সমুখে দীর্ঘ পথ । স্বাতী চক্রবর্তী

Comments

অন্য পাঁচটা দিনের মতই আজকাল আটই মার্চ নারী দিবসের শুভেচ্ছা জানানটা একটা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধরণের বেশ কিছু মেসেজ আগের দিন থেকেই আন্তর্জালে ঘুরে বেড়াতে থাকে। তার মধ্যে ‘প্রিটি’, ‘স্ট্রং’, ‘ওয়ান্ডারফুল’ লেডিসদের জন্য নানা ‘ফিল গুড’, ‘ফিল প্রাউড’ এই ধরণের বার্তাই বেশি এবং সঙ্গে অবশ্যই ‘হ্যাপি উইমেন্স ডে’। আবার একটা ‘নর দিবস’ই বা হয় না কেন, এইমর্মে ও কিছু মেসেজ  ভেসে আসে। পাশাপাশি যদিও বিভিন্ন নারী সংগঠনগুলি মিছিল বার করে নারী দিবসের মূল তাৎপর্যগুলো মাথায় রেখে, তার ইতিহাসের কথাটা কিন্তু তারপরও চাপা পড়ে থাকে। অচিরেই হয়ত দেখা যাবে এই উপলক্ষে উপহার দেওয়া নেওয়া ও শুরু হয়েছে। অথচ এই সময় কালেই #মি টু আন্দোলন হয়ে উঠেছে লাখ লাখ মেয়ে কর্মক্ষেত্রে ও অন্যত্র যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা নিয়ে, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। ইউরোপে মেয়েরা চোখে পড়ার মত মিছিল করেছে, সমান মজুরির দাবিতে। ভারতের মেয়েরা আন্দোলন করছে ধর্ষণের বিরুদ্ধে, সামাজিক নিরাপত্তার দাবিতে।

Zetkin_luxemburg1910

১৯১৮ সালে ক্ল্যারা জেটকিন ও রোজা লুক্সেমবার্গ

তবু ৮ মার্চ দিনটি কিভাবে কেন কিভাবে হয়ে উঠল আজকের আন্তর্জাতিক নারী দিবস সেটা অনেকটাই বিস্মৃত। তাই আজকের দিনে বরং একবার উল্টে দেখা যাক ইতিহাসের পাতা, ঘুমিয়ে পড়া অ্যালবামের ধুলো ঝেড়ে বার করি ক্লারা জেটকিন, রোজা লুক্সেমবার্গ, কল্লন্তাইদের ছবি। শুরুটা  হয়েছিল ১৮৫৭ সালে। আর শুরুর আগে সলতে পাকানোর কাজ চলেছিল উনিশ শতক জুড়ে, মূলত সমান ভোটাধিকার, সম্পত্তির অধিকার, দাসপ্রথার অবলুপ্তির দাবিতে। আমরা কম্যুনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে (১৮৪৮) দেখছি মার্কস পরিস্কার ভাবে লিখেছেন মেয়েদের সমান অধিকারের কথা। এই সময় জুড়েই ঘর ছেড়ে বাইরে রুটিরুজির খোঁজে বেরোনো মেয়েরা, নারী শ্রমিকরা,  জোট বাঁধছিলেন। এরই পটভূমিতে ১৮৫৭-র ৮ মার্চ।

March 8

গত শতাব্দীর প্রথম ভাগে নারীরা যখন কাজের পরিবেশ ও নারী শ্রমিকের সমঅধিকারের দাবিতে রাস্তায় নামল

১৮৫৭ সালের মার্চ মাসে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির হাজার হাজার মেয়ে ন্যায্য মজুরি, দশ ঘণ্টা কাজ, উন্নত কাজের পরিবেশ ও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে, ৮ মার্চ এক বিশাল মিছিলে যোগ দেয় তারা। পুলিসের আক্রমণ নেমে আসে তাদের ওপর। আন্দোলনরত বহু নারীশ্রমিক নির্মম অত্যাচারের শিকার হয় এবং গ্রেফতারবরণ করে। ১৮৬০ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্ক শহরের কারখানার নারী শ্রমিকরা তাদের অধিকার আদায়ের লক্ষে নিজস্ব ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে সমর্থ হয়। পাশাপাশি ১৮৬৮ সালে শ্রমিক শ্রেণীর প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কার্ল মার্কস নারীর অধিকারের প্রসঙ্গটি তুলে ধরেন। তার প্রচেষ্টায় প্রথম আন্তর্জাতিকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ট্রেড ইউনিয়নগুলিতে পুরুষের সঙ্গে নারী শ্রমিকদেরও সভ্যপদ দেয়া হতে থাকে। ১৮৭১ সালে প্যারি কমিউনেও নারীদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। ব্যারিকেড থেকে রাস্তার লড়াই সবেতেই তারা ছিল সামনের সারিতে। ১৯৮৯ সালে প্যারী শহরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিন সর্বপ্রথম সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমানাধিকারের দাবি উত্থাপন করেন। এরপর থেকেই ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স সর্বত্রই নারী আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। এবার দেখুন আগে কিন্তু মেয়েরা নিজেদের দাবিগুলো আদায়ের জন্য এক হয়েছে তার পরে এসেছে বাকিটা।

১৯০৮ সালের ৮ মার্চ আবারও নিউইয়র্ক শহরের পূর্বপ্রান্তে হাজার হাজার নারী দর্জি শ্রমিক তাদের ভোটাধিকার, এক কাজে এক মজুরি ইত্যাদি বিভিন্ন দাবিতে বিশাল এক প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দেয়। ইতিহাসে যা ‘বিশ হাজারির উত্থান’ (আপরাইজিং অব টুয়েন্টি থাউজ্যান্ড) নামে খ্যাত। নারী শ্রমিকদের এ সংগ্রামকে স্মারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ১৯১০ সালে ক্লারা জেটকিন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলনে প্রস্তাব দেন বছরের একটি দিন ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে পালিত হোক। প্রথমে বিভিন্ন দেশে মার্চ মাসে বিভিন্ন দিনে উদযাপিত হতো দিনটি। অবশেষে ১৯১৪ থেকে ৮ মার্চকেই বেছে নেওয়া হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে। ক্রমশ শুধুমাত্র শ্রমজীবী নারীদের সমঅধিকারের দাবিই নয়, নারীমুক্তির প্রতীক দিবস হিসেবেও এ দিনটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কিন্তু তা সীমাবদ্ধ ছিল বামপন্থী প্রগতিশীল মানুষের মধ্যে।  পরে জাতিসংঘ ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিলে, সারা পৃথিবীতে বিভিন্ন মতের মানুষ এ দিবসটি পালন করা শুরু করে।

এর সাথে ক্রমশ জুড়ে গেছে অন্যতর সব দাবি, এসেছে আরো নানা প্রান্তিক মানুষ। কিন্তু মূল সুরটি সমান অধিকার। আমাদের দেশগুলোতে এখনও মেয়েরা জন্মমুহূর্ত থেকেই পিছিয়ে। এমনকি কন্যা জন্ম অবধি অনিশ্চিত।

কাজেই দিনটির হ্যাপিনেসকে ছাপিয়ে বরং শপথের কথা বলি, দীর্ঘ পথ পড়ে আছে সামনে।

ছবি: ইন্টারনেট

লেখক:
স্বাতী চক্রবর্তী, চিত্র নির্মাতা, জয়েন্ট এডিটর (কলকাতা), বাঙালীয়ানা
Swati Chakraborty

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.