সাদাকালো পাঠ্যবই । অটল ভৌমিক

Comments

স্কুল কলেজে পড়াশোনার ক্ষেত্রে বিভাজনের যে কথাটি আমরা প্রায়ই বলি সেটির একটি দৃশ্যমান উদাহরণ আপনি পাবেন যখন আপনি ক্লাস সিক্স থেকে ক্লাস টেনের বইগুলো দেখবেন। প্রথম আলো পত্রিকাটিতে কিছুকাল ধরে এই পাঠ্যবই সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো ছাপা হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে আমি অথবা আমরা এই বিষয়টি নিয়ে ছাত্রজীবনে অনেক দিন ধরেই ভেবেছি। তাই এই ব্যাপারে আমার মৌলিক চিন্তার সবিশেষ বিবরণের সারসংক্ষেপ তুলে ধরতে আমার ভালোই লাগবে।

শুরুতে যে বিভাজনের কথাটি বলছিলাম, ক্লাস সিক্সে ছেলে এবং মেয়েদের বই আলাদা হয়ে যায়। এবং মেয়েদের হাতে গার্হস্থ্য অর্থনীতি আর ছেলেদের হাতে কৃষিশিক্ষা নামক দুটো বই তুলে দেয়া হয়। মনে হয় এইটাই নিয়তি নির্ধারিত যে ছেলেরা মাঠে কাজ করবে আর মেয়েরা পুরুষের যৌন পিপাসা মিটায়ে অবসরে গৃহস্থালী কাজে ব্যস্ত রবে। এখন আপনি নিজেই সাদা চোখে বুঝতে পারছেন যে এইখানে মেয়ে এবং ছেলেদের মধ্যে স্পষ্টত একটি বাউন্ডারি লাইন টেনে দেয়া হচ্ছে। তার মানে আমি সেই জায়গাতেই আপত্তি জানাচ্ছি যে, স্কুলে ছেলে এবং মেয়েদের আলাদা বই থাকার ব্যাপারটি আমি মানি না৷ এটি একধরনের প্রকট বর্ণবাদী আচরণ। এবং আচরণটি করছে স্বয়ং রাষ্ট্র; যার দায়িত্ব আসলে নাগরিকের মধ্যকার বৈষম্যমূলক আচরণ না হোক এইটা নিশ্চিত করা।

এখন ধরে নিচ্ছি আপনার অভিযোজনের ক্ষমতা খুব বেশি এবং আপনি খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। আপনার চরিত্রের এই নতজানু বৈশিষ্ট্যের কারণে আপনি এই রাষ্ট্রীয় অন্যায়টি মেনে নিলেন। এখন তবে এর ঠিক পরের ধাপে কী হচ্ছে সেটা জেনে নিন।

প্রথম আলোর খবরে একজন লিখেছেন, নবম শ্রেণির গার্হস্থ্য অর্থনীতি বইয়ে মেয়েদের শারীরিক গঠনের সাথে মানিয়ে কীভাবে আকর্ষণীয় (সেক্সি) ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলা যাবে সেই বিষয়ক দুটো চ্যাপ্টার রয়েছে।

এবং সেই বইয়ে লেখা আছে, কালো হওয়া, মোটা হওয়া, শরীরে জন্মগত দাগ থাকা, কোমর মোটা হওয়া, স্তন স্ফীত না হওয়া ইত্যাদি মেয়েদের খুঁত এবং এই খুঁত ঢেকে রেখে কীভাবে পারিবারিক অনুষ্ঠান বা বিয়ের অনুষ্ঠানে (যেখানে অনেক পুরুষ নারীদের মাংস ভোজনের গোপন ইচ্ছা তাদের রক্তলোলুপ চোখে প্রকাশ করার সুযোগ পায়) নিজের ফর্সা এবং সুন্দরী বোনকে টেক্কা দিয়ে নিজেকে আরো সেক্সি আরো মাংসাশী করে প্রদর্শন করে পুরুষের ভোগের থালায় উপস্থাপন করানো যায়।

আপনি অবিশ্বাস করতে পারেন যে এরম কিছু আসলেই লেখা আছে কী না। আর আমি আপনাকে বলতে চাই, যে রাষ্ট্রের স্কুলে এগারো বছর বয়সে শেখানো হয় ছেলেদের কাজ মাঠে আর মেয়েদের কাজ সেক্স আর থালাবাসন মাজাতে, সে রাষ্ট্রের বইয়ে কেনো জ্ঞান বিজ্ঞানের কথা থাকবে?

প্রথম যে অন্যায়টি ক্লাস সিক্সে থাকতেই আপনার সাথে হলো সেটি আপনি মেনে নিলেন। এখন ক্লাস নাইনে এসে আপনার বা আপনার সন্তানের সাথে যে অন্যায়টি হয়েছিলো বা হচ্ছে সেটি আপনি যদি মেনে নেন তবে আপনি তেলাপোকার মতোই কোটি বৎসর টিকে থাকার যোগ্যতা রাখেন।

আমরা বক্তৃতায় ময়দানে প্রায়ই যা বলি তা খুব সহজ। মানুষের স্বাধীনতায় রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারে না। যতক্ষণ না সেটা অন্যের ক্ষতি করছে। একটা মোটা মেয়ে টাইট জিন্স পরে হাঁটলে তাতে নিশ্চয়ই কারোর প্রাণ সংশয় হবে না। হ্যাঁ, আপনি বলতে পারেন আপনার এইসবে ইরেকশন হয়ে যায়, সেটি নিতান্তই আপনার শিশ্নের সমস্যা।
একটা পাঠ্যবইয়ে কীভাবে কালো মোটা মেয়েদেরকে বলতে পারে, এইসব হচ্ছে তার শরীরের খুঁত? এখন এই ক্ষতচিহ্ন শরীরে নিয়ে যদি কোনো মেয়ে আত্মহত্যা করে ফেলে এর দায় রাষ্ট্র কীভাবে নিবে?

আমার এক প্রেমিকার শরীরের একটা জায়গায় বিশাল কালো এক দাগ ছিলো। আমি সেখানেই চুমু খেতাম আর আমি জানতাম এই দাগটা তাকে হীনমন্যতার অনুভূতি দিতে পারে। তাই আমি সবচে বেশি ভালোবাসতাম তার ওই দাগ যেনো সে গ্লানিকর জীবনের পথে হেঁটে না যায়। আর আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আমাদেরকে হীন চরিতার্থ করবার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।

*এই বিভাগে প্রকাশিত লেখার মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাঙালীয়ানার সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকা অস্বাভাবিক নয়। তাই এখানে প্রকাশিত লেখা বা লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা সংক্রান্ত আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় বাঙালীয়ানার নেই।

বাঙালীয়ানা/এআর

মন্তব্য করুন (Comments)

comments

Share.

About Author

বাঙালীয়ানা

বাঙালীয়ানা স্টাফ করসপন্ডেন্ট