সততা । আনিকা আজাদ

Comments

বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে মিলি। আশেপাশের আত্মীয়স্বজন প্রায়ই বলে থাকে “একজন মাত্র মেয়ে? বুড়ো হলে আপনাদের কে দেখবে?” তা নিয়ে আপনাদের চিন্তা করতে হবে না বলে হাসি মুখে মিলির আব্বু উত্তর দেন।

মিলির আব্বু একজন সরকারি কর্মকর্তা। তিনি থাকেন ঢাকার মিরপুরে। চাইলেই তিনি ঘুষ খেয়ে বনানী গুলশানে বাড়ি গাড়ি করে আরাম আয়েশের জীবন কাটাতে পারতেন, করেননি। তার বিবেক তাকে চুরি করতে বাধা দেয়। প্রায়ই যখন মিলির মা-বাবা গল্প করেন, তারা আলোচনা করেন যে তারা তাদের একমাত্র সন্তানকে কেমন করে গড়ে তুলতে চান।

মিলির মা এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। তিনি একটা প্রাইভেট স্কুলে শিক্ষকতা করেন। মিলিকে ক্লাস ৯ পর্যন্ত তার মা-বাবা দুইজন মিলেই পড়াশুনা করিয়েছেন। মিলি যখন ক্লাস ১০ এ উঠলো তখন মিলির নানা মারা গেলেন। নানার সব থেকে প্রিয় সন্তান ছিলেন মিলির মা। আচমকা হার্ট অ্যাটাক হয় মিলির নানার। মৃত্যুর সময় বাবার পাশে থাকতে পারেননি বলে নিজেকে দোষারোপ করেছেন। শোকে কাতর মিলির মা কয়েক মাস মিলির নানুর কাছে গিয়ে থাকলেন। চাকরিটাও ছেড়ে দেন। তাই আর মিলিকে পড়াতে পারেননি।

এসময় মিলির বাবা তার স্ত্রীকে সম্পূর্ণ সহায়তা দিয়েছেন। তিনি শুধু বলেছেন, তুমি যাও। কোনো চিন্তা করো না, আমি তো আছি-ই। এর কিছুদিন পরেই মিলির এসএসসি। বাবাই তাকে সম্পূর্ণ সময় দিয়েছেন।

মিলির এসএসসি (বাংলা) পরীক্ষা ছিল কাল। তার বন্ধুদের দেখাদেখি পরীক্ষার আগে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র দেখেছে সে। প্রিপারেশন ভাল থাকার পরেও সে এই কাজ করেছে। পরের দিন স্বপ্নে দেখলো, তার আব্বু তাকে এই কাজ করার জন্য বকছে। স্বপ্ন দেখে তার ভীষণ খারাপ লাগলো৷ তার আব্বুর সাথে সে খুব ক্লোজ। কোনো ঝামেলায় পড়লে তার সবার আগে আব্বুর কথা মনে পড়ে। 

এর পরের কোনো পরীক্ষায় সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে প্রশ্ন দেখেনি। পরীক্ষা শেষে সে বাড়ি গেলে তার আব্বুকে এই কথাটা বলে।

শুক্রবার সকাল। তার আব্বু নাকে চশমা দিয়ে পেপার পড়ছিলেন। তার কথা শুনে হকচকিয়ে গেলেও মেয়েকে তা বুঝতে দিলেন না। চশমা খুলে রেখে কিছুক্ষণ মিলির দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

– আব্বু, কিছু বলেন। এভাবে তাকিয়ে থাইকেন না। অনেক সাহস নিয়ে বলেছি কথাটা।

– আমার মেয়ে হয়ে এই কাজটা করলি? কাজটা কি ঠিক হল?

– ঠিক হয় নাই বুঝেছি বলেই তো পরের পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্ন দেখিনি।

– তাহলে আমাকে বলতে গেলি কেন? আমাকে না বললে তো আমি জানতামই না! তুই আমার সেই লক্ষী মেয়েটি থেকে যেতি।

– এখন আমি অলক্ষী হয়ে গেলাম?

মিলির আব্বু হাসতে হাসতে উত্তর দিলেন, না মা। অলক্ষী কেন হবি? তুই আরো খারাপ কাজ করলেও আমার মিলিই থাকতি। আর তুই তোর একটা খারাপ কাজ থেকে অনেক বড়। এই যে বুঝতে পেরে কাজটা আর করিস নাই, এই তো বাবা হিসেবে আমার স্বার্থকতা। এখন বল তো, আমি স্বপ্নে এসে তোকে তাগিদ না দিলে কি ঠিক কাজটা করতি?

মিলির চোখ দিয়ে এতক্ষণ শুধু পানি পড়েছে। সে ধরা গলায় উত্তর দিল, জানি না।

– তুই বড় হবি এক সময়। সব সময় তো আমি থাকবো না কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক এসব বলে দেওয়ার জন্য। নিজের এই ঠিক-বেঠিকের বাউন্ডারি খুব শক্ত ভাবে গড়তে হবে যেন খারাপ কাজ করতে গেলেই নিজের মন থেকে বাধা চলে আসে।

কাঁদতে কাঁদতে মিলি বলে, আচ্ছা।

মিলির আব্বু মনে মনে ভাবে, মিলির জীবন তো কেবল শুরু। ঠিক-বেঠিক, সত্য-মিথ্যা এসবের দর কষাকষি তো শুরুই হল না। আহা! আমার মেয়েটা যদি কখনো বড়ই না হত! এসব কঠিন পরীক্ষা ছোট নিষ্পাপ  মিলিকে দেওয়া লাগতো না।

লেখক:
Anika Azad
আনিকা আজাদ, গল্পকার, প্রকৌশলী

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট