সলঙ্গা বিদ্রোহ ও গণহত্যা

Comments

১৯২২ সালের ২৭ জানুয়ারী শুক্রবার, তৎকালীন পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার উল্লাপাড়ার কাছেই সলঙ্গা হাট। সলঙ্গা পাবনা জেলার একটি বর্ধিঞ্চ ব্যবসায়িক জনপদ। সপ্তাহে ২ দিন হাট বসতো। গোটা উওরবঙ্গের মধ্যে সলঙ্গা হাট ছিলো প্রধান। আশেপাশে বিভিন্ন জেলা থেকে বিভিন্ন ধরণের পণ্যসামগ্রী, গবাদি পশু বেচাকেনার জন্য এই হাটে আনা হত। হাটবারে সলঙ্গায় হাজার হাজার লোক সমাগত হত। শুক্রবার ছিল বৃহত্তর হাটের দিন।

গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিলেতী পণ্য সামগ্রী এবং মদ বর্জনের আন্দোলন চলছিলো এই হাটে। আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের কর্মীরা সলঙ্গা হাটে নেমেছে বিলেতি পণ্য ক্রয় বিক্রয় বন্ধ করতে।

এই স্বদেশী আন্দোলনের কর্মীদের রুখতে ছুটে আসে তদানিন্তন পাবনা জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আর এন দাস, জেলা পুলিশ সুপার ও সিরাজগঞ্জ মহকুমা প্রসাশক এস কে সিংসহ ৪০ জন সশস্ত্র লালপাগড়ী পুলিশের একটি দল। কিন্তু নিরপরাধ জনতা ছিল নিরস্ত্র। তবে বুকে ছিলো স্বাধীনতার চেতনা।

সলঙ্গার গো-হাটায় ছিল বিপ্লবী স্বদেশী কর্মীদের অফিস। পুলিশ এসে তার ব্যাটেলিয়ন নিয়ে বিপ্লবীদের অফিস ঘেরাও করে গ্রেফতার করে নেতৃত্বদানকারী আবদুর রশীদ তর্কবাগীশকে। সঙ্গে সঙ্গে জনতার মধ্যে থেকে ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপার ও মহকুমা অফিসারদের ঘিরে জনতা তাদের প্রাণপ্রিয় নেতাকে উদ্ধারের জন্য মিছিল বের করে। পুলিশ মদের দোকানের কাছে অবস্থান নেয় এবং উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে পুলিশের ৩৯ জন সদস্য আন্দোলনকারী ও সাধারণ হাটুুরে জনতার উপর গুলিবর্ষণ করে। ব্রিটিশ পুলিশের একজন ব্রাহ্মণ সদস্য নিরস্ত্র জনতার উপর গুলিবর্ষণে অস্বীকৃতি জানিয়ে তা থেকে বিরত থাকে।

গুলিবর্ষণে কয়েক হাজার (কারো মতে ৪৫০০ কারো মতে ১০০০০) প্রতিবাদী মানুষ ব্রিটিশ পুলিশবাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারাল। আহত হল ৪৫০০-এরও বেশি। নিহতদের লাশের সাথে সংজ্ঞাহীন আহতদের উঠিয়ে নিয়ে ব্রিটিশ পুলিশ সিরাজগঞ্জের রহমতগঞ্জে গণকবর দিল।

সলঙ্গা হাটের হত্যাকান্ডের ঘটনা জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের চেয়ে কম ভয়ংকর ও নৃশংস ছিল না। তথাপি ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে, উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এই শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে চাপা পড়ে যায়। বস্তুতপক্ষে ভারতীয় উপমহাদেশে ১৯২২ সালের বৃটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে সলঙ্গা হত্যাকান্ডের ঘটনা যেমন সবচেয়ে নৃশংস পাশবিক তেমনি নিহতের সংখ্যা সর্বাধিক। সংবাদপত্রের উপর সে সময় বৃটিশদের কড়া নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও আনন্দবাজার, অমৃতবাজার, নায়ক এবং অন্যান্য পত্র-পত্রিকায় বহুদিন ধরে সলঙ্গা হত্যাকান্ডের খবর এবং সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশিত হয়।

প্রায় শতবর্ষ পরেও এ বিদ্রোহ অনেকের কাছেই অজানা। এটা স্বাভাবিক, কারণ সেদিন পাবনা জেলার (বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলা) সলঙ্গার হাটের যে গণবিদ্রোহ ও হত্যাকান্ড ঘটেছিল তা নিয়ে খুব বেশি লেখালেখি হয়নি। কালক্রমে এই উপমহাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস এ বাঙালী মুসলমান নেই বললেই চলে। মুসলমানদের বীরোচিত কাহিনী এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। স্বল্প সংখ্যক বাঙালী মুসলিম ইতিহাস ও শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট যারা ছিলেন তারাও বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি সম্ভবত সলঙ্গা বিদ্রোহে ধর্মীয় উপাদানের অভাবে। দুঃখজনক শুধু নয় বিস্ময়করও বটে যে এ ঘটনাটি ইতিহাসের কাদায় চাপা পড়ে গেছে। তবে, মাওলানা আব্দুর রশীদ সলঙ্গা বিদ্রোহ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিতে নাড়া দিয়েছিলেন।

সলঙ্গার রক্তসিক্ত বিদ্রোহ শুধু বাংলার মাটি নয় সিক্ত করেছে সমগ্র উপমহাদেশ। রক্তভেজা পিচ্ছিল পথে অহিংস, অসহযোগ আন্দোলনে যা কিছু অর্জিত হয়েছে তা সলঙ্গা বিদ্রোহেরই ফসল। যে শাহাদাতের রক্তপিচ্ছিল পথ মাড়িয়ে ভারতবর্ষ থেকে এক সময় শোষণের হাত গুটাতে বাধ্য হয়েছিল ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা, সেই পথ ধরেই কিছুকাল পরে জন্ম নিয়েছে স্বাধীন একটি ভূখণ্ড—বাংলাদেশ, একটি মানচিত্র আর লাল সবুজের পতাকা।

বর্তমানে, ২৭ জানুয়ারী সেইসব শহীদদের স্মরণ করে “সলঙ্গা দিবস” পালিত হয়।

আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ

১৯০০ সালের ২৭ নভেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়ার তারুটিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তর্কবাগীশের মধ্যে দেশপ্রেমের উন্মেষ ঘটে৷ ১৩ বছর বয়সে তিনি জমিদার মহাজনদের বিরুদ্ধে দুধ বিক্রেতাদের সংগঠিত করে দুধের ন্যায্যমূল্য দিতে মহাজনদের বাধ্য করেন। (১৯২০-১৯২২) সালে মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন৷ এ সময় তিনি সভা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আন্দোলনের সপক্ষে জনমত গড়ে তোলেন এবং সলঙ্গাহাটে কংগ্রেসের অফিস প্রতিষ্ঠা করেন।

তরুণ নেতা মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের নেতৃত্ব দেয়া ব্রিটিশবিরোধী ঐতিহাসিক ‘সলঙ্গা বিদ্রোহ’ ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘রক্তসিঁড়ি’ হিসেবে পরিচিত৷

Abdur Rashid Tarkabagish02
মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ায ও সলঙ্গা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে মাওলানা আবদুর রশীদকে কারাদন্ড ভোগ করতে হয়। ফলে তার এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা হয়নি৷ পরবর্তীকালে তিনি যুক্ত প্রদেশের বেরেলি ইশতুল উলুম মাদ্রাসা, সাহারানপুর মাদ্রাসা, দেওবন্দ মাদ্রাসা ও লাহোরের এশাতুল ইসলাম কলেজে পড়েন এবং তর্কশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করে তর্কবাগীশ উপাধিতে ভূষিত হন৷

১৯৩৩ সালে রাজশাহীর চাঁটকৈড়ে নিখিলবঙ্গ রায়ত খাতক সম্মেলন আহ্বান করে ঋণ সালিশী বোর্ড আইন প্রণয়নের প্রস্তাব রাখেন তিনি৷ মওলানা তর্কবাগীশ ১৯৩৬ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং ১৯৩৭ সালে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে নাটোরে কৃষক সম্মেলন আহ্বান করেন৷ তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একজন ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন৷ ১৯৩৮ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে তিনি বাংলা, আসাম ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন৷ ১৯৪৬ সালে তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন ৷ তিনি অবিভক্ত বাংলার এম.এল.এ হিসেবে  তৎকালীন ব্যবস্থাপক পরিষদে পতিতাবৃত্তি নিরোধ, বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা ও বিনা ক্ষতি পূরণে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের প্রস্তাব উত্থাপন করেন ৷

১৯৫২ সালের  একুশে ফেব্রুয়ারী ঢাকার রাজপথ যখন ছাত্রদের বুকের রক্তে রঞ্জিত, তখন লেজিসলেটিভ অ্যাসেমব্লিতে প্রতিবাদে গর্জে উঠেন মওলানা তর্কবাগীশ। তিনি বলেন, “আমাদের বক্ষের মানিক ছাত্রদের রক্তে রাজপথ লাল হয়ে গেছে, এই অবস্থায় অ্যাসেমব্লি চলতে পারে না। আগে প্রতিকার চাই”। সেদিন রাতেই তিনি পদত্যাগ করলেন মুসলিম লীগ থেকে। যে দলের সরকার বাংলাভাষার দাবী ভূলুণ্ঠিত করেছে, “যারা বাঙালীর বুকে গুলি চালিয়েছে, তাদের সঙ্গে তর্কবাগীশ থাকতে পারে না”।

১৯৫৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং ঐ বছর ১ জুন তিনি মুক্তিলাভ করেন। এরপর তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এবং ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ ও ১৯৫৬ সালে যথাক্রমে মারি ও লাহোরে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলায় বক্তৃতা প্রদান করে তিনি বাংলা ভাষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। তিনি ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন।

শেখ মুজিবুর রহমান স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে নতুন আন্দোলনের রূপরেখা হিসেবে “৬ দফা” উত্থাপন করলেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকেই এর বিরোধীতা করেন। ১৯৬৬ সালের ১৩ মার্চের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকেই মতবিরোধের এক পর্যায়ে দলের সভাপতি মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ তার অনুসারীদের নিয়ে বৈঠকস্থল ত্যাগ করেন। ১৮ ও ১৯ মার্চ ইডেন হোটেলে দলের বিশেষ কাউন্সিলেও তিনি অনুপস্থিত থাকায় সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম সভাপতিত্ব করেন। ১৯ তারিখের কাউন্সিলেই ১৪৪৩ জন কাউন্সিলর শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করেন।

মওলানা তর্কবাগীশ ছয়দফার বিরোধীতা করে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (পিডিএম)-পন্থি আওয়ামী লীগের পূর্ব পাকিস্তান শাখার এডহক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের পর তিনি মূল আওয়ামী লীগে প্রত্যাবর্তন করেন।

Abdur Rashid Tarkabagish_Mujib_Bhasani
মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, শেখ মুজিবর রহমান ও মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ।

১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি পাবনা-২ আসন থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে তিনি মুজিবনগরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেন। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ অধিবেশনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে খন্দকার মোশতাক ক্ষমতা দখল করলে ১৬ আগষ্ট মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ খন্দকার মোশতাক সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে বিবৃতি দেন।

১৯৭৬ সালের অক্টোবর মাসে তিনি গণ আজাদী লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং এ দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৩ সালের ৩০ জানুয়ারী তাঁর সভাপতিত্বে ১৫টি রাজনৈতিক দলের এক যৌথসভায় ১৫ দলীয় জোট গঠিত হয়। জোটের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে তিনি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিশিষ্ট ভূমিকা রাখেন।

মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আপোসহীন মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট ঢাকার পিজি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে।

বাঙালীয়ানা/এসএল

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.