সাতটি কৃষ্ণচুড়ার বুক চিরে উজ্জ্বল ২৪ এপ্রিল । কামাল লোহানী

Comments

হানিফ শেখ
আনোয়ার হোসেন
সুখেন ভট্টাচার্য
দেলওয়ার
সুধীন ধর
কম্পরাম সিং
বিজন সেন

১৯৫০-এর ২৪ এপ্রিল। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে ওরা সাতজন প্রাণ দিলেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলন তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান স্বৈরাচারী লীগ শাসনের নাগপাশ থেকে জনগণের মুক্তির লড়াইয়ে শামিল রাজনীতিসচেতন, সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষায় উদ্বুদ্ধ এই সাতজন প্রগতিবাদী কর্মী নির্দ্বিধায় অনাচার রুখে দাঁড়িয়ে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে খাপড়া ওয়ার্ডে বিদেশি শোষকদের স্বার্থ সংরক্ষণকারী ভাড়াটিয়াদের হাতে প্রাণ দেন বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে। কেউ কেউ চিরজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন, কেউ বা বিকলাঙ্গ।

শহীদ হানিফ শেখ, আনোয়ার হোসেন, সুখেন ভট্টাচার্য, দেলওয়ার হোসেন, সুধীন ধর, কম্পরাম সিং ও বিজন সেন। ওরা বীর, আকাশে জাগাত ঝড়। ত্রাসের কাঁপন তুলত শোষকের প্রাণে। ওরা বাঁচতে চাইত এই সুন্দর পৃথিবীতে, সুখময় এই ভূখণ্ডে। ওরা গড়তে চেয়েছিল প্রাণপ্রাচুর্যে উচ্ছল একটি দেশ, চেয়েছিল মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে নবনবীন সমাজ গড়তে, চেয়েছিল শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে মানুষের হৃদয়ে সখ্য ও সাম্যের বীজ বপন করতে।

কিন্তু যারা প্রাণের প্রাচুর্য নয়, প্রাণ হরণ করতে চায়, বিভেদের বিষবাণ ছুড়ে সমাজবদ্ধ মানুষকে করতে চায় দ্বিধাবিভক্ত, প্রাণের প্রদীপ আলোকে আলোকময় প্রাঙ্গণে যারা প্রকাশ করতে ভয় পায়, মানুষের প্রাণকে উপঢৌকন দিয়ে যারা আপন লোভী আকাঙ্ক্ষাকে পূর্ণ করতে চায়- তারা হত্যা করল মানুষগুলোকে, হত্যা করতে চাইল মানুষের জীবনপ্রয়াসী অভিযাত্রাকে।

ওরা সাতজন শহীদ। ওদের প্রাণের বিনিময়ে তৈরি হল রক্তিম অভিযাত্রার নতুন সংগ্রামের সড়ক। যে সড়কের কালো পিচের ওপর ঘটে গেল বাংলার জাতীয় চেতনার উন্মেষ- ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। আর এ পথ বেয়েই কাফেলা রক্তবীজ বপন করল। সৃষ্টি হল নতুন দিনপঞ্জি। ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হল সাধারণ নির্বাচন। জনগণের উত্থানে ভাসিয়ে নিয়ে গেল স্বৈরশাসন শিরোমণি মুসলিম লীগকে।

শেরেবাংলা আবুল কাসেম ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলনের যৌথ প্রয়াসে ভেঙে চুরমার করে দিলেন সাদ্দাতের বেহেশত। এদেশের নিপীড়িত মানুষ নিজেদের বুকের ওপর থেকে জগদ্দল পাথর অপসারণের পক্ষে নিরঙ্কুশ রায় দিল। কিন্তু পরাশক্তির স্বার্থ সংরক্ষণকারী তদানীন্তন মুৎসুদ্দীদের পূর্ববাংলা অঞ্চলের সিংহাসন কেঁপে উঠতে দেখে প্রভুর পরামর্শ এলো- ভেঙে দাও যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা, সবাইকে বন্দি করো। চালাও স্টিমরোলার। তাই ৫৪-র ২৯ মে’তে সেদিনের পূর্ব পাকিস্তানে জারি হল ৯২-ক ধারা। গভর্নরি শাসন। নির্মম নির্যাতন আর বাংলার সম্পদ অপহরণের গতি প্রচণ্ডবেগে চলতে লাগল।

এমনি ধারা বহন করে ১৯৫৮ সালে দেশময় আইয়ুবখানি শাসন প্রবর্তিত হল। নিকষ কালো অন্ধকারের হল সূচনা। কিন্তু বাংলাদেশের সংগ্রামে গর্বিত ছাত্র সমাজ গর্জে উঠল ১৯৬২ সালে। আইয়ুবের কালো দশকে বাংলা হল গণঅভ্যুত্থানের বিসুভিয়াস। এরপর একধারে সৃষ্টি হল ঊনসত্তর, সত্তর, একাত্তর। বিক্ষুব্ধ বাংলার অগণিত মানুষের ঘৃণা আর ক্রোধের বিস্ফোরণ ঘটল। আইয়ুবের উত্তরাধিকারী ইয়াহিয়া পাততাড়ি গুটিয়ে পালাল এদেশ থেকে। প্রমত্ত বাংলার দুরন্ত সন্তানদের হাতে অস্ত্রের ঝনৎকার ভাড়াটিয়া হানাদারদের বুকে ত্রাসের কাঁপন লাগিয়ে দিল। ওরা আত্মসমর্পণ করল বাংলাদেশের মানুষের কাছে।

১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বাংলার মানুষের ওপর যে নির্মম নৃশংস নির্যাতন চলছিল তার বিরুদ্ধে রাজশাহী জেলার নাচোল, ময়মনসিংহের হাজং আর সিলেটের সানেশ্বরে কৃষকরা প্রতিরোধের গণদুর্গ গড়ে তুলেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় অন্ধ মানুষের মরণকামড় সাময়িক হলেও সে দুর্গকে ভেঙে দিয়েছিল; দুর্গের প্রহরী মানুষদের নির্মম নির্বিচার গণহত্যার শিকারে পরিণত করেছিল। সেদিনের অগণিত বিদ্রোহী কৃষকের খুন সবুজ মাঠে জমাট বেঁধেছিল।

পঞ্চাশের এই দিনে রাজশাহী জেলে রাজবন্দি হত্যার তাজা রক্ত বায়ান্নর তরুণ প্রাণের তপ্তলহু এসে মিশল ঊনসত্তর আর একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের সমুদ্রে। এদের সবাই স্বৈরাচারের নিপাত চাইল প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয়ার আকাঙ্ক্ষায়, মুক্ত স্বদেশ দেখার স্বপ্ন বুনল।

পঞ্চাশের এই বীর সাত অকুতোভয় সৈনিকের লালরক্ত আমাদের যাত্রাপথে শোনায় বরাভয়। ওরা সেদিন দেশকেই শোষণহীন সমাজে পরিণত করার সংগ্রামে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন। ওদের মতো এদেশের সব মানুষই চায় মানুষের মতো বাঁচতে। খেয়েপরে নিরাপদ আশ্রয়ে দিনাতিপাত করতে।

তাই এদেশের মানুষের কল্যাণ কামনায় যারা এযাবৎ প্রাণ দিয়েছেন, ওরা আমাদেরই লোক। ওদের ভুলতে পারি না। যে নামেই ওদের পরিচয় হোক- হানিফ, সুখেন, আনোয়ার, সুধীন, দেলওয়ার, কম্পরাম ও বিজন সেন অথবা সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বার কিংবা আসাদ, জোহা, মতিয়ুর, বাবুল, ওয়াজিউল্লাহ, সিরাজ, প্রেমানন্দ, বাদল, সামাদ এমন অগণিত নাম আছে ওদের; কিন্তু পরিচয় এক- ওরা শহীদ- শত্রুরা ওদের হত্যা করেছে।

ইতিহাসের পথপরিক্রমায় বারবার চব্বিশে এপ্রিল আসে সেই হিসেবের তাগিদ নিয়ে।

১৯৪৯ সালে রাজশাহী জেলে অনশন ধর্মঘট করলেন রাজনৈতিক বন্দিরা নিজেদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে; কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাদের বিচারের প্রহসন করল- আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল বলে অভিযোগ এনে দিল এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড। শাপে বর হল। রাজবন্দিদেরও স্থান হলো কয়েদিদের সঙ্গে। ফলে কয়েদিদের সাথে রাজনৈতিক বন্দীদের যোগাযোগ হলো সহজ ও সরাসরি। কাজও প্রায় একইরকম করতে দিল। তখন কয়েদিদের দিয়ে ঘানি টানা, গম মাড়াই ও পেষাই ইত্যাদি অমানুষিক কাজ করানো হতো।

পশুর কাজ মানুষ করতে না পারলেই শুরু হতো অকথ্য দৈহিক নির্যাতন। আবার খেতেও দেয়া হতো না ঠিকমতো। কয়েদিরা এসব নীরবে সহ্য করত ভয়ে। কিন্তু রাজবন্দিরা তাদের সঙ্গে আসায় ধীরে ধীরে বিষয়টি বুঝতে শুরু করল। দাবি উঠল ‘মানুষ ঘানি টানবে না, ভালো খাবার দিতে হবে। বন্দিদের ওপর মারধর করা চলবে না।’

স্মারকলিপি তৈরি হল এবং যথাসময়ে পেশ করা হল কর্তৃপক্ষের কাছে। কয়েদিদের আবার দাবি কিসের- এই চিন্তায় উপেক্ষা করল, কিন্তু সংগঠিত কয়েদিরা অবিচল। দাবি না মানলে অনশন করবেন সবাই। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় কোনো লাভ হল না। অবশেষে ধর্মঘটে যেতে হল তাদের।

সহস্রাধিক সাধারণ বন্দি অনশন করছেন আর তাদের সমর্থনে অনশন ধর্মঘট করছেন রাজবন্দিরাও। এ খবর যেভাবেই হোক গিয়ে ঢাকায় পৌঁছল, টনক নড়ল কর্তাদের। কারাগারের বড়কর্তা আইজি আমীর হোসেন রাজশাহী জেল সফরে এসে কয়েদি ও রাজবন্দি দু’দলকেই বোঝানোর চেষ্টা করল অনশন ত্যাগ করার জন্য; কিন্তু আমীর হোসেন ব্যর্থ হয়। অনশন ধর্মঘট চালিয়ে যেতে অবিচল থাকেন সবাই।

এবারে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির আশ্রয় নিয়ে আইজি জেলসুপার বিল সাহেবকে পরামর্শ দিল ‘রাজবন্দি কয়েকজনকে সরিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে যান তাহলে সব ঠিক হয়ে যাবে।’ কিন্তু রাজবন্দিরা কেউ তাদের নিজেদের জায়গা খাপড়া ওয়ার্ড ছেড়ে যেতে রাজি নন।

এদিকে সাত দিন চেষ্টা করেও যখন কিছু হচ্ছে না তখন রাজবন্দি ও কয়েদিদের কয়েকজন প্রতিনিধি ডেকে এনে জেলগেটে বলল, আপনারা অনশন প্রত্যাহার করুন। এর জবাব উল্টো এলো। তার পরদিন ১৫ এপ্রিল আবার আইজির অনুরোধ এবং এবারের আশ্বাস- মারপিট করা হবে না, নিজেদের পয়সায় তামাক কিনতে দেয়া হবে ইত্যাদি।

কিছুটা বোধহয় চিড় ধরল। এই সুযোগে রাজশাহী জেলার খেলার মাঠে আড়াই হাজার কয়েদিকে সমবেত করল আর আমীর হোসেন বক্তৃতা ঝাড়ল, ‘কমিউনিস্টরা বাইরে কিছু করতে পারছে না। ভেতরে আপনাদের উসকে দিয়ে নিজেদের সুবিধা লোটার তালে আছে। আপনারা কমিউনিস্টদের ফাঁদে পা দিয়ে বিপাকে পড়বেন না।’ আর রাজবন্দিদের লকআপে গিয়ে শাসিয়ে আসল, ‘জেলের ভেতরে আপনারা বিপ্লব করছেন? ঠিক আছে, এর পরিণাম দেখতে পাবেন।’

এদিকে সব চুপচাপ। কর্তৃপক্ষ যা পরামর্শ দেয়ার হয়তো দিয়েছে। আমীর হোসেন পাড়ি জামিয়েছে ঢাকায়। তারপরই নেমে এল ২৪ এপ্রিল ১৯৫০। অনশন ভঙ্গ করতে ব্যর্থ হয়ে জেল কর্তৃপক্ষ তাদের ক্ষমতার দম্ভ নিয়ে উপস্থিত হলো খাপড়া ওয়ার্ডে। রাজবন্দিরা তাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্র, চৌকি, নারকেল ছোবড়ার গদির সাহায্যে ওয়ার্ডের দরজা বন্ধ করে গায়ের সব শক্তি দিয়ে ওদের ভেতরে আসা ঠেকাবার চেষ্টা করতে থাকল। এদিকে চারদিকে পজিশন নেয়া জেলপুলিশ বেপরোয়া গুলি চালাল এবং অল্পক্ষণেই সারা খাপড়া ওয়ার্ড রক্তে প্লাবিত হয়ে গেল।

বন্দিদশায় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রথম শিকার হন কুষ্টিয়া মোহিনী মিলের শ্রমিকনেতা হানিফ শেখ। এরপর চারদিক নিস্তব্ধ ভেবে খুলনার বিপ্লবী ছাত্রনেতা আনোয়ার মাথা উঁচিয়ে যেই না দেখতে গেছেন, অকস্মাৎ একটি গুলি এসে তার মাথার খুলি উড়িয়ে নিয়ে গেল। পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞে ধীরে ধীরে সুখেন, দেলওয়ার ও সুধীন ধর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।

গুলিবর্ষণ শেষ হলেও কিন্তু পৈশাচিকতার অবসান হল না। আরেক দল পুলিশ এবার ঢুকল লাঠিহাতে। মৃত্যুযন্ত্রণায় আহত রাজবন্দিরা কাতরাচ্ছেন, তাদেরই ওপর চলল নির্মম লাঠিচার্জ। মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর এক রাজবন্দি একটু পানি চাইলেন; কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল জেলার মান্নান, সে এক সেপাইকে তার মুখে প্রোস্রাব করে দিতে নির্দেশ দিল।

জেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে খবর পেয়ে একদল সশস্ত্র পুলিশ নিয়ে জেলে হাজির হলেন রাজশাহী পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট। তিনি এসে দেখলেন, তাকে যে সংবাদ দেয়া হয়েছে, রাজবন্দিরা জেলগেট ভেঙে চলে যেতে চাইছে সেটা মিথ্যা। ঘটনা ঘটেছে উল্টো। রক্তে রঞ্জিত খাপড়া ওয়ার্ড দেখে তিনি ক্রোধান্বিত হয়ে জেল কর্তৃপক্ষকে গালামন্দ করে পুলিশ বাহিনী নিয়ে ফিরে গেলেন। এই এসপি ছিলেন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পেশোয়ারের বাসিন্দা।

এদিকে অনেকে আহত অবস্থায় রক্তাত্ত মেঝেয় পড়ে রইলেন। দিনাজপুরের তেভাগা আন্দোলনের বীরসেনানী কম্পরাম সিং ও প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতা বিজন সেন পরে শহীদ হলেন।

এদিকে যারা শহীদ হলেন তাদের প্রত্যেকেরই লাশ সরিয়ে ফেলা হল। কোনো আত্মীয়কে পর্যন্ত খবর দেয়া হলো না। যারা আহত হয়েছিলেন তাদের অনেকেই পরবর্তীকালে পঙ্গু হয়ে গেলেন।

সাতটি কৃষ্ণচুড়ার বুক চিরে যে দিনটি চিহ্নিত হয়েছে সেই দিন চব্বিশে এপ্রিল। স্মরণীয় এই দিন। বরণীয়, এই দিনে সুখি দেশ গড়তে প্রাণপাত করে গেছেন তাঁরা।

লেখক:
কামাল লোহানী
কামাল লোহানী, ভাষা সংগ্রামী, শব্দসৈনিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.