দেশভাগের অজানা অধ্যায়: পর্ব- চার । সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

 

 

গতপর্বে আমরা দেখেছিলাম ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের ভয়ংকর চিত্রের সামান্য কিছু অংশ। একটি দেশের অর্থনীতি ,একটি দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা কিভাবে ধ্বংস হতে পারে তার ‘উত্তম’ এক উদাহরন ছিল ব্রিটিশ প্রণীত তখনকার আইনগুলো। সেই মন্বন্তরের পরে তারা তাদের নীতির কোন পরিবর্তন করেছিলেন এরকম কোন বিবৃতি বা তথ্য প্রমান আমরা পাইনা। তাদের এই রাজস্ব নীতি যে ভয়ংকর ছিল সেটা তাদেরই এক সিভিলিয়ানের কাছ থেকে আমরা জেনে আসতে পারি। দেখুন সেই সিভিলিয়ান কি বলেছেন…

“একটা বছরে যখন জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ, এবং কৃষিজীবীর ৫০ শতাংশ নির্মূল হয়ে গেল, তখন শতকরা ৫ ভাগও ভূমি রাজস্ব মকুব করা হয়নি; উপরন্তু দুর্ভিক্ষের বছরে(১৭৭০-৭১) রাজস্ব ১০ শতাংশ বেশী করা হয়।“ [Annals of Rural Bengal- W. W Hunter]

আসলে ইংরেজরা এদেশে শাসন করার আগেও শাসকদের আয়ের প্রধানতম উৎস ছিল ভূমিরাজস্ব। কিন্তু রাজস্ব সংগ্রহের সময় গ্রামকে ধরা হতো এককরূপে, ব্যক্তিকে নয়। সরকারকে রাজস্ব দিত গ্রাম, তাতে ব্যক্তির কোন দায় ছিল না।প্রজা তথা কৃষক তাদের উৎপাদিত শস্যের ভিত্তিতে রাজস্ব জমা দিত গ্রামের প্রধানকে ।তিনি সমস্ত রাজস্ব একত্র করে পাঠিয়ে দিতেন তার উর্ধতন কতৃপক্ষের কাছে। হিন্দুযুগে এই রাজস্বের হার ছিল উৎপাদনের একের-ছয় ভাগ, মোগল আমলে একের-তিনভাগ।

ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভের পর এই বহু পুরনো রাজস্ব সংগ্রহ ব্যাবস্থা ভেঙ্গে পড়লো। প্রত্যেক কৃষক ব্যক্তিগতভাবে রাজস্ব জমা দেয়ার জন্য দায়ী হল এবং রাজস্ব দিতে হল নগদ অর্থে, উৎপাদিত শস্যে নয়।এই ব্যাবস্থায় ব্যক্তি কৃষককে রাজস্ব জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হল গোমস্তা বা নায়েবদের হাতে। ফলে জমির উপর গ্রামের যৌথ মালিকানার অবসান ঘটলো!

এই ভয়ংকর ব্যাবস্থার পরেও কৃষকদের বুকে শেষ পেরেক ঠুকে দিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। তিনি সর্বনাশের পথে নিয়ে গেলেন নতুন ভূমি-সংস্কার আইন প্রণয়ন করে। তিনি বোর্ড–অফ রেভেনিউ কোনোরকম অনুসন্ধান না করে উৎপন্ন শস্যের উপর রাজস্ব ধার্য না করে খুশিমত রাজস্ব নির্ধারন করলেন ব্যক্তির উপর। প্রজারা রাজস্ব প্রদানে ব্যর্থ হলে সৈন্য পাঠিয়ে তা আদায় করা শুরু হল। এখানে কৃষক কিছু উৎপাদন করতে পারলো কি পারলো না সেটা বিবেচ্য থাকলো না।

ফলে বাড়তে থাকলো ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা। তারা তাদের অত্যাচারীকে তাদের ধ্বংসের কারন হিসেবে নিল। বাধ্য হলো বিদ্রোহ করতে। এই বিদ্রোহই আস্তে আস্তে রূপ গ্রহন করলো সন্ন্যাসী-ফকিরদের অস্ত্র ধরার মধ্য দিয়ে।

ফকিরদের বিশ্বাসের জায়গাটা খানিক ভিন্ন রকম ছিল। মুসলমান ফকিরদের নেতারা শাহ বা রাজা উপাধী ধারন করতো ।এই ভবঘুরে ফকিররা ধর্ম বিশ্বাসে গোঁড়া ছিল না, বরং যাযাবর বৃত্তির মধ্যদিয়ে তারা কিছু লৌকিক বিশ্বাস গ্রহন করেছিল। তারা মুলত সূফী মতবাদের দ্বারা বিশ্বাসী ছিল এবং বিশ্বাস করত সৃষ্টির সাথেই মিশে আছেন স্রষ্টা, তাঁর সতন্ত্র কোন অস্তিত্ব নেই।

দিনাজপুরের বুরহান ফকিরদের বিশ্বাস ছিল অনেক দিক দিয়ে অমুসলমানী। পুরনো দলিলপত্রে ‘মাদারী’ ফকিরদের বেশ উল্লেখ আছে। তারা হিন্দু সন্যাসীদের মত গায়ে ছাই মাখতো, মাথা ও গলায় পরতো শেকল। শিকার এবং উপবাস (রোজা) রাখা প্রায় অপ্রচলিত ছিল তাদের মধ্যে। এই ‘মাদারী’ ফকিরদের প্রধান নেতা ছিলেন কানপুরের মজনু শাহ!

ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যায় এদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট শক্তি লাভ করলেও এই টেরিটরির বাইরে এদের ছিল বিশাল এক আশ্রয়স্থল। সন্যাসী ও ফকিরেরা সমস্ত দেশময় ঘুরে বেড়াতো, ঘুরে বেড়াতো তীর্থে তীর্থে মেলায় মেলায়। উৎসব ,মেলার স্থান এবং দিনক্ষন ছিল এদের নখদর্পনে। হিন্দু সন্যাসীদের সবচেয়ে বড় মেলা অনুষ্ঠিত হত প্রতি তিন বছর পরপর আর স্থান ছিল হরিদ্বার, এলাহাবাদ, নাসিক এবং উজ্জ্বয়িনীতে। যেখানে মুসলমান ফকিরেরা গিয়েও আখড়া আস্তানা গাড়ত। এই মেলার নাম ছিল ‘কুম্ভ মেলা’। যা আজো ভারতে এমনকি বাংলাদেশের কোন কোন অংশে অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়। যদিও তখনকার ‘কুম্ভ মেলা’ আর বর্তমান সময়ের ‘কুম্ভ মেলা’র মধ্যে ব্যাপক তফাৎ আছে।

প্রশ্ন হলো এত দূর থেকে এসে তারা কিভাবে বাংলায় আক্রমন করতো? ১৭৭৫ সালে কুম্ভ মেলা শেষ হবার পর তাদের বাংলায় প্রবেশ করতে দেয়া হলো না ফলে তারা অন্য পন্থা অবলম্বন করলো। পশ্চিমদিক থেকে আগত এই সন্যাসীরা অযোধ্যা পেরিয়ে উত্তর বিহারের উপর দিয়ে পৌঁছাত তরাইয়ের নেপাল সীমান্তে কারন এপথে অবস্থিত জনকপুর ছিল সীতার জন্মস্থান হিসেবে খ্যাত। এখানেই হতো সাগর মেলা। এই তরাই থেকে পূর্ণিয়ার উত্তরদিকে গিয়ে মহানন্দা পার হয়ে প্রবেশ করতো রংপুরে। সেখান থেকে মহাস্থানগড় এবং আস্তে আস্তে ব্রক্ষপুত্রের তীর ঘেষে এগিয়ে যেত সামনে।
বাংলার বাইরে কানপুরের কাছে ছিল শাহ মাদারের সমাধি। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোক সমবেত হতো সেখানে। ফকির-সন্ন্যাসীর সংখ্যা হতো প্রচুর কখনও কখনও এই সংখ্যা ভক্তদের চেয়েও বেশী হত। এখানেই স্থানীয় ফকির-সন্ন্যাসীর আলোচনার মাধ্যমে তাদের ভবিষ্যত গতিবিধি ও দান গ্রহনের পরিকল্পনা নেয়া হত।

এই বিদ্রোহে কিছু চরিত্র ছিল ব্যাপকভাবে পরিচিত এবং তারা ব্রিটিশদের উপরে প্রতিনিয়ত আক্রমন চালাতো। এদের মধ্যে ফকির মজনু শাহ , ভবানী পাঠক এবং দেবী চৌধুরানী ছিলেন সবচে প্রভাবশালী।

প্রথমেই ফকির মজনু শাহকে খুজে আসিঃ

মজনু শাহের আদি নিবাস কানপুরের কাছে মাখনপুরে। সম্ভবত ১৭৭১ সালের প্রথমেই সে পূর্ণিয়ার ভেতর দিয়ে বাংলায় প্রবেশ করে। মহাস্থান গড়ের বিখ্যাত দরগায় যাবার সময় লেফটেন্যান্ট ফেলডাম তাকে বাধা দেয় এবং সে বিতাড়িত হয়। একবছর পরে সে আবারো ফিরে আসে ১৭৭২ এর জানুয়ারীতে বগুড়া জেলার খাতা পরগনায়। এরপর ওয়ারেন হেস্টিংস ও স্থানীয় জমিদারদের কারনে তাকে এই অঞ্চলে খুব বেশী দেখা যায়নি।

১৭৭৬ সালে তাকে আবারো এই অঞ্চলে দেখা যায়। তাজপুরের আমিল বাবু রামলোচন বোস হরেরামপুরে মজনু শাহের লুন্ঠনের খবর পাঠালেন।

সন্ন্যাসী-ফকিরদের কারনে ওয়ারেন হেস্টিংস এতই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে তিনি জমিদার ও কালেক্টরদের উপর নির্ভর করেননি । তিনি তার নিজস্ব গুপ্তচরের মাধ্যমে জানলেন কোম্পানির ফৌজত্যাগী প্রায় ২৫ জন সৈন্য মজনুর দলে আছে। খবর পেয়ে লেফটেন্যান্ট রবার্টসনকে পাঠালেন বহরমপুরে। সংঘর্ষে রবার্টসন সহ আরো পাঁচজন সিপাহী আহত হল আর মজনু শাহ গেলেন অক্ষত অবস্থায় পালিয়ে।

১৭৭৮ থেকে ১৭৮৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মজনুশাহ বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে , বিশেষকরে ময়মনসিংহ, রংপুর, দিনাজপুর,মালদহ ইত্যাদি জেলায় এক নাগাড়ে চালিয়ে গিয়েছিলেন তার অভিযান। এই অভিযান কখনও পরিচালিত হয়েছে জমিদারদের বিরুদ্ধে আবার কখনও ইংরেজদের কুঠি আক্রমনে। বারবার সিপাহি পাঠিয়ে , নিত্য নতুন সামরিক অফিসার নিয়োগ দিয়ে, জমিদারদের সাহায্য নিয়ে মজনু শাহকে গ্রেফতার করা যায়নি। ব্রিটিশ নথিগুলো বলছে সে গেরিলা পদ্ধতিতে হঠাৎ আক্রমন এবং হঠাৎ পালিয়া যাওয়ার কৌশল খুব ভালো জানতো। এমনও হয়েছে ব্রিটিশ সৈন্যরা তার খবর জেনে তাকে আক্রমন করতে যাচ্ছে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় পরে দেখা গেছে ব্রিটিশ সৈন্যদের ফেলে যাওয়া স্থানেই সে কোন জমিদার বা ব্রিটিশ কুঠি লুঠ করছে।

মজনু শাহকে যে কোম্পানির সিপাহীরা গ্রেফতার করতে পারেনি তার অন্যতম কারন হচ্ছে তার প্রতি সাধারন মানুষের সমর্থন। শোনা যায়, মজনু নাকি জমিদারদের সম্পত্তি লুন্ঠন করে বিলিয়ে দিতেন সাধারন মানুষের মধ্যে। কোম্পানির নথিপত্রে তাকে দেখানো হয়েছে একজন ‘ডাকাত’ এবং ‘লুণ্ঠনকারী’ হিসেবে। যদিও এই বর্ননা যে পুরোপুরি সঠিক না সেটা আমরা তার কার্যকলাপ আর তখনকার প্রজাদের প্রতিক্রিয়া দেখলেই বুঝতে পারি।

প্রকৃতপক্ষে মজনু শাহ ছিলেন এমন একজন ফকির নেতা যিনি বাংলার শোষিত কৃষকদের পক্ষে দাড়িয়েছিলেন ইংরেজ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে। মন্বন্তরের উত্তরপর্বে বাংলার কৃষকদের উপর জমিদার ও বিদেশী শাসনের উভমুখী শোষনের বিরুদ্ধে এ ছিল মজনুর সশস্ত্র সংগ্রাম। কখনো শোনা যায়নি মজনু সাধারন মানুষের বাড়ীঘর লুন্ঠন করেছেন। জমিদারদের কাছারি-বাড়ি, সরকারী খাজনা ও সরকারী খাদ্য শস্য লুঠ করাই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য। মজনু শাহ ছিলেন প্রায় রাজ্যহীন সম্রাটের মত।

সন্ন্যাসী বিদ্রোহের আরেক হিরো ভবানী পাঠক। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসের বদৌলতে ভবানী পাঠক ( আনন্দ মঠ) এবং দেবী চৌধুরানীর (দেবী চৌধুরানী) চরিত্র দুটি অমরত্ব লাভ করেছে। ফকির মজনু শাহের সাথে ভবানী পাঠকের সম্পর্ক ছিল অসাধারন, তারা বয়সে ছোট বড় হলেও অনেকগুলো কাজে একত্রেই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিয়েছে। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রায় শুরুর দিকে তিনি স্থানীয় কৃষকদের নিয়ে ময়মনসিংহ ও বগুড়ার মধ্যবর্তী জঙ্গলে আশ্রয় নেন। তার দলে বেশ কিছু বিহারী কৃষক ও রোহিলাখন্ডের কৃষকও উপস্থিত ছিল।

১৭৮৭ সালে ঢাকার কাস্টমস সুপারিনটেন্ডেন্ট উইলিয়ামের কাছে তামাক ব্যাবসায়ে নিযুক্ত কিছু ইংরেজ ব্যাবসায়ী অভিযোগ করেন যে, ভবানী পাঠকের দল তাদের নৌকা লুঠ করেছে। উইলিয়াম ভবানী পাঠকের বিরুদ্ধে কিছু সিপাহি পাঠান, কিন্তু লাভ হয় নাই কিছুই। ভবানী বগুড়া জেলায় পালিয়ে গিয়ে ইংরেজ বনিকদের উপর আক্রমন চালাতে থাকেন। ১৭৮৭ সালের জুন মাসে তিনি রংপুরের গোবিন্দগঞ্জের কাছে উপস্থিত হয়েছেন শুনে লেফটেন্যান্ট ব্রিনান ২৪ জন সিপাহি সমেত একজন হাবিলদারকে পাঠালেন পাঠকের বিরুদ্ধে। আকস্মিক আক্রমনে হতচকিত বিভ্রান্ত হয়ে ভবানী সদলবলে ঝাপিয়ে পড়েন সিপাহিদের উপর। যথেষ্ট প্রস্তুতি না থাকায় প্রচণ্ড সংঘর্ষের পর কয়েকজন সঙ্গী সহ নিহত হন বীরের মত।

এই কৃষক বিদ্রোহের আরেকজন কারিগর দেবী চৌধুরাণী। লেফটেনান্ট ব্রিনানের প্রতিবেদন ও গ্লেজিয়ারের রংপুর ডিসট্রিক্ট রিপোর্টে দেখা যায়, দেবী চৌধুরাণী একজন ডাকাত, ভবানী পাঠকের সাথে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। বেশ কয়েকজন বরকন্দাজ ছিল তার অধীনে। ঐ রিপোর্ট অনুযায়ী দেখা যায় তিনি একজন জমিদার ছিলেন যার প্রমান ‘দেবী’ শব্দটি তার নামের আগে রয়েছে। দেবী চৌধুরানী নৌকায় বাস করেন। যদিও নৌকায় বসবাসের কোন কারন ব্রিনান উল্লেখ করেননি।

সম্ভবত রাজস্ব আদায়ের কঠোরতা ও অত্যাচার তাকে বাধ্য করেছিল বিদ্রোহ করতে। দেবীযে ছোট জমিদার ছিলেন এ ব্যাপারে নিশ্চিত কোন প্রমান পাওয়া যায় না কোথাও। তবে একথা ঠিক তিনি একজন নেত্রী ছিলেন। ভবানী পাঠকের মৃত্যুরপর দেবী কাজ করে যাচ্ছিলেন ভবানী পাঠকের অসমাপ্ত কাজকে সমাপ্ত করার জন্য । তবে দেবীকে গ্রেফতারের কোন চেষ্টাই কখনো ব্রিটিশেরা করেন নি। ব্রিনানের বিবরনে গ্রেফতার না করার কোন ব্যাখ্যা দেখা যায় না। তার শেষ পরিনতি নিয়ে তেমন কোন দালিলিক তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

মজনু শাহ, ভবানী পাঠক এবং দেবী চৌধুরানীর একটি যৌথ আক্রমনের ইতিহাস পাওয়া যায়। সেটা ঘটেছিল দিনাজপুরে। দিনাজপুরের রাজা ছিলেন নাবালক , তিনি উত্তরবঙ্গের ইজারাদার হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন দেবী সিং কে। ফলে দেবী সিং একই সাথে রাজার ভূমিকা এবং ইজারাদারের ভূমিকাও পালন করছিলেন। এ কারনে প্রজাদের প্রতি অত্যাচারের মাত্রা যায় বেড়ে। ফলে কৃষকেরা বিদ্রোহ করতে বাধ্য হয়। এদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন মজনু শাহ, ভবানী পাঠক এবং দেবী চৌধুরানী। সংঘর্ষ হয় জমিদার ও কোম্পানির মিলিত বাহিনীর সাথে। তারা তিনজন মিলে লুঠ করেন কোষাগার এবং দিনাজপুরের কুঠি।

রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার শিকার হয়ে বাংলা- বিহারের কৃষকেরা যখন বিপর্যস্ত, তখন ইংরেজ শোষণ থেকে তাদের রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন সন্ন্যাসী-ফকিররা। ১৭৬৩ সালে প্রথম বিদ্রোহ করে তারা ঢাকার ও রাজশাহী জেলার বোয়ালিয়া কুঠি আক্রমন করে। তারপর ৩৫ বছর ধরে বহু চেষ্টার পর ইংরেজরা এই বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রনে আনতে সমর্থ হয়। কোম্পানির প্রতিবেদনে বলা হয় , সন্ন্যাসী-ফকিররা লুন্ঠনের উদ্দেশ্যে বাংলায় এসেছিল। লুন্ঠন ছিল তাদের একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু লুন্ঠনের আরো সহজ ও বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র পড়েছিল বাংলার বাইরে, কারন বাংলায় তখন ইংরেজ শাষন সবচেয়ে শক্তিশালী। সুতরাং ইংরেজদের এই ‘লুন্ঠন বা তস্কর’ শব্দ গুলো সন্ন্যাসী-ফকিরদের বিশেষন হিসেবে ধোপে টেকে না। জনগন এতটাই এই সন্ন্যাসী-ফকিরদের পক্ষে ছিল যে লুন্ঠনে অংশগ্রহনকারীকে গ্রামের রাস্তার উপর ফাঁসি দিয়েও এদের তথাকথিত ‘লুন্ঠনকে’ থামানো যায়নি! অর্থাৎ সাধারন প্রজারা এই ‘এই তস্কর, ডাকাত ও লুন্ঠনকারী’দের সহায়ক শক্তি ছিল!

গ্রন্থ সহায়তাঃ ১। নিখিল সুর রচিত ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ও সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ’।
২। Judicial (Criminal) Proceedings, 15-04-1793. 31-12-1798 & 20-01-1800.
৩। Annals of Rural Bengal- W W Hunter, 1878.
৪।, Sannyasis and Fakir Raiders in Bengal- Rai Sahib J.M Ghosh, Calcutta, 1901.

(তারুণ্যের ভাবনা বিভাগের লেখা সম্পূর্ণভাবে লেখকের নিজস্ব ভাবনা। এ বিভাগের মতামতের সাথে বাঙালীয়ানা’র ভাবনার কোন সম্পর্ক নেই এবং লেখার জন্য সকল দায় লেখকের – সম্পাদক)

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.