সময়ের সাহস কামাল লোহানী – প্রথম পর্ব । সাগর লোহানী

Comments
সঙ্গীতজ্ঞ, সাংবাদিক ওয়াহিদুল হক আমার বাবা সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে লিখছেন, “………… জীবনে পথ চলতে লোহানীকে দেখেছি নির্মেদ শরীর থাবা দিয়ে সে ধেয়ে আগে চলে যায়। …… কেবলই মহেন্দ্র নিন্দিত কান্তির জন্যেই তা হতে পেরেছে ……। শ্যামা নৃত্যনাট্যে সুন্দরী শ্রেষ্ঠা শ্যামা তো লোহানীকে অর্থাৎ বজ্রসেনকে উদ্দেশ্য করেই গেয়ে উঠেছিল, আহা, মহেন্দ্র নিন্দিত কান্তি, উন্নতদর্শন। তা দেবতাদের ঘি খাওয়া শরীরে চর্বি একটু থাকেই, লোহানীর তা ছিল না। কঙ্কালের উপর চামড়ার একটা চাদর পরানো ছিল মাত্র। এখনকার সবাই কি জানে লোহানী বজ্রসেন নাচতো? কিন্তু গান সে গাইতো না। আবার সমস্ত গা গরম করা গণসঙ্গীত ওর ঠোটস্থ ছিল। ইসবার লড়াই লাড়নেওয়ালা বাঁচকে না যানে পায়েগা বলে কি হুংকারটাই না দিত।”
কথাটা যে আমাদেরও। জ্ঞান হওয়া অবধি এভাবেই দেখেছি তাঁকে আমরা। শেষদিন পর্যন্ত এর ব্যতিক্রম ছিল না। অধিকার হরণের প্রতিবাদে, আদায়ের সংগ্রামে, তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছেন যেমনই তেমনই বিজয়ের গৌরবে মেতে ওঠেছেন যুবকের মত। আমরাও তাল রাখতে কখনো কখনো হিমসিম খেয়েছি। তিনি কিন্তু ৮৬ বছরেও আগের মতই তেজি ছিলেন মনে, শরীর কখনো কখনো বাধ সেধেছিল বটে কিন্তু সেও ক্ষণিকের জন্যে। তাইতো যুদ্ধাপরাধী নির্মূলে, ৭২ এর সংবিধান পুনর্বহালের দাবীতে, যুদ্ধাপরাধী বিচারের দাবীতে, ব্লগার হত্যা আর মৌলবাদী আস্ফালনের বিরুদ্ধে যেখানেই সংগ্রামী জনতার মিছিল, যেখানেই মানুষের মুক্তির আকুতি সেখানেই সবার আগে জাজ্বল্যমান উপস্থিতি ছিল তাঁর।
রাজশাহী কারাগার থেকে মুক্তির পর কামাল লোহানী ফিরে এলেন পাবনায়। কিন্তু অভিভাবক, শিক্ষাবিদ, ছোট চাচা তাসাদ্দুক হোসেন খান লোহানীর সাথে তাঁর শুরু হলো রাজনীতি নিয়ে মতবিরোধ। চাচার কথা “লেখাপড়া শেষে রাজনীতি করো, আপত্তি নেই”। কিন্তু কামাল লোহানী তখন রীতিমত রাজনীতি প্রভাবিত এবং মার্কসবাদের অনুসারী। চোখে তাঁর বিপ্লবের ঐশ্বর্য। তাঁকে ফেরাবার সাধ্য কার?
আর তাই তিনি ছোট চাচার কাছ থেকে মাত্র ১৫ টাকা চেয়ে নিয়ে অনিশ্চিতের পথে ঢাকা অভিমুখে পা বাড়ালেন। জীবনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করলেন। আর সেই সঙ্গে শুরু হল তাঁর জীবন সংগ্রাম।
কামাল লোহানী নামেই সমধিক পরিচিত হলেও পারিবারিক নাম তাঁর আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। বাবা আবু ইউসুফ মোহাম্মদ মুসা খান লোহানী। মা রোকেয়া খান লোহানী। তাঁদের বসতি ছিল যমুনা পাড়ে। খাস কাউলিয়ায়। আগ্রাসী যমুনা-গর্ভে তাঁদের বাড়িঘর জমি-জিরেত চলে যাওয়ার পর তাঁরা সিরাজগঞ্জেরই উল্লাপাড়া থানার খান সনতলা গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। আর এই খান সনতলা গ্রামেই ১৯৩৪ সালের ২৬ জুন ১১ আষাঢ় ১৩৪১ বঙ্গাব্দে কামাল লোহানী জন্মগ্রহণ করেন।
গ্রামের প্রসঙ্গ এলেই কোথায় যেন হারিয়ে যেতেন তিনি। স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন,

“… সেসময়ের অশেষ দুষ্টুমির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, একটু বলি। তখন আমাদের বাড়ীর পাশে একটা পুকুর ছিল। স্নান করতাম মাঝেমধ্যে বড়রা সাথে থাকলে কারণ সাঁতার জানতাম না। একবার তো অথৈ জলে ডুবেই মরতে গিয়েছিলাম, চাচাতো ভাই শাহাদাৎ হোসেন খান লোহানী (দারা) আমাকে রক্ষা করেছিলেন। মাঝেমাঝে মাছধরার ভণিতা করতাম, পারতাম না। পাশেই ছিল বড় একটা কদমগাছ। কী অপরূপ তার দৃশ্য। ফুল ফুটেছে ডালে ডালে। প্রাণহরণ করা এক দৃশ্য! পুকুরের দক্ষিণে জোলা কেটে বিস্তীর্ন ধানক্ষেতের ভরা বর্ষার জল পুকুরে আসার ব্যবস্থা ছিল। সেখানে আবার পাতা আছে ‘দ্বারকী’ বসিয়ে মাছধরার অভিনব গেঁয়ো কৌশল বা ফাঁদ। তবে বেশীরভাগ সময় কুঁয়ো থেকে জল তুলে ‘চাড়ি’তে কিংবা বালতি ভরে স্নান করতাম। গোছল না করে স্কুলে যেতাম ভোরে। ফিরে এসে স্নান সেরে দুপুরের খাবার খেতে বসতাম।

পাঠশালায় যেতাম সমবয়সী ভাইবোন কিংবা পাড়াপড়শী একসাথে। যাবার পথে সরকারি সড়কের পাশে, তিন মাথায় ডানে বাঁয়ে ছিল ছানা খাঁ’র জমিন ও ফলবাগান। একদিকে আমবাগান। ওটাতে আমাদের আকর্ষণ ছিল ঢের বেশী। ওখানে কাঁচামিঠে আম ছিল খুব মজার। সবাই বেশ আনন্দে পাঠশালা যাবার পথে কিংবা ঘরে ফিরে দুপুর বেলা ঢিল মেরে সেই আম পেড়ে খেতে ভালবাসতাম। তবে ছানা খাঁর চোখে পড়লে ধমকের সুরে “কে রে” বলে চিৎকার আমাদের ভয়ে শিটকে ফেলতো। সত্যি কথা বলতে কি, কাঁচামিঠে আমের গাছটা আমাদের অত্যাচারে কাহিল হয়ে গিয়েছিল। আমরা যখন দেখতাম কাঁচামিঠে আর নেই তখন টার্গেট করতাম ফজলী আমের দিকে। কিন্তু সুবিধে করতে পারতাম না কারণ গাছটা বেশ বড় ও উঁচু ছিল। ওঠার সাহস ছিল না। আর কচি হাতের ঢিল ওদের কাছে পৌঁছতো না। তখন রাস্তার উল্টোদিকে জামরুল গাছ বেশ নিচু, ওতে উঠাও ছিল সহজ। তাই তাকেই ধরে বসতাম আমরা। এতো ছিল সবার সাথে প্রতিদিনকার কার্যক্রম। কিন্তু এছাড়া সত্যিকার দুষ্টুমিও ছিল, যা মাঝেমধ্যে হতো। সেও আমাদের গ্রামেই। সে হলো, কারো পেয়ারা গাছে হানা দেয়া কিংবা পেঁপে পেড়ে এনে মজা করে খাওয়া, চুপটি করে কয়েকজনে। সবাইকে বলতাম না কারণ জানাজানি হবার ভয় ছিল তবে বেগম নানীর মুরগী দরমায় কখন ডিম পাড়ে তার খবর রাখতাম আমরা দু’একজন আর তাই খবর পেলেই দরমা থেকে মুরগী বেরিয়ে গেলে ভোরবেলা হাত ঢুকিয়ে ডিম চুরি করে আনতাম। ডিমতো ভেজে কিংবা সিদ্ধ করে খাওয়া যাবে না, কারণ ধরা পড়ে যেতে হবে। তাই কাঁচা ডিম ভেঙে খেয়ে ফেলতাম। এ চুরিতে মেয়েদের নিতাম না। ছেলেরাই থাকতো। কিন্তু বিপদ হতো যেদিন আমরা বেশী থাকতাম আর ডিম কম পেতাম। কেউ হয়তো বাদ পড়ে যেতো। আর তো সে যেতো ক্ষেপে। “বলে দেবো” বলে ভয় দেখাতো। পরের দিন তাকে দেব বলে রেহাই পেতাম।“

মাত্র ৬ বছর বয়সে তাঁর মা মৃত্যুবরণ করেন। একান্নবর্তী পরিবারে বাস হওয়ায় আর দুষ্টুমির মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বাবা তাঁকে গ্রামে না রেখে পাঠিয়ে দিলেন নিঃসন্তান ফুফু সালেমা খানমের কাছে কলকাতায়। এখানে এসে তিনি বেড়ে উঠতে লাগলেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের এক বিভীষিকাময় দুর্যোগের মধ্যে। কখনও ঘরে, কখনও-বা ট্রেঞ্চে। কিশোর কামাল লোহানী শিশু বিদ্যাপীঠে গেছেন কানে তুলো দিয়ে। যদি বোমা ফাটে ঘর থেকেই এ সতর্কতা। জাপানী বোমার ভয়ে বালির দেয়াল তৈরি করা আছে স্কুল প্রাঙ্গণে, সাইরেন বাজলেই ছুটে যেতে হবে ঐখানে, ওটা ছিল স্কুলের নির্দেশ। কাটে কাল মানুষের সৃষ্ট যুদ্ধ, মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আর দেশ বিভাগের উন্মাদনার মধ্য দিয়ে।
সেসময়ের বর্ণনায় বাবা তাঁর স্মৃতিকথায় লিখছেন,

‘১৯৪২ থেকে ৪৮ সাল পর্যন্ত কলকাতায় আমি থাকতে ১৯৪৩ সালের মহাদুর্ভিক্ষ, ১৯৪৬-এর গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং (Great Calcutta Killing) অর্থাৎ হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা দেখেছি। যা আমাকে শঙ্কিত করে তুলেছিল। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা যা হয়েছে ১৯৪৩-এ তার লোমহর্ষক বিবরণ সংবাদপত্রে এবং পরবর্তীকালে গল্প-কবিতা-গানে-উপন্যাসে প্রকটভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ৪৩’র মন্বন্তর যেমন বাংলার মানুষকে মহাদুর্ভিক্ষের কবলে ফেলে দিয়েছিল তেমনি কুৎসিত অমানবিক দৃশ্যাবলী দেখে আমার কৈশোর-চিত্ত প্রবলভাবে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছিল। আমরা পার্ক সার্কাসে থাকতাম। পি ২৩৯/এ কিম্বার্ক স্ট্রিটে তখন আমাদের বাসা ছিল। চারতলা বাড়ির নিচের তলায় আমরা রাস্তার ধারে থাকতাম আর আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন বেগম সুফিয়া কামাল ও তাঁর পরিবার। সুফিয়া কামাল ফুপুআম্মার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। রাস্তার ধারে আমাদের ঘর হওয়ায় তিনি পরামর্শ দিলেন বাসাটা ত্যাগ করে নিরাপদ কোনও জায়গায় যেতে। অবশেষে সুফিয়া খালাম্মাই বাসার সামনের কসাইপট্টিতে মসজিদের পাশে একটি বাসা ঠিক করে দিলেন এবং আমরা সেখানে গিয়ে উঠলাম। পাশেই বিশাল একটা লম্বা ঘরে স্কুলও বসতে শুরু করল।

৪৩’র মন্বন্তরে যেমন অগণিত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারণ করতে না পেরে তেমনি চোরাচালান ও কালোবাজারির দাপটে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা যখন বুঝতে পারল ভারত ছেড়ে তাদের যেতেই হবে; তখন তারা বিশেষ করে বাংলার মানুষের ঐক্যবদ্ধতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ধ্বংস করার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করতে শুরু করল। কিম্বার্ক স্ট্রিট থেকে পার্ক সার্কাস ট্রাম ডিপোর পাশে মেজো চাচা আবু লোহানীর বাড়িতে যাবার সময় যেসব বিভৎস এবং কুৎসিত দৃশ্য দেখেছিলাম তা আমার কৈশোরকে বিদ্রোহী করে তুলেছিল। কিন্তু কোনও কিছু করার ক্ষমতা এবং বয়স আমার ছিলো না, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পার্ক সার্কাস ময়দানে তাবু ফেলেছিল গোরা সৈন্যরা। এখানেই ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর বেলুন উড়িয়ে শত্রুবিমানের আনাগোনা প্রত্যক্ষ করা হত এবং বোমা বর্ষণের আশঙ্কা থাকলে সাইরেন বাজিয়ে মানুষকে সর্তক করা হত। কিন্তু দুর্ভিক্ষের এই কালে যখন চাল, ডাল, তেল এমনকি কেরোসিন তেলসহ নানা পণ্যের মনুষ্য সৃষ্ট অভাব তৈরি করা হলো তা থেকে যখন দুর্ভিক্ষ বাংলাকে গ্রাস করল তখন কলকাতা শহরে মায়েদের বোনেদের অসংখ্যজনকে দেখেছি, সানকি হাতে বড়লোকদের বাড়ির দ্বারে দ্বারে সামান্য ‘ফ্যান’ ভিক্ষা করতে। এই সুযোগ নিয়ে গোরা সৈন্যরা ভিক্ষারত মহিলাদের খাদ্যের লোভ দেখিয়ে সৈন্য শিবিরে নিয়ে যেতো উপভোগের জন্য। সরলমনা তরুণী থেকে বয়োবৃদ্ধদের এমনই শকুনি দৃষ্টিতে সেদিন পড়তে হয়েছিল।

৪৬ এর ভাতৃঘাতী দাঙ্গার কথা মনে পড়লে আজও শরীরটা শিউরে ওঠে। মনটা কাতর হয়ে যায়। কারণ যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যে হিন্দু-মুসলিম জনগোষ্ঠী ভাতৃত্বের বন্ধনে এবং সম্প্রীতির পরিবেশে সুদীর্ঘকাল বসবাস করে আসছিলাম সেই মৈত্রীর বন্ধনে আঘাত হানলো ইংরেজ কুচক্রীরা। হিন্দু প্রধান এলাকায় মুসলমান নিধন আর মুসলমান প্রধান এলাকায় হিন্দু হত্যা যেন নিত্যকার নিষ্ঠুরতায় পরিণত হলো। তবে খানিকটা গর্ব করেই বলতে পারি আমাদের পার্ক সার্কাস এলাকা সেদিক থেকে দাঙ্গা প্রবণ হয়ে ওঠেনি। তবে চিত্তরঞ্জন হসপিটাল ছাড়িয়ে এন্টালি এলাকা থেকে মাঝে মাঝে রাতের অন্ধকারে বন্দে মাতরম শ্লোগান দিয়ে যখন দাঙ্গাবাজ অমুসলিম গোষ্ঠী তাদের অস্তিত্ব জানান দিত তখন দেখেছি পার্ক সার্কাস, কিম্বার্ক স্ট্রিটের মসজিদেও মুসলীমরা গাদাগাদা ইট-পাটকেল ছাঁদের উপর জমা করত। যদি হিন্দুরা আক্রমণ করে তাহলে তারা এদিয়েই তাদের প্রতিরোধ করবে। কিন্তু পার্ক সার্কাস এলাকাতে তেমন কোনও ঘটনা ঘটেছে বলে শুনিনি। তবে মসজিদ থেকে ‘নারায়ে তাকবির’ নাড়া দিয়ে অনেক সময় বন্দে মাতরমের প্রত্যুত্তর দিতে শুনেছি। এসময় আমিও কসাইপট্টির যে বাসায় থাকতাম তার রোয়াকে কিছু ইট এনে রেখেছিলাম।

পার্ক সার্কাসে আদতেই সাম্প্রদায়িক সম্পীতি প্রবলভাবে বিরাজ করছিল। কিন্তু এরই মধ্যে পাশের হিন্দু প্রধান এলাকা থেকে নির্যাতিত হয়ে পাড়ার মোড়ে একটি ফার্মেসিতে চিকিৎসা নেয়া মুসলিম যুবতীদের দেখে নিপীড়কদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড ক্ষোভ জেগেছিল মনে। যুবতী দুজনার দেহ তো ছিন্নভিন্ন করেছেই তাদের স্তনকেও মনে হলো কামড়ে ‘কিমা’র মতো করে ফেলেছে। এ দৃশ্যটি ছিল বীভৎস ও হিংস্রতার নিকৃষ্ট উদাহরণ। তা সত্বেও পার্ক সার্কাসের মানুষের মধ্যে কোনও পশুত্বের উদ্রেক হতে দেখিনি, তারা কেবল ক্রুদ্ধ মনে সহানুভূতির সাথে মেয়ে দুটির চিকিৎসা করেছিলেন। এদিকে খবর শুনতে লাগলাম আমাদের আত্মীয় দুয়েকজন হিন্দু প্রধান এলাকায় আটকে গেছেন। তাদের কী পরিণতি হয়েছে তা আমরা বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দি নিজে সেইসব এলাকায় গিয়ে আটকে পড়া মুসলমানদের অনেক পরিবারকেই উদ্ধার করেছেন।‘

‘আর অন্যদিকে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে মানুষের মধ্যে হাহাকার আর মৃত্যুর শঙ্কা তৈরি করেছিল মুনাফাখোর ও লোভাতুর ঘৃণ্য ব্যবসায়ী দল। এর পেছনে ছিল ব্রিটিশ চালবাজি, মানুষকে হতোদ্যম করে তাকে কাবু করার অপচেষ্টা। তখনই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির বাংলা শাখা দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল। লঙ্গরখানা খুলে নিরন্ন মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণের উদ্যোগ ছিল স্বদেশবাসী অনেকের। ভারত ছাড়ার মুহুর্তে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের যে কৌশল তা রাজনৈতিক স্বদেশী শক্তি বুঝতে পেরেছিলেন। তখন মানুষের মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য কমিউনিস্ট পার্টি ট্রাকে, পিক-আপে মিছিল নিয়ে দুর্ভিক্ষ পীড়িত এলাকাগুলোতে ছুটে বেড়াতেন এবং মানুষকে সহায়তা দান করতেন। শুধু তাই নয় ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি গান বেঁধেছিল, “ভুখা হ্যায় বাঙাল রে সাথী, ভুখা হ্যায় বাঙাল” এবং বুলবুল চৌধুরী পরিচালিত নৃত্যনাট্যের মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কূটকৌশলকে তুলে ধরে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলার জনগণের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন। বাংলার জনগণকে ভুখা রেখে যেভাবে হত্যা করা হল, তার পেছনে ব্রিটিশদের উদ্দেশ্যই ছিল ঐক্যবদ্ধ জনবলকে দুর্বল করে দেওয়া।‘

‘একদিন এই হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার মধ্যে আমি চুপিসারে চলে গিয়েছিলাম পার্ক স্ট্রিটের মাথায় গড়ের মাঠ এলাকায়। যে দৃশ্য সেখানে দেখেছি তা কেবল হৃদয় বিদারকই নয় কুৎসিত, নিষ্ঠুর ও হিংস্র। মানুষ কি করে এতোটা পশু হতে পারে এ আমার কিশোর মনে কোনও ধারণা তৈরি করতে পারেনি। দেখছিলাম একজন হিন্দু ভদ্রলোক সাইকেল চেপে ভবানীপুরের দিকে যাচ্ছিলেন, তার পরনে ছিল ধুতি এবং শার্ট। এই না দেখে হিংস্র মুসলিম যুবকদের একদল তাঁকে তাড়া করল। ভদ্রলোক প্রাণে বাঁচার জন্য পাশের পেট্রোল পাম্পে আশ্রয় নিলেন কিন্তু যুবকদের হাত থেকে রেহাই পেলেন না। আরেকজনকে দেখলাম  উশৃংখল মুসলিম যুবকদের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য প্রাণপণে ছুটছেন। অবশেষে উঁচু এক দেয়াল দেখে, দেয়াল টপকাতে চেষ্টা করার সময় নাঙ্গা তলোয়ার হাতে মানুষটিকে খোঁচা মেরে দেয়াল থেকে নামানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু মানুষতো যেকোন কঠিন বিপদ থেকে বাঁচবার চেষ্টা করে। এখানেও ধারালো তলোয়ারের খোঁচা খেয়েও ভদ্রলোক দেয়াল পেরিয়ে গেলেন। দেখলাম দেয়ালের গায়ে রক্ত ঝরছে। পরে যে ভদ্রলোকের কী হয়েছিল তা জানি না। …… এমনই বহু ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলাম সেদিন, যা কিশোর মনকে নৃশংস পাশবিকতায় ক্রুদ্ধ করে তুলেছিল।‘

দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে কামাল লোহানী পাবনা চলে এলেন, ভর্তি হলেন পাবনা জিলা স্কুলে। ছোট চাচা শিক্ষাবিদ ও লেখক তাসাদ্দুক হোসেন খান লোহানীর কাছে থাকতেন। ১৯৫২ সাল, মাধ্যমিক পরীক্ষার বছর। ৫২’র ২১ ফেব্রুয়ারীর রক্ত ঢাকা থেকে ফিনকি দিয়ে যখন পাবনা পৌঁছল, তখন বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর আর দাঙ্গা দেখা তারুণ্যে উদ্দীপ্ত এই কিশোর ছুটে বেরিয়ে এলেন, কণ্ঠ উচ্চকিত করলেন মিছিলে, হত্যার প্রতিবাদে। রাজনীতিতে সবক নিলেন তিনি ঐ বায়ান্নর একুশ, বাইশ আর তেইশে ফেব্রুয়ারীর রক্তধোয়া দিনগুলোর সংঘাতে।
১৯৫২ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হলেন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হওয়ার পর যখন কলেজ নির্বাচন এগিয়ে এলো তখন তাঁরা ক’জন সমমনা একজোট হলেন, নাম দিলেন ‘পাইওনিয়ার্স ফ্রন্ট’ অর্থ্যাৎ প্রগতিবাদী ছাত্র জোট। লড়লেন নির্বাচনে এবং নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করলেন। এই ফ্রন্টের সদস্যরা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পর গড়ে ওঠা প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠন, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিলেন।
পড়ুন
সময়ের সাহস কামাল লোহানী – শেষ পর্ব 
১৯৫৩ সালে পাবনার তৎকালীন জিন্নাহ্ পার্কে (বর্তমান স্টেডিয়াম) মুসলিম লীগ কাউন্সিল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। এইখানে যোগদানের জন্য আসেন তৎকালীন পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী খুনী নুরুল আমিন, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সর্দার আব্দুর রব নিশতার, কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ নেতা খান আব্দুল কাউয়ুম খান, প্রাদেশিক লীগ নেতা মোহাম্মদ আফজাল প্রমুখ। ভাষা আন্দোলনে ছাত্র হত্যাকারী নূরুল আমিনের পাবনা আগমন ও মুসলিম লীগ সম্মেলনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলেন। টাউন হলের সামনে দাঁড়িয়ে খালি গলায় দিলেন জীবনের প্রথম বক্তৃতা। কামাল লোহানী পাবনার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী এবং এডওয়ার্ড কলেজের অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীদের সাথে প্রথমবারের মত গ্রেফতার হলেন পরদিন। ৭ দিন পাবনা জেলে আটক থেকে জামিনে মুক্তি পান।
এই বিক্ষুব্ধ সময়ে রাজনৈতিক সংগ্রাম ছাড়াও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন কামাল লোহানী। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে সক্রিয় ভূমিকা নেন। এসময়ই উপস্থাপনা, গ্রন্থনা এবং আবৃত্তিতে পাঠ নিলেন তিনি।
১৯৫৪ সালের মার্চে পূর্ববাংলায় অনুষ্ঠিত হয় প্রাদেশিক নির্বাচন। কামাল লোহানীসহ সব প্রগতিশীল ছাত্রই যুক্তফ্রন্টের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী পাবনা টাউন হলে মহান শহীদ দিবস উপলক্ষ্যে গণজমায়েত এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিপুল জনতার স্বতঃর্স্ফুত অংশগ্রহণে লীগ সরকার তটস্থ হয়ে পরদিন গ্রেফতার শুরু করে। ২২ ফেব্রুয়ারী সকালে কামাল লোহানী গ্রেফতার হন এবং যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয়ে নির্বাচনের পর মুক্তিলাভ করেন। কিন্তু মার্কিনী মদদপুষ্ট পাকিস্তান সরকার এই বিজয়কে গ্রহণ করতে পারেনি এবং শঙ্কিত হয়ে ১৯৫৪ সালের ২৯ মে ৯২-(ক) ধারার মাধ্যমে পূর্ববাংলায় ‘গভর্নরী শাসন’ চালু করে মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জা পূর্ববাংলায় গভর্নর হয়ে আসে এবং ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে।
তখন কলেজ ছুটি থাকায় গ্রামের বাড়ীতে চলে যান তিনি। ঈদের ঠিক আগের দিন ১ জুন খান সনতলা গ্রাম থেকে আবার গ্রেফতার হন কামাল লোহানী এবং উল্লাপাড়া থানা হাজত থেকে রাতের ট্রেনে পাবনা ডিস্ট্রিক্ট জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ঈদের দিন পাবনা জেলে ‘রাজবন্দি’ হিসেবে কারাজীবন শুরু করেন কিন্তু কিছুদিন পর রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয় এবং ১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে রাজশাহী কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন তিনি।
এই ১৩ মাসের জেল বাসে বাবা জেলসঙ্গী পেয়েছিলেন কমরেড নগেন সরকার, জ্যোতিষ বসু, আফতাব আলী, আব্দুল জব্বার, ননী চৌধুরী, গোপাল সরখেল, সন্তোষ ব্যানার্জী, মহাদেব সিং, ডোমারাম সিং,ভবেন সিং, রূপনারায়ন রায়, আলী আকসাদ, নুরুল ইসলাম, (ব্যারিষ্টার) আমীরুল ইসলাম, (সাংবাদিক) আমিনুল ইসলাম, আমজাদ হোসেন, গোরাই দা, আজহার আলী, মোতাহার উদ্দিন, ব্রজেন বসাক, আবুল কাশেম চৌধুরী, গোপাল সরকারসহ বহু কৃষক কমরেডকে। এই সময়ে জেলের ভেতরেই বন্দী তরুণদের জন্যে রাজনৈতিক ক্লাস হতো, বন্দী বয়োজ্যেষ্ঠ কমিউনিস্ট নেতারা ক্লাস নিতেন। এখানেই তিনি মার্কসবাদের দীক্ষা পেয়েছিলেন এবং মার্কসবাদকে জীবনাদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন যা থেকে জীবনের শেষদিনেও বিচ্যুত হননি কামাল লোহানী।
জেল থেকে ছাড়া পেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ত্যাগ করে ঢাকা চলে যাবার পটভূমি লিখতে গিয়ে কামাল লোহানী লিখেছেন,

‘তখন সকাল এগারোটা। জানতাম এসময়ে ছোট চাচা স্কুলে চলে যাবেন, সুতরাং বাসায় ঢোকার ওটাই মোক্ষম সময়। চাচীমা হয়তো কিছুটা বকাবকি করবেন কিন্তু এতদিন বাদে কাছে পাওয়ার আনন্দে নানী’র আদর তো পাবই। হলোও তাই। এরপর গোসল করে খেয়ে বিশ্রাম নিতে বললেন নানী। বিকেল গড়িয়ে চাচা যখন বাসায় ফিরলেন এবং আমার কথা জানতে পারলেন তখন তিনি আমাকে ডাকলেন। আমি তার ঘরে পড়ার টেবিলে তাঁর সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়ালাম। তিনি এবার আমাকে উপদেশ দিয়ে লেখাপড়ায় মন বসাতে বললেন। বললেন,“গরীব বাবার ছেলে এবার মন লাগিয়ে লেখাপড়াটা করো। মাথা থেকে রাজনীতির পোকা ঝেড়ে ফেলো। রাজনীতি করো আপত্তি নেই তবে নিজের পায়ে দাড়াবার মত আগে লেখাপড়া শেখো, ইচ্ছে করলে তখনও রাজনীতি করতে পারবে।” আমি মাথা নিচু করে সব কথা শুনে যে মানুষটির সামনে মাথা উঁচু করে কথা বলবার সাহস পেতাম না, তাঁর সামনে এবারে সোজা হয়ে দাড়ালাম, বলে ফেললাম, “আমাকে পনেরোটা টাকা দেবেন”। চাচা ক্ষুব্ধ হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“কি করবে?” কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, “আমি নিজের পায়ে দাড়াবার জন্যে ঢাকা যাব”। এবার তিনি ক্ষেপে বললেন, “পা তোমার কতটা শক্ত হয়েছে যে তার ওপর দাড়াতে চাচ্ছো।” এর কোন জবাব আমার মুখে আসেনি তাই চুপচাপ দাড়িয়ে রইলাম। কি যেন কি ভেবে চাচা টেবিলের ওপর রাখা মানিব্যাগটা থেকে পনেরোটা টাকা বের করে আমার দিকে ছুড়ে দিলেন। আর বললেন, “মানুষতো হতে পারলে না, যাও গোল্লায় যাও।” আমার মনে তখন স্বস্তি টাকা পাওয়ায়। মাথা নিচু করে টাকাটা উঠিয়ে ওইভাবেই ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। নানি আমাকে খুব করে বোঝাতে চেষ্টা করলেন, বললেন,“জাসনে ভাই। অপরিচিত শহরে গিয়ে কোথায় থাকবি, কি খাবি, কিই বা করবি। তার চেয়ে লেখাপড়াটা শেষ করলে ভালো করতিস না?” নানীকে বললাম, “আমার আর পড়তে ইচ্ছে করছে না।”নানীকে সালাম করে বললাম, “আর্শীবাদ করুন যেন মানুষ হতে পারি।” নানী কেঁদে ফেললেন। প্রচন্ড আদরে কত যে কথা বললেন, আজ ভাবলে কষ্ট হয়। মনে হয় ওঁদের সেদিন কতনা কষ্ট দিয়েছি।

সত্যি কথা বলতে কি আমার তখন মন উঠে গেছে, লেখাপড়ার দিকে কোন তাগিদ নেই। সত্যিই মাথায় রাজনীতি গিজগিজ করছে। ভাবনায় কেবল, রাজনীতির মাধ্যমেই দেশটাকে পাল্টাতে হবে এবং সে পাল্টানো, আমরা যেভাবে চাই সেইভাবে। অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের দুনিয়া গড়ার স্বপ্ন দুচোখে তখন প্রচন্ড উজ্জ্বল। নেতারা বলেছেন সামন্তবাদ ও ঔপনিবেশিকতাবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যদি সমাজকে পরিবর্তন করা যায় তবে বৃহৎ পুঁজিবাদী শক্তি ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। বিপ্লবের আকাঙ্খা তখন আমাকে পেয়ে বসেছে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।‘

ঢাকায় এসে তিনি চাচাতো ভাই ফজলে লোহানীর সহযোগিতায় ১৯৫৫ সালের আগস্ট মাসে মাসিক ৮০ টাকা বেতনে দৈনিক ‘মিল্লাত’ পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগ দিলেন। হাতেখড়ি হল সাংবাদিকতায়। সেই থেকে তাঁর কলমের আঁচড়ে তৈরি হতে লাগল এক একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।
১৯৫৫ সালে তিনি ‘পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিষ্ট পার্টি’-তে যোগ দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হলেন। কিন্তু ১৯৫৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে দেশ বিপন্ন হলে, কামাল লোহানী আত্মগোপন করতে বাধ্য হলেন। কিছুদিন পর গ্রেফতারের শঙ্কা কেটে গেলে আবার কাগজে যোগ দেন। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকায় প্রকাশ্য রাজনীতিতে অংশ নিতে ন্যাপ প্রতিষ্ঠিত হবার পর পার্টির নির্দেশে তিনি ন্যাপে যোগ দেন এ বছরেই।
পত্রিকার জন্যে নৃত্যগুরু জিএ মান্নানের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর জীবনের নৃত্য অধ্যায়। বুলবুল একাডেমীতে জিএ মান্নান ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ প্রযোজনা করতে গিয়ে ছেলে চরিত্রে অংশ নিতে বললে কামাল লোহানী তা গ্রহণ করেন। প্রশংসিত হন নৃত্যশিল্পী কামাল লোহানী। ১৯৫৯ সালে এই নৃত্যনাট্য নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ সফর করেন তিনি। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যে যান এবং ইরান, ইরাক সফর করেন।
১৯৬১ সালে সরকারী বাধার মুখে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকায় তোড়জোড় শুরু হলে কামাল লোহানী যুক্ত ছিলেন উদযাপনের সাংগঠনিক কাজে। শতবর্ষ পালন মূল আয়োজনে “শ্যামা” নৃত্যনাট্যে তিনি বজ্রসেনের ভূমিকায় অংশ নিয়ে নন্দিত হয়েছিলেন।
বাবা ঢাকাই প্রথম বাংলা (এফডিসি কেন্দ্রিক) চলচ্চিত্র ফতেহ লোহানী পরিচালিত “আসিয়া” তে মুখোশ নৃত্যে অংশগ্রহণ করেন। এরপর এহতেশাম পরিচালিত “এদেশ তোমার আমার” এ তিনি সমবেত নৃত্যে অংশগ্রহণ করেন।
৬৪-৬৫ সালের দিকে আজিজুর রহমানের পরিচালনায় “পাথরের কান্না” তে অভিনয় করেছিলেন কামাল লোহানী, তবে এই চলচ্চিত্র শেষ পর্যন্ত মুক্তিলাভ করেনি।
মঞ্চ নাটক পরিচালনা ও তাতে অভিনয় করেছেন তিনি বিভিন্ন সময়ে। ৬৭ তে ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠার পরে তিনি পল্টন ময়দানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নাটক “আলোর পথযাত্রী” পরিচালনা ও এতে অভিনয় করেন এসময়েই শিল্পী আমানুল হক পরিচালিত নৃত্যনাট্য “জ্বলছে আগুন ক্ষেতে ও খামারে” বিবেকের ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেছিলেন কামাল লোহানী।
১৯৭৪ সালে কামাল লোহানী সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচন উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সাংবাদিক আবেদ খান রচিত ‘জ্বালামুখ’ নাটক পরিচালনা ও নিপীড়ণে বিধ্বস্ত এক মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেন।
পঞ্চাশের দশক থেকেই তিনি অনুষ্ঠান গ্রন্থনা, আবৃত্তি ও বিবরণী পাঠে বেশী করে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন যা তাঁকে পুর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক চর্চায় প্রতিষ্ঠিত করে এবং তিনি সুদীর্ঘকাল এই ক্ষেত্রে বিচরণ করেন দাপটের সাথে।
পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে অধ্যয়নকালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী এবং আন্দোলনের সাথী বাবার চাচাতো বোন সৈয়দা দীপ্তি রানীকে পারিবারিক প্রবল বিরোধীতার মুখে ১৯৬০ সালে বিয়ে করেন। মা তখন সমাজকল্যাণে মাষ্টার্স করছিলেন। জীবিকার চাপ শুরু হলে কামাল লোহানী বনেদী সংবাদপত্র ‘দৈনিক আজাদ’-এ যোগ দিলেন। এসময় মা ঢাকার সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
বাবার একটা ডাক নাম আছে ‘দুলাল’, মায়ের ডাক নাম’খুকু’। খুকু আর দুলালের সম্পর্কের শুরুটা কিভাবে হয়েছিল সে গল্প আমরা মায়ের কাছ থেকে অনেক শুনেছি। এ সম্পর্কে বাবা লিখেছেন,

‘ম্যাট্রিকুলেশন শেষে দীপ্তি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হয়েছিল কলা বিভাগে। আমি একই বিভাগের একই বছরের সহপাঠী। নবীনবরণ অনুষ্ঠানে দেখলাম, একটি কৃষ্ণকালো হ্যাংলা পাতলা মেয়ে গান গাইলো “ওগো মোর গীতিময়”, সন্ধ্যা মুখার্জির গাওয়া। কিন্তু ‘তুমি কপোল চুমিয়া বলেছিলে’ লাইনটি গাইতে গিয়ে ‘কপোল’ শব্দটি অনুচ্চারিত রেখেই গেয়ে গেল। আমার কেন অনেকেরই কানে লাগল। কিন্তু আমি সাহস করে ওকে জিজ্ঞেস করলাম। জবাবটা যুতসই হলো না। কিন্তু দু’জনে কোন একটা বাঁধনে বোধহয় বেঁধেই গেলাম অজান্তে। পরে জেনেছিলাম, ও আমার আত্মীয়া। তাই নানা অছিলায় আত্মীয় স্বজনের সাথে ওদের বাড়ী গিয়ে হাজির হতাম। প্রথমে আমাকে ও এড়িয়ে যেত। ধীরে ধীরে সম্পর্কটা সহজ হয়ে উঠল। একদিন চাচীমা বেলা মজিদ বললেন, “তুই ওকে আপনি বলছিস কেন, ওতো তোর ছোট।” অনেকটা অনুমতি পেয়েই গেলাম। এবারে বাসায় যাওয়াটা সহজ হয়ে গেল। কিন্তু চাচা আমার যাওয়াটা পছন্দ করছিলেন না। চুন্নু কাকা’র  (সৈয়দ আব্দুল মজিদ) অপছন্দ, আমার স্বাভাবিকতায় বাধা হচ্ছিল দেখে আমরা দুজনায় কলেজে, না হলে আমার ফুপাতো বোন লীনা বুবু’র লালকুঠিতেও দেখা করতাম। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের ব্যাপারটা হৃদয়ের অনেক গভীরে পৌঁছে গেছে। বুবু আর দুলাভাই আমাদের বেশ ভালবাসতেন, তাই প্রশ্রয় দিতে দ্বিধা করতেন না। এমনি করে দুজনায় কেমন যেন একজনায় পরিণত হলাম। কলেজে প্রায় একবছর হয়ে গেল। অনেকেই আঁচ করল আমাদের সম্পর্কটা।‘

‘সহপাঠী হওয়ার সুবাদে দীপ্তির সাথে ক্রমশঃ ঘনিষ্ট থেকে আরো ঘনিষ্ট হতে থাকলাম। একদিন, আমাদের এ বন্ধন যেন অটুট থাকে এই কামনায় আঙুলের ‘মনিপুরী নক্সার অঙ্গুরীয়’ আমাকে পরিয়ে দিয়েছিল দীপ্তি। এই বন্ধনের পর যখন বিষয়টি সবার কাছেই স্পষ্ট হয়ে গেল তখন ওর কলেজ বন্ধ করে দেয়া হল আর আমার ওদের বাসায় যাওয়া। খুকুর মা ক্রোধে মন্তব্য করে বসলেন, “বামুন হয়ে চাঁদ ধরতে চায়, স্পর্ধা কত!” এতে আমাদের সম্পর্কের তেমন ব্যত্যয় ঘটলো না। খুকুর ছোটভাই সৈয়দ দীপেন অর্থাৎ টুনটুন আর বোন  রানী (দীপা ইসলাম) আমার ভরসায় পাশে এসে দাঁড়াল। চলছিল চিঠি বিনিময়। ১৯৫৪ সালে পাবনা শহর থেকে আমরা গ্রেফতার হলাম সাধারণ নির্বাচনের আগে। বেশীদিন থাকতে হলো না। যুক্তফ্রন্ট নিরঙ্কুশ ও ব্রুট মেজরিটি পেয়ে জিতলে আমরা ছাড়া পেলাম। এসময় খুকু কলেজে নিয়মিত আসছিল, আমি গ্রেফতার বলে।….চুন্নু কাকা, ওর বাবা ভীষন কড়া মানুষ। চোস্ত ভদ্রলোক। ডিউটিতে যান আসেন। নজর রাখেন ওর দাদা, সৈয়দ মঞ্জুর হোসেন। এক খ্যাপাটে লোক। ভীষন চটা আমার ওপরে। পেলে গিলে খাবে। লোকটাও ঐ প্রকৃতির, তাঁকে এড়িয়েই চলতাম, তবে ছোট ভাই বুড়োন, টুনটুন ও রানীর সাথে শিখা সংঘের অফিসে যোগাযোগ হতো, গোপনে। এরমধ্যে রোজার ছুটি হয়ে গেল। কলেজ বন্ধ। দেখা সাক্ষাৎ হবার কোন সুযোগ নেই, ভরসা ঐ ছোট ভাই বোন।‘

১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে গর্জে উঠলো। কামাল লোহানীর নামে জারি হল হুলিয়া। ১৩ ফেব্রুয়ারী গভীর রাতে ‘দৈনিক আজাদ’ থেকে ঘরে ফেরার পথে গ্রেফতার হলেন তিনি। এই সময় ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের ২৬ নম্বর সেলে শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দিন আহমদ, আবুল মনসুর আহমেদ, রনেশ দাশগুপ্ত, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াঁ, কফিলউদ্দিন চৌধুরী, অধ্যাপক রফিকুল ইসলামসহ অনেকেই একসাথে ছিলেন। এ সময় ছাত্রনেতা শাহ মোয়াজ্জেম, শেখ মনি, হায়দার আকবর খান রনো, শ্রমিক নেতা নাসিম আলীও ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে কারারুদ্ধ ছিলেন। সাড়ে তিন মাস পরে তিনি মুক্তি লাভ করেন। সেই সময়ে বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দিন আহমদের সাথে গড়ে ওঠা সখ্য কতটা গভীর ছিল তা আমরাও দেখেছি যা মতাদর্শগত ভিন্নতা সত্বেও ১৯৭৫ পর্যন্ত অটুট ছিল। বর্তমান সময়ের বাংলাদেশের রাজনীতিতে যা বিরল।
১৯৬২ সালে কারাবাস শেষে সঙ্গীতজ্ঞ ওয়াহিদুল হকের অনুরোধে কামাল লোহানী কম্যুনিস্ট পার্টির ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা ‘ছায়ানট’ সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নতুন একটি সংগঠনকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়েছিলেন বাবা। সাড়ে চার বছর এই দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু নীতিগত কারণে ৬৬-র শেষে ছায়ানট ছেড়ে দেন তিনি। পরে মার্কসবাদী আদর্শে ১৯৬৭ সালে গড়ে তোলেন ‘ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী’। এ সংগঠনে তিনি গণসঙ্গীত শিল্পী আলতাফ মাহমুদ, শেখ লুৎফর রহমান, আবদুল লতিফ, চারণ কবি হাকিম ভাই, কবি আবু বকর সিদ্দিকীসহ তৎকালীন প্রথিতযশা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের যুক্ত করেন। ১৯৬৭ সালের ২১, ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারী ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয় ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে। আয়োজন করেন গণসংগীতের অনুষ্ঠান “ধানের গুচ্ছে রক্ত জমেছে”। শুধু আয়োজক নন এসময়ে তিনি আবৃত্তি ও উপস্থাপনায়ও পূর্ণমাত্রায় যুক্ত হয়ে পড়েন।
১৯৬৭ সালে যখন পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন পার্লামেন্টে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে অবমাননা করে বক্তব্য দেয় এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরুদ্ধে কটুক্তি করে “তিনি আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির কেউ নন” উচ্চারণ করলে পুর্ব বাংলা ফুঁসে ওঠে। আপোষহীন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠক কামাল লোহানী ‘ক্রান্তি’র জরুরী সভা ডেকে প্রতিবাদ করেন, এ চক্রান্তের বিরুদ্ধে প্রস্তাব গ্রহণ করেন। সেই প্রস্তাব থেকেই অত্যন্ত সাহসের সাথে সামরিক শাসনের মাঝেও পাকিস্তান অবজারভারের নিউজ এডিটর এবিএম মুসা নিউজ করলেন ‘Regimentation of Culture?’।
এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে শুরু হল যুথবদ্ধ আন্দোলন ‘সাংস্কৃতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা পরিষদ’, যার আহবায়ক হলেন ওয়াহিদুল হক ও কামাল লোহানী। পরিষদ ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনে তিনদিনব্যাপী রবীন্দ্র অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছিল এবং বিপুল দর্শক সমাগমে অবাঙালী গুন্ডাদের হামলার পরেও অত্যন্ত সফলভাবে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন কামাল লোহানী তাঁর প্রবল সাহস ও নিষ্ঠার মাধ্যমে।
কেবলমাত্র গণসংস্কৃতিতে নয় ষাটের দশকে পন্ডিত বারীণ মজুমদার প্রতিষ্ঠিত “মিউজিক কলেজ” এর সাথে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সম্পৃক্ত না থাকলেও এর প্রতিটি কাজে তিনি যুক্ত থেকে বারীণ মজুমদারকে সর্বতো সমর্থন ও সহায়তা করে গেছেন আশির দশক পর্যন্ত। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালে পন্ডিত বারীণ মজুমদারের একক প্রচেষ্টায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনে আয়োজিত “প্রথম পাকিস্তান সঙ্গীত সম্মেলন” এবং ১৯৭২ সালে ঢাকা স্টেডিয়ামে আয়োজিত “আলাউদ্দিন সঙ্গীত সম্মেলন” এ কামাল লোহানী অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা, শিল্পী সংগ্রহ, উপস্থাপনাসহ বিভিন্ন দায়িত্বে জোরালো ভূমিকায় থেকেছেন।
৬০ এর দশকে মস্কো-পিকিং দ্বন্দে আন্তর্জাতিক কমিউনিষ্ট আন্দোলনের বিভাজন এবং তারই ধারাবাহিকতায় ৬৬ তে ‘পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিষ্ট পার্টি’ ও ৬৭ তে ন্যাপ বিভক্ত হলে মার্কসবাদী কামাল লোহানী হতাশ হয়ে পড়লেন এবং দলীয় রাজনীতি ত্যাগ করলেন কিন্তু রাজনীতি থেকে কিছুমাত্র সরে দাঁড়াননি। তিনি তাঁর লড়াই সংগ্রামের মুখ্যক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ‘সাংবাদিক ট্রেড ইউনিয়ন’ ও ‘গণসাংস্কৃতিক আন্দোলন’। সেই সময় থেকে আমি দেখেছি দলীয় রাজনীতিতে না থেকেও কিভাবে দেশ, মাটি ও মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিজেকে পরিপূর্ণ যুক্ততায় আবদ্ধ রাখা যায়। দেখেছি কিভাবে নিজের আদর্শের প্রতি অবিচল থাকা যায়।
তিনি নিজেকে পূর্ণাংগভাবে সম্পৃক্ত করেন সাংবাদিক ইউনিয়নে, দুদফায় যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। মুক্তকন্ঠরোধে বিভিন্ন কালাকানুনের বিরুদ্ধে এবং সাংবাদিকতার অধিকার আদায়ে তিনি রাজপথে নেমে আসেন। যখন বামপন্থীরা দ্বিধাবিভক্ত আওয়ামী লীগ ৬ দফার ভিত্তিতে অভ্যন্তরীণ বিরোধ সরিয়ে দলকে তৈরীতে ব্যস্ত সেসময় ৬৭ তে কালাকানুনের বিরুদ্ধে কামাল লোহানী বজ্রকন্ঠে রাজপথ কাঁপিয়ে শ্লোগান তোলেন ‘আইয়ুব শাহী, মোনেমশাহী নিপাত যাক, নিপাত যাক’।
১৯৭০ এর নির্বাচন পরবর্তী উত্তাল সময়ে বামপন্থী সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘স্বরাজ’ পত্রিকায় বাবা কয়েকটি অগ্নিগর্ভ প্রতিবেদন রচনা করেন। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চে জয়দেবপুর ক্যান্টনমেন্টে বাঙালী জওয়ানদের বিদ্রোহ প্রসঙ্গে কামাল লোহানী রচিত প্রতিবেদন উল্লেখযোগ্য যা স্বরাজে প্রকাশিত হয় “বিদ্রোহ ন্যায়সংগত” ব্যানার হেডলাইনে। এই সময়ে সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠনগুলোকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংঘবদ্ধ করে ‘বিক্ষুদ্ধ শিল্পী সমাজ’ গঠনেও তিনি তৎপর ছিলেন।
২৫ মার্চ ক্র্যাকডাউনের সময় বাবা ছিলেন অফিসে, শিফট ইন চার্জ হিসেবে বাবা সারাদিন মিছিল মিটিংএ থাকতেন তাই রাতের শিফটের দায়িত্ব নিতেন, তখন আমাদের বাসায় ফোন ছিল না, সারারাত প্রবল উৎকণ্ঠায় কাটলো আমাদের। ২৬ তারিখ দুপুরের দিকে মতিঝিল কলোনীর ডি টাইপে বসবাসরত (সম্ভবত ৬ নম্বর বিল্ডিং) সরকারী ডাক্তার রফিক সাহেবের ছেলে লুকিয়ে আমাদের বাসায় এসে জানালো বাবা রাতে ডাক্তার সাহেবকে ফোন করে জানিয়েছেন বাসায় খবর দিতে যে তিনি নিরাপদে আছেন। বাবা ফিরেছিলেন ২৭ তারিখ কয়েক ঘন্টার জন্যে কারফিউ তুলে নেবার পরে।
এপ্রিলের ১১ তারিখে আমার দাদু মুসা লোহানীর মৃত্যু সংবাদে বাবাকে একটুও বিচলিত দেখিনি। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে প্রবাসী সরকার গঠনের খবর পাবার সাথে সাথেই তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
মে মাসের ৮ তারিখে দুটো পাঞ্জাবী পাজামা নিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন, আমরা জানলাম দাদুর মৃত্যুর কারণে তিনি গ্রামে যাচ্ছেন। কিন্তু ১০ তারিখে ফিরে এলেন সাথে আমার পরিচিত ফয়েজ আহমদ, রুমি ভাই (শহীদ), ডা. বর্ধনের পরিবার, মোহামেডানের প্রখ্যাত স্ট্রাইকার প্রতাপ হাজরা ও তার পরিবারের বিভিন্ন বয়সী অনেকে। আড়ি পেতে মা-বাবার কথায় জেনেছিলাম পথে আর্মির কারণে ফয়েজ আহমদের গ্রাম বিক্রমপুরের বাসাইলভোগ থেকে ফিরে আসতে হয়েছে। একদিন পর ১২ তারিখে বড় মামা সৈয়দ মঞ্জুর হোসেন সকলকে নিয়ে কুমিল্লার চান্দিনা হয়ে নৌকাযোগে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় গিয়ে উপস্থিত হন ১৪ মে। এ যাত্রায় রুমি ভাই ছিলেন না তবে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে ফয়েজ আহমদ, ডা. বর্ধনের পরিবার, প্রতাপ হাজরা ও তার পরিবার, বাদল রহমান (চলচ্চিত্রকার), মেসবাহউদ্দিন সাবু ও ইশরাক ভাইয়ের কথা আমার মনে আছে আর ছিলেন আমার ছোট মামা সৈয়দ দীপেন।
পরে বাবার কাছ থেকে জেনেছি আগরতলার ধর্মনগর থেকে তিনি অন্যদের সাথে ট্রেনযোগে কলকাতা যান। যাত্রাসঙ্গী প্রতাপ হাজরাদের আত্মীয়ের আমহার্ষ্ট ষ্ট্রীটের বাড়িতে ওঠেন। সেখানে থেকেই বাবা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সূত্র খুঁজতে থাকেন। এমন সময় তাঁর সাংবাদিক বন্ধু মোহাম্মদউল্লাহ চৌধুরীর সাথে তাঁর দেখা হয়, তিনি তাঁকে ‘জয়বাংলা’ পত্রিকায় নিয়ে যান। বাবা সেখানেই কাজ শুরু করে দেন। এরই মাঝে একদিন তাঁর সাথে আমিনুল হক বাদশার দেখা হয় বাংলাদেশ মিশনের সামনে।
বাবার কাছে শুনেছি আমিনুল হক বাদশা অনেকটা ‘হাইজ্যাক’ করার মতো তাঁকে ট্যাক্সিতে উঠিয়ে নিয়ে যান বালীগঞ্জ সার্কুলার রোডে। সেখানে তখন আয়োজন চলছিল ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’-এর ৫০ কিলোওয়াট মিডিয়াম ওয়েভ ট্রান্সমিটার উদ্বোধনের। বালীগঞ্জের এই বাড়ি থেকে তিনি গেলেন ৮ নং থিয়েটার রোডে প্রবাসী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে, তাজউদ্দীন আহমেদ বাবাকে বার্তা বিভাগের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করলে, বাবা কাজ শুরু করলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। প্রচলিত রীতির যন্ত্রপাতি ও স্টুডিও ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও এই শক্তিধর ট্রান্সমিশনটি উদ্বোধন করা হয়েছিল ২৫ মে নজরুল জয়ন্তীতে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কামাল লোহানী কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি আবৃত্তি করলেন।
স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রে সংবাদ বিভাগে যোগ দিয়েছেন সৈয়দ হাসান ইমাম যিনি প্রথম সংবাদ পাঠ করলেন ‘সালেহ আহমদ’ নামে। কামাল লোহানী স্বাধীন বাংলা বেতারে কন্ঠ দিতেন ‘আবু নঈম’ নামে, আগষ্টের পরে মা আর উর্মি কলকাতা পৌঁছনোর পরে নিজের নামেই সম্প্রচার করতেন।
বিপ্লবী বেতারে কি আর বসে থাকা যায়। যখন যে দায়িত্ব দেয়া হবে, তখন সেটা পালন করতেই হবে। তাই বাবা সংবাদ বিভাগ সংগঠন করা ছাড়াও সংবাদ পাঠ, কথিকা লেখা ও প্রচার, ঘোষণা, শ্লোগান দেয়া ইত্যাদিতে কণ্ঠ দিয়েছেন। বিদ্রোহী বেতারে সবাই কর্মী এবং প্রয়োজনে সকলকে সবকিছুই করতে হয়। তিনি ভারতীয় গীতিকার গোবিন্দ হালদারের কাছ থেকে তাঁর লেখা গানের খাতা সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন সমর দাস আর আপেল মাহমুদকে, এরাই সুর করেছিলেন “একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি”,“পুর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে” এর মত উত্তাল গানগুলো।
১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে স্বাধীন বাংলা বেতারে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের প্রথম বার্তাটি লিখেছিলেন কামাল লোহানী এবং বিশ্ববাসীর কাছে সেই বিজয় বার্তা পৌঁছেছিল তাঁরই কন্ঠে। বাবার কাছে শুনেছি পাকিস্তানীদের প্রতি ধিক্কার, ঘৃণা, ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ছিল পাঁচ লাইনে একটি বাক্যের সেই ঘোষণা।

দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্য …

লেখক: সাগর লোহানী, কামাল লোহানী পুত্র, সম্পাদক, বাঙালীয়ানা

পড়ুন
সময়ের সাহস কামাল লোহানী – শেষ পর্ব 

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.