর খানেক আগেই আমার বাবা তাজুলের এই সংগ্রামী জীবন মেনে নিয়েছিলেন পুরোপুরিভাবে। বাবা তাজুলকে যে কি ভালবাসতেন তা কল্পনাও করা যাবে না। এত যুদ্ধ শুধু অর্থনৈতিকভাবে কিছু করার জন্য। বাবা বিয়েই দিয়েছিলেন তাজুল একদিন সিএসপি অফিসার হবে সেই স্বপ্নে, সেখানে তাজুলের একজন তাঁত শ্রমিক হওয়াটাকে কিভাবেই বা মেনে নেন বাবা! বাবার দুঃখটাও তো বুঝি।

তাজুল শত ব্যস্ততা আর অর্থনৈতিক সংকটের মাঝেও সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে প্রকাশিত পত্রিকা নিয়মিত কিনে পড়তেন। রাগ প্রধান গান এবং রবীন্দ্রসংগীত ভালো গাইতে পারতেন। রাগ প্রধান গান গাওয়ার সময় কোনো কথাবার্তা একদম পছন্দ করতেন না। রবীন্দ্রসংগীত খুব চমৎকার গাইতেন। তার অনেক প্রিয় গানের মধ্যে প্রায়ই এই গানটি গাইতেন, ‘এক গোছা রজনীগন্ধা হাতে নিয়ে বললাম, চললাম’। হ্যাঁ চলেই তো গেলেন, কিন্তু আমি? দুই সন্তানকে নিয়ে সাগরের মাঝে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মত সেই চলে যাওয়া দেখলাম।

লেখক:
Tajul Islam_Nasima Islam
নাছিমা ইসলাম, কমরেড তাজুল ইসলামের জীবনসঙ্গী
(শহীদ তাজুলের সংগ্রামী জীবনের সাথী নাছিমা ইসলাম ২০১৬ সালের ৪ জানুয়ারীতে মৃত্যুবরণের কয়েক বছর আগে তাজুলের স্মৃতি নিয়ে এই লেখাটি প্রকাশ করেন। তার সেই লেখাটিই শিরোনাম পাল্টে ৩৬তম তাজুল দিবসে বাঙালীয়ানার পাঠকের জন্য প্রকাশ করা হলো- সম্পাদক)

*প্রকাশিত এই লেখার মতামত এবং বানানরীতি লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা বানানরীতি বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই। – সম্পাদক

 

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.